পতিতা থেকে জলদস্যু, এই নারী ছিলেন চীনের ত্রাস

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

পতিতা থেকে জলদস্যু, এই নারী ছিলেন চীনের ত্রাস

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩২ ১১ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৬:৪৮ ১১ মার্চ ২০২১

সমুদ্র পথের যাত্রীদের আতংক ছিল জলদস্যুরা

সমুদ্র পথের যাত্রীদের আতংক ছিল জলদস্যুরা

ইতিহাসের অনেক পাতাই জলদস্যুরা রঞ্চিত করে রেখেছে। ব্ল্যাক বেয়ার্ড থেকে শুরু করে দেবী চৌধুরানী। গল্প-উপন্যাসের বদৌলতে জলদস্যুদের নিয়ে আমাদের অনেক কিছুই জানা। সমুদ্র পথের বণিক এবং যাত্রীদের জন্য ছিল এক আতংকের নাম।

ঝাঁকড়া চুল। এক চোখ কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা। একটি পা খোঁড়া। রুক্ষ মেজাজ। ঘাড়ে একটি ঈগল পাখি। জলদস্যু বলতে আমাদের মনে এরকম একজন ব্যক্তির অবয়ব ফুটে ওঠে। হলিউডের বিখ্যাত 'পাইরেটস্ অব দ্য ক্যারিবিয়ান' মুভিতে জনি ডেপের দুর্দান্ত অভিনয়ের কারণে জলদস্যুদের জীবন সম্পর্কে জানা যায় রোমাঞ্চ প্রিয় সিমেনা প্রেমীরা।

ফ্রান্সিস ড্রেক, ব্ল্যাকবার্ড কিংবা ক্যাপ্টেন কিড- ইতিহাসের বিখ্যাত সব জলদস্যুতবে পুরুষদের পাশাপাশি নারী জলদস্যুরাও ছিল আলোচনায়। দেবী চৌধুরানীর কথা মনে আছে? যার আসল নাম ছিল প্রফুল্ল। গরিব বিধবার মেয়ে ভাগ্যের জোরে হন জমিদারের পুত্রবধূ। তবে সেখানে ঠাই হয়নি প্রফুল্লর। ভাগ্যচক্রে ডাকাত দলের সঙ্গে মিশে যায় সে। এরপর ডাকাতের সর্দার হন। তবে ডাকাতি করলেও তিনি গরিব অসহায় মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন সব সময়। তার ক্ষোভ ছিল প্রজা শোষিত জমিদারদের উপর। তেমনি এক নারী জলদস্যু ছিলেন ঝেং শি। পতিতা থেকে জলদস্যুদের খাতায় নাম উঠান তিনি। তার জীবনের প্রতিটি বাঁকে রচিত হয়েছে একেকটি ইতিহাস। 

ফ্রান্সিস ড্রেক, ব্ল্যাকবার্ড কিংবা ক্যাপ্টেন কিড- জলদস্যুদের জগতে বড় বড় নাম। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, ইতিহাসের সফলতম জলদস্যু একজন নারী! ঝেং শি নামের এই চীনা নারী দক্ষিণ চীন সাগরে বলা চলে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিলেন। ইতিহাসে ঝেং শি নামে পরিচিত হলেও তার আসল নাম ছিল শিল জিয়াং গু। 'ঝেং শি' শব্দদ্বয়ের অর্থ 'ঝেং এর বিধবা স্ত্রী'। তার প্রথম স্বামীর নাম ছিল ঝেং য়ি। সেখান থেকেই হয়তো তার এই নাম এসেছে।

অত্যন্ত রূপবতী ছিলেন ঝেং শি, তবে ক্ষুধার রাজ্যে রূপের কদর করবে কে চীনের গুয়াংডং (বর্তমান নাম ক্যান্টন) প্রদেশে ১৭৭৫ সালে জন্মেছিলেন এই নারী। গরিবের মেয়ে ঝেং ছিলেন রূপবতী। যেখানে দুবেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয় তাদের। সেখানে রূপের কদর করবে কে। ধারণা করা হয় দারিদ্র্যের কারণে অল্প বয়সেই গুয়াংডু প্রদেশে একটি ভাসমান পতিতালয়ে পতিতাবৃত্তিতে নিয়োজিত হন। ঝেং শি যখন তরুণী, তখন চীনে প্রবল প্রতাপে জলদস্যুগিরি করে বেড়াতো ঝেং য়ি নামের একজন দস্যু। এই দস্যুরাজের সঙ্গে পতিতালয়েই পরিচয় হয় তার। পরবর্তীতে তার সঙ্গেই ঝেং শির বিয়ে হয়। তবে কীভাবে তাদের বিয়ে হলো, কিংবা আদৌ তাদের বিয়ে হয়েছিল কিনা তা নিয়েও রয়েছে নানান যুক্তি তর্ক। 

জলদস্যু সর্দারকে বিয়ে করেন ঝেং শি অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, সেই দস্যুরাজের বাহিনী ঝেং শির ভাসমান পতিতালয়ে আক্রমণ চালায়। তারা ঝেং শির সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে তাদের নেতা সেই দস্যুরাজ ঝেং য়ির কাছে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে ঝেং য়ি তাকে বিয়ে করেন। আবার কারো কারো মতে, ঝেং য়ি সরাসরি তাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, দস্যুরাজ ঝেং য়ি ও সুন্দরী ঝেং শি যে ১৮০১ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায় ইতিহাসে। তবের বিয়েতে ঝেং শি একটি অদ্ভুত শর্ত জুড়ে দেয়। যদি তাকে লুট করা মালামালের বিভাজনসহ সবকিছুতেই অর্ধেক অধিকার দেয়া হয়। তবেই সে সর্দারকে বিয়ে করবে। এদিকে ঝেং শিয়ের প্রেমে পাগলপ্রায় ঝেং য়ি তার সব শর্ত মেনে নেয়। 

ঝেং য়ি সেই সময়ের নামকরা দস্যু ছিলেন। তার নের্তৃত্বে কুখ্যাত 'লাল নৌবহর' দক্ষিণ চীন সাগরে ত্রাস ছড়াত। তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী জলদস্যু গ্রুপগুলোর সঙ্গে জোট তৈরি করেন। ফলে একটি বিশাল দস্যু-জোট তৈরি হয়, যে জোট ক্রমেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। এই জোটের সাহায্যে ঝেং য়ি ম্যাকাউ-এর পর্তুগিজ বন্দরে অবরোধ জারি করেন। পর্তুগিজরা তাদের সমৃদ্ধ নৌশক্তি নিয়ে বাধা দিতে আসলে উল্টো পরাজিত হয়ে ফিরে যায়। 

সমুদ্রের ত্রাস হয়ে ওঠেন এই দস্যু দম্পতি ব্যক্তিত্ব আর বুদ্ধিমত্তার জোরে ‘রেড ফ্ল্যাগ ফ্লিট'এর দস্যুদলে নিজের প্রভাব - প্রতিপত্তিও বাড়িয়ে তুলেছিল ঝেং শি। সম্পত্তির ভাগ তো ছিলই, পাশাপাশি দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতেও এই সময় থেকেই বেশ ভূমিকা নিতে শুরু করেন ঝেং শি। জলদস্যুদের জীবনে সে ছিল এক আশ্চর্য সুসময়। এই দুজনের নেতৃত্বে ২০০ জাহাজের নৌবহর কিছুদিনের মধ্যেই বাড়তে বাড়তে প্রথমে ৬০০ , তারপর প্রায় ১৮০০ জাহাজের এক বিরাট নৌসেনায় পরিণত হয়। নানা রঙের পতাকা দিয়ে সেসব জাহাজের ক্ষমতা প্রকাশ করা হত। দস্যুদলের সর্দারদের জাহাজে থাকত লাল পতাকা। বাকি জাহাজগুলোর মাথাতেও ক্ষমতা আর কাজ অনুসারে নীল, কালো, সবুজ নানারঙের পতাকা।

এই সময় আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন ঝেং শি। ওই এলাকার আরেক কুখ্যাত জলদস্যু ইয়ু শি’র সঙ্গে একটা সমঝোতা চুক্তি করেন তারা। এর ফলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, দস্যুদের নিজেদের মধ্যে মারামারি , লোকক্ষয়-এসব অনেকটাই কমে যায়। দক্ষিণ সমুদ্রে ক্যান্টোনিজ জলদস্যুদের একটা শক্তিশালী জোট গড়ে ওঠে। তবে দস্যু দলপতি ঝেং ই- এর সুসময় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিয়ের মাত্র দু'বছরের মাথায় এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাঝসমুদ্রে ভয়ংকর দুর্ঘটনার মুখে পড়েন তিনি। ১৮০৭ সালে সর্দার যখন মারা যান, তখন বাহিনীর দস্যুসংখ্যা ৫০,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। অনেক বড় জলদস্যু দল নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মাঝ সমুদ্রে। 

সমুদ্রে হাজার হাজার জাহাজবহর নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন ঝেং শি স্বামীর মৃত্যুর পর পুরনো জীবনে ফেরেননি ঝেং শি। ঝেং য়ি মারা গেলেও সেই দস্যুদলই হয়ে ওঠে তার নিজের পরিবার। সর্দারের মৃত্যুতে প্রথম প্রথম নেতৃত্ব নিয়ে কিছু অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল ঠিকই, তবে দল ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার আগেই ক্ষমতার রাশ শক্ত হাতে চেপে ধরেন ঝেং শি। সঙ্গে নেন পালিত ছেলে চ্যাং পাও'কেও। বিয়ের পরপরই চ্যাং পাও'কে দত্তক নিয়েছিলেন এই দস্যু দম্পতি। এবার সেই দত্তক নেয়া ছেলেই সর্বশক্তি নিয়ে এসে দাঁড়ালেন ঝেং শি'র পাশে । 

নেত্রী হিসাবে একদিকে যেমন দক্ষ ছিলেন, তেমনই কঠোর ছিলেন ঝেং শি। সামরিক কৌশল, ব্যবসার ফন্দিফিকির সবটাই খুব ভালো বুঝতেন ঝেং শি। নিয়মকানুনের অটিসটি বাঁধনে পুরো দলকে বেঁধে রেখেছিলেন তিনি। ডাকাতি পিছু নিয়ম করে দস্যুরানিকে রীতিমতো ট্যাক্স দিতে হত সেসময়। লুঠ করা মালের ৮০ % ই যেত দস্যুদের সমবায় তহবিলে। সর্দার বা ক্যাপ্টেনের কথাই ছিল দলের শেষ কথা। যেকোনো বিদ্রোহকেই বত্র মুঠিতে দমন করতে জানতেন দস্যুরানি ঝেং শি।

চীনের জন্য ঝেং শি এক আতংকের নাম হয়ে যায় তিনি নিয়ম করলেন , পুটতরাত করে সমুদ্র তীরের গ্রাম থেকে যেসব মেয়েদের ধরে আনা হয় , তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মেয়েদেরই বিনা শর্তে মুক্তি দিতে হবে। সুন্দরী বন্দিনীদের উপর কোনো রকম শারীরিক নির্যাতন বা যৌন অত্যাচার করা যাবে না। নারী বন্দিদের সঙ্গে দস্যুদলের কেউ সঙ্গম করার চেষ্টা করলে তার জন্য অপেক্ষা করে থাকত কঠিন শাস্তি। তবে বন্দিনী মেয়েটির ইচ্ছে অনুসারে, তার মত নিয়ে যদি দস্যুদের কেউ তাকে বিয়ে করতে চায়, একমাত্র তবেই অনুমতি মিলত। সেখানেও শর্ত ছিল , বিবাহিত মেয়েটির প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হত সেই দস্যুকে। অন্যথায় মুণ্ডচ্ছেদ।

মেয়েরা যাতে কোনো ভাবেই জলদস্যুদের লালসার শিকার না হয়, সে ব্যাপারে বেশ কঠোর ছিলেন ঝেং শি।সমুদ্র উপকূলীয় এলাকাগুলোতে তার দস্যুবাহিনী নিয়মিত আক্রমণ করত। ফলে সমুদ্র তীরবর্তী বিশাল অঞ্চলে ঝেং শির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পায়। এসব অঞ্চল থেকে তিনি তার দস্যুবাহিনীর মাধ্যমে কর আদায় করতেন।

এই জলদস্যু নারীকে নিয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমা একসময় ঝেং শির আধিপত্য এত বেশি অঞ্চলে বিস্তৃত হয় যে, চীনা রাজবংশের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চীনা রাজবংশ ব্রিটেন এবং পর্তুগালের সাহায্য নিয়ে তাকে পরাস্ত করতে নৌ-অভিযান প্রেরণ করে। তবে ঝেং শির বিশাল বাহিনীর কাছে তারা টিকতেই পারেনি। শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয় তাদের। এমনকি সম্মিলিত রাজকীয় বাহিনীর ষাটটি জাহাজ দখল করে নেয় ঝেং শির দস্যুরা।

চীনা সরকারের সঙ্গে এক সমঝোতা চুক্তি করে ঝেং শি উপায়ান্তর না দেখে চীনা রাজবংশ সুন্দরী দস্যুরানি ঝেং শিকে সমঝোতার প্রস্তাব দেয়। সমঝোতা অনুযায়ী, লুটের মালামাল নিজের কাছে রাখার নিশ্চয়তা পান। যেসব অঞ্চলের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেসব রাজবংশের হাতে ন্যস্ত করেন। এছাড়াও সমঝোতার ফলাফল হিসেবে দস্যুরানি তার 'ডান হাত' খ্যাত পালিত পুত্র চ্যাং পাওকে বিয়ে করেন। অদ্ভুত শোনালেও সত্য। 

কিন্তু হঠাৎ করেই কেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী দস্যুরানি সরকারের সমঝোতা প্রস্তাবে সাড়া দিলেন? এর জবাবে অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, প্রয়াত ঝেং য়ির সময় যে দস্যুগ্রুপগুলো নিয়ে জোট গঠন করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এটি একটি কারণ। এছাড়াও ঝেং শির 'সমুদ্রে ভেসে ভেসে বেড়ানো' জীবন আর ভালো লাগছিল না। তাই তিনি রাজবংশের সমঝোতা প্রস্তাবে সায় দেন।

শিল্পীর তুলিতে আঁকা ঝেং শি এবং তার স্বামী দস্যু সর্দার ঝেং য়ি সমঝোতার পর তার জীবন সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। তিনি তার শৈশবের এলাকায় ফিরে যান এবং গোপনে বসবাস করতে থাকেন। ১৮৪৪ সালে ৬৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান। একজন সাধারণ দেহব্যবসায়ী থেকে ইতিহাসের সফলতম দস্যু হওয়া- ঝেং শির জীবনে সবকিছু সহজ ছিল না।

ভাগ্যের ছোঁয়াও যে একেবারেই ছিল না, সেটিও অস্বীকার করা যাবে না। তবে তিনি যে একজন শক্তিমান ও গোছালো নারী ছিলেন, এ বিষয়টি একদম পরিস্কার। সেই সময়ে একজন নারীকে প্রধান হিসেবে মেনে নেয়ার মতো মানসিকতা চীনের মানুষের ছিল না, তবে ঝেং শির কৌশল, নের্তৃত্ব ও ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে তিনি তা সম্ভব করেছিলেন। ভিলেন হয়েও ইতিহাসের বড় একটি জায়গা দখল করে রেখেছেন প্রধান চরিত্রে। তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমাও। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে