শুধু আইনস্টাইনের মস্তিষ্কই নয়, চুরি হয়েছিল গ্যালিলিওর আঙুল এবং নেপোলিয়নের লিঙ্গও

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৩ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৯ ১৪২৮,   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

শুধু আইনস্টাইনের মস্তিষ্কই নয়, চুরি হয়েছিল গ্যালিলিওর আঙুল এবং নেপোলিয়নের লিঙ্গও

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:১৮ ৩০ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৬:৩৩ ৩০ মার্চ ২০২১

গ্যালিলিওর আঙুল, আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক, আলভা এডিসনের নিঃশ্বাস সংরক্ষণ করা হয়েছে লুকিয়ে

গ্যালিলিওর আঙুল, আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক, আলভা এডিসনের নিঃশ্বাস সংরক্ষণ করা হয়েছে লুকিয়ে

মৃতদেহ সংরক্ষণ কিংবা নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গ মমি করার চল শুরু করেছিল মিশরীয়রা। তাদের আবিষ্কৃত মমি রহস্য এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্যে ঘেরা। তবে বিখ্যাত ব্যক্তিদের অঙ্গ সংগ্রহ করা হয়েছিল কোন উদ্দেশ্যে, তা কি জানা গেছে আজো।

আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক সংরক্ষণ করার তথ্য পুরো বিশ্ব জানলেও অনেকেই জানেন না গ্যালিলিওর আঙুল, নেপোলিয়নের লিঙ্গ সংরক্ষণের গল্পটা। এমনকি বিজ্ঞানী থমাস এডিসনের শেষ নিঃশ্বাসটুকু আজো সংরক্ষিত আছে জাদুঘরে। 

বিজ্ঞানী থমাস এডিসন

বিজ্ঞানী থমাস এডিসন
গ্রামোফোন, ভিডিও ক্যামেরা এবং দীর্ঘস্থায়ী বৈদ্যুতিক বাতি (বাল্ব) সহ বহু যন্ত্র তৈরি করেছিলেন থমাস আলভা এডিসন। যা বিংশ শতাব্দীর জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।এডিসন ইতিহাসের অতিপ্রজ বিজ্ঞানীদের অন্যতম একজন বলে বিবেচিত, যার নিজের নামে ১,০৯৩টি মার্কিন পেটেন্টসহ যুক্তরাজ্যে, ফ্রান্স এবং জার্মানির পেটেন্ট রয়েছে। গণযোগাযোগ খাতে বিশেষ করে টেলিযোগাযোগ খাতে তার বহু উদ্ভাবনের মাধ্যমে তার অবদানের জন্য তিনি সর্বস্বীকৃত।

যার মধ্যে একটি স্টক টিকার, ভোট ধারনকারী যন্ত্র, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারী, বৈদ্যুতিক শক্তি, ধারণযোগ্য সংগীত এবং ছবি। বাসস্থান, ব্যবসায়-বাণিজ্য বা কারখানায় বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন ও বন্টনের ধারণা এবং প্রয়োগ দুটিই এডিসনের হাত ধরে শুরু হয় যা আধুনিক শিল্পায়নের একটি যুগান্তকারী উন্নতি। 

বিজ্ঞানী থমাস এডিসনের শেষ নিঃশ্বাসটুকু আটকে আছে এই টেস্ট টিউবটিতে  বিজ্ঞানী থমাস এডিসনের মৃত্যু হয় ১৯৩১ সালে। শুনতে অবাক লাগলেও তার শেষ নিঃশ্বাস সংরক্ষণ করে করা রয়েছে। জীবনের শেষ সময়ে হাসপাতালে তার সঙ্গে সর্বক্ষণ থাকতে বলা হয়েছিল তার ছেলে চার্লসকে। অটোমোবাইল ব্যবসায়ী হেনরি ফোর্ড একটি টেস্ট টিউব দিয়েছিলেন চার্লসে। ফোর্ড ছিলেন বিজ্ঞানী থমাসের ব্যবসার অংশীদারও। বাবার শেষ নিঃশ্বাস নেয়ার সময় টেস্ট টিউবটি তাঁর মুখে ধরেন চার্লস। সেই টেস্টটিউবে আজও বন্দি বিজ্ঞানীর শেষ নিঃশ্বাস। মিশিগানের হেনরি ফোর্ড মিউজিয়ামে রাখা রয়েছে সেটি। 

জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি

জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি
পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত এবং দার্শন সব জায়গাতেই গ্যালিলিওর সমান অবদান। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে রয়েছে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের উন্নতি সাধন। যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের এত বিশাল অগ্রগতির পেছনে গ্যালিলিওর চেয়ে বেশি অবদান আর কেউ রাখতে পারেননি। তাকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক,আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক এবং এমনকি আধুনিক বিজ্ঞানের জনক হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর আঙ্গুল সংরক্ষণ করা আছে  ইতালির একটি জাদুঘরে ১৬৪২ সালের ৪ জানুয়ারি মারা যান জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলির। তার বুড়ো আঙুল এবং মধ্যমা আজও রাখা রয়েছে জাদুঘরে। ইতালির ‘মিউজিয়াস অব দ্য হিস্ট্রি অব সায়েন্স’ নামে জাদুঘরে রয়েছে। সংরক্ষণ করে রাখা রয়েছে তার কিছু দাঁত এবং মেরুদণ্ডের কশেরুকা। গ্যালিলিওর শরীরের এই সব অংশগুলো ১৭৩৭ সাল থেকে জাদুঘরে রয়েছে। ওই সময় একটি স্মৃতিসৌধ থেকে অন্য সৌধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তার মৃতদেহ। তখনই এগুলো খুলে পড়ে যায়।

অ্যালবার্ট আইনস্টাইন

অ্যালবার্ট আইনস্টাইনপদার্থ বিজ্ঞানে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিলেন আইনস্টাইন। একজন কেরানি হয়েও তিনি পদার্থবিজ্ঞানের যেসব সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন, তা আজো টপকাতে পারেনি কেউ। ঊনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল-এর মৃত্যুর বছর অর্থাৎ ১৮৭৯ সালের ৪ মার্চ উল্‌ম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা হেরমান আইনস্টাইন মূলত পাখির পালকের বেড তৈরি ও বাজারজাত করতেন। ছোটবেলায় ঠিকভাবে কথা বলতে পারতেন না আইনস্টাইন। জড়তা ছিল অনেক। তারপরও স্কুলে বেশ ভালো ফলাফল করতেন তিনি। 

পাঁচ বছর বয়সে একটি কম্পাস হাতে পান আইনস্টাইন এবং তার ব্যবহার দেখে বিস্মিত হন। অদৃশ্য শক্তির কারণে কিভাবে কম্পাসের কাঁটা দিক পরিবর্তন করছে? তখন থেকে আজীবন অদৃশ্য শক্তির প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ ছিল। এরপর ১২ বছর বয়সে তিনি জ্যামিতির একটি বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হন। এই বইটি অধ্যয়ন করে এত মজা পেয়েছিলেন যে একে আজীবন "পবিত্র ছোট্ট জ্যামিতির বই" বলে সম্বোধন করেছেন। আসলে বইটি ছিল ইউক্লিডের এলিমেন্ট্‌স। এইসব কিছুই আইনস্টাইনকে আকর্ষিত করে আবিষ্কারের নেশায়। 

আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর তার মস্তিস্ক চুরি করেন প্যাথোলজিস্ট টমাস হার্ভে১৯০৫ সাল ছিল আইনস্টাইনের জীবনের অন্যতম বিস্ময়কর বছর। এই বছরে তার তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশ পায়। যা বিজ্ঞানের দুনিয়ায় নতুন দিশা দেখিয়েছিল। এই সব নতুন আবিষ্কারের একটির সূত্রেই আইনস্টাইনের নোবেল পুরস্কার। মৃত্যুর আগে অনেকের মতোই আইনস্টাইন চেয়েছিলেন, তার দেহ গবেষণার কাজে লাগুক। এমনটাই জানা যায় মৃত্যুর মাস খানেক আগে জীবনীকার কার্ল সীগিলকে লেখা একটি চিঠি থেকে। তবে শেষ পর্যন্ত আইনি ব্যবস্থা করে যেতে পারেননি। ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল মারা গেলেন তিনি। প্রথা মেনে সেই দেহ পাঠানো হল ময়না তদন্তের জন্য।

আইনস্টাইনের চোখও নাকি চুরি করা হয়েছিল আর এর পরেই এক দুঃসাহসী কাজ করে বসলেন প্যাথোলজিস্ট টমাস হার্ভে। অটপসি চলাকালীন, নিঃশব্দে মৃতদেহ থেকে মস্তিষ্কটি সরিয়ে রাখলেন। অবশ্য অনুমতি না নিয়ে সেই মস্তিষ্কে হাত দেননি তিনি। পরেরদিন সংবাদপত্রে নিজের চুরির ঘটনা প্রকাশ করে সেই মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণার জন্য অনুমতি চাইলেন। এমন ঘটনার কথা জানতে পেরে আশ্চর্য হলেন সবাই। হতবাক আইনস্টাইনের পরিবারও। তবে খুব শিগগিরিই পাওয়া গেল অনুমতি। আর তারপর সেই মস্তিষ্ককে ২৪০টি সূক্ষ্ম স্তরে কেটে ফেললেন ডা. হার্ভে। মাইক্রোস্কোপের তলায় সেই স্লাইডগুলোকে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন।

আইনস্টাইনের মস্তিস্কটি ২৪০ টুকরা করা হয় ১৯৫৫ সালে শুরু হয়েছিল গবেষণা। চলল প্রায় ৩০ বছর। ১৯৮৫ সালে প্রথম গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হল। দেখা গেল, সত্যিই আইনস্টাইনের মস্তিষ্কের মধ্যে আছে অসংখ্য বিস্ময়। সাধারণ মানুষের তুলনায় সেই মস্তিষ্কের ওজন প্রায় ২০ গ্রাম কম। তাছাড়া নিউরোন এবং গিলা কোষের অনুপাতও স্বাভাবিক নয়। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত দশ বছরে আরও বেশ কতগুলি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। দেখা যায়, তাঁর মস্তিষ্কের গঠনও ঠিক স্বাভাবিক নয়। সাধারণ মানুষের প্যারাইটাল কর্টেক্সের মধ্যে যে গভীর খাঁজ থাকে, আইনস্টাইনের ক্ষেত্রে তা প্রায় নেই বললেই চলে।

ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব হেল্থ অ্যান্ড মেডিসিন-এ সংরক্ষিত আছে এটি আইনস্টাইনের সেই বিস্ময়কর মস্তিষ্কের ২৪০টি টুকরোর কিছু সংরক্ষণ করা রয়েছে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব হেল্থ অ্যান্ড মেডিসিন-এ। বাকি অর্ধেক রয়েছে ফিলাডেলফিয়ার একটি জাদুঘরে। আইনস্টাইনের চোখও সতর্কভাবে খুলে বার করে নিয়েছিলেন ওই চিকিৎসক। তার দু’টি চোখ সংরক্ষিত রয়েছে নিউ ইয়র্ক সিটির একটি জাদুঘরে।

নেপোলিয়ন

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বা নাপোলেওঁ বোনাপার্ত ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের সময়কার একজন জেনারেল। সাধারণ একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও স্বপ্ন দেখেছেন ব্রিটিশ শাসন করার। সেনাবাহিনী প্রধান থেকে শুরু করে ফ্রান্সের শাসক। শেষ জীবনে নির্বাসনে কাটিয়েছেন এই শাসক। ১৮২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে নেপোলীয়ন ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। তিনি ৫ ই মে তে মৃত্যুবরণ করেন।

সম্রাটের মৃত্যুর পর এক ব্রিটিশ চিকিৎসক দেহ থেকে লিঙ্গ আলাদা করে নিয়েছিলেনসম্রাটের মৃত্যুর পর এক ব্রিটিশ চিকিৎসক তার মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করেছিলেন। তখনই তিনি নেপোলিয়নের লিঙ্গ দেহ থেকে আলাদা করে নিয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে ২৯০০ ডলারে আমেরিকার একজন ইউরোলজিস্ট সেটি কিনেছিলেন। ২০০৭ সাল পর্যন্ত সেটি তিনি বাক্সবন্দি করে নিজের বিছানার নীচে রাখতেন। ২০০৭-এ তাঁর মৃত্যু হয়। এবং ২০১৬ সালে ফের একবার নিলামে ওঠে নেপোলিয়নের লিঙ্গ। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে