পোকাগুলো জীবিত থাকতেই খেতে হয় এই চিজ

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

পোকাগুলো জীবিত থাকতেই খেতে হয় এই চিজ

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০০:০৯ ২০ মার্চ ২০২১   আপডেট: ০০:২২ ২০ মার্চ ২০২১

পোকাগুলো জীবিত থাকতেই খাওয়া হয় এই চিজটি

পোকাগুলো জীবিত থাকতেই খাওয়া হয় এই চিজটি

পাস্তা, পিজ্জা কিংবা বার্গার যাই খান না কেন একটু বাড়তি চিজ চাই সবারই। প্রাণীর দুধ থেকে তৈরি এই চিজ বা পনির খাবারের তালিকায় যুক্ত হয়েছে প্রায় সাত হাজার বছর আগে থেকে। অনেকে মনে করেন,  মানুষ সম্ভবত কোনো দুর্ঘটনার মাধ্যমে বা কাকতালীয়ভাবে চিজ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবারগুলো তৈরি করে ফেলেছিল। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদ্য রসিকদের চাহিদা অনুযায়ী চিজের এসেছে নানান রকমফের। 

তবে পোকাওয়ালা চিজ খেয়েছেন কখনো? গা ঘিন ঘিন করছে নিশ্চয়! আচ্ছা, শুনেছেন কখনো? এটি বিশেষভাবে তৈরি করা একটি চিজ। যেটি তৈরির প্রক্রিয়া অনেকটা একইরকম হলেও খাওয়ার উপযোগী হয় পোকা হওয়ার পর। না নষ্ট নয়, এই চিজের বৈশিষ্ট্যই এটি। দামেও অন্যান্য চিজের তুলনায় অনেক বেশি।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এটি খুবই জনপ্রিয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আচার-ব্যবহার, খাদ্যাভ্যাসে রয়েছে নানান বৈচিত্র্য। পোকামাকড় থেকে শুরু করে গা শিউরে ওঠা অনেক কিছুই আছে মানুষের খাবারের তালিকায়। মাছের অন্ত্রের স্যুপ খেত রোমানরা, যাকে বলে গারুম। তাদের কাছে তো অবাক লাগতেই পারত ইলিশের পাতুরি নামটা। সে রকম সকাল-বিকাল যাদের পাতে চিজের বাহার খেলা করে তারা একবার চেখে দেখতে পারেন জ্যান্ত ম্যাগটের চিজ!

এই চিজের মধ্যে ছোট ছোট সাদা রঙের ম্যাগট ঘোরাফেরা করে। পোকাগুলো জ্যান্ত থাকা অবস্থাতেই খেতে হয় এই চিজ। কোনো চিজে থাকা ম্যাগট মরে গেলে সেটি আর খাওয়া হয় না। বিশ্ব বিখ্যাত এই চিজের পোশাকি নাম কাসু মার্টজু। ভূমধ্যসাগরের একটি ছোট দ্বীপ সারডিনিয়া। ইতালির অন্তর্গত সারডিনিয়া দ্বীপের মানুষের কাছে আজও প্রিয় খাবার এই পোকা ধরা চিজ!

পোকাগুলো মারা গেলে চিজটি নষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে ধরে নেয়া হয় ইতালির পেকোরিনো চিজ থেকেই কাসু মার্টজুর উদ্ভব। ভেড়ার দুধ থেকে তৈরি করা হয় এই পেকোরিনো চিজ। পার্থক্য একটাই, অন্যান্য চিজের প্রস্তুতি প্রণালীর সন্ধান প্রক্রিয়াটি (ফার্মেন্টেশন) এ ক্ষেত্রে একটু ভিন্ন। যাকে সন্ধান প্রক্রিয়া না বলে পচন প্রক্রিয়া বলাই শ্রেয়।

সাধারণ সন্ধান প্রক্রিয়ায় দুধ থেকে চিজ তৈরি না করে ভেড়ার দুধ থেকে তৈরি পেকোরিনো চিজকে খোলা অবস্থাতেই রেখে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য হল তাতে মাছি বসতে দেয়া। চিজ ফ্লাই নামে এক বিশেষ ধরনের মাছি ওই চিজে ডিম পাড়ে। ভাবতে পারছেন! চিজের মধ্যেই ডিম ফুটে লার্ভা বেরিয়ে আসে। এরপর চিজের সব স্নেহজাতীয় পদার্থকে (ফ্যাট) ভেঙে ফেলতে থাকে তারা। লার্ভার শরীরের মধ্যে থাকা অ্যাসিড চিজের স্নেহজাতীয় পদার্থকে ভেঙে ফেলে।

ভেড়ার দুধ থেকে তৈরি হয় এই চিজ খাবার দীর্ঘ দিন মুক্ত ভাবে ফেলে রাখলে তাতে মাছি বসে যেমন পোকা ধরে যায়, একইসঙ্গে সেই খাবার নরম ও রসালো হয়ে যায়। সে ভাবে এই চিজেও মূলত পচন ধরে যায়। নরম, রসালো, থকথকে পোকা ধরা এই জনপ্রিয় চিজের নাম কাসু মার্টজু। পোকাসহ চিজ নিশবের বিভিন্ন দেশের বাজারে বিক্রি হয় দেধারছে। যদি কোনো চিজের মধ্যের পোকা মারা গিয়ে থাকে তা হলে সেই চিজ খারাপ বলে ধরে নেয়া হয়। তা আর খাওয়া যায় না। শুধু পোকাগুলো যতক্ষণ জীবন্ত আছে তখক্ষণই চিজ টাটকা বলে মনে করা হবে।

পোকাগুলো পেটের ভেতরে সহজে মারা যায় না, এরা মানবদেহের কোষ খেয়ে অনেকদিন বেঁচে থাকেচিজের ভেতরে থাকা পোকাগুলো সাধারণত ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। কোনো ক্রেতা যদি পোকা ছাড়া চিজ খেতে চান তা হলে প্রথমে চিজটিকে একটি বায়ুরুদ্ধ প্যাকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ রাখতে হবে। অক্সিজেনের অভাবে সমস্ত পোকা চিজ থেকে বেরিয়ে ওই প্যাকেটের গায়ে চলে আসবে। প্যাকেটের গায়ে পোকাগুলোর লাফানোর শব্দও শোনা যাবে। শব্দ বন্ধ হলে ধরে নিতে হবে চিজের মধ্যে আর পোকা নেই। তারপর সেটি বার করে খেতে হবে।

দীর্ঘদিন এভাবে উন্মুক্ত জায়গায় চিজ ফেলে রাখা হয় কোনোরকম বিপদের আভাস পেলে পোকাগুলো প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লাফাতে পারে। তাই খাওয়ার সময় চিজটিকে ভালো ভাবে হাতের মধ্যে চেপে ধরে খেতে হয়। তা না হলে মুখে যাওয়ার আগেই বিপদ বুঝে লাফিয়ে পালাতে পারে পোকাগুলো। স্বাভাবিক ভাবেই এই চিজ অস্বাস্থ্যকর। বর্তমানে নিষিদ্ধও করে দেয়া হয়েছে এর প্রস্তুতি। কাউকে বিক্রি বা কিনতে দেখলে জরিমানা করা হয় বহু দেশে। তবে জনপ্রিয়তা কমেনি এতটুকুও। তাই কালো বাজারে কাসু মার্টজুর কেনাবেচা চলছে। একটি সাধারণ পেকোরিনো চিজের প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয় কাসু মার্টজু।

খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পোকাগুলো মানুষের শরীরেও বেঁচে থাকে। পাকস্থলীয় গাঢ় অ্যাসিডেও এদের কোনো ক্ষতি হয় না। শরীরে প্রবেশ করে এরা মানুষের কোষের মধ্যে ঢুকে যায় এবং সেগুলো খেতে থাকে। ফলে নানারকম শারীরিক সমস্যা দেখা যায়।ইতালি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা তুলে এটিকে ইতালির ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টাও করা হয়েছে বহু বার। তবে এর ক্ষতিকারক দিক বিবেচনা করে তাতে সায় মেলেনি।

বর্তমানে অস্বাস্থ্যকর এই চিজ তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে বছরের পর বছর ধরে ওই একই ভাবে কাসু মার্টজু প্রস্তুত করা হয়। আইনত যাতে চিজ বিক্রি করা যেতে পারে তার জন্য ভেড়া খামারের মালিকদের সঙ্গে কাজ করে ইতালির সাসারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ২০০৫ সালে কাসু মার্টজু প্রস্তুতির একটি অভিনব এবং স্বাস্থ্যকর উপায় বার করেছিলেন। তবে তাতে আবার সায় মেলেনি কাসু মার্টজু প্রস্তুতকারকদের। কেননা চিজের সঙ্গে পোকার স্বাদ তাদের মুখে লেগে আছে এখনো। আবার অন্যদিকে ঐতিহ্য ক্ষুণ্ণ করতে চান না তারা। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে