সুলতানা রাজিয়া: যুদ্ধের দক্ষ সৈনিক থেকে নারী শাসক

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

সুলতানা রাজিয়া: যুদ্ধের দক্ষ সৈনিক থেকে নারী শাসক

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:২৭ ৮ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১২:৩৯ ৮ মার্চ ২০২১

রাজিয়া সুলতানা

রাজিয়া সুলতানা

নারীর ক্ষমতায়নের শুরু আজ থেকে নয়। এই ধারাবাহিকতা চলে আসছে বহু শতাব্দী থেকে। যদিও নারী- পুরুষের বৈসম্য হয়ে আসছে অনেক আগে থেকেই। নারীকে শুধু স্ত্রী আর মায়ের ভূমিকাই কল্পনা করা হত। কোনো নারী রাজ্য শাসন করছেন। একথা যেন রূপকথার গল্প ছিল মধ্যযুগে। তবে ইতিহাস বলছে, নারীরা সফলভাবেই শাসন করেছেন তাদের রাজ্য। নারীরা তাদের বুদ্ধিমত্তা, ক্ষমতা আর যোগ্যতা দিয়েই সফলভাবে রাজ্য পরিচালনা করেছেন। 

ক্লিওপেট্রা ছিলেন নারী শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে সফল আর অন্যতম একজন। জানেন কি? মধ্যযুগে নারী শাসকদের মধ্যে প্রথম মুসলিম নারী শাসক কে ছিলেন? সুলতানা রাজিয়া। তিনি ১২৩৬ থেকে ১২৪০ সাল পর্যন্ত প্রায় চার বছর রাজত্ব করেছিলেন। রাজিয়া ছিলেন সুলতান ইলতুতমিশের কন্যা ও ভারতের প্রথম নারি শাসক। তিনি একাধারে প্রশাসক ও সেনাপতি ছিলেন এছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে একজন দক্ষ সৈনিক হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। ১২০৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন এই মহীয়সী নারী। 

রাজিয়া সুলতানা ছিলেন প্রথম নারী মুসলিম শাসক সুলতান ইলতুতমিশের সুযোগ্য পুত্র নাসির-উদ-দীন মাহমুদের মৃত্যুর পর সুলতান ইলতুতমিশ তার অন্যান্য পুত্রদের তুলনায় রাজিয়াকেই সুলতান হিসেবে যোগ্য মনে করেন এবং মনোনীত করেনবাবার পরবর্তী উত্তরসূরি হিসেবে সিংহাসনে বসেন। তার যোগ্যতা এবং বুদ্ধিমত্তার কারণে দুই ভাই থাকা সত্ত্বেও তিনি সিংহাসনে বসার সুযোগ পেয়েছিলেন। 

সেসময় মুসলিম বিশ্ব এবং খ্রিস্টান ইউরোপ উভয় ক্ষেত্রেই খুব কম রাজ্যেই নারী শাসক ছিল। আর সেসময় এটি খুবই অস্বাভাবিক ছিল। যখন বৈধ কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী থাকত না তখন বাধ্য হয়ে নারীদের শাসনের ভার দেয়া হত। তবে রাজিরার বেলায় হয়েছিল তার উল্টা। তার সৎ দুই ভাই উত্তরাধিকারী হিসেবে থাকার পরও তিনি শাসক হয়েছিলেন।  

ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর তার মেয়ে রাজিয়া সিংহাসনে বসেন  রাজিয়া ছিলেন দিল্লির মামলুক সুলতানিতের প্রথম এবং একমাত্র নারী শাসক। আরবিতে তাকে ডাকা হত রাদিয়া নামে। সুলতান শামস আল-দীন ইলতুৎমিশের ঘরে ১২০৫ সালে রাজিয়ার জন্ম হয়। ইলতুৎমিশ ছিলেন তুর্কি দাস। তিনি মধ্য এশিয়ার উপত্যকা থেকে ভারতে দাস হয়ে এসেছিলেন। তাকে কিনেছিলেন কুতুব আল-দিন আইবাক নামের একজন। তিনি ছিলেন মামলুক দাস বংশের প্রতিষ্ঠাতা। আরো পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে রাজবংশের শাসকরা সবাই পূর্বসূরীদের বংশধর ছিলেন না।

অনেকেই অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। তেমনি একজন ছিলেন কুতুব আল-দিন আইবাক। রাজিয়ার মা তুরকান খাতুন ছিলেন কুতুব আল-দ্বীন আইবাকের কন্যা। ইলতুৎমিশ স্ত্রীর জন্যই তার শ্বশুরের রাজ্যের সিংহাসনে বসেছিলেন। ইলতুৎমিশের শাসনামলে ভারতে মুসলিম শাসন খুবই শক্তিশালী হয়েছিল।

মাত্র সাড়ে চার বছর তিনি রাজত্ব করেছেন ভারতবর্ষে রাজিয়া মাত্র সাড়ে চার বছর ভারতবর্ষ শাসন করেছিলেন। ভারতবর্ষের সমৃদ্ধ ইতিহাসের ভীড়ে এই সময়টুকুর কথা হয়ত তেমন আলোচনাতেই আসত না। তবে রাজিয়া সুলতানা নিজ যোগ্যতাবলেই ওই সময়টুকুকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পেরেছিলেন। কারণ একজন নারী হিসেবে ওই সময় সিংহাসনে আরোহণ করা কল্পনারও বাইরে ছিল। ১৯৪০ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মৃত্যু হয় এই বীরের। তার মৃত্যু নিয়ে বেশ কিছু মতবাদ রয়েছে। ধারণা করা হয় তিনি শুধু ভারতই নয় পুরো বিশ্বের প্রথম নারী মুসলিম শাসক ছিলেন।

ভারতে ইসলামের প্রচার সেই সঙ্গে বর্ণবাদ দূর করেছিলেন তিনি। বিশেষত নিম্নবিত্তদের মধ্যে যারা ছিল ইলতুৎমিশ তার বড় ছেলে নাসিরুদ্দীন মাহমুদকে তার উত্তরসূরি হিসাবে গড়ে তোলেন। তবে অপ্রত্যাশিতভাবে নাসিরুদ্দীন মাহমুদ ১২২৯ সালে মারা যান। তার অন্যান্য পুত্ররা বিপথে চলে যাওয়ায় একমাত্র নাসিরুদ্দিনকেই যোগ্য মনে করেছিলেন তিনি। 

পুত্র সন্তান থাকা স্বত্বেও কেন তিনি রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করলেন, এ নিয়ে ছিল নানান জন নানান প্রশ্ন তুলেছিলেন। সবাই আপত্তি তুলেছিলেন এই নিয়ে। ইলতুৎমিশ সবার প্রশ্নের একটিই মাত্র উত্তর দিয়েছিলেন, রাজিয়া তার পুত্রদের চেয়ে বেশি দক্ষ। তবে ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পরে অভিজাতরা সর্বসম্মতিক্রমে রাজিয়ার সৎ ভাই রুকনউদ্দিন ফিরুজকে নতুন রাজা হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন। তবে রুকনউদ্দীনের রাজ্য পরিচালনা করার সক্ষমতা ছিল না।  

রাজিয়া সুলতানাকে নিয়ে তৈরি করা হয় টিভি সিরিয়াল রুকনউদ্দিন সাত মাসেরও কম সময় সিংহাসনে থাকতে পেরেছিলেন। এরপর সিংহাসনে বসেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নারী মুসলিম শাসক রাজিয়া শাহ। সেই সময় সমাজের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি রাজিয়ার পক্ষে ছিলেন। অল্পদিনেই রাজিয়া তার দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সবার মন জয় করে নেন। তবে রাজত্বের প্রথম থেকেই রাজিয়া তুর্কি বংশোদ্ভুত অভিজাতদের কঠোর বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিনি শক্তিশালী তুরস্ক-বংশোদ্ভূত প্রাদেশিক গভর্নরদের চেয়ে দিল্লির সাধারণ জনগণের সমর্থনে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তুর্কিদের একেবারেই পাত্তা দিতেন না তিনি। 

রাজিয়ার রাজত্বকালে শিয়ারা সুলতানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। সেটিও রাজিয়ার কৌশলী দক্ষতার ফলে সফলভাবে দমন করা সম্ভব হয়েছিল। এছাড়াও অনেক বিদ্রোহ দমন করে টিকে ছিলে রাজিয়া। ১২৪০ সালের এপ্রিলে একদল অভিজাতদের দ্বারা তিনি পদচ্যুত হন। এরপর ইখতিয়ারউদ্দীন আলতুনিয়া নামের একজন বিদ্রোহীকে বিয়ে করেন রাজিয়া। 

নিজের কর্ম দক্ষতায় সবার মন জয় করেছিলেন রাজিয়া এটি ছিল তার সিংহাসন ফিরে পাওয়ার একটি কৌশল মাত্র। তবে তা আর সম্ভব হয়নি। সে বছরের অক্টোবরে তার সৎ ভাই মুইজউদ্দিন বাহরামের কাছে পরাজিত হন রাজিয়া। এরপরই তাকে হত্যা করা হয়। প্রাচীন দিল্লিতেই রাজিয়ার সমাধি অবস্থিত। চতুর্দশ শতাব্দীর ভ্রমণকারী ইবনে বতুতা উল্লেখ করেছেন,  রাজিয়ার সমাধিটি তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে। এক গম্বুজবিশিষ্ট সমাধিটির কাছে অনেকেই আশীর্বাদ চাইতে আসতেন। কথিত আছে, রাজিয়ার সমাধিটি তার সৎ ভাই বাহরামই নির্মাণ করেছিলেন। রাজিয়ার পাশেই তার বোন শজিয়ার সমাধি রয়েছে। 

রাজিয়া সুফী সাধক শাহ তুর্কিমান বায়াবানীর এক ভক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তার সমাধিস্থ স্থানটিই সুফী সাধকের  খানকাহ হিসেবে পরিচিতি পায়। অবহেলায় আর অযত্নে আজ সমাধি প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। ২০ শতকের শেষদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা এর পাশেই একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। বর্তমানে কাইঠালের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন রাজিয়ার মূল সমাধির স্থান হিসেবে প্রতীয়মান।

রাজিয়া মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মারা যান ১৯৮৩ সালে রাজিয়ার একটি বায়োপিক তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে রাজিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বলিউডের অন্যতম একজন অভিনেত্রী হেমা মালিনী। ২০১৫ সালে রাজিয়ার জীবন সম্পর্কিত একটি টিভি সিরিজ প্রচার করতে শুরু করে একটি চ্যানেল। টিভি শোটি রাজিয়া সুলতানের প্রকৃত ইতিহাস থেকে অনেক দূরে ছিল। সেখানে দর্শকদের আকৃষ্ট করার জন্য কিছু মনগড়া সিকোয়েন্স দেখানো হয়। টিভি সিরিজে রাজিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করেন পানখুরি অবাস্তি। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে