অন্তঃসত্ত্বা রানির পানিতে ডুবে করুণ মৃত্যু, বাঁচালো না কেউ

ঢাকা, বুধবার   ১৪ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ১ ১৪২৮,   ০১ রমজান ১৪৪২

অন্তঃসত্ত্বা রানির পানিতে ডুবে করুণ মৃত্যু, বাঁচালো না কেউ

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২৯ ৩ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৬:৩৫ ৩ মার্চ ২০২১

রানি সুনন্দা পানিতে ডুবে মারা যান হাজার হাজার মানুষের সামনে

রানি সুনন্দা পানিতে ডুবে মারা যান হাজার হাজার মানুষের সামনে

হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে রাজা বাদশাহদের রাজ্য শাসন। সাধারণ মানুষের ধরা ছোয়ার একেবারে বাইরে এদের বসবাস। এতোটা দূরে দূরে থাকত বলেই হয়তো সাধারণ মানুষের এদের মিয়ে এতোটা কৌতূহল ছিল। রাজকীয় জীবন সবদিক থেকেই সমৃদ্ধ হওয়ার কথা। সেভাবে চলছিল থাইল্যান্ডের রাজা মোংকুট এবং রানি পিয়ামের কন্যা সুনন্দা কুমারীরত্নর জীবন। 

১৮৬০ সালে আক্ষরিক অর্থেই সোনার চামচ মুখে জন্মান তিনি। বয়স বাড়তে থাকে, রূপ ও গুণে সবার মন জয় করতে থাকেন রাজকন্যা। আনন্দে কাটতে থাকে জীবন, পার করে ফেলেন ১৯টি বছর। ২০-এ যখন পা ফেললেন, তখন ১৮৮০ সাল। ইউরোপ ও তার উপনিবেশ জুড়ে মানুষ ততদিনে আধুনিকতার স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। তবে সুদূর শ্যাম প্রদেশে তখনও মধ্যযুগের অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের মধ্যেই জন্ম নিল ‘অস্পৃশ্য রানি’-র কাহিনী। রানি সুনন্দার দুঃসম্পর্কের ভাই চুলালংকর্ণ বা পঞ্চম রামের সঙ্গে বিবাহ হয়। সুনন্দার আরো দুই বোনকে বিবাহ করেন চুলালংকর্ণ। অর্থাৎ তাদের তিন বোনের ছিল এক স্বামী।  

সোনার চামচ মুখে নিয়ে থাইল্যান্ডের রাজার ঘরে জন্ম নেন সুনন্দা  সপরিবারে আনন্দ উদযাপনের জন্য গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদে যাচ্ছিলেন রাজকন্যা সুনন্দা। নদীর বুকে ভেসে চলেছিল বজরা। একটিতে করে ঘুরছেন অন্তঃসত্ত্বা রানি। সঙ্গে ছিল তার বছর দুয়েকের আরেক মেয়ে। হঠাৎই ঘটল দুর্ঘটনা। নৌকা উল্টে পানির মধ্যে পড়ে গেলেন দুজনেই। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে দেখছেন সবাই। তাদের বাচাতে কেউ এগিয়ে এলো না। কেননা রাজপরিবারের কারো দেহ সমগোত্রীয় বা সমান মর্যাদাসম্পন্ন না হলে স্পর্শ করা যাবেনা। দেহরক্ষীদেরও তাদের স্পর্শ করার অনুমতি ছিল না।

সুনন্দার স্বামী রাজা চুলালংকর্ণঅন্যদেরও রানির দেহরক্ষীরাই যে বারণ করছেন এগিয়ে আসতে। রাজপেয়াদার নির্দেশ বলে কথা! আসলে, রানি-কে স্পর্শ করার অধিকার ছিল না কারোরই। এমনকি, প্রাণ বাঁচাতেও নয়। শেষ পর্যন্ত এই রাজকীয় নিয়ম পালন করতে গিয়ে তারা রানি আর রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে পারেননি! পানিতে ডুবেই মারা গেলেন রানি সুনন্দা এবং তার মেয়ে। শেষ পর্যন্ত রানি নিজেই পরিচিত হলেন ‘অস্পৃশ্য রানি’নামে।

এখানেই নৌকা ডুবে সুনন্দা সন্তান সহ মারা যান শোনা যায় চুলালংকর্ণের নাকি ৮৪টি সন্তান ছিল। অবশ্য এই তথ্যের সত্যতা জানা যায় না। তবে সুনন্দার গর্ভে একটিমাত্র কন্যাসন্তানের জন্ম হয় ১৮৭৮ সালে। এর ঠিক দুবছরের মাথায় আবারও গর্ভবতী হলেন রানি সুনন্দা। আর তখনই নেমে এল ভাগ্যের পরিহাস। অস্পৃশ্যতার মধ্যযুগীয় রীতিই হয়ে উঠল তার জীবনের কাল। তবে শুধু রানি সুনন্দার মৃত্যুই নয়, তার অন্ত্যেষ্টিও এক ঐতিহাসিক ঘটনা। 

সন্তান কোলে নিয়ে সুনন্দা রাজা প্রত্যেক রানির জন্য আয়োজন করেছিলেন অন্ত্যেষ্টির এক নতুন প্রথা। ভারি রাজকীয় সেই অন্ত্যাষ্টিক্রিয়া। প্রথমেই তরল রুপা ভরে দেয়া হবে প্রত্যেকের শরীরে। তারপর সোনা দিয়ে মুড়ে দেয়া হবে তাদের শরীর। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কথা উঠলে তালিকার প্রথম দিকেই থাকবে রানি সুনন্দার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া।

সুনন্দার স্বামী রাজা চুলালংকর্ণ তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করেছিল জাঁকজমক করে আজও থাইল্যান্ডের মানুষ ‘অস্পৃশ্য রানি’ নামেই মনে রেখেছেন সুনন্দাকে। তবে শোনা যায়, নিজের মায়েদের মৃত্যুর পর রাজকীয় আড়ম্বর মেনে নিতে পারেননি চুলালংকর্ণের সন্তানরাই। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই এই প্রথার অবসান ঘটে। আর ক্রমশ সমাজ থেকে অস্পৃশ্যতাও মুছে যায়। রাজা চুলালংকর্ণের শেষ জীবন কাটে অন্ধকার কারাগারে। আর এরপর ঔপনিবেশিক শাসনের সূত্রে থাইল্যান্ডেও প্রবেশ করে আধুনিকতা। মাত্র ১৪০ বছর আগে ঘটে যাওয়া এমন ঘটনা আজ শুনতে আশ্চর্য লাগতে পারে। ভারত মহাসাগরের তীরে এমন কত আশ্চর্য ঘটনাই স্মৃতি হয়ে থেকে গিয়েছে।

সূত্র: হিস্টোরি কালেকশন 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে