দাস্তানগোয়িরা, হারিয়ে যাওয়া সেই কথায় মুগ্ধ করার পেশা

ঢাকা, বুধবার   ১৪ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ২ ১৪২৮,   ০১ রমজান ১৪৪২

দাস্তানগোয়িরা, হারিয়ে যাওয়া সেই কথায় মুগ্ধ করার পেশা

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২৬ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৭:২৯ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১

দাস্তানগোয়িরা হারিয়ে যাওয়া এক পেশা

দাস্তানগোয়িরা হারিয়ে যাওয়া এক পেশা

গল্প, উপন্যাস, পুঁথি, পালাগান, মঞ্চ নাটক, যাত্রা কতো কি-ই না তৈরি হয়েছে শুধু মাত্র মানুষের বিনোদনের জন্য। টেলিভিশন আসার পর অবশ্য এসব মাধ্যমে কিছুটা ভাটা পড়েছে। এখনতো আর সেই আয়োজন করে পুঁথি পাথ কিংবা যাত্রা দেখতে যান না কেউই। এমনকি আয়োজনও হয় না কোথাও। এসব কাজের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তারাও পেশা বদল করেছেন একের পর আক। তেমনই এক পেশা ছিল দাস্তানগোয়িরা।

যাদের কাছ ছিল শুধু গল্প বলা। ইতিহাস, পুরান, রাজ-রাজাদের যত উপাখ্যান শুনিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করা। খাতা কলম বা পুঁথি ছাড়াই এক এলাকার গল্পকে এরা নিয়ে গেছেন অন্য জায়গায়, মুখে মুখে কাহিনী, উপাখ্যান ছড়িয়ে গেছে এদের কাছ থেকে। পৃথিবীর ইতিহাসজুড়ে আছে এমন গল্পকারেরা, এদের খুঁজে পাওয়া যাবে নানা সংস্কৃতিতে।

আমির হামজা থেকে অনুপ্রাণিত চিত্রকর্ম এরা হাট-বাজার এবং লোক সমাগম বেশি এমন জায়গায় গিয়ে তাদের গল্প শোনাতেন। মানুষ জড়ো হয়ে যেত তার চারপাশে। একের পর এক গল্প শুনাতে থাকতেন, অন্যরা তা মন্ত্র মুগ্ধের মতো শুনতে থাকত। বাইরের দুনিয়ার এক অপরিচিত খবর নিয়ে এসেছে এই গল্পকার, নানা জনপদের গল্প শুনতে শুনতে শ্রোতা কল্পনায় ছবি আঁকে মনের ভেতর। এদের বলা হত দাস্তানগোয়িরা। মূলত দাস্তান শুনিয়েই দু'পয়সা রোজগার করতেন, এদের পরিচয় ছিল দাস্তানগোয়ি। ‘দাস্তান’ শব্দটি মূলত ফারসি, এর অর্থ আখ্যান। যারা পথে পথে ঘুরে দেশবিদেশ থেকে এই আখ্যান সংগ্রহ করতেন, নতুন নতুন মানুষের সামনে গিয়ে বলতেন তারাই দাস্তানগোয়ি নামে পরিচিত। 

যাত্রা পথে বণিকদের দাস্তান শোনাতেন দস্তানগোয়িরা ভারতীয় উপমহাদেশেই যেমন গড়ে উঠেছিল পাঁচালী পাঠ। যদিও পাঁচালীতে সুর ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে গল্প শুনিয়ে মানুষকে মোহিত করে দেয়ার একটি মাধ্যম গড়ে ওঠে ইসলামিক যুগের পূর্ববর্তী সময়ে। ধারণা করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে তৎকালীন পারস্যে, অর্থাৎ বর্তমান ইরানে প্রথম দাস্তানের প্রচলন ঘটে। সেই সময় মধ্যপ্রাচ্যের আরব বণিকরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যেতেন। তারা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার সময় দলে একজন করে দস্তানগোয়িকে সঙ্গে নিতেন। তিনি অবসরের সময় বিভিন্ন কাহিনি শুনিয়ে বণিকদের দলের মন চাঙ্গা করতেন। মূলত বিভিন্ন দেশের লোককথা ছাড়াও রাজা, মন্ত্রী বা সেনাদের বীরত্বের কাহিনীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠত দাস্তান।

বণিক দলের মধ্যে মিশে গিয়ে দস্তানগোয়িরা ধীরে ধীরে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন। এভাবেই তারা মধ্য এশিয়া, পারস্য, খাইবার পাস পেরিয়ে দিল্লিতে এসে পৌঁছেছিলেন। আবার আরেকটি দল বর্তমান বসনিয়া, তুরস্ক, মিশরে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় যাযাবর একদল মানুষ এসেছিলেন যারা ‘কিসসা’ বা ‘দাস্তান’ বলে বেড়াতেন। এই ‘কিসসা’ কিংবা ‘দাস্তান’ যারা এর বাংলা কী হবে তা নিয়ে একটু বিতর্কও আছে। এটি বৃহত্তর বাংলার পুঁথি থেকে আলাদা, কারণ সুর করে বলা হয় না। ব্যবহার হয় না বাদ্যযন্ত্র। হাত পা, মৌখিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে এই দীর্ঘ কাহিনী বলে যাওয়া হয়। এমনও শোনা যায় দিল্লী, লখনৌ, লাহোর কিংবা আগ্রার পথে প্রান্তরে, মসজিদের সিড়িতে, বাজারে, সরাইখানায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাহিনী বলে যায় এরা। 

হামজানামার একটি ছবি, যা নানাসময় হাত বদলে এখন এর অনেকগুলোই প্রাশ্চাত্যের বিভিন্ন জাদুঘরেমূলত সেই সময়ের সরাইখানাগুলোতে দাস্তানের আসর বসত। এছাড়া সৈন্য শিবিরেও দস্তানগোয়িদের আনাগোনা ছিল। অনেক সময় বিভিন্ন মহল্লায় নারীরা জড়ো হয়ে দাস্তান শুনতেন। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তনের পর দস্তানগুলোতে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনাগুলো মূল চরিত্র হয়ে উঠতে শুরু করে। ধর্ম থেকে উপাদান নিয়ে, ইতিহাসের মালমশলায় নির্মিত হয় এই মহাআখ্যান। মধ্যযুগে ভারতের পথে প্রান্তরে এক জনপ্রিয় দাস্তান ছিল আমির হামজাকে নিয়ে, ইসলামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এই আমির হামজা। তার জীবনের বীরত্বের বাস্তব উপাদান যেমন ছিল ঠিক তেমনি কল্পনার অদ্ভুত মিশেল ছিল দীর্ঘকায় এই দাস্তানে। 

আমির হামজার দাস্তান সেই সময়ে খুব জনপ্রিয় ছিল। তা পারস্যের মানুষের কাছে যেমন বহুল পরিচিত ছিল, তেমনই লাহোর দিল্লির মানুষেরাও সেগুলি আপন করে নেয়। মুঘল সম্রাট হুমায়ুন বিহারের সুবাদার শেরশাহের কাছে পরাজিত হয়ে পারস্যে পালিয়ে গিয়েছিলে। সেই সময় তিনি দস্তানগোয়িদের সঙ্গে পরিচিত হন। পরবর্তীকালে তিনি আবার ক্ষমতায় ফিরলে দিল্লীর মুঘল দরবারে যথেষ্ট সমাদর পেয়েছিল দাস্তানগোয়িরা। পরবর্তীকালে আকবর সম্রাট হওয়ার পর আমির হামজার দাস্তানগুলো নিয়ে চিত্রকল্প আঁকার নির্দেশ দেন।

এক নারী দাস্তান শোনাচ্ছেন, ছবিট তোলা ১৯১১ সালে অনেক ঐতিহাসিক তাজমহল, লালকেল্লা থেকেও মুঘল আমলের শ্রেষ্ঠ শৈল্পিক নিদর্শন হিসেবে মনে করেন আমির হামজার দাস্তানের ওপর নির্ভর করে আঁকা ছবিগুলিকে, যা পরিচিত ছিল ‘হামজানামা’ নামে। প্রায় বারো’শো ছবির একটি সিরিজের মাধ্যমে আমির হামজা দাস্তান ফুটিয়ে তুলেছিলেন তৎকালীন চিত্র শিল্পীরা। ১৭৩৯ সালে নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করে দিল্লি লুট করার সময় ময়ূর সিংহাসনের পাশাপাশি মুঘল তসবিরখানা লুট করেন। এই মুঘল তসবিরখানাতেই রাখা ছিল হামজানামা। অর্থাৎ আমির হামজার দাস্তানের ওপর নির্ভর করে আঁকা ছবিগুলো। বর্তমানে এই ছবিগুলির বেশিরভাগই ইউরোপের বিভিন্ন মিউজিয়ামে রাখা আছে। 

দাস্তানগোয়িদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল কোনো সুর বা গান ব্যবহার না করেই কেবলমাত্র মুখের কথা ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতেন তারা। এটা অনেকটা গল্প দাদুর মতো। অনেকটা ছোটবেলায় আমরা যেভাবে দাদুকে ঘিরে বসে গল্প শুনতাম। আর দাদু টানা তার নাতি নাত্নিদের নানা রকম গল্প শুনিয়ে যেতেন। দস্তানগোয়িরা অনেকটা সেরকমই গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে মানুষকে বিভোর করে দিতেন। সবচেয়ে বড় কথা দস্তানগোয়িদের মাধ্যমেই সেই সময় এক জায়গার মানুষ অন্য জায়গার কথা জানতে পারত।

সঈদ সাহিল আগা একজন দাস্তানগোয়িরাদস্তানগোয়িরা এক সময় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজা-উজির সবাইকে দাস্তান শুনিয়ে অর্থ উপার্জন করতেন। প্রথমদিকে ফারসি ভাষায় দাস্তানের কাহিনী শোনানো হত। পরবর্তীকালে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করার পর উর্দু ভাষাতেও দাস্তানগোয়িরা কাহিনী শোনাতে শুরু করেন।

সিপাহী বিদ্রোহের পর ভারতে ছাপাখানার কাজ জোরকদমে শুরু হয়। সেই সময়ে বিভিন্ন দাস্তান কাগজে ছেপে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে দস্তানগোয়িদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। কারণ মানুষ ছাপার অক্ষরে বিভিন্ন কাহিনী পড়তে শুরু করেন। এইভাবে হারিয়ে যায় এক প্রাচীন শিল্প। বর্তমানে ভারত সহ বিভিন্ন জায়গায় দাস্তান পুনর্জীবিত করার চেষ্টা শুরু হয়েছে।

বিশ্বের কিছু কিছু জায়গায় এখনো এর আয়োজন করা হয় ১৯৮০ সালে ভারতে শামসুর রহমান ফারুকীর উদ্যোগে একদল ব্যক্তি উদ্যোগ নেন এই দাস্তানকে আমার ফিরিয়ে আনা যায় কিনা। মরক্কো, ইন্দোনেশিয়া, বসনিয়া এ ধরনের মৌখিক আখ্যান বলার চল আছে তবে সেখানে আবহ সংগীতের ব্যবহার করা হয়, কোথাও আবার বায়োস্কোপের মতো চিত্রকলা দেখিয়ে তার সঙ্গে সঙ্গে গল্প বলা হয়। তবে ইতিহাস থেকে দেখা যায় ভারতীয় দাস্তান ছিল এদিক থেকে আলাদা, এখানে আখ্যানই প্রধান আর মুখের কথা আর শারীরিক অঙ্গভঙ্গি। এখানে সংগীত, বাদ্যের ব্যবহার নেই। এরপর থেকে ভারতে জোরেশোরে চেষ্টা হয়েছে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে তোলার, ঘটা করে আয়োজন করা হয়েছে দাস্তান শোনার পরিবেশ করে। তবে চলতি পথে থমকে দাঁড়িয়ে, কাফেলা থামিয়ে সরাইখানায় দাস্তান শোনার দিন তো চলে গেছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে