ক্রীতদাস হয়ে আমেরিকা, চুলের প্রসাধনী বিক্রি করে বনে গেলেন কোটিপতি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৩ এপ্রিল ২০২১,   চৈত্র ৩০ ১৪২৭,   ২৯ শা'বান ১৪৪২

ক্রীতদাস হয়ে আমেরিকা, চুলের প্রসাধনী বিক্রি করে বনে গেলেন কোটিপতি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:০১ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৩:২৫ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

চুলের প্রসাধনী তৈরি করে কোটিপতি হন সারাহ

চুলের প্রসাধনী তৈরি করে কোটিপতি হন সারাহ

কোটিপতির তকমা অনেকে অনেকভাবেই পেয়ে থাকেন। কেউবা জন্মসূত্রে পারিবারিকভাবেই প্রচুর ধন সম্পদের মালিক হোন। কেউবা নিজের উপার্জন দিয়ে কোটিপতি হোন। এক্ষেত্রে আবার বৈধ এবং অবৈধ দুই উপায়ই রয়েছে। যেভাবেই কোটিপতি বা ধন- সম্পদের মালিক হতে চান না কেন। খুব একটা সহজ কাজ নয় এটি। তারপরও দরিদ্রতার কষাঘাতে প্রতিনিয়ত জরাজীর্ণ হয়েও অনেকে কোটিপতি হয়েছেন। সেটিই জীবনের সার্থকতা। তেমনই এক উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন ম্যাডাম সি জে ওয়াকার।

একজন ক্রীতদাসের সন্তান হয়েও নিজের চেষ্টায় বিশ্বের কোটিপতিদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। আবার হয়েছেন অন্যদের অনুপ্রেরণা। ১৮৬৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর লুজিয়ানার ডেল্টায় ম্যাডাম সি জে ওয়াকারের জন্ম। তবে জন্মসূত্রে তার আসল নাম ছিল সারাহ ব্রেডলভ। সারাহ ছিলেন আফ্রিকান আমেরিকান। তার জন্মের অনেক আগে তার বাবা-মা ক্রীতদাস হিসেবে আমেরিকায় আসেন।তার বাবা-মা ওভেন এবং মিনার্ভা। তাদের পঞ্চম সন্তান ছিলেন সারা। দাসত্ব মুক্তির ঘোষণার পর তাদের পরিবার মুক্ত হয়।

মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবা-মা হারান ম্যাডাম সি জে ওয়াকারমাত্র ৬ বছর বয়সে এতিম হয়ে যান সারাহ। এরপর তিনি তার বড় বোন লুভিয়ানার সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। সেখানে তারা দুজনই একটি সুতার কারখানায় কাজ করতেন। তবে ভগ্নিপতির লোলুপ দৃষ্টি থেকে বাঁচতে পারেননি সারাহ। যেকারণে ১৮৮১ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে মুসা ম্যাক উইলিয়ামসের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত মাত্র ৬ বছরের মাথায় ১৮৮৭ সালে বিধবা হন সারাহ। তখন তার কোলে ২ বছর বয়সী এক মেয়ে। 

এখনকার মতো আঠারো শতকেও নারীরা চুলের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগতেন এরপর তার তিনবেলা খাবার জোগাড় করা এবং মেয়েকে বড় করা তার পক্ষে খুব কষ্টের হয়ে যায়। তখন সময়টা ১৮৮৯ সাল। ভাগ্যের সন্ধানে সারাহ তার ২ বছর বয়সী মেয়ে আলিয়া সেন্টকে নিয়ে লুইয়ের মিসৌরিতে চলে আসেন। সেখানে সারাহ তার ৩ ভাইয়ের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। প্রথমে একটি লন্ড্রিতে এবং তার কিছুদিন পর একটি  মেসে রান্নার কাজ করেন। তবে সেখানে নানান রকম সমস্যা এবং আর্থিক তেমন কোনো উন্নতি না হওয়ায় তিনি সেই কাজ ছেড়ে দেন।  

তখন তিনি চার্লস জোসেপ ওয়ার্কার নামের এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেন। তবে সেখানকার আইনি নানান জটিলতার কারণে ১৯১০ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। আবারো আর্থিক সমস্যার মধ্যে পড়ে যান সারাহ। ভাইদের সহযোগিতায় সারাহ একটি সেলুনে কাজ পেয়ে যায়। সেখানে অনেক নারীই চুলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসতেন। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের চুল বেশি কোঁকড়ানো হওয়ায় তাদের মাথায় ময়লা জমে বিভিন্ন চর্মরোগ হয়ে থাকে। তখন আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে পানি, বিদ্যুতের সরবরাহ ছিল অনেক কম। এসব কারণে মাথা নোংরা থাকায় অনেক নারীরই চুল পড়ে যেত। সারা যেহেতু সেলুনে কাজ করতেন, তাই এসব দৃশ্য তিনি রোজই দেখতেন। 

সারাহ সেলুনে কাজ করার সময় চুলের প্রসাধনী তৈরি করা শুরু করেন সারাও চুলের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগতেন। তখন চুলের যত্ন নেয়ার মতো তেমন কোনো ভালো প্রসাধনীও ছিল না বাজারে। এরপর হঠাৎই সারা চুলের প্রসাধনী তৈরি করবেন বলে ঠিক করেন। ভাইদের সহযোগিতায় সারা প্রাকৃতিক উপায়ে বিভিন্ন ভেষজ দিয়ে তৈরি করে ফেলেন ‘ওয়াকার সিস্টেম’। চুলে ব্যবহৃত শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, লোশন, ভেষজ তেলসহ যাবতীয় প্রসাধনীই পরবর্তীতে ওয়াকার সিস্টেম হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

সেলুনে আসা নারীদের প্রাথমিক অবস্থায় সারা এসব প্রসাধনী ব্যবহারের পরামর্শ দিতেন। এরপর নারীরা সারার প্রসাধনী ব্যবহার করে সুফল পেতে থাকেন। চারদিকে নাম-ডাক ছড়িয়ে পরে সারার। কেমিক্যাল বা প্রসাধনী সম্পর্কে সারার তেমন কোনো জ্ঞান ছিল না; তবুও নিজের চেষ্টা আর পরিশ্রমে সারা নিজের মেধা প্রমাণ করেন।

২০ হাজার নারীকে তিনি প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন ১৯০৫ সালে ওয়াকার তার পকেটে মাত্র ১ ডলার নিয়ে কলোরাডোর ডেনভারে চলে যান। এরপর তিনি চুল গজানোর তেল, ভেজিট্যাবল শ্যাম্পুর মতো প্রাকৃতিক চুলের প্রসাধনী তৈরির কাজে নেমে পড়েন। সেখানেই সারার সঙ্গে পরিচয় হয় চার্লস জোসেফ ওয়াকারের। যিনি ছিলেন সেন্ট লুইসের একজন সংবাদপত্র বিজ্ঞাপন বিক্রয়কারী।

 ম্যাডাম সি জে ওয়াকার তার প্রসাধনী প্রচারণার একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন এ বিয়ের মাধ্যমেই ম্যাডাম সি জে ওয়াকার নামে পরিচিতি লাভ করেন সারা। প্রথমে তার স্বামী তাকে বিপণন, বিজ্ঞাপন এবং মেল অর্ডারগুলোয় ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছিলেন। ১৯০৮ সালে পেনসিলভেনিয়ার পিটসবার্গে সারা তার স্বামীর সহযোগিতায় একটি বিউটি সেলুন এবং কারখানা চালু করেন।

সেলুনে অন্য নারীদের কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন সারাহ কারখানাটি সারা তার মেয়ের নামানুসারে করেন। ১৯১০ সালে সারার ব্যবসায়িক পরিধি বাড়তে শুরু করে। ১৯১১ থেকে ১৯১৯ সালের মধ্যেই কোটিপতি ব্যবসায়ী হিসেবে নিজের পরিচয় গড়েন। তার নাম হয়ে যায় ম্যাডাম সি জে ওয়াকার। তার কারখানা তখন বেশ বড় হয়ে ওঠে। ১৯১৭ সালের মধ্যে তার কারখানায় ২০ হাজার নারী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে চুলের প্রসাধনী তৈরির কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

১৯১২ সালে ম্যাডাম সি জে ওয়াকার তার তৃতীয় স্বামীর কাছ থেকেও বিচ্ছেদ ঘটান। এর ৫ বছর পরই চার্লস জোসেফ ওয়াকার মারা যান। মৃত্যুর আগেই সারা তার কন্যা আলিয়াকে সব সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করেন। অন্যদিকে সারা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করেন। একজন উদ্যোক্তা হিসেবেই নয়, সারা একজন দানবীর নারী ছিলেন।

ম্যাডাম সি জে ওয়াকারের প্রসাধনীর একটি বিজ্ঞাপনী পোস্টার তিনি কর্মীদের জন্য ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাদের বিভিন্ন সময় বোনাস দিয়ে পুরস্কৃত করতেন সারা। তখনকার সময় কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের চাকরির ক্ষেত্রে অনেক বৈষম্য ও সীমাবদ্ধতা ছিল। তিনি নারী শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অবদান রেখেছেন। টাস্কিজি ইনস্টিটিউটের নারীদের জন্য বৃত্তি অর্থায়নসহ বিভিন্ন কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের প্রতিষ্ঠানে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন ম্যাডাম সি জে ওয়াকার।

বিশ্বের অন্যতম কোটিপতি নারী ম্যাডাম সি জে ওয়াকারহাইপারটেনশনের কারণে ১৯১৯ সালের ২৫ মে মাত্র ৫১ বছর বয়সে মারা যান ওয়াকার। তার মৃত্যুর পরে ১৯২০ সালের দিকে ওয়াকারের নামটি আরও বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে। কারণ তার ব্যবসায়ের পরিধি বাড়তেই থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও কিউবা, জ্যামাইকা, হাইতি, পানামা এবং কোস্টারিকা পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল তার কোম্পানি। ৮০ হাজার কর্মী কাজ করত তার অধীনে। 

মেয়েকে নিয়ে খুব ভালোভাবেই জীবন কাটাতে শুরু করেন সারাহ ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন এতিম এ নারী। ছোটবেলা থেকে বাবা-মায়ের ভালোবাসা না পেলেও বিশ্ববাসী তাকে ভালোবেসেছে। প্রচুর খ্যাতি আর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তার জীবনকালে। আজ তিনি বিশ্ববাসীর কাছে রোল মডেল। বিশেষ করে নারীদের জন্য দৃষ্টান্ত গড়েছেন ম্যাডাম সি জে ওয়াকার। তার জীবন অবলম্বনে সম্প্রতি টিভি সিরিজ নির্মিত হয়েছে ‘সেলফ মেড’ নামে।

সূত্র: ওমেনহিস্টোরি 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে