হীরার খনির গরিব দেশ

ঢাকা, শনিবার   ১০ এপ্রিল ২০২১,   চৈত্র ২৮ ১৪২৭,   ২৬ শা'বান ১৪৪২

হীরার খনির গরিব দেশ

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৩০ ১ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৩:৫৯ ১ মার্চ ২০২১

সিয়েরা লিওনে রয়েছে হীরার খনি

সিয়েরা লিওনে রয়েছে হীরার খনি

হীরা বলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে চকচকে এক পাথরের কথা। যেটি কিনা বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান এক টুকরো পাথর। সাদার পাশাপাশি কালো, সবুজ, নীল, গোলাপি, বেগুনি, হলুদ ও লালসহ অনেক রঙের হীরা পাওয়া যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে এই খনিজ সম্পদটি। তবে সেসব দেশকে এই মূল্যবান সম্পদটি কতটা উন্নত করতে পেরেছে, খোঁজ নিয়েছে কি কেউ?  

তেমনই এক হীরার খনির দেশ সিয়েরা লিওন। পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটি রয়েছে দারিদ্র্যসীমার নিচে। এখানকার মানুষ আজো থাকেন অর্ধাহারে। যেখানে শিক্ষা বিলাসিতা মাত্র। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ খুবই অভাবী এবং অসুখীও। এখানকার মানুষ খনিজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে হীরা, এটি অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। এছাড়াও রয়েছে অন্যতম পণ্য টাইটানিয়াম ও বক্সাইট, অন্যতম প্রধান পণ্য সোনা, এবং রয়েছে রুটাইল এর পৃথিবীর বৃহত্তম মজুদের একটি অংশ। তারপরও এদেশের মানুষের এই করুণদশা কেন? এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই।এত দুর্দশার মাঝেও এই মানুষগুলো আনন্দ উৎসবে মেতে থাকে সারাক্ষণ এর প্রধান কারণ হচ্ছে শুধু মাত্র শ্রমিক হিসেবেই এখানকার মানুষেরা কাজ করেন খনিগুলোতে। বিভিন্ন দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো সেখানে খনি খননের কাজ করে থাকে। যে কারণে এই সম্পদের বেশিরভাগ মূল্যই চলে যায় মালিকদের হাতে। মান মাত্র মজুরিতে এখানে কাজ করতে হয় স্থানীয় মানুষগুলোকে। এছাড়াও সিয়েরা লিওনের মানুষের এই দুর্দশার আরো একটি কারণ রয়েছে। 

সিয়েরা লিওনে রয়েছে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক হারবর। সিয়েরা লিওনকে‘হীরার খনির গরিব দেশ' বলা হলেও এদেশের শতকরা ৭০ ভাগ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। দীর্ঘদিন ব্রিটিশ উপনিবেশও ছিল এখানে। ব্রিটিশদের অত্যাচারে সিয়েরা লিওনের জনগণের জীবন ছিল দুর্বিষহ। অবশেষে ১৯৬১ সালের ২৭ এপ্রিল সিয়েরা লিওন ব্রিটিশ শাসন থেকে পরিপূর্ণভাবে মুক্তি লাভ করে এবং স্বাধীন দেশগুলোর তালিকাভুক্ত হয়। স্যার মিল্টন মারগাই এ দিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। স্বাধীন দেশে জনগণ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে না নিতেই নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়। 

হীরার খনিতে কাজ করেই এদের জীবিকা নির্বাহ করে ১৯৬৪ সালে অসুস্থতার কারণে স্যার মিল্টন মারা গেলে দেশটিতে দুর্নীতি ও অপশাসনের দরুন অরাজকতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। সাধারণ জনগণের মধ্যে তৈরি হয় ক্ষোভ এবং অসন্তোষ। অভ্যন্তরীণ কলহ দিন দিন বাড়তেই থাকে। পরিণতিতে স্বাধীনতার ত্রিশ বছরের মাথায় ১৯৯১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় সিয়েরা লিওনে। ১৯৯১ সালের ২৩ মার্চ কয়েকটি বিদ্রোহী দল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জোসেফ মোমাহকে পরাস্ত করার চেষ্টা করলে এ যুদ্ধের আরম্ভ ঘটে। এটি আফ্রিকার সবচেয়ে রক্তাক্ত ও ভয়াবহ গৃহযুদ্ধগুলোর একটি, যা ২০০২ সাল পর্যন্ত চলে এবং এ যুদ্ধে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ মারা যায়। আর দেশটির তৎকালীন ৪০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৫ লাখ নিজেদের বাসস্থান হারায়।

সিয়েরা লিওনের সাংবিধানিক নাম সিয়েরা লিওন প্রজাতন্ত্র। ভূ-রাজনৈতিকভাবে সিয়েরা লিওনের উত্তর সীমান্তে গিনি, দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে লাইবেরিয়া এবং দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের দিকে আটলান্টিক মহাসাগর অবস্থিত। সিয়েরা লিওনের বৃক্ষহীন তৃণভূমি অঞ্চল থেকে রেইনফরেস্ট পর্যন্ত একটি বিচিত্র পরিবেশের গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলবায়ু বিদ্যমান। সিয়েরা লিওনের মোট আয়তন ৭১,৭৪০ বর্গকিলোমিটার (২৭,৬৯৯ বর্গমাইল) এবং এর মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬ মিলিয়ন।

এখানকার কেউ কেউ মাছ ধরে নিজেদের জীবিকা চালিয়ে নিচ্ছে ফ্রিটাউন সিয়েরা লিওনের রাজধানী, সর্ব বৃহত্তম শহর এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। বো সিয়েরা লিওনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এক লাখের বেশি জনসংখ্যাভূক্ত অন্যান্য শহরগুলো হলো: কেনেমা, ম্যাকেনি, কাইদু।সিয়েরা লিওন উত্তর, পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চল চারটি ভৌগলিক অঞ্চলে বিভক্ত, যেগুলো আবার ১৪টি জেলায় বিভক্ত। 

সিয়েরা লিওনে প্রায় ১৬টি জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে, যাদের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা ভাষা ও রীতিনীতি। দুটি বৃহত্তম ও সবচেয়ে প্রভাবশালী জাতিগোষ্ঠী হল তেমনে ও মেন্দে। তেমনে জাতিগোষ্ঠীকে দেশের উত্তরাঞ্চলে প্রাধান্য করতে দেখা যায়, যখন মেন্দেরা দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে তাদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে। যদিও দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে সরকারি প্রশাসন ও বিদ্যালয়সমূহে ইংরেজীতে কথা বলা হয়, তবুও দেশে এবং দেশের সকল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ক্রিও ভাষা সবচেয়ে বেশি কথ্য ভাষা। বিশেষ করে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য এবং একে অপরের সাথে সামাজিক যোগাযোগে ক্রিও ভাষা ব্যবহার করে। 

 স্বাধীনতার ত্রিশ বছরের মাথায় ১৯৯১ সালের গৃহযুদ্ধে মারা যায় অনেক মানুষ সিয়েরা লিওন একটি নামমাত্র মুসলিম দেশ, যদিও খ্রিস্টান সংখ্যালঘুরা যথেষ্ট প্রভাবশালী। সাধারণভাবে দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০% মুসলিম, ৩০% আদিবাসী বিশ্বাসী এবং ১০% খ্রিস্টান ধর্মীয়। যাহোক, সেখানে আদিবাসী বিশ্বাসের সংগঠিত ধর্মীয় সামঞ্জস্যতা অধিক। সিয়েরা লিওনকে বিশ্বের সবচেয়ে ধর্মীয় সহিষঞ্চু জাতি হিসাবে গন্য করা হয়। মুসলিম ও খ্রিস্টানরা একে অপরের প্রতি সহযোগী ও শান্তিপূর্ণ আচরণ করে। সিয়েরা লিওনে ধর্মীয় সহিংসতা খুবই বিরল। 

১৯৯১ সালে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তা অনেক ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেয়। পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো সিয়েরা লিওনের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হলে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নেয়। বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশ সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে যোগ দেয়। বাংলাদেশ থেকে ৭৭৫ জন সেনার প্রথম দলটি সিয়েরা লিওনের দক্ষিণ অঞ্চলে লুঙ্গি নামক স্থানে দায়িত্ব নেয়। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ থেকে আরও সেনা সিয়েরা লিওন যান এবং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ হাজার ৩০০ জন সেনা একত্রে সিয়েরা লিওনে কর্মরত ছিলেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশ দল ২০০৫ সালে ফিরে আসে। সর্বমোট প্রায় ১২ হাজার সেনা সিয়েরা লিওনে দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সেই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটি পুর্ননির্মাণ করেন  বাংলাদেশ সেনাদল তাদের নিয়মিত সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনার জন্য বিবদমান বিভিন্ন জাতির মধ্যে আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সাধারণ সেনারা ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষাও ব্যবহার করতে থাকেন। বাংলা ভাষা স্থানীয় লোকজনের অপরিচিত হওয়ায় বাঙালি সেনারা তাদের ধৈর্যের সঙ্গে তা শেখাতে শুরু করেন। সাধারণ মানুষ বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করে খুব আগ্রহের সঙ্গে। ভাষার সঙ্গে সঙ্গে তারা বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হতে থাকে।২০০২ সালের মধ্যে যেখানেই বাংলাদেশি সেনাদল গিয়েছে, সেখানেই স্থানীয়রা বিশেষত তরুণ-তরুণীরা বাংলায় কথা বলতে পারছে। বিভিন্ন সভায় স্থানীয়রা বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করে। 

এদেশের সরকারি ভাষা বাংলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয়দের বাঙালি নাচ ও গান পরিবেশন করতে দেখা যায়। বাংলাদেশ সেনাদলের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষা জনপ্রিয়তা পায়। স্থানীয়রা কাজ চালানোর মতো বাংলা ভাষা শিখে নেয়ার ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং দেশ পুনর্গঠনে বাংলাদেশ সেনাদল অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে যায়। সিয়েরা লিওনে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ৩১টি দেশের সেনাদল কর্মরত ছিল। প্রায় প্রতিটি দেশের সেনাদল যুদ্ধরত বিভিন্ন বিদ্রোহী দলের আক্রমণের মুখোমুখি হলেও বাংলাদেশ সেনাদল এ বিষয়ে ছিল ব্যতিক্রম। কারণ বাংলাদেশি সেনাদল তাদের দায়িত্বের প্রতি সব সময় নিষ্ঠাবান ছিল, উপরন্তু সাধারণ মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করত। ফলে বাঙালি সেনাদের বাংলা ভাষাকে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচারের উদ্যোগটি সহজেই সফলতা পায়।

শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং দেশ গঠনে বাঙালি সেনাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালের ১২ ডিসেম্বর সিয়েরা লিওনের প্রেসিডেন্ট আহমেদ তেজান কাব্বা বাংলা ভাষাকে সিয়েরা লিওনের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। বাংলাদেশ ও ভারতের কয়েকটি রাজ্য ব্যতীত আর কোথাও বাংলা ভাষা সরকারি ভাষা হিসেবে এই প্রথম স্বীকৃতি পায়। প্রেসিডেন্ট কাব্বা বাংলাদেশ সেনাদলের নির্মিত ৫৪ কিলোমিটার সড়ক উদ্বোধনকালে এই ঘোষণা দেন।

খনিতে কাজ করতে করতে এদের হাতের অবস্থা হয় এমন এই দেশের এখনো ভাগ্য ফেরেনি। যদিও তারা সভ্যতার ছায়াতলে কিছুটা আসতে পেরেছেন। তবে দুঃখ মেটেনি এখনো। তারা তাদের ভাগ্য কোনোদিন ফেরাতে পারবে কিনা তা সময়ের অপেক্ষা। তবে আষাঢ় কথা এখানকার শিক্ষার হার এখন অনেক বেশি। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে