৫০০ বছর ধরে চিকিৎসাবিদ্যার রেফারেন্স ইবনে সিনা’র যে বই

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৫ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

৫০০ বছর ধরে চিকিৎসাবিদ্যার রেফারেন্স ইবনে সিনা’র যে বই

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১৯ ২ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৫:২৪ ২ এপ্রিল ২০২১

ছবিঃ সংগৃহীত

ছবিঃ সংগৃহীত

আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগের ঘটনা। তখন দেহের চিকিৎসা বলতেই কিছু ছিল না, মনের চিকিৎসা তো দূরের কথা। কিন্তু সেই সময় একজন চিকিৎসক চিকিৎসাবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিককে যে মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন আজ হাজার বছর পরও তার প্রাসঙ্গিকতা হারায় নি।

বলছি ৯৮০ খৃষ্টাব্দে জন্ম নেয়া কালজয়ী এক মহামনীষী ইবনে সিনার কথা। তার ‘চিকিৎসক’ পরিচয়টিই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। কিন্তু তা সত্যেও তিনি ছিলেন আসলে একজন সর্ববিদ্যায় বিদুষী। দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, রসায়ন, ভূগোল, ভূতত্ত্ব, পদার্থবিদ্যা, মনোবিজ্ঞান, ইসলামি ধর্মতত্ত্ব এমনকি কাব্যসাহিত্যে পর্যন্ত ছিল তার পাণ্ডিত্য, আছে তার লেখা।

ইবনে সিনা’র উপাধিখচিত মুদ্রা

শাইখ আল-রাইস শরীফ আল-মুলক আবু আলী আল-হুসাইন বিন আবদুল্লাহ বিন আল-হাসান বিন আলী ইবনে সিনা, পাশ্চাত্যে যাকে আভিসেনা (Avicenna) নামে অবহিত করা হয়। অর্থাৎ, মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম পুরোধা। বিভিন্ন বিষয়ে তার অবদান থাকলেও মূলত চিকিৎসাবিজ্ঞানে তার অবদানের জন্য তিনি সর্বাধিক আলোচিত ও পরিচিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিভিন্ন রোগ ও চিকিৎসা সম্পর্কিত তার বিশ্বকোষীয় রচনা ‘আল-কানুন ফিত-তিব্ব’ গ্রন্থে তিনি তৎকালীন সময়ে পরিচিত যাবতীয় রোগ ও তার চিকিৎসার বিবরণ প্রদান করেছিলেন। আরবী ভাষায় রচিত এই গ্রন্থে পূর্ববর্তী গ্রীক-রোমান চিকিৎসা পদ্ধতি, পারস্যিক চিকিৎসা পদ্ধতি এবং ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কেও তিনি আলোচনা করেন।

ইবনে সিনা’র চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত বিশ্বকোষ ‘আল-কানুন’ এর পাতা

১০২৫ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থটিকে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল পাঠ্যপুস্তক হিসেবে গ্রহণ করা হয়। দ্বাদশ শতকের দিকে গ্রন্থটি ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয় এবং তা ইউরোপের বিভিন্ন  বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত গ্রন্থটি ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞান শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে।

ইবনে সিনা’র চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত বিশ্বকোষ ‘আল-কানুন’ এর চিত্রসম্বলিত পাতা

ধারণা করা হয় তার মোট রচনার সংখ্যা ৪৫০, যার ২৪০টি এখনো পাওয়া যায়। ইবনে সিনার বিভিন্ন রচনার মধ্যে তার চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত বিশ্বকোষ ‘আল-কানুন ফিত-তিব্ব’ বা সংক্ষেপে আল-কানুন সর্বাধিক পরিচিত। এটি ১৯৭৩ সালে নিউইয়র্কে পুনর্মুদ্রিত হয়।

আল-কানুন গ্রন্থটি মোট পাঁচ খন্ডে বিভক্ত। প্রথম খন্ডে মানুষের শরীরের বর্হিভাগ ও আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গের বিবরণ এবং তাদের কাজসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য সাধারন স্বাস্থবিধিও এতে আলোচিত হয়েছে।

ইবনে সিনা’র চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত বিশ্বকোষ ‘আল-কানুন’ এর অনুবাদ

দ্বিতীয় খন্ডে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ঔষধ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ খন্ডে বিভিন্ন রোগ ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে আলোচনা এবং পঞ্চম খন্ডে বিভিন্ন ঔষধ তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কিডনী ও মূত্রাশয়ের বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে প্রথম ইবনে সিনা তার আল-কানুনে আলোচনা করেন। এছাড়া প্রস্রাবের সাথে রক্ত আসার কারনও তিনিই প্রথম উদঘাটন করেন।

ইবনে সিনা বিশ্বাস করতেন, রোগী কখনোই সুস্থ হতে পারেনা যদি না তার অসুস্থতার কারণ ও সুস্থতার পন্থা উভয়টিই শনাক্ত করা যায়। তিনি তার আল-কানুনে বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান হল এমন একটি বিজ্ঞান যার দ্বারা আমরা শরীরের বিভিন্ন অবস্থার কথা জানতে পারি; সুস্থতায়, অসুস্থতায়, কি কারণে কারো স্বাস্থ্যহানী ঘটে এবং কখন ঘটে। অপর কথায় এটি হল এমন শিল্প, যা স্বাস্থ্য সম্পর্কে চিন্তা করে এবং যে শিল্পের সাহায্যে স্বাস্থহানীতে তা পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।

ইবনে সিনা’র চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত বিশ্বকোষ ‘আল-কানুন’ এর পাতা

ইবনে সিনা মানুষের জীবনচক্র সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে মানব জীবনকে চারটি ধাপে এবং প্রথম ধাপকে আবার পাঁচটি ভাগে ভাগ করেন। মানব জীবনের এই চারটি ধাপ হল; ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত যৌবন, ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত মধ্যবয়স, ৬০ বছর পর্যন্ত পড়ন্ত বয়স এবং এর পরবর্তী থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বার্ধক্য। অন্যদিকে যৌবনের পাঁচটি ভাগ হলো নবজাতক, শিশু, বালক/বালিকা, কিশোর/কিশোরী এবং তরুণ/তরুনী।

ইবনে সিনা তার আল-কানুন গ্রন্থের মাধ্যমে মানব স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় জ্ঞানকে একত্রিত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। মূলত তার এই গ্রন্থের মাধ্যমেই চিকিৎসা সংক্রান্ত বিশ্বকোষ রচনার সূচনা হয়।

ইবনে সিনা’র চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত বিশ্বকোষ ‘আল-কানুন’ এর অনুবাদ

প্রসঙ্গত, ইবনে সিনা জন্মেছিলেন উজবেকিস্তানের বোখারায়। পারস্যের এই সাম্রাজ্যটি সেসময় ইরান, পাকিস্তান ও মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করতো। বালক বয়স থেকেই ইবনে সিনার প্রতিভা বিস্ময় জাগাতে শুরু করে। কোরআন মুখস্ত করে ফেলেন মাত্র ১০ বছর বয়সেই। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই যুক্তিবিদ্যায় তার পারদর্শিতা ছাড়িয়ে যায় তার শিক্ষককেও। ১৬ বছর বয়সে শুরু করেন চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন। এবং মাত্র দুবছরে ১৮ বছর বয়সেই চিকিৎসা বিষয়ক সেসময়কার যত জ্ঞান আর তথ্য ছিল- সবই আয়ত্ত করে ফেলেন ইবনে সিনা। তার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি কয়েক শতাব্দী ধরে পশ্চিমা চিন্তাবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এবং তার বইগুলো দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উত্স হিসাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচএফ