বাঙালির হাত ধরেই ৮০০০ বছরের পুরনো ‘আধুনিক’ শহরের সন্ধান

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

বাঙালির হাত ধরেই ৮০০০ বছরের পুরনো ‘আধুনিক’ শহরের সন্ধান

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:১৭ ১৫ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৪:৪১ ১৫ মার্চ ২০২১

৮০০০ বছর পুরনো সভ্যতা ছিল বর্তমানের মতোই অত্যাধুনিক জীবনযাপন

৮০০০ বছর পুরনো সভ্যতা ছিল বর্তমানের মতোই অত্যাধুনিক জীবনযাপন

বিভিন্ন সময় হাজার হাজার বছরের পুরনো সভ্যতা আবিষ্কার করেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। আবিষ্কৃত সভ্যতার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো ধরা হয় সিন্ধু সভ্যতাকে। শুরুতে এটি ৫ হাজার ৫০০ বছরের পুরনো বলে ধারণা করা হয়। তবে বিস্তর গবেষণার পর গবেষকরা নিশ্চিত হন এটি তারও অনেক আগের সভ্যতা। আনুমানিক ৮০০০ বছরের পুরনো হবে। এরই সমসাময়িক আরো একটি সভ্যতার হদিস পাওয়া যায়। সেটি হচ্ছে মহেঞ্জোদারো সভ্যতা। এটি বর্তমানে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় সিন্ধু নদের তীরে অবস্থিত। একটি রেললাইনের কাজ করার সময় এই সভ্যতার হদিস পান শ্রমিকরা।

ধারণা করা হয়, ৪ হাজার ৬০০ বছরের পুরানো এই শহর। তবে সম্প্রতি কিছু গবেষণার প্রতিবেদন থেকে জানা যায় এটি মেসোপটেমিয়া এবং সিন্ধু সভ্যতার সময়কার একটি সভ্যতা। যেটি পুনর্নিমাণ করা হয় সাত বার। একই জায়গায়। ধারণা করা হয় এটি ছিল সিন্ধু সভ্যতার প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র। বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে খুব বেশি যোগাযোগ ছিল না মহেঞ্জোদারো সভ্যতার মানুষের। প্রায় দেড়শ বছর পূর্বে এই শহরের হদিস পাওয়া যায়। মহেঞ্জোদারো শব্দের অর্থ মৃতের স্তুপ। এই শহর সম্পর্কে মানুষ খুব কমই জানে তবে যতটুকু জানে ততটুকু বেশ বিস্ময়কর! 

দেড়শ বছর আগে হদিস মেলে এই সভ্যতার আধুনিকতার সূত্রপাত ৮ হাজার বছর আগে হয়তো মহেঞ্জোদারোর মানুষেরাই করেছিল। গবেষণা করতে গিয়ে গবেষকদের চক্ষু চড়াকগাছ। ইটের বাড়ি, সান বাঁধানো পুকুর এবং পয়ঃপ্রণালীর আধুনিক ব্যবস্থার নজির দেখা যায় ধবংস্তূপে। তাদের বাড়িগুলো ছিল লাল পোড়ামাটির তৈরি দোতলা। সব বাড়িই মোটামুটি একই উচ্চতার ছিল। রাস্তাগুলো ছিল একই ধরনের। এ থেকে বোঝা যায় মহেঞ্জোদারোর মানুষেরা গাণিতিক শাস্ত্রে কতোটা এগিয়ে ছিল।

কিছু বাড়িতে নিজেদের স্নানাগার ছিল। তবে বর্তমানে মহেঞ্জোদারো একটি ধ্বংসস্তূপ যেটি লিপিবদ্ধ হয়েছে ইতিহাসের পাতায়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম রোমাঞ্চকর জায়গা এই মহেঞ্জোদারো। এটি ছিল হরপ্পা সভ্যতার প্রধান শহর। যেটা বর্তমানে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় সিন্ধু নদের তীরে অবস্থিত। 

বর্তমানের মতো আধুনিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল মহেঞ্জোদারোর বাসিন্দারা ১৮৫৬ সালে একজন ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ার এই অঞ্চলে রেললাইন স্থাপনের কাজ করছিলেন। সেসময় মাটির তলায় তিনি পুরনো ইট পান যেগুলো আজকের দিনের মতোই দেখতে ছিল। তখন একজন স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে জানা যায় এখানকার সকল বাড়ি এই ইটের তৈরি যা মাটি খুঁড়ে পাওয়া যায়। তখন সেই ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ার বুঝে যান এগুলো সাধারণ কোনো ইট নয়। এই জায়গায় লুকিয়ে আছে কোনো প্রাচীন সভ্যতা।

সিন্ধু নদের তীরে গড়ে ওঠা এই শহর সম্পর্কে এই ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ারই প্রথম জানতে পেরেছিলেন। পরে ১৯২২ সালে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় নামের এক বাঙালির হাত ধরে মহেঞ্জোদারো পুনরাবিষ্কার হয়। ১৯৩০ সালে স্যার জন মার্শাল এর নেতৃত্বে ব্যাপক খননকার্য চালানো হয়। ৪০ বছরের বেশি সময় লেগেছিল এই শহর পুরোপুরি আবিষ্কার করতে। ইউনেস্কো এই শহরটিকে বিশ্ব হ্যারিটেজ ঘোষণা করে ১৯৮০ সালে। 

এক বাঙালির হাত ধরেই পুনরাবিষ্কার হয়মহেঞ্জোদারোতে বসবাসরত তখনকার মানুষের উন্নত জীবনাচরণ সবচেয়ে বেশি বিস্ময়কর। মহেঞ্জোদারো তখনকার সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ ছিল। এই শহর প্রায় ৬০০ একর জমির উপর বিস্তৃত ছিল বলে ধারণা গবেষকদের। যেটা তখনকার সময় বেশ বড় আয়তনের। এখনকার ধ্বংসস্তূপ থেকে জানা যায় শহরে প্রবেশ করার জন্য একটা বড় গেট ছিল। এছাড়াও এখানে এমন কয়েকটি বড় বাড়ি আছে যা তিনতলা পর্যন্ত উঁচু।

এখানে বাড়ি বানানোর জন্য যে ইট ব্যবহার করা হয়েছিল তা কোনো সাধারণ ইট ছিল না বরং ওয়াটার প্রুফ ইট ছিল। ধারণা করা হয় পৃথিবীতে প্রথম পাত কুয়া তৈরি করা হয়েছিল হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীদের দ্বারা। এই শহরে ৭০০ এর বেশি পাতকুয়ার সন্ধান মিলেছে। সিন্ধু নদের তীরে অবস্থিত মহেঞ্জোদারো সবচেয়ে পুরনো পরিকল্পিত একটি শহর। এখানকার রাস্তাগুলো এলোপাথাড়ি তৈরি হয়নি বরং প্রত্যেকটি রাস্তারই একটি নির্দিষ্ট ধারা এবং মাপ ছিল। এ থেকে ধারণা করা হয় মহেঞ্জোদারোর মানুষদের গণিতশাস্ত্রে বেশ ভালো জ্ঞান ছিল।

মহেঞ্জোদারোর বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে এই স্নানাগার মহেঞ্জোদারো নির্মিত হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২৬ শতাব্দীতে। কোনো সাধারণ শহর ছিল না বরং এই শহরে বড় বড় ঘর, পরিকল্পিত রাস্তা ও কুয়া থাকার প্রমাণ মিলেছে। আরো অবাক করার মতো তথ্য হলো এই শহরে নোংরা জল বের হওয়ার জন্য ড্রেইনেজ ব্যবস্থা ছিল অর্থাৎ বড় বড় নির্দিষ্ট সংখ্যক ড্রেন ছিল যা সেসময় হিসেবে বেশ অকল্পনীয় একটু ব্যপার। মহেঞ্জোদারোর মানুষেরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে এত সজাগ ছিল যেটা হয়তো আজকের যুগের মানুষেরও নেই।

এমনকি মহেঞ্জোদারো শহরে বাথরুম ব্যস্থারও প্রমাণ মিলেছে। মহেঞ্জোদারোর এক বড় আকর্ষণ ছিল মহা স্নানাগার। নগরীর ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত গ্রেট বাথ নামক স্থাপনাটি। গবেষকদের ধারণা ধর্মীয় পরিশুদ্ধির জন্য এই জায়গায় গোসল করতে আসতো পুণ্যার্থীরা। পুলের জল যাতে বেরিয়ে না যায় তাই সেদিকেও খেয়াল ছিল মহেঞ্জোদারোর বাসিন্দাদের। 

যে সময়টাতে মানুষ জঙ্গলে বাস করত, তখন মহেঞ্জোদারোর বাসিন্দারা কীভাবে এতোটা আধুনিক ছিল তাও এক রহস্যমহেঞ্জোদারোর সঙ্গে বাইরের সভ্যতার মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল পানি পথ। এজন্যই হয়তো তাদের সঙ্গে অন্যদের যোগাযোগ কম ছিল। কেননা বাইরের অন্য কোনো সভ্যতার আলামত পাননি গবেষকরা। মহেঞ্জোদারোর মানুষের প্রধান পেশা ছিল চাষাবাদ। নিজেদের খাবারের চাহিদা নিজেরাই মেটাতে চাষবাস করতো। খাদ্যশস্য মজুদ করে রাখার জন্যও তাদের ছিল বিশেষ ব্যবস্থা। শস্যের আদান-প্রদানের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ছিল স্থাপনাটির পাশে। এমনকি খাদ্য শস্য যেন অনেকদিন পর্যন্ত ভালো থাকে এবং শস্য ভান্ডারে বাতাস চলাচলের জন্যও উপযুক্ত ব্যবস্থা করে রেখেছিল মহেঞ্জোদোরোর বাসিন্দারা।

খনন করার সময় সেখানে পাওয়া কঙ্কালগুলোর দাঁত যখন পর্যবেক্ষণ করা হয় তখন অবাক করার মত একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়, তখনকার মানুষেরা আজকের দিনের মতো নকল দাঁত ব্যবহার করত। এটা থেকে বোঝা যায় হরপ্পা সভ্যতার মানুষেরা চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কেও অনেক এগিয়ে ছিল। হরপ্পা সভ্যতার মানুষেরা শিল্প-সংস্কৃতিতেও আধুনিক  ছিলেন বলে গবেষকরা অভিমত দিয়েছেন। শিল্পকলায় তখনকার মানুষদের বেশ আগ্রহ ছিল বলে ধারণা করা যায়।

তখনকার নারীরা এই ধরনের গয়না ব্যবহার করতেনপোড়ামাটির তৈরি নানা শিল্পকর্ম পাওয়া গেছে অধিবাসীদের মধ্যে। অলংকার ব্যবহারের প্রচলন ছিল সেই সময়। গলার হার, কানের দুল, হাতের ব্রেসলেট জাতীয় গহনা পরার চল ছিল নারীদের মধ্যে। পুরাতত্ত্ববিদদের মতে, সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা গান বাজনা ও খেলাধুলাও চর্চা করত। গবেষকরা কিছু মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট ও খেলনার সন্ধান পেয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন চিত্রকলা, মূর্তি, বিভিন্ন রকমের পাত্র এবং অন্যান্য দরকারি জিনিসপত্র পাওয়া গিয়েছে যেগুলো দেশ বিদেশের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে।

যে সময়টাতে মানুষ জঙ্গলে বসবাস করত। সেই সময় মহেঞ্জোদারোর মানুষেরা বসবাস করত অত্যাধুনিক ইটের বাড়িতে। যা বিংশ শতাব্দীতে লক্ষ করা যায়। পোশাক, খাবার, সংস্কৃতি সব কিছুতেই ছিল আধুনিকতার ছোঁয়া। একসময় এখানে যারা বসবাস করত, তাদের পরিকল্পনা ও দক্ষতার সাক্ষ্য দেয় ধবংসস্তূপের পতিটি নিদর্শন।

এই ধরনের কিছু মূর্তি পাওয়া যায় মহেঞ্জোদারো বিভিন্ন জায়গায় তবে নিখুঁত নগর নির্মাণের মতোই চমকে দেয়া মহেঞ্জোদারো পতন কখন, কীভাবে এবং কেন হলো তা আজো পুরাতত্ত্ববিদদের অজানা! সেখানে প্রাপ্ত কয়েকটা জিনিস এর কার্বন ট্রেডিং করার পর তারা মনে করেন জলবায়ুর বিরাট পরিবর্তন এই শহর ধ্বংস হওয়ার প্রধান কারণ। ধীরে ধীরে সিন্ধু নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে এখানে পানির অভাব দেখা দেয়।

খাবার, বাড়িঘর, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সবই ছিল এখনকার মতোই পরিকল্পিত সেই সঙ্গে আবহাওয়া কোনো বিপদ ডেকে এনেছিল যার ফলে হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায় তবে ধ্বংসের পেছনে নিশ্চিত কোনো কারণ কী লুকিয়ে আছে সকলেরই অজানা। পুরাতত্ত্ববিদরা আজও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংসের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণটি জানার উদ্দেশ্যে। তবে কবে নাগাত জানা যাবে এই রহস্য। একটি চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, এই মহেঞ্জোদারো ৭ বার ধ্বংস করে ৭ বার পুননির্মাণ করা হয়েছিল। তেমন কিছুই শেষবার হয়েছিল কিনা তাও রহস্য। হতে পারে এবার আর এখানে থাকতে ইচ্ছা হয়নি বাসিন্দাদের। অন্য কোনো সভ্যতার অংশ হয়েছিল তারা। তার সবকিছু ফেলে চলে গিয়েছেন অন্য কোথাও।  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে