খাদ্যাভাসেও মিশরীয়দের স্বকীয়তা, মৃতদের দেয়া হতো খাবার

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

খাদ্যাভাসেও মিশরীয়দের স্বকীয়তা, মৃতদের দেয়া হতো খাবার

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৪৫ ৬ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৬:৫৭ ৬ মার্চ ২০২১

মৃত স্বজনদের সঙ্গে খাবার দিয়ে দিতেন মীশরীয়রা

মৃত স্বজনদের সঙ্গে খাবার দিয়ে দিতেন মীশরীয়রা

প্রাচীন সভ্যতার সূতিকাগার নীলনদ বিধৌত দেশ মিশর। দেশটির প্রতিটি স্থাপনা যেন কালের সাক্ষী। মিশর মানেই মমি আর সোনালি বালির মরুভূমির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা পিরামিডের রহস্য। যার রহস্য এখনো উন্মোচন করতে পারেননি প্রত্নতাত্ত্বিকরা। মিশরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন, সমৃদ্ধ, এবং রহস্যময়। এদের আচার- ব্যবহার, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস সবই অন্য সবারচেয়ে একেবারেই আলাদা।   

প্রাচীনকাল থেকেই মিশর খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনে বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছে। নদী অববাহিকার পলি মাটির উপস্থিতির কারণে শস্যের ক্ষেত্রে দেশ বেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। এছাড়া প্রাচীন মিশরীয়রা পশুপালনেও বেশ পারদর্শী ছিলেন, তাছাড়া নীলনদকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কও গড়ে তুলেছিল মিশরীয়রা। 

মিশরীয়দের কাছে খাবার ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণপিরামিডের গায়ে আঁকা বিভিন্ন চিত্র এবং প্যাপিরাস থেকে উদ্ধার করা তথ্য থেকে জানা যায় তৎকালীন মিশরে জনগণের সম্পদ এবং প্রতিপত্তির অবস্থা বিবেচনায় তাদের খাবারদাবারের ধরন নির্ধারিত হত। সমাজের উচ্চশ্রেণীর জন্য বিভিন্ন উপযুক্ত খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও আপামর জনসাধারণের জন্য কেবল রুটি, বিয়ার, নোনতা মাছ কিংবা খেজুরেই তা সীমাবদ্ধ ছিল। তবে উচ্চশ্রেণীর আয়োজনে সমাজে প্রায়শই বিভিন্ন ধর্মীয় কিংবা অন্য যেকোন উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন হত যেখানে গরীব এবং সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা থাকত।

রাজ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাধারণ প্রজাদের খাবারের মিল ছিল খুব কম মৃতদের জন্য খাবার উৎসর্গ করা ছিল মিশরের প্রচলিত রীতি। এজন্য পরবর্তীতে পাওয়া যায় মমির সঙ্গে বিভিন্ন খাদ্যশস্য। মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল মৃত্যুর পর তাদের নতুন জীবন শুরু হবে। এজন্য সেখানে তাদের প্রয়োজন হবে খাবার, পোশাক, মূল্যবান রত্ন, গয়না, যুদ্ধাস্ত্র। এমনকি পোষ্যকেও মমি করে দেয়া হয়। যেন মৃত্যুর পরও প্রভুর সঙ্গে আনন্দে জীবন কাটাতে পারে।  

শস্য

গম চাষের জন্য মিশরের মাটি সবচেয়ে বেশি ভালো ছিল
মিশরীয়রা ভাত খুব একটা খেত না। সে সময় তাদের খাদ্য তালিকায় ছিল যব বা গম। এর বিশেষ একটি কারণও আছে। যেহেতু অন্যান্য ফসল মিশরের মাটিতে হত না। আর গম বেশি হওয়ার জন্যই মূলত এটিই তাদের খাদ্য তালিকায় বিশেষ স্থান করে নেয়। নীলনদের তীরে জমা হওয়া পলি মাটি এবং নদের পানিকে চাষাবাদের প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানোর কারণে মিশরে প্রচুর শস্য ফলত। গমের রুটির পাশাপাশি যব গাঁজন প্রক্রিয়ায় বিয়ার বানানো হত।

ওয়াইন

ওয়াইন ছিল মিশরীয়দের জনপ্রিয় পানীয়
বর্তমানে অনেক দেশেই মদ বা অ্যালকোহল খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। তবে পাঁচ হাজার আগে নীলনদ বিধৌত দেশ মিশরে ছিল এর বেশ জনপ্রিয়তা।  নীলনদের প্রভাবে মিশরীয় ব্যবসা বাণিজ্য বেশ প্রসার লাভ করে। ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে মিশরীয়রা আঙুর সংগ্রহ করে নিজেরা উৎপাদন শুরু করে।

আঙ্গুর থেকে তারা বিশেষ উপায়ে এই ওয়াইন তৈরি করত এই আঙুর দিয়ে তারা নিজস্ব পদ্ধতিতে ওয়াইন তৈরি করত যা তখন খুব জনপ্রিয় ছিল অভিজাত শ্রেনীর মধ্যে। লাল রঙের এই ওয়াইন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হত। তবে রাজ পরিবারের জন্য এই ওয়াইন তৈরি হত বিশেষ পদ্ধতিতে। যা সাধারণ জনসনের জন্য একেবারেই নিষিদ্ধ ছিল। 

ফল এবং শাকসবজি

ফল এবং শাকসবজিও ছিল মিশরীয়দের খাদ্য তালিকায়
খাবারের ব্যাপারে মিশরীয়রা বরাবরই ছিল আলাদা যত্নশীল। উর্বর মাটির কারণে তরমুজ,ডুমুর, খেজুর, ডালিম, আপেল ইত্যাদি ফলমূলের চাষ হত প্রাচীন মিশরে। পাশাপাশি পেয়াজ, লেটুস, মটরশুঁটি, ছোলা এবং বিভিন্ন রকমের ডাল এবং সবজিও ফলত প্রচুর।

মাংস

মিশরীয়রা গৃহপালিত পশুর মাংস খেত না
মিশরীয়রা মাংস খেতে খুবই ভালোবাসতো। তবে সেগুলোর উৎস গৃহপালিত পশু ছিল না। গরু, ভেড়া, ছাগল ইত্যাদি প্রাণীকে গৃহপালিত হিসেবে বিবেচনা করা হত যার থেকে মুলত দুধ আহরণ করা হত। অভিজাত শ্রেণীদের মধ্যে শিকারে যাওয়ার প্রবণতা থাকলেও মাংস খাবার হিসেবে খুব জনপ্রিয় ছিল না তখন। তবে এর মধ্যে রাজ পরিবারগুলোতে গরুর মাংস খাওয়ার প্রচলন ছিল।

মাছ
নীলনদ থেকে মাছ ধরা যেত বলে আপামর জনসাধারণের নিকট মাছ গুরুত্বপূর্ন আমিষের উৎস ছিল। অন্যদিকে মাংসের প্রচলন বেশি থাকায় মাছের কদর কম ছিল অভিজাতদের নিকট।

শিকার করা পশু পাখির মাংস খেতেই অভ্যস্থ ছিল মিশরীয়রা পাখি
প্রাচীন মিশরে হাঁস, কোয়েল, কবুতর আর পেলিকানস ইত্যাদির ডিম এবং মাংস প্রচলিত ছিল। জানা যায় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শতাব্দীর আগে মিশরে মুরগীর তেমন উপস্থিতি ছিল না।

মসলা এবং মিষ্টি
মশলা হিসেবে মিশরীয়দের মধ্যে জুনিপার, মৌরি, ধনিয়া, জিরা, মেথি আর পোস্ত ইত্যাদি ব্যবহারের প্রচলন ছিল। এছাড়া রান্নায় ভিনেগারও ব্যবহৃত হত। খাবার মিষ্টি করার ক্ষেত্রে ধনীরা মধু ব্যবহার করত যা ছিল খুবই দামী অন্যদিকে সাধারণ জনগন ব্যবহার করত বিভিন্নরকমের ফল। আর লবণ পাওয়া যেত সিওয়া ওয়াসিস থেকে। প্রচলিত এক কিংবদন্তীর কারণে মিশরীয়রা সামুদ্রিক লবণ ব্যবহার করতেন না। মিশরের উর্বর মাটিতে উৎপাদিত মশলা লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে বাণিজ্যের উপকরণ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

মমির সঙ্গে তারা শুধু খাবারই নয়, আসবাবপত্র এমনকি দামী গয়নাও দিয়ে দিত এছাড়া প্রাচীন মিশরে ‘উপত্যকার খাদ্যোৎসব’ নামে একটি উৎসবের আয়জন করা হত। এই উৎসবে মশাল জ্বেলে তারা খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করত এবং বিশ্বাস করত এই ভোজ উৎসবে মৃতদের সঙ্গে জীবিতদের পুনরায় সাক্ষাত হয়। মিশরীয়রা পিরামিডে স্থাপিত মমির সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার ও পানীয় সরবারহ করতেন, তারা বিশ্বাস করতেন পুনরায় জীবিত হয়ে মমিরা সেসব খাবার গ্রহণ করবেন। এছাড়াও নানান উৎসব আয়োজনে মিশরীয়দের খাকত বিশেষ খাবার। তবে প্রজারা এসব খাবারের কিছুই পেতেন না। রাজ পরিবার এবং সমাজের অভিজাত মানুষদের জন্য তাদের থাকত সব আয়োজন। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে