নেশায় নয়, প্রতিবন্ধকতা কাটাতেই এভারেস্ট জয় করেছিলেন হিলারি

ঢাকা, সোমবার   ১৯ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ৬ ১৪২৮,   ০৬ রমজান ১৪৪২

নেশায় নয়, প্রতিবন্ধকতা কাটাতেই এভারেস্ট জয় করেছিলেন হিলারি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৩৫ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১  

এডমন্ড হিলারি, প্রথম এভারেস্ট জয়ী

এডমন্ড হিলারি, প্রথম এভারেস্ট জয়ী

পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, তুষারাবৃত এভারেস্ট জয় করার নেশা বিশ্বের অনেক মানুষের। ১৯৪৮ সালে প্রথম এই পর্বতশৃঙ্গ জয় করতে যাত্রা শুরু করেন একদল মানুষ। তবে সেই চেষ্টা সফল হয় ১৯৫৩ সালের ২৯ মে সকালে। এডমুন্ড হিলারি  প্রথম এভারেস্টের শীর্ষে পা রাখেন। তবে পর্বত জয় করতে নয় , নিজেদের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে বেরিয়েছিল তারা। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ , তুষারাবৃত এভারেস্টের মাথায় তখনও পা পড়েনি মানুষের। শুধু জল্পনাকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। ৮৮৪৮ মিটারের সেই আশ্চর্য উন্নাসিক পাহাড় জয় করার স্বপ্ন নিয়েই সুদূর নিউজিল্যান্ড থেকে ছুটে গেছিলেন এই মানুষটি।  

যতদিন মানুষের বিস্ময় থাকবে, নতুনকে চেনার নেশা থাকবে মনে , ততদিন অভিযাত্রীদের বিশ্বকোষে এই দীর্ঘকায় অসমসাহসী মানুষটির নাম লেখা থাকবে সোনার অক্ষরে। শুধু এভারেস্টই নয়, তিনিই প্রথম অভিযাত্রী। যিনি তিন- তিনটি মেরু- উত্তর মেরু, দক্ষিণ এবং এভারেস্ট যাকে বলা হয় থার্ড পোল বা তৃতীয় মেরু। সবগুলোই জয় করেছিলেন। উত্তর মেরুজয়ে তার সফরসঙ্গী ছিলেন চাঁদে প্রথম পা দেয়া মানুষ নীল আর্মস্ট্রং। একশো বছর আগে ১৯১৯ সালের ২০ শে জুলাইয়ে জন্ম হিলারির। নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড শহরে পার্সিভাল অগস্টাস হিলারি ও গারট্রুড ক্লার্কের ঘর আলো করে এল নবজাতক , নাম দেয়া হল এডমন্ড। হিলারিরা জাতে ইংলিশম্যান। পরিবারের আগের প্রজন্ম উনিশ শতকের মাঝামাঝি ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ার থেকে এসে নিউজিল্যান্ডের ওয়াইরোয়া নদীর ধারে বসতি গড়ে তোলেন।

সফর সঙ্গী তেনজিংয়ের সঙ্গে এডমন্ডগ্যালিপলির যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন পার্সিভাল। তারই সম্মানদক্ষিণা হিসেবে তাকে নিউজিল্যান্ডের টুয়াকাউ অঞ্চলে বসবাসের জমি দেয়া হলে সপরিবারে সেখানেই চলে আসেন হিলারি পরিবার। মৌমাছি চাষ করে মধু উৎপাদন করে সংসার চলত তাদের। তবে এডমন্ডের মা গারট্রড স্বপ্ন দেখতেন ছেলে একদিন অনেক বড় মানুষ হবে। দেশ- বিদেশে নাম ছড়িয়ে পড়বে তার। এজন্য ছেলের পড়াশোনার দিকে বিশেষ নজরদারি ছিল মায়ের।

এডমন্ডকে প্রথমে ভর্তি করা হল টুয়াকাউ নার্সারি স্কুলে। সেখানে প্রাথমিক পড়াশোনার পর অকল্যান্ড গ্রামার স্কুল থেকে হায়ার স্টাডি। ছেলেবেলায় ছাত্র হিসেবে এডমন্ড যে দারুণ মেধাবী ছিলেন, তা বলা যায় না। বরং একরকম লাস্টবেঞ্চারই ছিলেন। উঁচু ক্লাসে গিয়ে পড়লেন ভারি সমস্যায়। একে পড়াশোনার চাপ, তার উপর প্রতিদিন দীর্ঘ ট্রেন জার্নি। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার জন্য সকাল ৭ টায় বেরিয়ে সাইকেল চালিয়ে টুয়াকাউ স্টেশনে যেতে হত তাকে। ক্লাস শেষ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধে।

স্ত্রী সন্তানদের সঙ্গে এডমন্ড হিলারিগতানুগতিক পড়াশোনা চলছিল , তার মধ্যেই হঠাৎ করে এক অভাবনীয় সুযোগ এল এডমন্ডের জীবনে। ১৬ বছর বয়সে স্কুল থেকেই ছাত্রদের নিয়ে যাওয়া হল মাউন্ট রুয়াপেহু পর্বতে ভ্রমণে। স্বভাবে লাজুক এডমন্ডের বন্ধুবান্ধব ছিল না তেমন। স্কুলের এই শিক্ষামূলক ভ্রমণে এসে তার সামনে যেন নতুন এক পৃথিবীর দরজা খুলে গেল। অনেক উচ্চতায় তুষার শুভ্র প্রকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রথম তার মনে নতুন কিছুর ভাবনা জাগলো।

তবে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে মন দিলেন পড়াশোনায়। মন মাঞ্ছিল না কিছুতেই। কল্পনার রাজ্যে বারবার ছুটে যাচ্ছিলেন পাহাড়ে। এদিকে সংসারের অভাব। তাই লেখাপড়ায় ইতি টেনে কিছুটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য হয়েই বাবা আর ভাই রেক্সের সঙ্গে এডমন্ডও যোগ দিলেন মৌমাছি প্রতিপালনের পারিবারিক ব্যবসায়। সারা গ্রীষ্মকালটা এইসব ব্যবসার কাজে কেটে যেত তার। আর টাকা জমিয়ে শীতকালে ছুটতেন পাহাড়ে পাহাড়ে। অভিযানের নেশায় এডমন্ড বুদ তখন। দুচোখে সারা পৃথিবী ঘুরে দেখার স্বপ্ন। কিন্তু এর মধ্যেই শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এসময় মিত্রশক্তির পক্ষে রয়্যাল নিউজিল্যান্ড এয়ারফোর্স সি - প্লেনের নেভিগেটর হিসাবে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিলেন এডমন্ড।

তেনজিং এবং জর্জের সঙ্গে হিলারিযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪৫ নাগাদ তাকে ফিজি আর সলোমন দ্বীপপুঞ্জে পাঠানো হয়। সেখানেই এক দুর্ঘটনায় আগুনে শরীরের অনেক অংশ ঝলসে যায় তার। ১৯৪৫ এর আত্মসমর্পণ চুক্তির পর বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতেই সুস্থ হয়ে আবার পাহাড়ের কাছেই আশ্রয়ের খোঁজে ফিরে এলেন হিলারি। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি নাগাদ আরও বেশ কয়েকজন। পর্বতারোহীর সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ শিখর ‘মাউন্ট কুক ' - এ আরোহণ করেন হিলারি। সে বছরই তার সঙ্গে পরিচয় হয় সহকর্মী বন্ধু নরম্যান হার্ডির। তার পরের বছর, ১৯৪৯ সালের দিকে তিব্বতের ভিতর দিয়ে এভারেস্ট যাওয়ার প্রচলিত পথ বন্ধ করে দেয়া হয়।

তখন এভারেস্ট অভিযানের জন্য নেপালের ভেতর দিয়ে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় পথ রইল না। নেপাল থেকেও অভিযানের অনুমোদন পাওয়া ছিল বিরাট ঝক্কির ব্যাপার। বছরে দুই-একটা অভিযাত্রী দল ছাড়া ছাড়পত্র মিলত না কারো। এভারেস্ট তখনও অধরা মাধুরী। দূর থেকে হাতছানি দিলেও মানুষের সাধ্য হয়নি তার মাথার উপর বিজয়কেতন ওড়ানোর ।

এডমন্ড হিলারি জয় করেছেন তিনটি মেরুস্কুলের পড়াশোনা শেষ করে অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে অঙ্ক ও বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ক্লাসে ভর্তি হন এডমন্ড। সেই সঙ্গে ওখানকার ট্রাম্পিং ক্লাবেরও সদস্য হয়ে ওঠেন। ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতা, বেতের মতো ঋজু শরীর আর দুর্দান্ত ফিটনেস- আদর্শ পর্বতারোহী হওয়ার সমস্ত গুণই ছিল তার মধ্যে। ১৯৩৯ সাল নাগাদ সুযোগও এসে গেল দক্ষিণ আল্পস পর্বতমালার মাউন্ট অলিভিয়ার পর্বতশৃঙ্গ অভিযানে অংশ নেয়ার। এডমন্ডের জীবনের প্রথম শৃঙ্গজয় এই অলিভিয়াতেই ।
১৯৫২ শুরুতেই এক সুইস অভিযাত্রীর দল এভারেস্ট অভিযানে গিয়ে বিফল হয়। খারাপ আবহাওয়ার দরুণ সামিট পয়েন্টের মাত্র ৮০০ ফুট দূর থেকে ফিরে আসতে হয় তাদের। পরের বছর মানে ১৯৫৩ তে জন হান্টের নেতৃত্বে ব্রিটিশ অভিযাত্রীর আরেক দল এভারেস্ট অভিযানের পরিকল্পনা নিলে এডমন্ড হিলারি তার বন্ধু জর্জ লোয়িকে নিয়ে সেই দলে নাম লেখালেন। দশ হাজার পাউন্ড মালপত্র , ৩৬২ জন কুলি আর ২০ জন শেরপা সহ চারশতাধিক অভিযাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক এক্সপিডিশন ।

মার্চ মাসে বেস ক্যাম্প থেকে যাত্রা শুরু করে ধীরে ধীরে দলটি ৭,৮৯০ মিটার উঁচুতে উঠে সাউথ কলে ক্যাম্প ফেলে। এই সাউথ কল বা দক্ষিণের পথটি তার আগের বছরই আবিষ্কার করেছিলেন সুইস অভিযাত্রীরা। বেসক্যাম্পে ঢোকার মুখে প্রকৃতির সেই ভয়াল সুন্দর রূপের সামনে সম্মোহিতের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন এডমন্ড। পাহাড়ে তিনি আগেও চড়েছেন, কিন্তু মাউন্ট এভারেস্টের সৌন্দর্যের সঙ্গে কোনোকিছুরই যেন তুলনা চলে না। সারাজীবন দেয়া অজস্র সাক্ষাৎকারে সে কথা বারবার বলে গেছেন এডমন্ড।

প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ ছুটে যায় এভারেস্টের শৃঙ্গ জয় করতেএলোমেলো বাতাস আর তুষারঝড়, পদে পদে বরফে পা পিছলানোর ভয়, তার মধ্যেই পা টিপে টিপে পথ চলা। ২৬ মে টম বুর্দি ও চার্লস ইভান্স প্রথম চেষ্টা করলেন শৃঙ্গজয়ের। কিন্তু ইভান্সের অক্সিজেন সিলিন্ডারে গন্ডগোল দেখা দেয়ায় মূল শৃঙ্গের ৩০০ ফুট নীচ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয় তারা। এরপর এল তেনজিং নরগে আর এডমন্ড হিলারির পালা। সাউথ কলে তুষারঝড়ে আটকে পড়ায় দুটো মূল্যবান দিন ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়েছে তাদের। ২৮ শে মে ৮৫০০ মিটার উঁচুতে বহু কষ্টে তাবু ফেলা হলো। সেখানেই তাদের রেখে নীচে ফিরে গেলেন আং নিমা, আলফ্রেড গ্রেগরি ও জর্জ লোর।

কোনোভাবে রাতটা কাটল। কিন্তু সকালে উঠে এডমন্ড দেখলেন সারারাত বরফ পড়ে তাদের জুতা জমে পাথর হয়ে গেছে। প্রায় দু'ঘণ্টার চেষ্টায় সে জুতা সারিয়ে নতুন করে শুরু হল পথ চলা। কিন্তু সামনেই চল্লিশ ফুটের খাড়া দেয়াল। একবার পা ফসকালে কী হবে তা দুজনেই জানেন। তাতেও থেমে গেলেন না কেউই। দেয়ালের একটা ফাটলে নজর গেল এডমন্ডের। প্রথমে পা বাড়ালেন তিনিই, ইশারায় অনুসরণ করতে বললেন তেনজিংকে। পথে পথে পায়ের নীচে শীতল বরফের মৃত্যুফাঁদ। এই ঠাণ্ডায় অক্সিজেন সিলিন্ডার থেকেও শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও এক ঘোরের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চললেন দুজনে।

ভাইবোনদের সঙ্গে ছোট্ট এডমন্ডঠিক সকাল ১১:৩০ মিনিটে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। অজয় অক্ষয় হিমালয়ের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গের মাথায় পা রাখলেন হিলারি আর তেনজিং। রচিত হল নতুন ইতিহাস। হাতের আইস অ্যাক্স তুলে ছবি তুললেন তারা। তবে এই অভিযান নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক হয়েছে নানান সময়ে। কে প্রথম পা দিয়েছিল এভারেস্টের শীর্ষে তেনজিং নাকি হিলারি। তেনজিংয়ের পতাকা হাতে এভারেস্টের চূড়ায় একটি ছবি দেখে অনেকেই হিলারির ছবি নেই কেন সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেই প্রশ্নের জবাবে হিলারি জানান, তেনজিং ছবি তুলতে জানত না যেকারণে তার ওই মধুর স্মৃতি ধরে রাখতে পারেননি হিলারি। এখনকার যুগ হলে তো কথাই ছিল না। সেলফি তুলতেন নিশ্চয় দুজনে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ