হারানো প্রেম ফিরে পেতে প্রেমিক একাই বানালেন চুনাপাথরের প্রাসাদ

ঢাকা, শুক্রবার   ০৭ মে ২০২১,   বৈশাখ ২৫ ১৪২৮,   ২৪ রমজান ১৪৪২

হারানো প্রেম ফিরে পেতে প্রেমিক একাই বানালেন চুনাপাথরের প্রাসাদ

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:২৯ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৭:৫২ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

কোরাল ক্যাসল

কোরাল ক্যাসল

প্রেমে পড়ার মতোই যেন অবধারিত ভবিষ্যৎ ব্যর্থতা। মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ বলা যায় ভালোবাসা আর বিচ্ছেদকে। বিচ্ছেদের মাধম্যে প্রেমে বা বিয়ের ইতি টানেন অতি সুখে থাকা দম্পতিরাও। সম্পর্কের তিক্ততা নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে দূরে থেকে ভালোবাসাটাই শ্রেয় মনে করেন অনেকে।

আবার অনেকে প্রতারিত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত প্রিয়মানুষটির কাছে। প্রতারণা মেনে না নিতে পেরে কেউ আত্মহুতি দেন, কেউবা তলিয়ে যান বিষাদের অন্ধকারে। জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হয়েও দাঁড়ায় এই কষ্ট। তবে বেশিরভাগ মানুষই প্রতারণা মেনে নিতে না পেরে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলকাজগুলো করে থাকেন।

এডওয়ার্ড একাই তৈরি করেছিলেন এই বিশাল প্রাসাদ লাটভিয়ার এডওয়ার্ড লেডস্কালনিন বিয়ের আগের দিন প্রতারিত হয়েছিলেন হবু স্ত্রীর কাছ থেকে। এই আঘাতে মেনে নিতে পারেননি তিনি। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন এডওয়ার্ড। হারানো প্রেম ফিরে পেতে তৈরি করেন প্রেমেরসৌধ। চুনাপাথরের একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন এডওয়ার্ড। এটি সাধারণ ঘটনা হলেও, আজও রহস্যাবৃত রয়েছে লাটভিয়ার নির্মিত সেই চুনাপাথরের প্রাসাদ।   

হবু স্ত্রীর কাছে ধোঁকা খাওয়ার পর এডওয়ার্ড চলে আসেন আমেরিকার ফ্লোরিডায়। সেখানেই তিনি তার এই প্রেমসৌধ তৈরি করেছিলেন তিল তিল করে। বলা হয়, বিশ্বের রহস্যাবৃত প্রাসাদের মধ্যে এডওয়ার্ডের নির্মাণ অন্যতম। আসলে রহস্য হচ্ছে এই প্রাসাদের নির্মাণশৈলীতে। কীভাবে আর কতদিনে এই প্রাসাদ নির্মাণ হয়েছিল। এত চুনা পাথরের জোগান কোথা থেকে পেয়েছিলেন এডওয়ার্ড? সেই প্রশ্নের খোঁজ মেলেনি আজো! 

এই প্রাসাদে রয়েছে ফুয়ারা, নানা রকম সৌধ ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দের ১২ জানুয়ারি লাটভিয়ায় একটি উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম এডওয়ার্ডের। তাদের পারিবারিক ব্যবসা ছিল পাথরের প্রাসাদ তৈরির। সেই দক্ষতা তিনি নিজেও অর্জন করেছিলেন পুরোমাত্রায়। এডওয়ার্ড ছোট থেকেই শারিরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। এজন্য খুব বেশি স্কুলে যেতে পারতেন না। ঘরে বসে বই পড়ে সময় কাটাতেন।  যা এডওয়ার্ডের অনুসন্ধানী মন এবং জ্ঞানের জন্য আজীবন আকাঙ্ক্ষা বিকাশে সহায়তা করেছিল। 

এডওয়ার্ড লেডস্কালনিনএডওয়ার্ড তার প্রাসাদ নির্মাণে প্রথমে চুনাপাথরের সঙ্গে কাঠ মিশিয়ে ব্যবহার করেছিলেন। তবে পড়ে পুরোটায় চুনাপাথর ব্যবহার করেন। তার তৈরি প্রাসাদে জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া পাথরও আছে, যেগুলোর উচ্চতা ২৫ ফুট। ওজনে ৩০ টনেরও বেশি। ফলে এই প্রাসাদে কিছু পাথর রহস্যময় স্টোনহেঞ্জের থেকেও বড়। কিছু প্রবালের ওজন গিজার গ্রেট পিরামিডে ব্যবহৃত এক একটি পাথরের থেকেও ভারী।

একাই তৈরি করেছিলেন চুনাপাথরের বিশাল এই প্রেমসৌধ এ ছাড়াও প্রাসাদে অপেক্ষা করে আছে বহু বিস্ময়। সূর্যঘড়ি, পাথরের রকিং চেয়ারের পাশাপাশি আছে ৫০০ পাউন্ড ওজনের হৃদয়াকৃতি টেবিল। এই টেবিল ছিল তার হারিয়ে যাওয়া প্রেমের প্রতীক। তালিকায় আছে ৯ টন ওজনের দরজা। একটি পালকের স্পর্শেই সেই দরজা ঘুরতে থাকে লাট্টুর মতো। খুব গোপনে এই প্রবাল প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন এডওয়ার্ড। বেশির ভাগ কাজ করেছিলেন গভীর রাতে। যাতে কেউ তার নির্মাণকৌশল জানতে না পারে। ফলে অনেকেরই ধারণা, তিনি প্রাচীন কোনো জাদুবিদ্যা ব্যবহার করেছিলেন।

এই স্থাপনার নাম বেশ কয়েকবার হাতবদল হয়েছে, সঙ্গে নামও মানুষকে সবচেয়ে বেশি যা স্পর্শ করে যায়, তা হল, কৈশোরে হারানো প্রেম তথা প্রেমিকার জন্য এই লাটভিয়ান তার পরবর্তী জীবন কাটিয়েছিলেন শুধু পাথর কেটে এবং বহন করে! প্রাসাদ তৈরির খরচ যোগাড় করতে তিনি বিভিন্ন রকম পেশা বদলে করেছেন। ফ্লোরিডায় এসে এডওয়ার্ড জমি কিনেছিলেন রুবেন মোসারের কাছ থেকে। সেখানেই চুনাপাথরের এই রহস্যপ্রাসাদ তৈরি করে নাম দিয়েছিলেন ‘এডস প্লেস’। শোনা যায়, ফ্লোরিডায় আসার সময় তিনি আক্রান্ত ছিলেন যক্ষ্মারোগে। সে সময় মোসারের স্ত্রী তার সেবাযত্ন করেছিলেন।

তখনকার নির্মিত প্রাসাদের চেয়ে এডওয়ার্ডের তৈরি প্রাসাদ ছিল অনেকটাই আলাদা। সেখানে চুনাপাথরের দেয়াল, ছাদ এবং আসবাবপত্র এমন ভাবে ছিল। যা প্রয়োজনে স্থানান্তরও করা যায়। এডওয়ার্ড সেটাও করেছিলেন। তার ভয় হত, প্রাসাদের রহস্য ফাঁস হয়ে যাবে। অন্যান্য প্রাসাদ থেকে এডওয়ার্ডের তৈরি প্রাসাদটি বিশ্ববাসীর মন কাড়ে তখন থেকেই। প্রাসাদকে ঘিরে আছে নানা কৌতূহল। প্রাসাদের চুনাপাথরের দেয়াল, ছাদ এবং আসবাবপত্র প্রয়োজন বিশেষে স্থানান্তরও করা যেত। তিনি পরে ফ্লোরিডা শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে আরো ১৬ কিমি উত্তরে নিয়ে যান তার সৃষ্টিকে। ৩ বছর ধরে চলেছিল এই স্থানান্তর পর্ব। শেষমেশ সেখানেই স্থায়ী হয়ে আছে রহস্যময় এই প্রাসাদ। 

প্রেমিকা ফিরে এলে তার সঙ্গে এখানে বসে চা খেতে চেয়েছিলেন হয়তো ১৯৫১ সালে ৬৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন এডওয়ার্ড। তার কোনো উইল ছিল না। ফলে পাথরের প্রাসাদ-সহ বাকি সম্পত্তির মালিক হন আমেরিকার মিশিগানবাসী হ্যারি নামে তার এক ভাইপো। কিছু সূত্রের দাবি, হ্যারির শারীরিক ও আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাই তিনি ওই প্রাসাদ বিক্রি করে দেন। তবে শিকাগোর এক গয়না ব্যবসায়ী জুলিয়ান লেভিনের দাবি ছিল, তিনি ওই জমি কিনেছিলেন ফ্লোরিডার প্রশাসনের কাছ থেকে। এমনকি তিনি জানতেনও না ওখানে একটি প্রাসাদ আছে।

শেষ এই সম্পদ বিক্রি হয় ১৯৮১ সালে। একটি বেসরকারি সংস্থার কাছে বিক্রি করে দেন লেভিন। এখনো সেই সংস্থার অধীনেই আছে প্রাসাদটি। মালিকানার মতো বদলেছে নামও। ‘এডস প্যালেস’ থেকে ‘রক গেট’, ‘রক গেট পার্ক’ হয়ে এই স্থাপত্যের বর্তমান নাম ‘কোরাল ক্যাসল’। এডওয়ার্ডের তৈরি তার ষোড়শী প্রেমিকা তথা হবু স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার স্মৃতিসৌধ আজ পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য।

বিশাল এই স্থাপনাগুলো যেখানে যেতেন সঙ্গে নিয়ে যেতেন বছরে প্রায় ৬৫ হাজারের মতো দর্শনার্থী আসেন এই প্রেমসৌদ দেখতে। অবাক হন এমন প্রেমিকাকে পাওয়ার জন্য প্রেমিকের যে পাগলামি, তার কোথায় গিয়ে দাড়িয়েছিল তাই দেখেন সবাই। পাথরের খাদে খোঁজেন সেই ব্যর্থ প্রেমিকের প্রেমিকাকে পাওয়ার আকুতি। 

সূত্র: আনইউজুয়াল প্লেস 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে