জাপানিদের পাবলিক বাথে বিবস্ত্র গোসলের সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরনো

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

জাপানিদের পাবলিক বাথে বিবস্ত্র গোসলের সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরনো

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:২৬ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৬:২০ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

পাবলিক বাথে গোসল করা জাপানিদের অনেক পুরনো রীতি

পাবলিক বাথে গোসল করা জাপানিদের অনেক পুরনো রীতি

প্রশান্ত মহাসাগরের একদম পূর্ব কোণে ৬৮০০ টি দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা ছোট্ট একটি দেশ জাপান। জাপান যে শুধু প্রযুক্তিতে এগিয়েছে তা নয়, শিল্প সাহিত্যে চিত্রকলা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে তাদের অবাদ বিচরণ। খুবই শান্ত স্বভাবের জাপানিরা। একটু লাজুক প্রকৃতিরও বটে! সহজেই অন্যদের সঙ্গে খাতির জমিয়ে ফেলতে পারে জাপানিরা। সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের কিছু বিচিত্র তথ্য।

বিশেষ করে এদের গোসল সংস্কৃতি। জাপানিদের সবচেয়ে অদ্ভুত এক ব্যাপার হচ্ছে এদের পাবলিক বাথ। ঐহিত্যবাহী পাবলিক গোসলখানা জাপানে 'সেন্টু' নামে পরিচিত, যার বাইরের দিকটা দেখতে বেশিরভাগ সময়ই বৌদ্ধদের মঠের মত হয়। এগুলো দেখতে আধুনিক সেন্টগুলো যেমনটা হয়, তেমনটাই! বিশাল শপিং সেন্টারে অত্যাধুনিক সুবিধায় সজ্জিত। কী আধুনিক, কী পুরাতন- বাইরে যাই হোক না কেন, সব সেন্টুর ভেতরের পরিবেশ ও আচার প্রায় একই রকম।

অনেক মানুষ একসঙ্গে গোসল করে পাবলিক বাথে সেন্টুর এর ভেতরে সবাই নগ্ন থাকতে। বাইরে লাজুক প্রকৃতির হলেও বাথের ভেতর তাদের সেই লজ্জার কোনো প্রকাশি পাবেন না। এটাই এর রীতি। এই কাণ্ড দেখে যদি ভুলেও হেসে ফেলেন, তাহলে আপনাকে অভদ্র ভাববে তারা।  

গোসলের জন্য নগ্ন হওয়া স্বাভাবিক এখানে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। সেই সঙ্গে কিছু নিয়মও মানতে হবে আপনাকে। যেমন জলটঙ্গিতে কাপড় পরে ঢোকা নিষেধ, জাম্প দেয়া যাবে না, গা ধোওয়ার সময় অন্যের গায়ে পানি যেন না যায়, ব্যবহার শেষে পানির কল বন্ধ করে দিতে হবে। তোয়ালে ব্যবহার করা যাবে  তবে পানিকে অপরিষ্কার করা যাবে না। তোয়ালে রাখতে ঝামেলা হলে, মাথার উপর রাখতে পারেন। এতে অবশ্য খানিকটা বিপত্তিও আছে, মাথাও গরম হবে, মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়বে।

এখানে গোসল করতে হয় বিবস্ত্র অবস্থায় আপনার কাপড় রাখতে পারবেন ছোট্ট বাক্সে। এরপর তালা লাগিয়ে চাবি হাতের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখতে হবে পুরো সময়টা। সেন্টুতে একসঙ্গে পনের-বিশজনের মত গোসল করতে পারে। সবাই এখানে উলঙ্গ! এবং গভীর মনোযোগে গোসল করছে তারা। কেউ কারো বিশেষ অঙ্গের দিকে তাকাচ্ছেন না। লজ্জা পেলে কেউ তোয়ালে পরতে পারেন। তবে কাউকে বুঝতে দেয়া যাবে না, আপনি লজ্জা পাচ্ছেন। জানলে বাকিরাও লজ্জা পাবে। 

তবে গরমের দেশের মানুষদের এখানে গোসল করা একটু কষ্টই। কেননা জাপান শীতের দেশ হওয়ায় বাথের পানি থাকে অনেক গরম। ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস! প্রথমে সহ্য করা কষ্ট। তবে কিছুক্ষণ বসার পর গা সয়ে যাবে। তবে পাশের আরও দুটি ছোট জলটঙ্গি আছে। একটির পানি ঠাণ্ডা, একেবারেই জিরো ডিগ্রি। খুব গরম লাগলে ওখানে গিয়ে ঠাণ্ডা হয়ে নেয়া যায়। এখানেই শেষ নয়। খাঁটি 'রেড ওয়াইন' এও শরীর ভিজিয়ে নিতে পারবেন। কেননা একটি বাথে থাকে  'রেড ওয়াইন'। 

অনেকে জীবনসঙ্গী খোঁজার জন্য এই জায়গা বেছে নিতেন বাথে আপনাকে সাবান শ্যাম্পু ওরাই দিবে। যতোক্ষণ খুশি গোসল করতে পারবেন, কেউ কিছু বলবে না। বিল একই, ৫৫০ ইয়েন। অনেকক্ষণ ধরে গোসল করে শরীর ক্লান্ত লাগলে ঢুকে পরতে পাবেন হিটিং রুমে। সারি সারি বেডের পাশে কয়লার চুল্লি জ্বলছে। এর তাপে সবার ঘাম ঝরছে। চাইলে টিভিতে পছন্দের শো দেখে নিতে পারবেন। হিটিংরুম থেকে বের হতেই মনে হবে, আপনার ওজন হয়তো অনেক কমে গেছে। শান্তিতে মন-প্রাণ উড়ছে। কোনো দুঃচিন্তা নেই, অভাব নেই, অভিযোগ নেই। শরীরের সব ক্লান্তি যেন এক ঝটকায় দূর হয়ে গেছে। 

সান্টুর ভেতর দেয়ালের গা ঘেঁষে রয়েছে অ্যাকোয়ারিয়াম। যেখানে অসংখ্য রঙিন মাছ সাতার কাটছে মনের আনন্দে। জাপানে সব সেন্টুতেই বাগান থাকে। কাঁচের দেয়াল দিয়ে গোসলের সময় বাগান দেখা যায়। ছোট ছোট পাথর আর গাছ দিয়ে তৈরি। জাপানের গোসলের সংস্কৃতি অনেক পুরনো। যা আজো তারা পালন করছে। পঞ্চম শতাব্দীতে যখন এদেশে বৌদ্ধধর্মের চর্চা শুরু হয়, তখন থেকেই জাপানিরা এভাবে গোসল করে। প্রথম দিকে বুদ্ধিস্ট-মঙ্করা পবিত্র হওয়ার জন্য এভাবে গোসল করত। নারা প্রদেশে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত বৌদ্ধ মঠ টডিজিতে আজও সেন্টু রয়েছে।

এখন হোটেলগুলোতেও রয়েছে এমন ব্যবস্থা ১৯০০ সাল পর্যন্ত মেয়ে-ছেলেরা একসঙ্গে গোসল করতো। জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের পর পাশ্চাত্যের ক্রিশ্চিয়ান ধর্মের অনুসারীরা ছেলে-মেয়ের একসঙ্গে নগ্ন হয়ে গোসল করাকে ভালোভাবে নেয়নি। তারা বলত, 'জাপানিরা গোসলে অসভ্য, শরম ছাড়া।'

পাশ্চাত্যের এই সমালোচনায় জাপান সরকার ১৯০০ সালে নারী-পুরুষ একসঙ্গে গোসল বন্ধ করে দেন। নারী-পুরুষ একসঙ্গে গোসলের হাজার বছরের অভ্যাস ভুলতে জাপানিদের ২০ বছর লেগেছিল। ১৯২০ সাল থেকে নারী-পুরুষের গোসলখানা আলাদা হয়ে যায়। এখন ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে গোসল করে না। তবে ছোট বাচ্চারা বাবা-মায়ের সঙ্গে গোসল করে।

বাড়িতে যেসব গোসলের জায়গা তৈরি করা হয় তাকে বলে `ওহুরু`পূর্বে জাপানের সেন্টুকে মনে করা হত 'সোশ্যাল ফোরাম'। লোকাল কমিউনিটি'র 'ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড'। ইদো যুগে (১৬০৩-১৮৬৮) জাপানি সমাজে সামুরাই, কৃষক, শিল্পী ও ব্যবসায়ী ইত্যাদি শ্রেণি বৈষম্য থাকলেও গোসলখানায় ছিল সবাই এক স্বর্গের মত। ভেদাভেদ ভুলে সবাই একসঙ্গে গোসল করতো, মিষ্টি খেত, খেলা করতো, মনখোলা কথা বলে গড়ে তুলতো সামাজিক বন্ধন। আদিতে নর-নারী একসঙ্গে সেন্টুতে গোসল করার সময় জীবনসঙ্গী বাছাই করতো। বিয়ের আগে একে অন্যের শরীরটা দেখে নিত, ভাব করতো।  

জাপানে প্রতি শহরেই আছে সেন্টু! সারা জাপানে প্রায় এক হাজার আটশ'টি সেন্টু আছে। আধুনিক বাড়ি ও হোটেলগুলোতে সেন্টু বানানোর কারণে ঐতিহ্যবাহী সেন্টুর সংখ্যা কমছে। মানুষ বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা আগের মত সেন্টুতে যেতে চায় না। প্রাইভেসি রক্ষা করে চলে।

পাশ্চাত্যের প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে খরচ কমানোর জন্যও বাসাতে গোসল করে অনেকে। আরাম ও বিনোদনের সব সুবিধা আছে আধুনিক সেন্টুগুলোতে। বার, ম্যাসেজ চেয়ার, রেস্টুরেন্ট, গেইম, মিউজিক শো, শপিং এমনকি ড্যান্সিং ক্লাব এবং গেস্টরুমও।

শীতের দেশ হওয়ায় গোসলে এরা গরম পানি ব্যবহার করে জাপানিরা সাধারণত দিনে গোসল করে না। প্রতি রাতে গরম পানিতে গোসল করা জাপানিদের রীতি। সারাদিন পরিশ্রমের পর, গরম পানিতে গোসল করে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রশান্তিলাভকে জাপানিরা খাবারের মতই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। বাড়িতে এভাবে গোসলকে বলা হয়, 'ওহুরু'। ধনী-গরীব সব বাসাতেই 'ওহুরু'র জন্য বাথটাব আছে।

জীবন্ত আগ্নেয়গিরির দেশ জাপান। সারা জাপানে ১১০টির মত জীবন্ত আগ্নেয়গিরি আছে। এসব আগ্নেয়গিরির গা ঘেঁষে রয়েছে হাজারেও বেশি 'হটস্প্রিং' মানে উষ্ণ প্রস্রবন। এসব হটস্প্রিংকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিখ্যাত সব 'ওনসেন'। প্রতি বছর ১৩ কোটিবার পর্যটকগণ এসব ওনসেনে ঘুরতে যান। বিশাল ব্যবসা ও জনপ্রিয়তা। সাবান, শ্যাম্পু, খাবার এমনকি কাগজের প্যাকেটও হয় প্রকৃতিনির্ভর 'অরগানিক'। এই সংস্কৃতিকে দর্শনার্থীরা সেবার গুণ মনে করে, প্রশংসার চোখে দেখে। একেক অঞ্চলের হটস্প্রিং-এর পানিতে একেক ধরনের খনিজ থাকে। প্রকৃতি সৌন্দর্যও ভিন্ন, নিজস্ব অনাবিল।

শিল্পীর তুলিতে আঁকা জাপানিদের পাবলিক বাথের দৃশ্য সালফার, আয়ন, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি ২০ প্রকারের খনিজের মিশ্রণে গড়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময় ওনসেন ও প্রাকৃতিক স্পা সংস্কৃতি, আকর্ষণীয় পযর্টক, হোটেল আর রিসোর্ট। জাপানিদের বিশ্বাস 'হটস্প্রিং'র মিনারেল রক্ত সঞ্চালনের জন্য উপকারি। জাপানি এমন মানুষও আছে, শুধু গোসলের জন্য সারাদেশ ঘোরেন।

অভিজ্ঞরা বলেন, জাপানি গোসলের অপর নাম শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি, আত্মিক শুদ্ধতা। জাপানিরা গোসলে তৃপ্ত হলে বলে, 'গকুরাকু, গকুরাকু', যার অর্থ 'স্বর্গীয়'।

জাপানিরা গোসলে তৃপ্ত হলে বলে, `গকুরাকু, গকুরাকু`, যার অর্থ `স্বর্গীয়`প্রতিটি বাড়িতে 'ওহুরু' থাকলেও মানুষ প্রতি মাসে অন্তত একবার সেন্টু'তে যান। সৌখিন, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্তরা, সিনিয়র সিটিজেনরা দলবেঁধে ওসসেন ট্যুরে যায় প্রায়ই। গোসলের পেছনে ব্যয় করেন বড় অঙ্কের টাকা ও সময়। জাপানি ভাষায় 'সেন্টু' মানে আশার প্রতীক, আরামের প্রতীক। উন্নতমানের প্রাকৃতিক 'ওনসেন'-এ শুধু একবার গোসলের জন্য লাগে তিন হাজার থেকে আটত্রিশ শ' জাপানিজ ইয়েন (২ হাজার থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা)। জাপানিরা বাড়ির গোসলখানাকে বলে 'ওহুরু', পাবলিক বাথকে বলে 'সেন্টু' আর প্রকৃতি 'হটস্প্রিং'র গোসলখানাকে বলে 'ওনসেন'। তবে সব জায়গাতেই বিবস্ত্র গোসল। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে