যুবকের হাসির প্রেমে চিকিৎসক, মাথার খুলি দিয়ে বানালেন পেপারওয়েট

ঢাকা, বুধবার   ১৪ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ২ ১৪২৮,   ০১ রমজান ১৪৪২

যুবকের হাসির প্রেমে চিকিৎসক, মাথার খুলি দিয়ে বানালেন পেপারওয়েট

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৪২ ৪ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৫:০০ ৪ মার্চ ২০২১

বন্দিকে মেরে তার মাথা পেপারওয়েট বানিয়ে ব্যবহার করেন চিকিৎসক

বন্দিকে মেরে তার মাথা পেপারওয়েট বানিয়ে ব্যবহার করেন চিকিৎসক

সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের, হিটলারের নির্দেশে নাৎসি বাহিনী নির্বিচারে ইহুদিদের মেরে ফেলছে। বন্দি করছে শত শত নারী শিশুদের। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রেশ কাটেনি তখনো। বাতাসে রক্ত আর বারুদের গন্ধও মিলানোর সময় দেয়নি হিটলার বাহিনী। এরমধ্যেই ১৯৩৯ সালে শুরু হয় বিশ্বের ইতিহাসে  সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ।

১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল, এই ছয় বছর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়সীমা ধরা হলেও ১৯৩৯ সালের আগে এশিয়ায় সংগঠিত কয়েকটি সংঘর্ষকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। এছাড়া বেসামরিক জনগণের উপর চালানো নির্বিচার গণহত্যা, হলোকস্ট (হিটলার কর্তৃক ইহুদীদের উপর চালানো গণহত্যা), পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োগ প্রভৃতি ঘটনায় কুখ্যাত এই যুদ্ধে প্রায় ৫ কোটি থেকে সাড়ে ৮ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এসব পরিসংখ্যান এটাই প্রমাণ করে যে এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে নৃশংসতম যুদ্ধ। 

নাৎসিদের হাতে বন্দি ছিল শত শত নারী, শিশু  নাৎসিদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প আর কয়েদখানার মধ্যে কোনো পার্থক্যই নেই। স্বাধীনতা নেই কোনো, নেই ব্যক্তিগত পরিসর। তার ওপর নাৎসি সেনাদের অত্যাচার। সব মিলিয়ে এক কথায় যাকে বলে দুর্বিষহ জীবন। তবুও অনেকের দিনের শেষে বন্ধু জুটে গিয়েছে এই নরকেও। ঘটেছে অনেক ঘটনা। ইতিহাসের পাতার ভাঁজে ইতিহাস তৈরি হয়েছে। এমিল মুলার এবং জেভার সুমেরের কথা মণে আছে কি? বিশ্বের প্রথম সমকামী দুই পুরুষ তারা। তাদের পরিচয় হয়েছিল এই নাৎসিদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। প্রেম, প্রণয় শেষে একই কবরে শুয়ে আছেন শত বছর ধরে। 

তবে আজ বলছি এক সুদর্শন ব্রিটেন যুবক ওয়াল্টারের। তবে এটি তার আসল নাম নয়। ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা এই যুবকের পরিচয় কখনো নাৎসি বাহিনী প্রকাশ করেনি। এক বিকেলে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পেই পরিচয় হওয়া এক পরিচিতের সঙ্গেই হাসি-ঠাট্টা করছিল ওয়াল্টার। দূর থেকে এক ওয়ার্ডেনকে আসতে দেখে নিজেকে সংযত করে ওয়াল্টার। সেইসঙ্গে খানিকটা আড়ষ্টও হয়ে গুটিয়ে নেন নিজেকে। তখন কে-ই বা জানত এবার ডাক পড়বে তারই? তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন ক্যাম্পের চিকিৎসক আরিবার্ট হাইম। শুনে খানিকটা স্বস্তি পেল ওয়াল্টার। যাক, অন্তত এবারের জন্য রক্ষা পাওয়া গেল নাৎসি জল্লাদদের হাত থেকে। হয়তো কোনো পরীক্ষার জন্য তার ডাক পড়েছে। 

আরিবার্ট ফারডিনান্দ হাইম হলো ও তাই। তবে কে জানত তার অজান্তেই অপেক্ষারত ছিল নিয়তি। চেম্বারে ঢুকতেই এক গাল হেসে ওয়াল্টারকে শুয়ে পড়তে বললেন হাইম। আশ্বস্ত করলেন কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন তিনি। শুধু নিতে হবে একটাই ইঞ্জেকশন। আর তারপরই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে ছুটি মিলবে ওয়াল্টারের। নরকমুক্তি! খুশিতে ভরে গেল ওয়াল্টারের মন। এটুকুই তো কষ্ট সহ্য করা। তাতে ক্ষতি কী? রাজি হয়ে গেল ইহুদি তরুণ। তার বাঁদিকের পাঁজরের ধার ঘেঁষে ইঞ্জেকশনের সূচ ফোটালেন হাইম।

কয়েক মুহূর্ত বাদেই শুরু হল বুকের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা। বন্ধ হয়ে এল শ্বাসও। অন্ধকার নেমে এল ওয়াল্টারের দু’চোখে। ছটফট করতে করতে কয়েক মিনিটের মধ্যে নিথর হয়ে গেল শয্যায় শুয়ে থাকা দেহটা। নাৎসি সেনাদের ডেকে হাইম আদেশ দিলেন মৃতদেহটিকে সিদ্ধ করে নিয়ে আসতে। তারপর ছুরি দিয়ে ঘাড় থেকে আলাদা করা হল মাথা। ধারালো ব্লেড দিয়ে হাইম করোটি থেকে ছাড়িয়ে নেয় চামড়া, মাংস। খুলির মধ্যে ভরে ফেলেন পাথর। পেপারওয়েট বানিয়ে রেখে দিলেন টেবিলে। আর তার চামড়া দিয়ে তৈরি করেছিলেন চেয়ার।

নির্মমভাবে বন্দিদের হত্যা করতেন তিনি পরবর্তীকালে এই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পেরই এক বন্দি সবিস্তারে জানিয়েছিলেন আতঙ্কে মোড়া এই অতীতের গল্প। জানিয়েছিলেন ওই ইহুদি যুবকের হাসি দেখে পছন্দ হওয়ায় তার খুলিকে স্মারক হিসেবে পেতে চেয়েছিলেন হাইম। আর সে জন্যই তার হৃদপিণ্ডে ইঞ্জেক্ট করেছিলেন পেট্রোল, পানি এবং বিষ। 

শুনে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে নিশ্চয়ই? তবে এখানেই শেষ নয়। হাইমের নৃশংসতার মাত্রা ছাড়িয়েছিল যেকোনো সিরিয়াল কিলারের নির্মমতাকেও। মাত্র ২ মাস মাউথাউসেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করেছিলেন হাইম। আর তাতেই সবার ত্রাস হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। চলত নৃশংস পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কখনো অ্যানেস্থেসিয়া না করেই অপারেশন করতেন হাইম। আবার কখনো শরীরের ব্যবচ্ছেদ করে বের করে আনা হত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। আর স্টপওয়াচ চালিয়ে হাইম পর্যবেক্ষণ করতেন ঠিক কতক্ষণ লাগছে একজন বন্দির মৃত্যু হতে।

সন্তানের সঙ্গে হাইম মাত্র দুই মাসেই দুই শতাধিক বন্দিকে এভাবে হত্যা করেছেন হাইম। প্রতিটি ‘অবজেক্ট’-এর পরীক্ষার তথ্য তিনি নথিভুক্ত করতেন নিজের খাতায়। এরপর ফিনল্যান্ডের মাউন্টেন ডিভিশন নর্ডের ওউলু হাসপাতালে নিয়োজিত হয়েছিলেন হাইম। সেখানেও চলত একইরকম বর্বরতা। অল্প সময়েই পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন ‘ডক্টর ডেথ’নামে।

১৯৪৫ সালের মার্চ মাসে মার্কিন সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হন হাইম। যুদ্ধবন্দি হিসাবে তাকে পাঠানো হয় ক্যাম্পে। যদিও খুব বেশদিন বন্দি থাকেননি হাইম। বছর খানেকের মধ্যেই ছাড়া পান তিনি। তারপর তিনি আবার ফিরে আসেন তার পেশায়। পশ্চিম জার্মানির ছোট্ট শহর বাডেন বাডেনে গাইনোকোলজিস্ট হিসেবে একটি ক্লিনিক চালাতেন।

বন্দির মাথার খুলিটি পেপারওয়েট বানিয়ে টেবিলে সাজিয়ে রেখেছিলেন পুরো নাম আরিবার্ট ফারডিনান্দ হাইম। ১৯৬১ সালে বিশ্বযুদ্ধের একটি ট্রায়ালে মাউথাউসেন ক্যাম্পের এক বন্দি আদালতে উল্লেখ করেন হাইমের কথা। বিবরণ দিয়েছিলেন তার নৃশংসতার। আর তারপরেই নড়েচড়ে বসে জার্মান প্রশাসন। অনুসন্ধানের পর উদ্ধার করা হয় হাইমের সমস্ত নথি। পুনরায় কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়া হয় হাইমকে। তবে সংবাদমাধ্যমে আগেই এর আভাস পেয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন তিনি।

১৯৬২ সাল থেকে নিরন্তর তার খোঁজ চালিয়ে গেছে পৃথিবীর বিভিন্ন ইন্টেলিজেন্স সংস্থা। তল্লাশি চলেছিল স্পেন থেকে শুরু করে ল্যাটিন আমেরিকা পর্যন্ত। তার মাথার দাম ছিল ৩ লাখ ইউরো। এমনকি ২০০৭ সালেও গুজব উঠেছিল হাইম জীবিত আছেন। আর্জেন্টিনা বা চিলিতে রয়েছেন তিনি। তবে অনেক অনুসন্ধানের পরেও ধরা যায়নি তাকে। 

২০০৮ সালে তার দুই পুত্র দ্বারস্থ হন আদালতের। তারা দাবি করেন ব্যাংকে থাকা হাইমের অর্থ-সম্পত্তির। জানান, মিশরে ১৯৯২ সালে প্রয়াত হয়েছেন হাইম। সেই সূত্র ধরেই নতুন করে অনুসন্ধান চালান হয় মিশরে। তদন্তে উঠে আসে, শেষ বয়সে মিশরেই ছিলেন হাইম। তারেক ফারিদ হোসেন নামে আস্তানা গেড়েছিলেন সেখানে। কায়রোর অঞ্চলিক মানুষরাই ছবি দেখে চিহ্নিত করেন তাকে। তবে এর আগে চিলি, আর্জেন্টিনাতেও বেশ কিছুদিন তার আগে গা ঢাকা দিয়ে ছিলেন হাইম। ভিন্ন ভিন্ন নামে। 

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বেঁচেছেন অন্য নামে, অন্য দেশে তবে হাইমের মৃত্যুর পরেও শেষ হয়নি মামলার। আশির দশকে বার বার তার পরিবারের কাছে প্রশাসন দ্বারস্থ হওয়ার পরেও, জানানো হয়েছিল হাইমের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই তাদের। পরে জানা যায়, পরিবারে প্রায়শই টাকা পাঠাতেন হাইম। ছিল নিয়মিত যোগাযোগ। ২০১২ সালে ভুল তথ্য দেয়ার জন্য জার্মান আদালতে মামলা রুজু হয় তার দুই পুত্রের নামে। এখনো পর্যন্ত চলছে সেই মামলা। বিশ্বযুদ্ধের সাড়ে সাত দশক পেরিয়ে এসে, আজ হাতে গোনা কিছু মানুষ জীবিত রয়েছেন তৎকালীন সময়ের। এখনো চোখ বুজলেই হারিয়ে যান কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বিভীষিকাময় দিনগুলোতে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে