দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রেমিকাকে লেখা চিঠি পৌঁছায়নি আজও

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রেমিকাকে লেখা চিঠি পৌঁছায়নি আজও

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৪৫ ১৫ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৭:০১ ১৫ মার্চ ২০২১

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লেখা এই চিঠিটি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লেখা এই চিঠিটি

মাত্র কয়েক দশক আগেও প্রেমিকা দুরুদুরু বুকে কাপা হাতে খুলতেন প্রেমিকের চিঠি। কিছুক্ষণ শত শত মাইল দূরে থাকা প্রিয়জনের ঘ্রাণ নেয়ার চেষ্টা করতেন চিঠির ভাঁজে। বার দশেক পড়া সেই চিঠি প্রতিবারই যেন নতুন লাগে প্রেমিকার। এই দৃশ্য পার হয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি। প্রযুক্তির আশীর্বাদে হাতের মুঠোফোনে মুহূর্তেই কয়েকগণ্ডা বার্তা আদান প্রদান করা যায় যে কারো সঙ্গে। তবে চিঠির সেই আবেগ এখনো কী পাওয়া যায়?

স্কুলফেরত রাস্তায় বিকেলের আলোকে সাক্ষী রেখে হাতে হাতে পৌঁছে যাওয়া সেই সব প্রেমপত্ররা আজকের প্রজন্মের কাছে অচেনা। পৃথিবীর তাবড় তাবড় ব্যক্তিরাও প্রেমপত্র লিখেছেন তাদের প্রিয়জনকে। নেপোলিয়ান থেকে কবি কীটস, চার্চিল থেকে হেন্ড্রিক্সের সে প্রণয়প্রস্তাব দিয়ে যাবে চিরকালীন রোমান্সের খোঁজ। সেসব চিঠি তো এখনো সাতিহ্যের অন্যতম এক রোমান্টিকতার জায়গা দখল করে আছে। 

লন্ডনের ইসপ্ল্যানেড হোটেলের ইউটিলিটি রুমের কাঠের পাটাতনের নিচ থেকে পাওয়া যায় চিঠিগুলোআশি বছর আগে হৃদয়ের আবেগ, অনুভূতি ও ভালোবাসার কথা জানিয়ে মনের মানুষকে চিঠি লিখেছিলেন প্রেমিকা। প্রেমিক ছিলেন সৈনিক। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গিয়েছিলেন। গেল সপ্তাহে লন্ডনের ইসপ্ল্যানেড হোটেলের ইউটিলিটি রুমের কাঠের পাটাতনের নিচ থেকে পাওয়া যায় চিঠিগুলো। হোটেলটি সংস্কারের কাজ চলছে। সংস্কার করতে গিয়েই এটি শ্রমিকদের চোখে পড়ে।

চিঠিগুলোতে কারো নাম ছিল না, তাই কে কাকে পাঠাচ্ছে তা জানা যায়নি চিঠিগুলো কে এবং কাকে লিখেছিলেন, তা জানা যায় নি। কারণ, এতে কারও নাম উল্লেখ করা হয় নি। শুধু একটি চিঠির উপরে ডানদিকে ঠিকানা দেয়া আছে-৫০, ডেলবার্ন স্ট্রিট, মাদারওয়েল, ল্যানাকশায়ার। 

বিবিসি জানায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হোটেলটিতে সৈন্যদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করা হয়েছিল। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে কোনো এক প্রেমিকা তার সৈনিক প্রেমিককে লিখেছিলেন চিঠিগুলো!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই হোটেলটিতে সৈন্যরা থাকত, তারাই চিঠিগুলো লিখেছিল বলে ধারণা করা হয়এমনই আরেক সৈন্য তার স্ত্রীর লেখা চিঠি পেয়েছিলেন ৭২ বছর পর। যখন তার স্ত্রী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। প্রয়াত স্ত্রীর লেখা চিঠি পেয়ে স্বভাবতই আবেগাপ্লুত রফ ক্রিস্টোফারসেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তার স্ত্রী যখন ওই চিঠি লিখে পাঠিয়েছেন তখন তিনি নরওয়ের নৌবাহিনীর নাবিক হিসেবে কাজ করছিলেন।  অনাগত সন্তানের কথা জানিয়ে স্বামীকে চিঠি লিখেছিলেন ৭২ বছর আগে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই চিঠি স্বামীর হাতে পৌঁছেনি। যখন পৌঁছেছে তখন প্রেরক ভার্জিনিয়া নামের সেই নারী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন পরপারে।  

১৯৪৫ সালের ৪ মে লেখা সেই চিঠি ২০১৭ সালের মে মাসের চলতি সপ্তাহে হাতে পান রফ ক্রিস্টোফারসেনের ছেলে। তিনি তখন অফিসে ছিলেন। অফিস থেকেই ক্যালিফোর্নিয়ার বাসায় থাকা বাবাকে ফোন করে চিঠি পড়ে শোনান।

স্ত্রীর সঙ্গে রফ ক্রিস্টোফারসেন‘প্রিয় স্বামী’ সম্বোধন করে চিঠিটিতে ভার্জিনিয়া লেখেন, তুমিও কী আমাকে মিস করছো যেমনটা আমি তোমাকে মিস করছি? আমি ভেবে অবাক হই অবসরের সময়টা তুমি এখন কীভাবে কাটাও। আশা করি ওষুধটা ঠিকমতো খাচ্ছো, কিছুতেই তোমার আর অসুস্থ হওয়া চলবে না।

আর লক্ষ্মী ছেলের মতো মদ-টদ থেকে দূরে থাকবে। তোমার ফেরার অপেক্ষায় আছি, তবে তোমার সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার বিষয়টি নিয়েও কিছুটা উদ্বিগ্ন। আমি এখন কুৎসিৎভাবে বড় হয়ে গেছি, আমাকে দেখতেও অনেক মোটা দেখায়। আমার ধারণা অবস্থা আরও খারাপ হবে।

চিঠিটি রফের কাছে পৌঁছায় ৭২ বছর পর যাই হোক ভালোই আছি, চিকিৎসকও বলেছেন সব ঠিকঠাক আছে। আমি খুব খুশি। নিজেকে খুব গর্বিত মনে হচ্ছে কারণ আমি এমন একজনের সন্তান গর্ভে ধারণ করেছি যাকে আমি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। আমার সবসময় মনে হয়, তোমার একটা অংশ সবসসময় আমার সঙ্গেই আছে।

বাচ্চার কথা তো অনেক হলো। কিন্তু তুমিই আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তোমাকে ভালোবাসি, রফ। যেমনটা আমি সূর্যের উষ্ণতাকে ভালোবাসি। সূর্যকে ঘিরে যেমন সবকিছু আবর্তন করে আমার কাছে তুমি তেমনটাই গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি, খুব দ্রুত বাড়ি ফিরে আসবে, আমার পাশে থাকবে।  

মৃত্যু ছাড়া কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।  
ভার্জিনিয়া

অনেক সৈন্যই স্বপ্ন দেখতেন রণাঙ্গন থেকে ফিরে অপেক্ষায় থাকা প্রিয় মানুষটাকে আপন করার ১৯১৭ সালের ২৪ মার্চ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ফ্রান্সের এক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ব্রিটিশ সেনা উইলিয়াম মার্টিন প্রেমিকা এমিলি চিট্টিক্সের কাছে ওপরের এ চিঠিটি লেখেন। কথা ছিল, যুদ্ধ শেষ হলে উইলিয়াম বাড়ি ফিরে এসে এমিলিকে বিয়ে করবেন। কিন্তু চিঠিটি লেখার তিন দিন পর, ২৭ মার্চ উইলিয়াম যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেন। বাগদত্তার মৃত্যুর পর এমিলি আর বিয়ে করেননি। প্রিয় মানুষটির শেষ চিঠিটি তিনি আগলে রাখেন ১৯৭৪ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত। ১০০ বছরেরও পুরোনো এই চিঠি আজও উইলিয়াম ও এমিলিসহ হাজারো স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয় আমাদের। চিঠির যুগ পেরিয়েছে বহুকাল। তবে সেই আবেগ এখনো পাওয়া যাবে তখন যারা চিঠিতে ভাব আদান-প্রদান করেছে। পুরনো সেই চিঠি আজো দুজন মানুষের ভালোবাসার সাক্ষী বহন করে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে