৬ হাজার বছর ধরে ঈগল পোষার রীতি যে জাতির

ঢাকা, বুধবার   ১৪ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ২ ১৪২৮,   ০১ রমজান ১৪৪২

৬ হাজার বছর ধরে ঈগল পোষার রীতি যে জাতির

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩১ ৭ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৬:৩৭ ৭ মার্চ ২০২১

ছবি: ৬ হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণকারী এক দুঃসাহসী জাতি

ছবি: ৬ হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণকারী এক দুঃসাহসী জাতি

মঙ্গোলিয়া এশিয়া মহাদেশের রহস্যময় দেশ হিসেবে পরিচিত। এই দেশে যেমন আছে গোবির মতো ভয়ঙ্কর মরুভূমি, তেমনি অবস্থান করছে বরফে ঢাকা বিস্তীর্ণ প্রান্তর। এই মঙ্গোলিয়ার পশ্চিম দিকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিন হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত একটি অঞ্চল হল আলতাই। আলতাই বাইয়ান আলিগির প্রদেশের অন্তর্গত। মঙ্গোলিয়ার অন্তর্গত অঞ্চল হলেও এখানে মূলত কাজাখ আদিবাসীদের বসবাস।

বাচ্চা ঈগল আলতাই অঞ্চলটির সীমানা বরাবর অবস্থিত চীন, কাজাখাস্তান এবং রাশিয়া। প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থা প্রচলিত থাকায় এখানে সুনির্দিষ্ট কোনো সীমানা নেই বলে জানা যায়। বিশেষ করে শীতকালে গোটা আলতাই পুরু বরফের চাদরে ঢাকা থাকে। এই সময় এখানকার তাপমাত্রা ৩০° সেলসিয়াসের‌ও নিচে চলে আসে। আর এই সময়ে এখানকার অধিবাসীরা তীব্র খাদ্য সঙ্কটে ভোগেন।

আর এই খাদ্য সঙ্কট দূর করতেই আজ থেকে প্রায় ৬ হাজার বছর আগে আলতাই উপত্যকার অধিবাসীরা শিকারি ঈগল পোষা শুরু করেন। এই ঈগলের সাহায্যে আলতাই উপত্যকার কাজাখ আদিবাসীরা মারমোন্টস নামে এক বিশেষ ধরনের বৃহৎ ইঁদুর ও কার্সিক শিয়াল শিকার করে। আর এই শিকারের পাশাপাশি নেকড়ে বাঘও শিকার করেন! তবে শিকারি ঈগলকে পোষা কেবলমাত্র জাতি অনুযায়ী প্রচলিত তা নয়, বরং আলতাই উপত্যকায় বসবাসকারী প্রতিটি মানুষের মধ্যেই এই রীতির প্রচলন রয়েছে।

ডান কাঁধে ঈগলকে বসিয়ে শিকারের সন্ধানে বেরিয়ে হন তারা একসময় সমগ্র মঙ্গোলিয়ায় শিকারি ঈগল পোষার রেওয়াজ চালু থাকলেও তা এখন শুধু আলতাই উপত্যকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে। মঙ্গোলিয়ার দুই বিখ্যাত শাসক চেঙ্গিস খাঁ ও কবুলাই খাঁ পর্যন্ত শিকারি ঈগল পুষতেন। বর্তমানে এখানকার ২৫০ জন আদিবাসী শিকারি ঈগলের সাহায্যে শীতকালে খাদ্যের বন্দোবস্ত করেন।

এখানকার বাসিন্দারা এক ধরনের টুপি পড়েন, যা শিয়ালের চামড়া ও পশম মিশিয়ে তৈরি করা হয়। তাছাড়া তারা গায়ের পোশাক তৈরি করেন ভেড়ার চামড়া ও পশম মিশিয়ে। এই টুপি ও পোশাক আলতাই উপত্যকার কাজাখ আদিবাসীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে বর্তমান সময়ে এই রীতি ক্রমশ অবলুপ্তির পথে।

ঈগলের দেখানো পথে শিকার করতেন তারাএই বিশেষ জনগোষ্ঠীর পরিচয় পাওয়া যায় বিখ্যাত ভূপর্যটক মার্কো পোলোর নথি থেকে প্রথম আলতাই উপত্যাকার। তারা বিস্তীর্ণ মাঠের মধ্যে বেশ কিছুটা অন্তর ছোট এক ধরনের গোল আকৃতির কুঁড়ে ঘর তৈরি করে বসবাস করেন। এই কুঁড়ে ঘরগুলোকে তারা বলেন ‘গেরেস’।

এখানকার বাসিন্দারা একদম ছোট থেকেই ঈগল পাখিকে শিকারি হওয়ার প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে। এই সময়ে মনিবের সঙ্গে ঈগলের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ঈগলের বয়স একটু বেশি হয়ে গেলেই তাকে আর পোষ মানানো যায় না। কারণ ঈগল এমনিতে অত্যন্ত স্বাধীনচেতা পাখি। তবে পুরুষ ঈগলের তুলনায় নারী ঈগল অনেক দক্ষ ও ক্ষিপ্র শিকারি হয়। আবার শিকারি ঈগল যখন অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে, অর্থাৎ তার বয়স বাড়ে সে তখন আস্ত একটি চিতাবাঘকে শিকার করতে সক্ষম হয়।

শিয়ালের চামড়া ও পশমের টুপিএখানকার মানুষ প্রধানত শীতকালে ঘোড়ার পিঠে চড়ে এবং নিজেদের ডান কাঁধে ঈগলকে বসিয়ে শিকারের সন্ধানে বেরিয়ে যান। ঈগল আগে থেকেই শিকারের অস্তিত্ব টের পায় তার ঘ্রাণ শক্তির মাধ্যমে। তখন সে তার মনিবের পিঠে নখ দিয়ে চাপ দেয়। আর এই চাপ দেয়ার মাধ্যমে শিকারের অস্তিত্ব জানান দেয়। এর ফলে বুঝতে পারে যেদিকে শিকার থাকে সেই দিকে এগিয়ে যায় শিকারি।

বাইয়ান আলিগি প্রদেশের রাজধানী অলিগিতে শিকারি ঈগল প্রতিযোগিতা হয়। এই প্রতিযোগিতা শুরু হয় প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে। আর এই প্রতিযোগিতায় যে শিকারির ঈগল জয়ী হয় তাকে পুরস্কার হিসেবে নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। এছাড়া এই সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিনোদনের উদ্দেশ্যে ঘোড়া নিয়ে বিভিন্ন খেলা আয়োজন করা হয়।

বাইয়ান আলিগি প্রদেশের রাজধানী অলিগিতে শিকারি ঈগল প্রতিযোগিতাবর্তমানে একটি শিকারি ঈগলকে ১০ বছরের বেশি তারা কাজে লাগান না। ১০ বছর হয়ে গেলে সেই ঈগলকে মুক্তি দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই অঞ্চলে ধীরে ধীরে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ায় এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থা তাদের কার্যকলাপ বৃদ্ধি করার ফলে শিকারের সংখ্যা ক্রমশ কমতে শুরু করেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রাচীন পদ্ধতিতে জীবন যাপনে অভ্যস্ত আলতাই অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ক্রমশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ