মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়ের জন্য বাটার কারখানা খুলে দিলেন এক সাহেব

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৩ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৯ ১৪২৮,   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়ের জন্য বাটার কারখানা খুলে দিলেন এক সাহেব

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:০৯ ৩০ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৩:২৬ ৩০ মার্চ ২০২১

মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন এই সাহেব

মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন এই সাহেব

২৫ মার্চের পর থেকে পূর্ব বাংলার পুরো দৃশ্যপট পালটে যায়। একদিকে বাঙালির চোখে প্রতিশোধের আগুন। অন্যদিকে পাকবাহিনীর অত্যাচারের চূড়ান্ত। সারাদেশেই চলছে পাকবাহিনীর গণহত্যা, গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করছে পুড়িয়ে। কোথাও মানুষের স্বস্তি নেই। শহর থেকে মানুষ ছুটছে গ্রামের দিকে। সেখানেও নিরাপত্তা নেই, আবার ছুটে চলা। এবারের গন্তব্য ভারতের বর্ডার। বর্ডারটুকু পার হলেই জীবনটা অন্তত রক্ষা হবে এযাত্রায়। 

দেশের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠছে মুক্তিবাহিনী। দামাল ছেলেদের লক্ষ্য গেরিলা আক্রমণ করার। কিন্তু নেই পর্যাপ্ত অস্ত্র, নেই ট্রেনিং। গেরিলা যুদ্ধের প্রথম শর্ত তো গোপনে আক্রমণ সংগঠিত করা। অথচ নিষ্ঠুর খানসেনাদের লুকিয়ে প্রস্তুতির জায়গা কোথায়? তাদের চোখ সর্বত্র ঘোরাফেরা করছে। এই যে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে যারা। তারা কিন্তু সবাই ট্রেনিং প্রাপ্ত ছিলেন না। সাধারণ খেটে খাওয়া বাঙালি আজ প্রতিশোধের নেশায় হাতে তুলে নিয়েছে দেশ রক্ষার দায়িত্ব। ছাত্র, কৃষক, জেলে, রিকশাচালকসহ হাজার হাজার বাঙালি যুবক গোপনে তৈরি করে ফেলল ‘মুক্তিবাহিনী’।

 প্রধান সেনাপতি কর্নেল এমএজি ওসমানীকে গোপনে পাকবাহিনীর সংবাদ পৌঁছে দিতেন
ঠিক এই সময়েই অদ্ভুতভাবে এগিয়ে এলেন উইলিয়াম এ এস ঔডারল্যান্ড। নাম শুনেই বুঝতে পারছেন, তিনি বাঙালি নন। পূর্ব-পাকিস্তানে এসেছেন মাত্র বছরখানেক আগে। ১৯৭০ সালে। আন্তর্জাতিক জুতোর কোম্পানি বাটার প্রোডাকশন ম্যানেজার ঔডারল্যান্ড। ৭১ সালে তিনি ছিলেন টঙ্গীর বাটা কারখানায়। সেসময় বাটা জুতা ছিল দেশের অন্যতম বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। সেটার নির্বাহী কর্মকর্তা হওয়ায় ঔডারল্যান্ডের অবাধ চলাচল ছিল সর্বত্র। সেই সুবাদে তার বেশ খাতির ছিল টিক্কা খান, রাও ফারমান আলী, নিয়াদিজের সঙ্গে। অনেকটা নিজের গরজেই এদের সঙ্গে খাতির জমিয়ে ছিলেন ঔডারল্যান্ড। অন্যদিকে প্রধান সেনাপতি কর্নেল এমএজি ওসমানীর সঙ্গেও গোপনে যোগাযোগ রাখতেন এবং বিভিন্ন গোপন খবর জানাতেন। একপ্রকার গুপ্তচরের কাজই করেছিলেন পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে।    

মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন নিজেইটঙ্গীর বাটা কারখানায় গোপনে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে ডেকে নিলেন ঔডারল্যান্ড। আর তারপর বললেন, পূর্ব-পাকিস্তানে বাটার যত কারখানা আছে, সব কারখানার ভেতর থেকেই চলবে যুদ্ধের প্রস্তুতি। বাঙালি যুবকরা সেদিন মন থেকে বিশ্বাস করেছিল এই বিদেশি মানুষটিকে। আর ঔডারল্যান্ড নিজেও সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছেন অক্ষরে অক্ষরে। সেই সঙ্গে বাটার শ্রমিকদের সংঘবদ্ধ করে টঙ্গীসহ সেক্টর ১ এবং ২ নম্বরে গড়ে তোলা গেরিলা বাহিনীকে নিজ দায়িত্বে প্রশিক্ষণ দেন। এই শিক্ষা নিজে পেয়েছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। নিজের সেই সবটুকু জ্ঞান ঢেলে দিয়েছিলেন বাঙালি মুক্তিবাহিনীদের। 

উইলিয়াম এ এস ঔডারল্যান্ড১৯১৭ সালে আমস্টারডামে জন্ম ঔডারল্যান্ডের। দারিদ্রের কারণে প্রথাগত শিক্ষা বেশিদূর এগোয়নি। ১৭ বছর বয়সে শুরু করেছিলেন জুতো সারাইয়ের জীবিকা। তবে এর মধ্যেই এসে পড়ল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানির পরাক্রমী নাৎসি বাহিনী দখল করে নিল নেদারল্যান্ড। অনেকেই নাৎসিদের দলে যোগ দিলেন। কিন্তু ঔডারল্যান্ড পালিয়ে যোগ দিলেন মিত্রশক্তির সঙ্গে। তখনও মিত্রশক্তির জয়ের আশা ক্ষীণ। কিন্তু অত্যাচারী নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালাতেই হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই ইউরোপ ছাড়লেন ঔডারল্যান্ড। একটি জাহাজে চেপে লুকিয়ে চলে এলেন অস্ট্রেলিয়া। নাৎসি আক্রমণ থেকে বাঁচতে তখন এমন অনেকেই অস্ট্রেলিয়ায় এসে আশ্রয় নিচ্ছেন। সেখানেও কিছুদিন জুতো সারাইয়ের কাজ করলেন। আর এভাবেই যোগাযোগ হয়ে গেল আন্তর্জাতিক সংস্থা বাটার সঙ্গে। প্রথম সাধারণ কর্মচারী হয়ে যোগ দিলেন। তারপর নিজের ব্যবসায়িক বুদ্ধির সাহায্যে একে একে প্রতিযোগিতার সিঁড়ি টপকে যেতে থাকলেন।

২৫ মার্চের ভয়াবহতার ছবি তুলে নিজেই পাঠিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে
পদোন্নতির সূত্রেই এবারে এসে পড়লেন পূর্ব-পাকিস্তানে। তবে আসার আগে পর্যন্ত সে-দেশের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। কিন্তু যুদ্ধ যখন শুরু হল, তখন পক্ষ বেছে নিতে হল তাকেও। খানসেনাদের অত্যাচার দেখলেন নিজের চোখে। ঠিক যেন নাৎসি বাহিনীরই এক ছোটো সংস্করণ। লড়াই ছাড়া রাস্তা নেই। বাটার কারখানায় শুরু হল সেই যুদ্ধের প্রস্তুতি। আর ঔডারল্যান্ড নিজে ততক্ষণে দায়িত্ব নিয়েছেন যুদ্ধের প্রকৃত খবর আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরার। ইতিমধ্যে অপারেশন সার্চ লাইটের বেশ কিছু ছবি তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন ইউরোপের পত্রিকাগুলিতে। মুক্তি বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র, ওষুধ সবকিছুর জোগানের ব্যবস্থা করলেন ঔডারল্যান্ড।

কিছুদিনের মধ্যেই বদলে যেতে থাকল যুদ্ধের সমীকরণ। আন্তর্জাতিক স্তরে পাক সরকার তখন যথেষ্ট নিন্দার মুখে। মুক্তিবাহিনীকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এল ভারতও। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং অসংখ্য মানুষের  প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন হল বাংলাদেশ। আর সেই যুদ্ধেরই শরিক এক বিদেশি। উইলিয়াম এ এস ঔডারল্যান্ড। বাংলাদেশের কাছে তিনি আজও ‘দুঃসময়ের বন্ধু’। 

বাঙালিদের সঙ্গে নিজেও প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধে  নিজের জীবন বিপন্ন করে যুদ্ধে নেমে পরেছিলেন ঔডারল্যান্ড। ভিন্ন এক ভাষা, ভিন্ন এক দেশের জন্য কি গভীর মমতাই না জেগেছিল তার মনে। ২৫ মার্চের অপারেশ সার্চলাইটের ভয়াবহতার কিছু ছবি তুলে পাঠিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। তিনি বাঙালি যোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে টঙ্গী- ভৈরব রেললাইনের ব্রীজ, কালভার্ট ধ্বংস করে পাক সেনাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করতে থাকেন।  সে সময়ে তিনি ঢাকার অস্ট্রেলিয়ান ডেপুটি হাইকমিশন থেকে গোপনে সহযোগিতা পেতেন। যুদ্ধ শেষ হলে আবার কর্মস্থল টঙ্গীতে ফিরে আসেন তিনি। 

১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ও অসামান্য নৈপুণ্যতার কারণে, ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে বীরপ্রতীক সম্মাননায় ভূষিত করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর প্রতীক পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকায় তার নাম ২ নম্বর সেক্টরের গণবাহিনীর তালিকায় ৩১৭। ১৯৯৮ সালের ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও সনদপত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে ঔডারল্যান্ডকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু তিনি অসুস্থ থাকায় আসতে পারেননি। তিনি বীর প্রতীক পদকের সম্মানী ১০ হাজার টাকা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে দান করে দেন।একমাত্র বিদেশি হিসেবে তাকে বাংলাদেশ সরকার এই খেতাবে ভূষিত করেছে। মৃত্যুর পূর্বমূহুর্ত পর্যন্ত অত্যন্ত গর্ব ভরে ও শ্রদ্ধার্ঘ্য চিত্তে নামের সঙ্গে বীর প্রতীক খেতাবটি লিখেছিলেন তিনি।

কোনো একসময় ঢাকায় তোলা উইলিয়াম এ এস ঔডারল্যান্ডের একটি ছবি ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশেই ছিলেন তিনি। তারপর বাটা কোম্পানি থেকে অবসর নিয়ে ফিরে গেলেন অস্ট্রেলিয়া। ২০০১ সালে পার্থ শহরে মৃত্যু হয় ঔডারল্যান্ডের। ১৯৭১ সালে আমরা প্রাণপ্রিয় জন্মভূমিকে মুক্ত করতে জীবনবাজী রেখে লড়াই করেছি। আমাদের স্বার্থ ছিল শোষণমুক্ত নতুন একটি স্বাধীন দেশ পাব। কিন্তু ঔডারল্যান্ড লড়েছিলেন নিঃস্বার্থভাবে। তারুণ্যের দিনগুলোতে তিনি লড়াই করেছিলেন নাৎসীদের বিরুদ্ধে নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে। আর পরিণত বয়সে লড়েছেন বাংলাদেশকে পাকহানাদার মুক্ত করতে।

স্বাধীন বাংলাদেশ ভুলে যায়নি ঔডারল্যান্ডের অবদানের কথা, তাকে ভূষিত করা হয় বীর প্রতীক খেতাবেতিনি লড়েছিলেন অন্যায় অবিচার আর মানবতা লঙ্ঘনকারিদের বিরুদ্ধে। তার জীবন পর্যালোচনা করলে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এক মহৎ এবং বিশ্ব মানবতাবাদী চরিত্র। পৃথিবীতে খুব কম মানুষই পেরেছেন নিজেকে দেশ বা কালের সীমার উর্দ্ধে প্রতিষ্ঠিত করতে। তবে তার জীবন প্রমাণ করে দিয়ে যায়, কাঁটাতারের সীমানায় মানুষকে যতই বেঁধে ফেলা হোক, প্রকৃত মানবতার লড়াইটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক। ঔডারল্যাণ্ড বিশ্ব মানবতাবাদীর এক বিরল নিদর্শন ৷ 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে