২৭০০ বছর আগের ভাস্কর্যে আঁকা ঘটনাটি ছিল মিথ্যা প্রচারণা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৫ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

২৭০০ বছর আগের ভাস্কর্যে আঁকা ঘটনাটি ছিল মিথ্যা প্রচারণা

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৩৮ ৩১ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৩:৫০ ৩১ মার্চ ২০২১

এই ভাস্কর্যটি তৈরি করা হয়েছিল ২৭০০ বছর আগে

এই ভাস্কর্যটি তৈরি করা হয়েছিল ২৭০০ বছর আগে

মিথ্যা কিংবা বানোয়াট নানা খবর আজকাল সামাজিক বিভিন্ন মাধ্যমের কল্যাণে দেখা যায়। সেগুলো আবার না জেনে বুঝে অনেকে বিশ্বাস করে বসেন। তবে অনেক কিছু মিথ্যা হলেও সত্যের ছিটেফোঁটা পাওয়া যায় অনেক সময়। তবে বর্তমানে ভাইরাল যুগেই যে এমন মনগড়া মিথ্যা সংবাদ প্রচার বা আলোড়ন সৃষ্টি করে, তা কিন্তু নয়। এর জন্ম আসলে সভ্যতার একেবারে শুরুতে!

২৭০০ বছরের প্রাচীন এই ভাস্কর্যই তার প্রমাণ। শত শত বছর ধরে যে মূর্তি মানুষকে ভুল তথ্য পরিবেশন করে আসছে। আসিরিয়ান সভ্যতার কিংবদন্তি রাজা আসুরবনীপালের সিংহ শিকারের একটি দৃশ্য নিয়েই মূর্তিটি তৈরি। আপাতভাবে তাতে বোঝার কিছুই নেই। দেখা যাচ্ছে একটি সিংহকে রাজা তার বল্লমের সাহায্যে হত্যা করছেন। খুবই স্বাভাবিক এই ভাস্কর্যটি। অতীতের অনেক সভ্যতার ব্যাপারে জানা গেছে এসব দেয়ালচিত্র থেকেই। রাজাদের যুদ্ধ জয়, রাজ্য শাসন সবকিছুই তারা বিভিন্ন নথি, দলিল এবং চিত্রের মাধ্যমে রেখে গেছেন অনাগত ভবিষ্যতের জন্য। তবে এগুলোর কোনটা কতোখানি সত্যতা রয়েছে তা বর্তমানে এসে প্রমাণ করা বেশ কঠিনই বটে!

রাজাদের যুদ্ধ জয়, রাজ্য শাসন এসব কিছুই জানা যায়  এসব দেয়ালচিত্র আর ভাস্কর্যের মাধ্যমেতবে গবেষকরা বিভিন্ন নথি ঘেটে বের করতে পেরেছেন কিছু কিছু। যেমন ২৭০০ বছরের এই ভাস্কর্যের কথাই ধরুন না। এটি দেখে আপনার কি মনে হচ্ছে? কোনো যুদ্ধজয়ের পর ফিরে এসে সিংহ হত্যা করছেন তিনি। রোমান ও আসিরিয় সভ্যতায় এমন রেওয়াজ ছিল। আসলে বিষয়টি তা নয়, সেই সন্দেহ তৈরি করে সমকালীন কিছু সরকারি নথি। সেখান থেকেই ঐতিহাসিকরা জানতে পারেন, রাজা আসুরবনীপালের মৃত্যু হয়েছিল সিংহের আক্রমণেই।

তবে ভাস্কর্যে তার সাফল্যের দৃশ্য দেখানো হলেও বাস্তবের রাজা সিংহের কাছে হেরে গিয়েছিলেন। ১৯৩২ সালে প্রথম একদল প্রত্নতাত্ত্বিক এই নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। আর এই সময় প্রথমেই খুঁটিয়ে দেখা হয় মূর্তির আরও নানা দিক। প্রত্নতাত্ত্বিকদের সব প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায় একটি অলঙ্কারের মধ্যে। রাজার কানে ঝুলতে থাকা একটি কুণ্ডল। 

সেই যুগে সিংহ ছিল মানুষের জন্য এক আতঙ্কের নাম হঠাৎ দেখলে মনে হয়, রাজাদের এমন অলঙ্কার থাকতেই পারে। আকারে তা মানুষের কানের চেয়ে বেশ কিছুটা বড়। আর তার মধ্যেই আছে পাঁচটি তিরের ফলার মতো অংশ। ভাস্কর এই কুণ্ডলটি তৈরি করেছেন অতি যত্নে। প্রতিটি ফলার তীক্ষ্ণতা এতদিন পরেও স্পষ্ট বোঝা যায়। আর সন্দেহ তৈরি হয় সেখানেই। এটি নিশ্চই রাজার প্রকৃত অলঙ্কারের সজ্জা নয়। বরং এর ভিতর দিয়ে কোনো সাংকেতিক বার্তা দেয়া হয়েছে। অবশেষে আসিরিয়ান ধর্মবিশ্বাসের নানা অধ্যায় খুঁজে মেলে সেই সাংকেতিক বার্তার হদিশ। ১৯৬০ সাল নাগাদ ঐতিহাসিকরা একমত হন, রাজা আসুরবনীপাল আসলে সিংহের আক্রমণেই প্রাণ হারিয়েছেন।

সিংহ শিকার করা তখন রাজাদের সাহসিকতার পরিচয় বহন করত ঐতিহাসিকদের মতে, এই দৃশ্য আসলে কল্পিত। কিংবা হতে পারে রাজার পরাজয় মেনে নিতে পারেননি প্রজারা। তাই তাকে বিজয়ীর বেশেই উপস্থাপন করেছেন তাদের শিল্পকর্মে। বাস্তবের সঙ্গে যার একেবারেই সম্পর্ক নেই। আসিরিয়া তখন রীতিমতো সিংহের উপদ্রবে বিপর্যস্ত। প্রত্যেক পুরুষ সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতেন। মানুষ ছাড়াও শিকার বলতে গবাদি পশু তো আছেই। সেসময় রাজাদের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হত সিংহের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করা।

রাজা আসুরবনীপাল সিংহের আক্রমণে মারা গিয়েছিলেন রাজা আসুরবনীপালও এজন্যই সিংহের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তবে তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। সিংহের আক্রমণে মারা যান তিনি। তাই তার পরাজয়কে ঢেকে ফেলা হয়েছে এক রূপকের সাহায্যে। আর ইঙ্গিত পাওয়া যায় ওই কুণ্ডলে। সেখানে পাঁচটি তীরের ফলার উপস্থিতি আসলে রাজার বারবার ফিরে আসার কথাই বলে। অর্থাৎ সিংহের হাতে মৃত্যু হলেও রাজা আবার সংগ্রামের জন্য আসবেন। তবে এর মধ্যে একধরণের আত্মতৃপ্তির অনুভূতি থাকলেও সত্যতা নেই কিছুই।

এই দৃশ্যটি তৈরি করা হয়েছিল রাজার পরাজয়ের ঘটনাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাজ সামান্য তথ্য থেকেই একটা ইতিহাসের বিশ্লেষণ করা। তবে সেই কাজ মাঝে মাঝে সত্যিই কঠিন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে প্রাচীন যুগে রাজাদের স্তুতি করার জন্য এত ধরণের রূপকের ব্যবহার করা হত, যা আজ বোঝা বেশ কঠিন। আর এভাবেই ২৭০০ বছর ধরে ভুল তথ্য দিয়ে আসছে ‘দ্য লায়ন হান্ট অফ আসুরবনীপাল’ নামে পরিচিত ভাস্কর্যটি। তবে ইতিহাস আর নথি তার প্রমাণ বয়ে বেড়াচ্ছে শতাব্দী থেকে শতাব্দী। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে