স্রোতের বিপরীতে চলা নভেরার গল্প

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৫ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ২ ১৪২৮,   ০২ রমজান ১৪৪২

স্রোতের বিপরীতে চলা নভেরার গল্প

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১৯ ৮ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৭:৩২ ৮ মার্চ ২০২১

নভেরা আহমেদ

নভেরা আহমেদ

রুদ্রাক্ষের মালা গলায়, উঁচু করে বাঁধা খোঁপা, কপালে তিলক। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে রক্ষণশীল সমাজে একটি মেয়েকে এভাবে একেবারেই কল্পনা করা যায় না। সমাজকে এই বেশে নভেরা আহমেদ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হেঁটে বেড়াতেন চট্টগ্রাম আর ঢাকার পুরনো রাজপথে। নজরকাড়া ব্যক্তিত্ব যা কারও চোখ এড়াতো না। সমাজ তাকে কটূক্তি করতে এতোটুকুও কার্পণ্য করে নি কখনো। সেই নভেরার অবদান বাংলায় কম নয়। বরং খানিকটা বেশিই বলা যায়। বাংলাদেশ সৃষ্টির আগে এবং পরে ভাস্কর্য নির্মাণে তার কীর্তি আজও অমলিন। 

আধুনিক ভাস্কর্যের অন্যতম পথিকৃৎ, অগ্রণী বাঙালি নারী ভাস্কর নভেরা আহমেদ। ১৯৩৯ সালের ২৯ মার্চ বাগেরহাটের সুন্দরবনে নভেরার জন্ম। চাচা নাম রাখেন ‘নভেরা’। ফার্সি শব্দ নভেরা অর্থ নবাগত, নতুন জন্ম। কর্মসূত্রে তার বাবা সৈয়দ আহমেদ কর্মরত ছিলেন সুন্দরবন অঞ্চলে। তবে পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের আসকারদিঘির উত্তর পাড়। পরবর্তীতে তার বাবা চাকরিসূত্রে কিছুকাল কলকাতায় অবস্থার করায় নভেরার শৈশব কেটেছে কলকাতা শহরে। বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তিনি নাচ, গান শেখার পাশাপাশি মাটি দিয়ে মূর্তি তৈরী (মডেলিং) করতেন। তিনি কলকাতার লরেটা স্কুল থেকে প্রবেশিকা (ম্যাট্রিক) পাস করেন।

নভেরা পঞ্চাশ- ষাটের দশকে নিজেকে স্রোতের বিপরীতে চালিয়েছেন আইন শিক্ষার জন্য তাকে বাড়ি থেকে লন্ডনে পাঠানো হয় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে। তবে শৈশব থেকেই নভেরার ইচ্ছা ছিল ভাস্কর্য করার; তাই তিনি সেখানে গিয়ে সিটি অ্যান্ড গিল্ডস্টোন কার্ভিং ক্লাসে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে ভর্তি হন ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসে ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ডিজাইনের মডেলিং ও স্কাল্পচার কোর্সে। সেখান ভাস্কর্য বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন।

১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে নভেরা আহমেদ ইতালির ফ্লোরেন্সে চলে আসেন। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে অল পাকিস্তান পেইন্টিং অ্যান্ড স্কাল্পচার এক্সিবিশন আয়োজন হয়। সে সময়ে ১০ বছর বয়সী একটি ছেলে ঘরের কাজে নভেরাকে সাহায্য করত। এই প্রদর্শনীর জন্য নভেরা তারই একটি আবক্ষমূর্তি তৈরি করলেন এবং নাম দিলেন ‘চাইল্ড ফিলোসফার’। এই ভাস্কর্যের জন্য তিনি সেই প্রদর্শনীতে প্রথম পুরস্কার লাভ করেন।

দেশের প্রথম নারী ভাস্কর ছিলেন নভেরা আহমেদ তিনি সবসময়ই ছিলেন সময়ের চেয়ে বেশি এগিয়ে চলা নারী, তাই ঠিক সেসময়ে তিনি ততটা স্বীকৃতি বা গ্রহণযোগ্যতা পাননি, যা তার অবশ্য প্রাপ্য ছিল। একজন ভাস্কর্য্য শিল্পী হিসেবে নভেরা আহমেদের মূল প্রবণতা ফিগারেটিভ এক্সপ্রেশন। তার কাজের প্রধান বিষয়বস্তু হচ্ছে নারী প্রতিমূর্তি। তবে নারী প্রতিমূর্তি নির্মাণে তিনি বিমূর্ততার দিকে ঝুঁকেছেন। কাজের স্টাইলের দিক থেকে তিনি ব্রিটিশ ভাস্কর হেনরী মূর অনুবর্তী।

পরবর্তী কালে আরো একজন ভাস্কর একইভাবে হেনরী মূর দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছেন তিনি হলেন জুলিয়া কেইক। নভেরা আহমেদ এবং জুলিয়া কেইক-এর কাজের মধ্যে আশ্চর্যজনক সমিলতা রয়েছে।সমসাময়িক পুরুষ শিল্পীরা ইউরোপীয় ইন্দ্রিয় সুখাবহ নারীদেহে একটি রোমান্টিক ইমেজ দেয়ার চেষ্টা করতেন। এমনকি জয়নুল, কামরুলরা নারীকে মাতা, কন্যা, স্ত্রী এবং অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখালেও নারীদের যথার্থ কর্মময় জীবন উহ্যই ছিল তখনো পর্যন্ত।

তার কর্মে ছিল আবহমান বাংলার লোকজ আঙ্গিকের আভাসনভেরা আহমেদ নারীকে দেখেছেন সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে, পুরুষ শিল্পীদের উপস্থাপনার বিপরীতে। তার কাজে নর-নারীর গ্রন্থনা একটি ঐক্য গঠন করে। তিনি ভাসা ভাসা সুন্দর আনন্দময়ী আদর্শ ফর্ম করার পরিবর্তে তার ফর্মগুলোকে সরল, অর্থপূর্ণ, স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ করেছেন। উন্মোচন করেছেন সবধরনের বিচলিত, আবেগমথিত, সত্যিকারের নারীর রূপকে। দি লং ওয়েট কাজটি তারই নমুনা। তার মায়েরা সুন্দরী নয়, কিন্তু শক্তিময়ী, জোড়ালো ও সংগ্রামী। তারা মানবিকতার ধ্রুপদী প্রতীক। 

পাশ্চাত্য জীবনধারাই বেশি পছন্দ ছিল নভেরা আহমেদের ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে অধিকাংশই বেশ বড় আকারের; ৫ ফুট থেকে শুরু করে এমনকি ৭ ফুট ১১ ইঞ্চি পর্যন্ত উচ্চতাবিশিষ্ট। নভেরা তার শিল্পকর্মে একঘেয়েমি কাটাতে পরবর্তীতে কতগুলো কাজে ভিন্নমাত্রা সংযোজন করেছিলেন। যেমন: নগ্ন নারী মুর্তি, লম্বা গ্রীবা ও মাথার এনাটমিতে বাংলাদেশের ‘কন্যা-পুতুলের’আঙ্গিকের পাশাপাশি হাত-পা-শরীরের অবস্থান স্থাপনের ক্ষেত্রে মদীয়ানির ফর্ম ও ড্রইভের সুষমা, স্তন ও শরীরের উপস্থাপনায় মহেঞ্জোদারোর ‘বালিকা-মূর্তির’প্রাচ্য অভিলাষকে একত্রিত করেছেন। অন্যদিকে প্লাস্টার অব প্যারিসে নির্মিত দু’টি ভাস্কর্যে মুখমন্ডল বহুলাংশে বাস্তবধর্মী, সামান্য গান্ধারা শিল্পধারায় প্রভাবিত। সম্ভবত এই মস্তক দু’টি বুদ্ধের মস্তকের অনুকরণে অণুকৃতি।

নভেরা আহমেদের শিল্পধারা ছিল সমসাময়িক ভাস্করদের তুলনায় অনেক আলাদা নভেরার বেশকিছু ভাস্কর্যে আবহমান বাংলার লোকজ আঙ্গিকের আভাস পাওয়া যায়। তবে লোকজ ফর্মের সাথে সেখানে পাশ্চাত্য শিক্ষার সমন্বয়ও বর্তমান। লোকজ টেপা পুতুলের ফর্মকে সরলীকৃত করে তাকে দক্ষতার সঙ্গে বিশেষায়িত করেছেন তিনি। এভাবে ঐতিহ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্য শিক্ষার স্বার্থক ভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা তার আধুনিক চিন্তার লক্ষণ। এক্ষেত্রে তার ভাস্কর্যগুলো আদলে তিনকোনা, চোখ ছিদ্র, লম্বা গ্রীবা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে আসে। চলেছেন সবসময় স্রোতের বিপরীতে। 

১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে অধিকাংশই বেশ বড় আকারের; ৫ ফুট থেকে শুরু করে এমনকি ৭ ফুট ১১ ইঞ্চি পর্যন্ত উচ্চতাবিশিষ্ট। একই বিষয়বস্তু নিয়ে নির্মিত একাধিক ভাস্কর্যের মধ্যে পরিবার (১৯৫৮), যুগল (১৯৬৯), ইকারুস (১৯৬৯) ইত্যাদি কাজে মাধ্যমগত চাহিদার কারণেই অবয়বগুলো সরলীকৃত। ওয়েলডেড স্টিলের জেব্রা ক্রসিং (১৯৬৮), দুটি লুনাটিক টোটেম ইত্যাদির পাশাপাশি রয়েছে ব্রোঞ্জ মাধ্যমে তৈরি দণ্ডায়মান অবয়ব। এ ছাড়া কয়েকটি রিলিফ ভাস্কর্য ও স্ক্রল। লুনাটিক টোটেম বা মেডিটেশন (১৯৬৮); এই দুটি ভাস্কর্যে শিল্পী নভেরার মরমি অনুভবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। 

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রায় ৪৫ বছর ফ্রান্সের প্যারিসে কাটিয়েছেন নভেরা প্রায় ৪৫ বছর ফ্রান্সের প্যারিসে বসবাস করেন। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে দেশ ত্যাগ করার পর প্যারিসে বসবাস কালে ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন নভেরা, তবে বড় কোনো আঘাত পাননি। তবে এরপর তিনি কখনো বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেননি। ২০১০ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে স্ট্রোকের ফলে হুইলচেয়ারে বসেই তার শেষ জীবন কাটে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ মে, মঙ্গলবার প্যারিসের স্থানীয় সময় ভোর ৩টায় মধ্যে ৭৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। 

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে একুশে পদকও পেয়েছেন এই মহীয়সী নারী ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। তাকে নিয়ে নভেরা (১৯৯৫) শিরোনামে জীবনী উপন্যাস রচনা করেছেন হাসনাত আবদুল হাই। নির্মিত হয়েছে প্রামাণ্য চিত্র নহন্যতে (১৯৯৯)। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি বিস্তৃত দীর্ঘ জীবনের তুলনায় নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের সংখ্যা কম। ষাট দশকের শেষভাগের মধ্যেই তার যা কিছু সৃষ্টি ও নির্মাণ।

২০১৫ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যুর পর ৪৩টি চিত্রকর্মের হদিস পাওয়া গেছে। তার ৮০ তম জন্মদিনে গুগল ডুডল তৈরি করে সম্মাননা প্রদান করে। সমাজের প্রচলিত ধারার স্রোতে গা ভাসাননি কখনো নভেরা। নারীদের জন্য ক্ষেত্র তৈরি করেছেন তিনি। নারীকে তার নিজের পছন্দ অপছন্দে চলার স্বাধীনতা শিখিয়েছেন নভেরা।  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে