ডায়মন্ড খচিত পোশাকই ছিল মিশরীয় নারী‌দের ফ্যাশন

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

ডায়মন্ড খচিত পোশাকই ছিল মিশরীয় নারী‌দের ফ্যাশন

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:২২ ১৯ মার্চ ২০২১   আপডেট: ২২:৩৮ ১৯ মার্চ ২০২১

মিশরীয়দের পোশাকেও ছিল স্বকীয়তা

মিশরীয়দের পোশাকেও ছিল স্বকীয়তা

মিশরের নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে সোনালি বালিতে দাঁড়িয়ে থাকা পিরামিড আর হাজার বছর আগের মমির কথা। প্রাচীন সত্যতার সূতিকাগার নীলনদ বিধৌত দেশ মিশর পুরো বিশ্বের কাছে এখনো আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের অন্যতম রহস্যমণ্ডিত দেশ এই মিশর। বিশেষ করে প্রাচীন মিশর নিয়ে চলছে প্রায় ৩০০ বছর ধরে গবেষণা। প্রত্নতাত্ত্বিকরা একের পর এক রহস্য উদ্ধার করেই যাচ্ছে। এতে রহস্যের জালে যেন আরো ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এই ইতিহাস। 

তবে গবেষকরা তো বটেই! সাধারণ মানুষের মনেও বেশ উত্তেজনা কাজ করে নীল নদের তীরে গড়ে ওঠা পাঁচ হাজার বছর আগের সেই সমৃদ্ধ নগরীকে নিয়ে। মিশরীয়দের খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে হাজার হাজার বছর আগে করা মমি পদ্ধতি যেমন বিশ্বকে তাক লাগিয়েছে। তেমনই পিরামিড রহস্য গবেষকদের কপালের দুশ্চিন্তার ভাঁজ দীর্ঘ করেছে। মিশরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন, সমৃদ্ধ, এবং রহস্যময়। এদের আচার- ব্যবহার, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস সবই অন্য সবারচেয়ে একেবারেই আলাদা।  

সমাধি এবং মন্দিরের দেয়ালের চিত্র থেকেই প্রাচীন মিশরীয়দের জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়প্রাচীন মিশরীয়দের মমি আর পিরামিডের মতোই এদের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, আচার ব্যবহার সবকিছু নিয়েই কৌতূহল রয়েছে বিশ্ববাসীর। বিভিন্ন সময় আবিষ্কৃত হওয়া মমি এবং কালের সাক্ষী পিরামিডই এসব জল্পনা কল্পনার উত্তর সামনে এনেছে। পিরামিডগুলো মিশরীয়রা ব্যবহার করেছে ফারাওদের মমি সংরক্ষণ করার জন্য।

সেকারণেই বেশিরভাগ ফারাওয়ের মমি এই পিরামিড থেকেই বিভিন্ন সময়ে আবিষ্কার হয়েছে। আর এর মাধ্যমেই অতীতে মিশরীয়দের বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে পোশাক। কেননা মমির সঙ্গে রেখে দেয়া হত খাদ্যশস্য, পোশাকসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য জিনিসপত্র। এছাড়াও পোশাকের ব্যাপারে চমকপ্রদ কিছু নজির পাওয়া যায় তাদের সমাধি এবং মন্দিরের দেয়ালে মিশরীয়দের জীবনযাপনের চিত্র থেকে।

পাঁচ হাজার বছর আগে নারীদের পোশাকের ডিজাইন আজো জনপ্রিয় হয়ে আছে এসব চিত্রগুলো ছিল স্বতন্ত্র এবং তৎকালীন ও প্রাচীন বিভিন্ন সভ্যতা থেকে একেবারেই ভিন্ন। এসব চিত্র সেসময় ধনী এবং গরিবের মাঝে পোশাকের বেলাও যে ব্যবধান ছিল তার স্পষ্ট প্রমাণ দেয়। মমি আবিষ্কারের পর তা গবেষণা করে জানা যায়, নীল নদের তীরে সাধারণ মিশরীয়দের দুটি দল বসবাস করত। একটি ছিল সমাজের উঁচু বর্ণের এবং দ্বিতীয়টি ছিল নিচু বর্ণের। দুই দলের জন্য দুইজন রাজা থাকত। উঁচু শ্রেণির রাজা পরতেন সাদা রঙের মুকুট এবং নিচু শ্রেণির রাজা পরতেন লাল রঙের মুকুট। সেসময় তারা নিচু বর্ণের মিশরীয়রা কোনো পোশাক পরিধান করত না। তবে উঁচু শ্রেণির যারা ছিলেন তারা সামান্যই কিছু পোশাক পরতেন। 

বর্ণভেদে মিশরীয় নারী পুরুষের পোশাকে ছিল অনেক তফাৎ এরপর যখন মিশরেই পোশাক উৎপাদন শুরু হলো তখন সব শ্রেণির মানুষেরাই পোশাকের ব্যবহার শুরু করেন। নারীরা নিচের অংশে স্কার্ট এবং উপরে খুব সামান্যই কাপড়। আর পুরুষেরা তাদের নিচের অংশে ত্রিভুজাকৃতির ছোট্ট একটু কাপড় লজ্জাস্থান ঢেকে রাখার জন্য ব্যবহার করতেন। এই ত্রিভুজাকৃতির এক টুকরা কাপড়ের নাম ছিল শেহেন্তি। 

তবে রাজাদের জন্য ছিল আয়তাকার এক টুকরো কাপড়। যেটা কোমরের বেল্টের সঙ্গে আটকে রাখা হত। এর উপরে সাদা কাপড়ের একটি স্কার্টের মতো কাপড় পরতেন। যেটা কালাসিরিস নামে পরিচিত ছিল। এটি এতোটাই প্রশস্ত ছিল, যা রাজার গোড়ালি পর্যন্ত ঢেকে রাখত। উপরের অংশে  একটি চাদর মতো কাপড় ডান থেকে বামে জড়িয়ে রাখতেন। যদিও পরে এই স্কার্ট ছোট হয়ে হাঁটুর কাছ পর্যন্ত হয়।

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন এই পোশাকটি পাওয়া যায় মিশরে প্রাচীন মিশরীয়দের বেশিরভাগ বস্ত্র লিনেন থেকে তৈরি করা হয়েছিল। ভেড়া এর উল, ছাগল চুল এবং পাম থেকেও কাপড় তৈরি করত তারা। তবে ৭ম শতাব্দী এসে মিশরীয়রা রেশমের কাপড় ব্যবহার শুরু করে। তবে একটু বিষয় খেয়াল করলে দেখা যাবে মিশরীয়রা সাদা রঙের কাপড় ব্যবহার করতেন। তবে অনেক পরে এসে মিশরীয়রা হালকা রঙের পোশাকের ব্যবহার শুরু করে। 

এর কারণ হতে পারে রঙের ব্যবহার হয়তো আবিষ্কার করতে পারেনি। আবার মিশর নীল নদের তীরে বালির দেশ হওয়ায় সেখানে গরম অনেক বেশি। তাই সাদা রঙের কাপড়ের ব্যবহার তারা বেশি করত। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও উত্তাপ বিবেচনা করে তৈরি হতো নারী-পুরুষের পোশাক। পোশাকের সঙ্গে মিশরীয়রা বিভিন্ন ধরনের অলঙ্কার ব্যবহার করতেন। নারী পুরুষ সবাই ব্যবহার করতেন অলঙ্কার। সোনা, রূপা, এমনকি মুক্তা এবং পাথরের ব্যবহারও ছিল তাদের অলঙ্কারে। 

পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে অলঙ্কারও পরত তারা পোশাকে ব্যবহার করা হতো সোনা, ডায়মন্ড, মুক্তা ও মূল্যবান পাথর। তাদের পোশাকগুলোকেও অলঙ্কার মনে করা হতো। ধনাট্য পুরুষ পরতো লিলেনের পোশাক। সৈন্যরা চামড়ার ও সাধারণ মানুষ পরতো দীর্ঘদিন পরা যায় এমন কাপড়ের পোশাক। নারীদের পোশাক ছিল খুব ফ্যাশনেবল ও পরিশীলিত। মিশরীয় নারীরা ছিল সমাজে খুব সম্মানিত। তাদের পছন্দ ছিল রঙিন ও স্বচ্ছ পোশাক! অনেক নারী পরতো ধুতির মতো পোশাক। ঠিক স্তনের নিচে বাঁধতো ব্যান্ডেজের মতো। এসব কিছুর নজির মিলেছে মমির সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র থেকেই। এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো পোশাকও পাওয়া যায় মিশরীয় মমির শরীরে। তাই ধারণা করা হয় মিশরীয়রাই পোশাক ব্যবহার শুরু করেছিল বিশ্বে। 

নারীদের পোশাকে থাকত ডায়মন্ডসহ মূল্যবান পাথর খচিত জুতা ব্যবহারের প্রমাণও পাওয়া যায় প্রাচীন মিশরে। তবে মানুষে মানুষে তফাৎ বোঝাতে তারা জুতার ব্যবহার করত। সবাইকে সব রকমের জুতা পরতে দেয়া হতো না। যারা দাস শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, তারা পরতেন পাম গাছের পাতা দিয়ে বানানো জুতা। কিছু কিছু সময় আবার তাদেরকে জুতাই পরতে দেয়া হতো না! সাধারণ জনগণ পরতেন প্যাপিরাস পাতা দিয়ে বানানো জুতা।

জুতার ব্যবহারও ছিল প্রাচীন মিশরে সমাজের একেবারে উঁচুস্তরের মানুষদের জুতার মাথা থাকতো চোখা। রঙের ব্যাপারেও তাদের পছন্দ একটু আলাদা ছিল। লাল আর হলুদ রংটা তারা নিজেদের করে রেখেছিলেন। সমাজের বাকি শ্রেণির মানুষেরা আর যা-ই করুক না কেন, কখনো লাল কিংবা হলুদ রঙের জুতা পরতে পারতেন না। তবে গবেষকরা এখনো মিশরীয়দের পাঁচ হাজার বছর আগে এমন সমৃদ্ধ হওয়ার রহস্য খুঁজে বেড়াচ্ছেন।  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে