চিরকুমারী রাজকন্যার জীবনের শেষ দিন কাটে কারাগারের অন্ধকারে

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

চিরকুমারী রাজকন্যার জীবনের শেষ দিন কাটে কারাগারের অন্ধকারে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০১ ১৭ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৪:১৭ ১৭ মার্চ ২০২১

রাজকন্যা সারাজীবন পার করেছেন জ্ঞান অর্জনে

রাজকন্যা সারাজীবন পার করেছেন জ্ঞান অর্জনে

আওরঙ্গজেব বা আলমগীর ছিলেন মোগল সম্রাট। তার মৃত্যুর পর থেকে আর কোনো মোগল সম্রাট মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং নিজের হাতে কোরআন শরীফ লিখে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ১৭০৭ সালের ৩রা মার্চ তিনি ইন্তেকাল করেন। তার নিজের হাতে করা উইলখানি তার মৃত্যুর পর তার বালিশের নীচে পাওয়া যায়। তাছাড়া আহকাম-ই-আলমগিরিতে তার আরেকটি উইল পাওয়া গিয়েছিল।

খুবই সাধাসিধে ধরনের একজন বাদশাহ ছিলেন আওরঙ্গজেব। রাজ কোষাগারের অর্থ নিজের জন্য কখনো খরচ করেননি। নিজের জীবিকা নির্বাহ করেছেন টুপি সেলাই আর কোরআন লিখে। তার পূর্ণ নাম আল-সুলতান আল-আজম ওয়াল খাকান আল-মুকাররম আবুল মুজাফফর মুহি উদ-দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর। তার পিতা পঞ্চম মুঘল বাদশাহ তাজমহল-নির্মাতা শাহজাহান আর মাতা আগ্রার তাজমহলে শায়িতা মুমতাজ।

সম্রাট আওরঙ্গজেবের কন্যা ছিলেন জেবুন্নেসাআর এই ন্যায় পরায়ণ এবং সৎ বাদাশার কন্যা জেবুন্নেসা। সম্রাট আওরঙ্গজেব আর তার প্রথম সহধর্মীনি সম্রাজ্ঞী দিলরাস বানু বেগমের কন্যা জেবুন্নেসা। সম্রাট আওরঙ্গজেব আদর করেই কন্যার নাম জেবুন্নেসা রেখেছিলেন যার অর্থ “ললনাশ্রী”। ১৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারী জেবুন্নেসার জন্ম। যেহেতু জেবুন্নেসা ছিলেন আওরঙ্গজেব এবং দিলরাস বানুর প্রথম সন্তান, তাই জেবুন্নেসাকে পেয়ে আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছিলেন বাদশাহ।  

জেবুন্নেসা বিদুষী ছিলেন, ছিলেন চিরকুমারী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রখর বুদ্ধির অধিকারিণী। যে কোনো কিছু খুব দ্রুত মুখস্থ করে ফেলতে পারতেন। মাত্র তিন বছর বয়সে কোরআন মুখস্থ করতে শুরু করেন। যে বয়সে অনেকে ঠিকভাবে কথাই বলতে পারে না। সেই বয়সে কোরআন মুখস্থ করতে শুরু করেন জেবুন্নেসা। ৭ (সাত) বছর বয়সে কোরআনে হাফেজা হন তিনি। এই খুশিতে সম্রাট আওরঙ্গজেব জেবুন্নেসা কে ৩০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা উপহারস্বরুপ প্রদান পূর্বক একদিন সরকারী ছুটি ও বিপুল ভোজের আয়োজন করেছিলেন। হাফেজা হওয়ার পর তিনি আরবি, ফারসি আর উর্দু ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করেন। তার কবি প্রতিভাও ছিল অসামান্য। এতো প্রতিভা দেখা দেয়ায় নানান বিষয়ের পন্ডিতদের নিয়োগ দেয়া হয় জেবুন্নেসাকে পারদর্শী করতে। 

কবিতা ভালোবাসতেন জেবুন্নেসা একবার পারস্যের বাদশা স্বপ্নের মধ্যে একটি কবিতার ছত্র মুখস্থ করেন–

‘দুররে আবলাক কাসে কমদিদা মওজুদ’
যার অর্থ “সাদা-কালো মিশ্রিত রঙের মোতির প্রত্যক্ষদর্শী বিরল” ।

তিনি দেশের কবি সাহিত্যিকদের আহবান করলেন এর সাথে মিলিয়ে অনুরূপ আরেকটি ছত্র লেখার জন্য। কিন্ত কেউ এর সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি। দিল্লীর দরবারেও সেই ছত্রটি পাঠানো হল। ছত্রটি পেয়ে দরবারের সবাই যখন ইতস্তত করছেন তখন সেটি অন্তঃপুরে জেবুন্নেসার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হল।

তিনি একটু চোখ বুলিয়েই ঐ বাক্যের নিচে আর একটি বাক্য লেখেন–
‘মাগার আশকে বুতানে সুরমা আলুদ’। যার অর্থ- কিন্তু সুরমা পরা চোখের অশ্রুবিন্দুতে ঐ মোতির প্রাচুর্য

পারস্যের বাদশাহ’র সামান্য একটি বাক্যে অসাধারন জ্ঞানবুদ্ধি বিজরিত উচ্চশ্রেণির ছন্দ সৃষ্টিতে ভারতের জ্ঞানগুণীরা তো মুগ্ধ হয়েছিলেন-ই পারস্যে যখন লেখাটি পৌছাল তারাও লেখিকাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করলেন আর পারস্যের জ্ঞানগুনীরাও সুলতান কে অনুরোধ করলেন এই বিখ্যাত নারীকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য আমন্ত্রন জানাতে।

আওরঙ্গজেব ছিলেন খুবই দয়ালু এবং সৎ শাসক পারস্যের বিখ্যাত কবির লিখিত কবিতার মাধ্যমে জেবুন্নেসাকে আমন্ত্রন জানানো হল–
‘তুরা অ্যায় মেহজাবী বে পরদা দিদান আরজু দারাম’। বাংলায় যার অর্থ- হে চন্দ্রাপেক্ষা সুন্দরী, আমাদের ব্যবধান দূরীভূত হোক , পর্দার বাইরে আপনার দর্শনের আশা নিয়ে যেতে চাই। এর জবাবে পারস্যের সুলতানের জবাবে জেবুন্নেসা লিখলেন- ‘বুয়ে গুলদার বারগে গুল পুশিদাহ আম দর সৌখন বিনাদ মোরা …’। যার অর্থ-পুষ্পের সুঘ্রানের মত পুষ্পেই আমি লুকিয়ে আছি। আমায় যে কেউ দেখতে চায়, সে দেখুক আমার-ই লেখায়।

নাতির এই সুসংবাদে খুশি হয়েছিলেন সম্রাট শাহজাহানও। তিনি শিকোহের পুত্র সুলিমান শিকোহের কাছে জেবুন্নেসাকে বিয়ে দেন। তিনি গবেষণায় জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস, দর্শন এবং সাহিত্যে পারদর্শীতা লাভ করতে থাকেন। অল্প বয়সেই ফার্সি, আরবি এবং উর্দুর মতো ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। 

সাহিত্য প্রেমী রাজকন্যা ছিলেন খুবই দয়ালু ১৬৫৩ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সী জেবুন্নেসা পারস্যের কবিতা বর্ণনা করতে শুরু করে এবং তার শিক্ষিকা, ওস্তাদ বায়েজ তাকে আরও কবিতা পড়ার জন্য উত্সাহিত করতে থাকে। জেবুন্নেসা গোপনে সাহিত্য ও কাব্য দলগুলোতে অংশ নিতেন, যেখানে গনি কাশ্মীরি, নাই'মাতুল্লাহ খান প্রমুখ মহান কবিরা অংশ নিয়েছিলেন। তার ছিল একটি ব্যক্তিগত পাঠাগার। যেখানে তিনি বেতনভুক্ত কয়েকজন পন্ডিতকে রেখেছিলেন। পাঠাগারে আইন, সাহিত্য, ইতিহাস এবং ধর্মতত্ত্বের মতো প্রতিটি বিষয়ে সাহিত্যকর্মও সরবরাহ ছিল। এ থেকে বোঝা যায় জেবুন্নেসা পড়ালেখার প্রতি অনেক বেশি আগ্রহী ছিলেন। 

ব্যক্তি জীবনে অবিবাহিত ছিলেন এই রাজকুমারী। তবে এজন্য কম সমালোচনার স্বীকার হন নি তিনি। প্রাসাদ এবং প্রাসাদের বাইরে চিরকুমারী জেবুন্নেসার চরিত্র নিয়ে নানান গুজব ছড়ানো হয়। এতে কিছুই এসে যায়নি রাজকুমারীর। নিজের মত মতোই কাজ করেছেন সারা জীবন। জেবুন্নেসা ছিলেন একজন দয়ালু হৃদয়বান ব্যক্তি এবং সর্বদা প্রয়োজন ব্যক্তিদের সহায়তা করেতেন। তিনি বিধবা ও এতিমদের সাহায্য করতেন। শুধু সাধারণ প্রজাদেরই নয়। তিনি হজ তীর্থযাত্রীদের আর্থিক সাহায্য করতেন সবসময়। সংগীতের প্রতিও আগ্রহী হয়েছিলেন এই রাজকুমারী। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, তিনি তার সময়ের সেরা গায়িকা ছিলেন। সুমধুর কণ্ঠে গান গাইতেন সঙ্গীদের নিয়ে। 

চিরকুমারী ছিলেন রাজকন্যা জেবুন্নেসা আওরঙ্গজেব শাহজাহানের পরে যখন সম্রাট হন। তখন জেবুন্নেসার বয়স মাত্র ২১ বছর। আওরঙ্গজেব তার মেয়ের প্রতিভা এবং ক্ষমতা সম্পর্কে জানতেন। কন্যার বিচক্ষণতা, বুদ্ধিমত্তার কারণে সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতেন। ইতিহাসের কিছু জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, সম্রাট আওরঙ্গজেব তার দরবারে রাজকন্যা জেবুন্নেসাকে আমন্ত্রণ জানাতেন। কন্যাও তার বাবাকে সাধ্যমতো বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন। 

সম্রাট আওরঙ্গজেবের জেবুন্নেসা ছাড়াও আরো চার কন্যা ছিল। তারা হলেন- জিনাত-উন-নিসা , জুবদাত-উন-নিসা , বদর-উন-নিসা এবং মেহের-উন-নিসা। এরমধ্যে জেবুন্নেসা ছিলেন খুবই মার্জিত স্বভাবের। ব্যবহার পোশাক সবকিছুতেই মার্জিতের ছোঁয়া। সব সময় সাদা রঙের কাপড় পরতেন তিনি। তার চেহারা সম্পর্কে ইতিহাসে বলা আছে, তার বাম গালে দুটি লম্বা দাগ ছিল, লম্বা এবং পাতলা ছিলেন। তার মুখ ছিল গোলাকার এবং ফর্সা। পাতলা ঠোঁট, ছোট দাঁত এবং চোখের মনি ঘন কালো। রাজকন্যা হলেও জাঁকজমক জীবন পছন্দ ছিল না জেবুন্নেসার। তার একমাত্র অলঙ্কারটি ছিল একটি মুক্তার মালা। তিনি অনেকটা তুর্কি নারীদের মতো গাউন ধরনের জামা পড়তেন। 

লাহোরে রয়েছে রাজকন্যা জেবুন্নেসার সমাধি বাবা সম্রাট আওরঙ্গজেব অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে লাহোরে নিয়ে চিকিৎসা করান জেবুন্নেসা। তবে ধীরে ধীরে সম্রাটের বিশ্বাস রাজকুমারীর উপর থেকে উঠে যেতে থাকে। সম্রাটের এক পালক পুত্র ছিল। তার নাম আকিল কাহন। তার সঙ্গে জেবুন্নেসার প্রেমের সম্পর্ক আছে এমন গুজব  ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সম্রাটের কানে এই খবর গেলে তিনি খুবই রেগে যান। আদরের কন্যা জেবুন্নেসাকে কারাগারে বন্দি করেন।

শাস্তি ছিল তার জমানো সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, তার বার্ষিক ৪ লাখ টাকা পেনশন বাতিল করা এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেলিমগড়ে বন্দি থাকবেন। এখানে বিশ বছর কারাবাসের পরে, ১৭২৪ সালে জেবুন্নেসা সাত দিন অসুস্থতার পরে শাহজাহানবাদে বন্দি অবস্থায় মারা যান। তার সমাধি নিয়েও রয়েছে অনেক তর্ক বিতর্ক। কেউ বলেন রাজকন্যা জেবুন্নেসার সমাধি লাহোরে, কেউ বলেন পাকিস্তানে নয়, অন্য কোথাও সমাধি দেয়া হয়েছে তাকে।  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে