ম্যালেরিয়ায় রাজার মৃত্যু, একটি সভ্যতার কফিনে শেষ পেরেক

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

ম্যালেরিয়ায় রাজার মৃত্যু, একটি সভ্যতার কফিনে শেষ পেরেক

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২৩:৩৬ ২০ মার্চ ২০২১   আপডেট: ২৩:৫৩ ২০ মার্চ ২০২১

ইনকা সভ্যতার শেষ রাজা আটাওয়ালপা

ইনকা সভ্যতার শেষ রাজা আটাওয়ালপা

বাবা হুয়াইনা কাপাকের মৃত্যুর পরপরই দুই ভাই সিংহাসন পাওয়ার জন্য লিপ্ত হয় এক গৃহযুদ্ধে। বড় ভাইয়ের কাছে হেরে যায় ছোটভাই হুয়াসকার। বড়ভাইয়ের আটাওয়ালপার শাসনেই চলতে থাকে পুরো সাম্রাজ্য। তবে সেই সুখ বেশি দিল টিকল না কপালে তার। ম্যালেরিয়া হয়ে মারা যায় রাজা। সেই সঙ্গে তার সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। সেই সঙ্গে এক সভ্যতার কফিনের শেষ পেরেকটিও পোঁতা হয়ে যায়। 

আটাওয়ালপা ছিলেন ইনকা সভ্যতার শেষ রাজা। জুলাই ২৬, ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে মারা যান আটাওয়ালপা। ১৪৯৭ সালের ২০ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন এই রাজা।  ইনকা সাম্রাজ্যের ১৩তম ও শেষ স্বাধীন সম্রাট ছিলেন। ইনকা সাম্রাজ্য দক্ষিণ আমেরিকার একটি প্রাক কলম্বিয়ান সাম্রাজ্য। দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় ১৫ শতকে যে সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল তা ইনকা সাম্রাজ্য নামে পরিচিত। ইনকা শব্দের অর্থ "সূর্যের সন্তান"। 

বাবার মৃত্যুর পর দুইভাই সিংহাসন দখলের জন্য জড়িয়ে পড়েন এক গৃহযুদ্ধে  কোস্কো কেন্দ্রিক গড়ে উঠলেও ইনকা সাম্রাজ্য পরবর্তীকালে সমগ্র পেরু ও বলিভিয়া, দক্ষিণ ইকুয়েডর, উত্তর আর্জেন্টিনা, ও উত্তর চিলি এর একটি বড় অংশ জুড়ে ছড়িয়ে পরে। তারা ছিল যুদ্ধবাজ জাতি। সাধারণত কোস্কো অঞ্চলের শাসকদের ইনকা বলা হতো। কখনো কখনো সমুদয় জনগোষ্ঠীকেও ইনকা বলা হতো। ইনকার রাষ্ট্রীয় ভাষার নাম কেচুয়া। এর বাইরেও সাম্রাজ্য জুড়ে অন্তত ২০ টি স্থানীয় ভাষার অস্তিত্ব ছিল।

চৌদ্দ শতকের শেষ দিকে এখান থেকে ইনকা সাম্রাজ্যের বিস্তার শুরু হয়। ইনকারা তাদের আবাস ভূমিকে বলত "তাওয়ানতিনসুইয়ু"। এ শব্দটি কেচুয়া ভাষার শব্দ। যার অর্থ চার অংশ। বিশাল আকারের জন্য ইনকা সাম্রাজে ছিল ভৌগোলিক বৈচিত্র্য। কোথাও ছিল চাষ উপযোগী উপত্যকা, কোথাও পাহাড়ি ভূমি, কোনো অংশ জুড়ে ছিল সমুদ্রের তটভূমি। 

আটাওয়ালপা ছিলেন ইনকা সভ্যতার শেষ রাজাইনকা সাম্রাজের প্রথম যুগের ইতিহাস খুব স্পষ্ট নয়। স্পেনীয়দের লেখায় কিছু ধারণা পাওয়া যায়। কোস্কো অঞ্চলে যাত্রা শুরু হলেও ক্রমে বর্তমান আইয়াকুচো, পেরু ইত্যাদি অঞ্চলের অনেকটা অংশ নিয়ে ইনকাদের বিশাল শক্তিশালী রাজ্য গড়ে উঠেছিল। দশ শতকে এ অঞ্চলগুলো ছোট ছোট সামন্ত অধিপতিদের অধীনে ছিল। প্রথমদিকে ইনকারা প্রতিবেশী ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। এভাবেই তারা বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলে। 

ইনকা সাম্রাজ্যের সম্রাটদের আনুষ্ঠানিক ভাবে "সাপা" বা "সাপা ইনকা" বলা হতো। কোস্কো রাজ্য এর রাজা পাচাকুতি ইনকা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনিই ছিলেন ইনকাদের প্রথম সাপা। শেষ স্বাধীন সাপা ছিলেন আটাওয়ালপা যিনি স্পেনীয় আক্রমণে প্রাণ দেন। আবার অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, যুদ্ধের আগেই রাজা মারা গিয়েছিলেন ম্যালেরিয়া কিংবা গুটিবসন্তের মতো কোনো অসুখে।

ইনকারা ছিল সভ্য এক জাতিএরপর থেকে স্প্যানিশদের দখলে চলে যায় সভ্যতাটি। ইনকাদের নাম পরিবর্তন হতে থাকে। অন্য বিভিন্ন জাতির সঙ্গে মিশে গিয়ে ইনকারা ছড়িয়ে পরে। ইনকারা ছিল স্বভাবে খুবই কোমল মনের। ইনকা যোদ্ধারা অন্য নগর আক্রমন করে জয় করলেও স্থানীয় শাসনকর্তাকে হত্যা করত না যদি সে শাসনকর্তা ইনকা আইন মেনে চলত, বিদ্রোহ করত না, কর দিত আর শস্য ভান্ডার মজুদ রাখত। ইনকাদের কর ব্যবস্থা ছিল কঠোর। নারীদের নির্দিষ্ট পরিমাণে কাপড় বুনতে হত। 

ভিকুনার পশম থেকে ইনকারা তৈরি করত বিশেষ ধরনের পোশাকপুরুষেরা কাজ করত সৈন্যবিভাগে কি খনিতে। জনগণও কর দিতে হত। হাতে পয়সা না থাকলে রাষ্ট্রীয় কাজ করে শোধ করে দিত। কিংবা সুতা পোশাক তৈরি করে বিক্রি করে কর দিত। জনগণকে শস্যের একাংশ রাখতে হত সংরক্ষণের জন্য। খাদ্যশস্য মজুদের কলাকৌশল রপ্ত করেছিল বলেই ইনকা সভ্যতা নাকি অত উন্নত স্তরে পৌঁছেছিল-ঐতিহাসিকদের এই মত। সাম্রাজ্যজুড়ে ছিল স্টোরহাউজ। ৩ থেকে ৭ সাত বছরের খাদ্যশষ্য মজুত থাকত সেখানে। মাংসও শুকিয়ে নোনা করে রাখত। 

চাষবাস হত উপত্যকায় আর পাহাড়ের ঢালে। ইনকাদের প্রধান খাদ্যই ছিল আলু ও ভূট্টা। মানবসভ্যতায় আলু কিন্তু ইনকাদের অবদান। আলু আর ভুট্টা ছাড়া তাদের খাবারের তালিকায় ছিল ওল। নীল শ্যওলাও নাকি খেত তারা। তাদের চাষাবাদের মধ্যে ছিল মরিচ। মাংসের মধ্যে খেত গিনিপিগ ও লামার মাংস। সামুদ্রিক মাছও তাদের প্রিয় খাবার। সাম্রাজ্যের পশ্চিমে প্রশান্ত সাগর। আর বিখ্যাত হ্রদ টিটিকাকা। ভূট্টা পিষে এক ধরনের পানীয় তৈরি করে খেত ইনকারা। পানীয়ের নাম চিচা। পেরুতে এটি এখনো জনপ্রিয়।

ইনকারা ভিকুনাকে তাদের ঈশ্বরের দূত মনে করতইনকা সভ্যতার মানুষ পোশাকের ব্যাপারেও ছিল একটু খুঁতখুঁতে। পোশাক শুধু আব্রু রক্ষার কাজই করে না। রুচি এবং সামাজিক অবস্থানও বোঝায়। পোশাকের গুণগত মান এবং দামের ওপর ভিত্তি করে সমাজে যথেষ্ট শ্রেণি বিভাজন দেখা যায়। কিন্তু মধ্য যুগে দক্ষিণ আমেরিকার একাংশে এক অদ্ভুত নিয়ম প্রচলিত ছিল। এক বিশেষ ধরনের পশমে তৈরি পোশাক কেবলমাত্র রাজপরিবারের মানুষজনই ব্যবহার করতে পারত, সাধারণ প্রজাদের জীবিত অবস্থায় ওই পোশাক ব্যবহারের অনুমতি ছিল না। তবে মৃত্যুর পর সাধারণ মানুষের সঙ্গে ওই পশমের পোশাকের একটা ছোট্ট টুকরো দিয়ে দেয়া হতো। গোটা বিষয়টি খুব অদ্ভুত হলেও এটাই ঘটত ইনকা সাম্রাজ্যে। কারণ ইনকারা এই বিশেষ পশমের পোশাকটিকে ‘ঈশ্বরের কাপড়’ বলে মনে করত। 

স্প্যানিশরা দখল করে নেয় এই সাম্রাজ্য ইনকাদের কাছে এতোটা মূল্যবান ছিল যে পশম সেটি আসত ভিকুনা নামে এক বিশেষ ধরনের প্রাণী থেকে। এটি দেখতে পাওয়া যায় দক্ষিণ আমেরিকায়। চিলি, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, পেরুতেও এই প্রাণীর দেখা মেলে। এটি অনেকটা ছাগল ও ভেড়ার মিলিত রূপের মতো দেখতে। তবে ছাগল বা ভেড়ার থেকে ভিকুনা অনেকখানি আলাদা। এদের‌ গায়ের পশম থেকেই আজও পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান পোশাকগুলো প্রস্তুত হয়ে থাকে। 

ইনকা আমলে ভিকুনাকে ঈশ্বরের দূত মনে করা হত। তাই এই প্রাণীটিকে হত্যা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল সেসময়। কোনো ব্যক্তি যদি ভিকুনা হত্যা করত তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার বিধান ছিল। তবে কেবলমাত্র রাজ পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন মতো পশম সংগ্রহ করা হত। এই পোশাক কিন্তু এখনো বিশ্বের সবচেয়ে দামি কাপড়ের মধ্যে অন্যতম। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে