নিম্নবিত্তদের শহরে ‘রহস্যময়’ মাছ বৃষ্টি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

নিম্নবিত্তদের শহরে ‘রহস্যময়’ মাছ বৃষ্টি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:০৫ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৬:১১ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

হন্ডুরাসে প্রতি বছর দুইবার মাছ বৃষ্টি হয়

হন্ডুরাসে প্রতি বছর দুইবার মাছ বৃষ্টি হয়

বৃষ্টির পানির সঙ্গে শিলা তো অনেক দেখেছেন। বরফের ছোট্ট ছোট্ট টুকরা, কিছুক্ষণ পরই গলে পানি হয়ে যায়। হাতে নিয়ে খেলায় মেতেছেন ছোটবেলায়। এই সুখ স্মৃতি রয়েছে অনেকের ঝুলিতেই। তবে বৃষ্টির সঙ্গে শিলাই নয় উল্কা পড়ার কথা শুনেছেন হয়তো। তবে যদি দেখেন বৃষ্টিতে পানি নয়, পড়ছে মাছ। অবাক হবেন বৈকি! অলৌকিক কিছু ভেবে ফেলাও দোষের কিছু নয়। এটি অবিশ্বাস্য মনে হলেও হন্ডুরাসে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।  

প্রতি বছরই এমন ঘটনায় সাক্ষী হয়ে থাকেন মধ্য আমেরিকার হন্ডুরাসের লাখো মানুষ। মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে এমন ‘মাছ বৃষ্টি’ প্রতি বছরই হয় হন্ডুরাসের বিভিন্ন জায়গায়। স্থানীয়রা এই ঘটনাকে বলেন ‘জুভিয়া দে পেতেস’। স্প্যানিশ এই শব্দটির অর্থ হল ‘মাছের বৃষ্টি’। মাছ বৃষ্টি বলতে একটি দুটি নয়, লাখ লাখ মাছ আকাশ থেকে ঝরে পড়ে। রাস্তা-ঘাটে, বাড়ির সামনে, ছাদে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে হাজার হাজার মাছ! মাঝে মধ্যে নয়, আমেরিকার হন্ডুরাসে ইয়োরো এলাকায় বছরে দু’বার আকাশ থেকে ঝরে পড়ে শত শত মাছ। 

শিলাবৃষ্টির সঙ্গে মোটামুটি সবাই পরিচিত প্রত্যেক বছর মে থেকে জুনের মধ্যে এখানে তীব্রগতিতে ঝড় ও বৃষ্টি হয়। ঝড়ের মধ্যে রাস্তায় শত শত নানা ধরনের মাছ আছড়ে পড়ে। সেই সঙ্গে আকাশ থেকে অঝোরে ঝরে পড়তে থাকে স্কুইড, ব্যাঙ ও আরও কত কী! স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ সময় রীতিমতো লোক নামিয়ে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করাতে হয়। এর পেছনে বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। পৃথিবীর আরও বেশ কয়েকটি স্থানে এ ধরনের বৃষ্টি হয়। এলাকাবাসী মেঘ দেখে আন্দাজ করতে পারেন কখন শুরু হবে তুমুল ঝড় ও মৎস্য-বৃষ্টি। 

উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি (১৮৫৬ সাল–১৮৬৪ সাল) সময়ে খ্রিস্ট ধর্মযাজক হোসে সুবিরানা হন্ডুরাসে আসেন। তার সময়ে এই অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাতেন। তাদের দুর্দশা দূর করতে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন তিনি। হোসে সুবিরানার প্রার্থনার পর থেকেই দারিদ্র্যের কষ্ট দূর করতে ঈশ্বর আকাশ থেকে ‘মাছের বৃষ্টি’করেন বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেন এই অঞ্চলের মানুষ।

বিশ্বের অনেক দেশেই মাছ বৃষ্টি হতে দেখা যায় হন্ডুরাসে ‘মাছের বৃষ্টি’ হওয়ার কারণ নিয়ে হয়েছে অনেক গবেষণা। ১৯৭০ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ দলকে পাঠানো হয় হন্ডুরাসে। ওই দলের সদস্যরা এই ‘মাছের বৃষ্টি’র ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। পরীক্ষা করে জানা যায়, এই অঞ্চলে আকাশ থেকে যে সব মাছের বৃষ্টি হয়, তা কোনো সমুদ্রিক মাছ নয়। সেগুলো মিষ্টি জলের মাছ। অর্থাৎ আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়া মাছগুলো কোনো নদী, পুকুর বা হ্রদের মতো মিষ্টি জলের জলাশয়ের মাছ।  

বেশির ভাগ মাছই প্রায় একই প্রজাতির। যদিও ১৯৭০ সালে হন্ডুরাসে ‘মাছের বৃষ্টি’র সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সদস্য দল পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করেনি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল কর্তৃপক্ষ। আটলান্টিক মহাসাগর তার থেকে প্রায় ২০০ মাইল দূরে এই মাছের বৃষ্টি হয়। অনেকে মনে করেন, টর্নেডো বা সামুদ্রিক ঝড় আটলান্টিক মহাসাগরের বিভিন্ন অংশের মাছ উড়িয়ে এনে এই অঞ্চলে এনে ফেলে। তবে এমন ঘটনা প্রতি বছর কী করে সম্ভব? এখনও এই ঘটনা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।

মাছের সঙ্গে ব্যাঙ, সাপ, স্কুইডসহ নানান প্রাণী পড়ে আকাশ থেকে তবে শুধু হন্ডুরাসই নয়; মাছ বৃষ্টির ঘটনার আলামত মিলেছে আরও কয়েকটি দেশে। গেল বছর মাছ বৃষ্টির অভিজ্ঞতা লাভ করেছে শ্রীলঙ্কা। আর সম্প্রতি থাইল্যান্ডেই মাছ বৃষ্টি হওয়ার খবর জানা গেছে। ২০১৪ সালের মে মাসে পশ্চিম শ্রীলংকার চিলাউ জেলায় মাছ বৃষ্টি হয়! মাছগুলো ছিল ৫ থেকে ৮ সে.মি লম্বা মাত্র! এবং সেগুলোর মাঝে বেশ কিছু মাছ জীবিত ছিল। এটা শ্রীলঙ্কায় নতুন কিছু না, ২০১২ সালে দক্ষিণ শ্রীলঙ্কায় ‘প্রওন রেইন’ অর্থাৎ চিংড়ি মাছের বৃষ্টি হয়! এছাড়া মেক্সিকোতে প্রতিবছর বৃষ্টির মৌসুমে মাছ বৃষ্টি হয়ে থাকে! ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উত্তর মেক্সিকোর টাম্পিকো নামক অঞ্চলে একই ঘটনা ঘটেছিল। সেই অঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছে শক্তিশালী ঝড়তুফানের সঙ্গে মাছ বৃষ্টি হওয়াটা এতোই নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে গিয়েছে, যে তারা এ ঘটনাকে বার্ষিক উৎসব হিসেবে পালন করে আসছে ১০ বছর ধরে!

অনেক জায়গায় মাকড়সা বৃষ্টিও হয় তবে শুধু মাছ বৃষ্টিই নয়, বিশ্বের অনেক দেশে সাপ, জেলিফিশ, ইঁদুর, মাকড়সা এবং এমনকি রক্তের বৃষ্টিও হয়েছে। যদিও এগুলো নিয়ে হচ্ছে নানান গবেষণা। তবে এসব ঘটনার জন্য একটি কারণ দাড় করিয়েছেন গবেষকরা। আর সেটি হচ্ছে, যখন কোনো বড় নদী বা সাগরের ওপর টর্নেডো বা ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয় তখন ঘূর্ণায়মান বাতাস অগভীর নদী বা সাগরের ওপরে পানির সংস্পর্শে আসলে সাগর বা নদীর হালকা ওজনের মাছগুলো পানির সঙ্গে ওই ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে মিশে গিয়ে উপরে ওঠে যায়! উক্ত অঞ্চল থেকে আপাত দৃষ্টিতে ঘূর্ণিঝড় থেমে গেছে মনে হলেও তা মূলত অনেক ওপরে ঘুরতেই থাকে। তাছাড়া ঘূর্ণিঝড়ের ঘূর্ণিবায়ু পানির সঙ্গে মাছ টেনে নিয়ে তা মেঘ হিসেবে জমা রাখে! আশ্চর্যের বিষয় হলো মেঘমালায় সেই মাছগুলো বহন করে!

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ সময় রীতিমতো লোক নামিয়ে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করাতে হয়ফলে উক্ত টর্নেডো বা ঘূর্ণিঝড় মাছগুলো সঙ্গে নিয়েই ঘুরে ঘুরে সাগর বা নদীর নিকটবর্তী অঞ্চলে আসে। মূলত তখনই ঘূর্ণিঝড়ের জলঘূর্ণন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মেঘ থেকে পানিরূপে বৃষ্টি হয়, তখন মাছগুলোও পানির সঙ্গে মাটিতে পরতে থাকে। এভাবেই ঘটে যায় মাছ বৃষ্টি! যদিও মাছ টেনে নেয়ার কিছুক্ষণ পরই জলঘুর্ণন থেমে যায়। তাইতো শুধু স্থলেই না, এমনকি উক্ত নদী বা সাগরেও সেই মাছ বৃষ্টি হতে পারে! 

কম সময়ের মধ্যে মাছগুলো পরে যায় বলেই কিছু মাছ জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়। যেমনটি পাওয়া গিয়েছিল শ্রীলংকায়। সুইজারল্যান্ডের এক গ্রামের বাসিন্দা বলেছিল সে নাকি ব্যাঙ এর বৃষ্টি দেখেছে! এর কোনো প্রমাণ পাওয়া না গেলেও বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী তা কিন্তু অসম্ভব কোনো ঘটনা নয়! কেননা ঘূর্ণিবায়ু মাছ সমৃদ্ধ সাগর বা নদী থেকে মাছ টেনে  নিতে পারলে অবশ্যই ব্যাঙ, সাপসহ যেকোনো হালকা ওজনের জলজ প্রাণীও টেনে নিতে পারে! 

ঘূর্ণিঝড়ের ঘূর্ণিবায়ু পানির সঙ্গে মাছ টেনে নিয়ে তা মেঘ হিসেবে জমা রাখে!অনেকেই আবার মনে করেন, আদৌ মাছের বৃষ্টি ছিল নাকি মাছবাহী লরি খুলে রাস্তায় মাছ পড়ে যাওয়ার ঘটনা ছিল তা নিয়ে দ্বিমত আছে। তবে এই দুটি স্থানের কোনটিতেই হন্ডুরাসের মতো নিয়মিত এমন ঘটনা ঘটে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে