দ্য থার্ড ডিফেনেস্ট্রেশন: তুচ্ছ ঘটনায় ৩০ বছর যুদ্ধ, মারা যায় ইউরোপের অর্ধেক পুরুষ

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৫ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

দ্য থার্ড ডিফেনেস্ট্রেশন: তুচ্ছ ঘটনায় ৩০ বছর যুদ্ধ, মারা যায় ইউরোপের অর্ধেক পুরুষ

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০৭ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৪:২৩ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

দ্য থার্ড ডিফেনেস্ট্রেশন

দ্য থার্ড ডিফেনেস্ট্রেশন

রাজনৈতিক হোক বা পারিবারিক, দ্বন্দ্ব বাধলে একপক্ষ অন্য পক্ষকে হারাতে অনেক কিছুই করেন। প্রায়ই খবরের শিরোনামে দেখা যায়, আলোচনা সভা কিংবা সালিশি এক পক্ষের লোক অন্য পক্ষের মানুষদের সঙ্গে হাতাহাতি বাধিয়ে দিয়েছেন। বিয়ে বা উৎসবেও এর ঘাটতি নেই। মারামারি হইহুল্লোড় সব জায়গায় লেগেই আছে। তবে এটি কিন্তু আমাদের বর্তমান বিশ্বের চিত্র নয়। ছিল আরো তিনশ বছর আগেও।

এই সব কিছু ঘটনার অবসান কিন্তু কিছুদিন পরেই হয়ে যায়। তবে জানেন কি? সপ্তদশ শতকের প্রথমদিকের ইউরোপে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল। যা থেকে লেগে যায় যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের স্থায়িত্বকাল ছিল ৩০ বছর। রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে বিদ্যমান দুই পক্ষ মুখোমুখি আলোচনায় বসেছে, হঠাৎ একপক্ষের মানুষজন অন্যদের জানালা থেকে নিচে ছুঁড়ে ফেলে দেয় নিচে। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তারা। কেননা তিন তলা থেকে সোজা গিয়ে পড়েছিল গোবরের গাদার ওপর। তাই প্রাণে রক্ষা পান তারা সেদিন। এরপর পড়িমড়ি করে দৌড় নিজের রাজ্যের উদ্দেশ্যে। 

সামান্য এক ঘটনা নিয়ে লেগে যায় যুদ্ধ, স্থায়িত্বকাল ৩০ বছর এই ঘটনাটি ‘দ্য থার্ড ডিফেনেস্ট্রেশন’নামে পরিচিত। ঘটনাটি ঘটেছিল তৎকালীন হোলি রোমান এম্পায়ারের অন্যতম প্রধান ক্ষমতার কেন্দ্র প্রাগে। খ্রিস্টান ধর্মের দুই শাখা রোমান ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে বিরোধ মেটাতে গিয়ে একদল ক্যাথলিক রাজপ্রতিনিধিকে প্রাগের সংসদ সদস্যরা দুর্গের তৃতীয় তলার জানালা থেকে নিচে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।

ডিফেনেস্ট্রেশন শব্দটির অর্থ হল জানালা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া। তবে মধ্যযুগের ইউরোপে মূলত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে এক পক্ষ অপর পক্ষকে জানালা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার মতো বেশ কিছু ঘটনার নজির আছে। প্রাগে মোট তিনবার এরকম জানালা দিয়ে ফেলে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে তৃতীয় ঘটনা, অর্থাৎ ১৬১৮ এর ঘটনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ফলপ্রসূ । রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আলোচনা চলাকালীন জানালা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার প্রচলন শুরু করেছিল তারা। 

মধ্যযুগে ইউরোপে হোলি রোমান এম্পায়ার নামে একটি রাষ্ট্র জোট গড়ে উঠেছিল। এটা ঠিক এক রাজার অধীন কোনো রাজ্য ছিল না। বরং বেশ কিছু বৃহৎ ও শক্তিশালী রাজ্যের পাশাপাশি অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্য নিয়ে হোলি রোমান এম্পায়ার গড়ে ওঠে। বর্তমান জার্মানি, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ইতালি, চেক রিপাবলিক, হাঙ্গেরি ও ফ্রান্সের কিছু অংশ নিয়ে তৎকালীন এই রাষ্ট্র জোট গড়ে উঠেছিল। ভলতেয়ারের মতে, "হলি রোমান এম্পায়ার পবিত্র, রোমান বা সাম্রাজ্য- কোনোটাই না।"

এই যুদ্ধে মারা যায় ইউরোপের অর্ধেক পুরুষ বেশিরভাগ ইতিহাসবিদের মতে, 'হলি রোমান এম্পায়ার' ছিল একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যা বিভিন্ন সার্বভৌম রাজ্য, ডাচি, এমনকি অন্য সাম্রাজ্য অর্থাৎ বিভিন্ন কন্সটিচুয়েন্ট নিয়ে গঠিত ছিল। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং ক্ষমতাবানদের মধ্যে ছিল অস্ট্রিয়া, বারগান্ডি, ব্যাভারিয়া, বোহেমিয়া, সাক্সনি, মিলান, প্রাশিয়া ইত্যাদি। এসব সার্বভোম রাজার মধ্য থেকে সম্রাট নির্বাচন করা হতো। যে রাজ্য থেকে সম্রাট নির্বাচিত, সেই রাজ্যের রাজধানী সাম্রাজ্যের রাজধানী হতো এবং পার্লামেন্ট সেই রাজ্যে স্থানান্তরিত হতো।

হোলি রোমান এম্পায়ারের অন্তর্গত রাষ্ট্রগুলো এক ধরনের গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে সম্রাট অর্থাৎ রাষ্ট্র জোটের প্রধানকে নির্বাচিত করত। যে রাজ্যের রাজা সম্রাট হিসেবে নির্বাচিত হতেন সেই রাজ্যের রাজধানী সেই সময় হোলি রোমান এম্পায়ারের রাজধানী হিসেবে পরিগণিত হত এবং সংসদ-টিও সেখানেই স্থানান্তরিত হত। এই রাষ্ট্র জোটের মধ্যে শক্তিশালী রাজ্যগুলো ছিল প্রাশিয়া, বোহেমিয়া, বার্গান্ডি, স্যাক্সন, অস্ট্রিয়া, ব্যাভেরিয়া, নরম্যান্ডি, মিলান ইত্যাদি।

শিল্পীর তুলিতে আঁকা ফার্দিনান্দ ১৪৩৭-১৮০৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় জুড়ে হোলি রোমান এম্পায়ারের নেতৃত্ব ছিল অস্ট্রেলিয়ান রাজপরিবার হ্যাসবার্গদের ওপর। মাঝের ১৭৪১-৪৫ সাল পর্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য কেবলমাত্র এই কর্তৃত্ব অস্ট্রেলিয়ান রাজপরিবারের হাতছাড়া হয়। ইতিমধ্যেই মার্টিন লুথার ভ্যাটিকানের পোপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে খ্রিস্টান ধর্মের নতুন শাখা প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের প্রচলন করেন। হোলি রোমান এম্পায়ারের অন্তর্গত রাজ্যগুলোর রাজন্যবর্গের একাংশ প্রোটেস্ট্যান্ট ভাবধারার অনুগামী হয়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবেই জনগণের একাংশ প্রোটেস্ট্যান্ট মতে আস্থাশীল হন।

খ্রিস্টান ধর্মের দুই শাখা হলেও ষোড়শ ও সপ্তদশ শতক জুড়ে ইউরোপে ক্যাথলিকদের সঙ্গে প্রটেস্ট্যান্টদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। অবস্থা বেগতিক দেখে হোলি রোমান এম্পায়ারের সম্রাট পঞ্চম চার্লস ১৫৫৫ সালে অসবার্গ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। এই চুক্তি মোতাবেক সাম্রাজ্যের অন্তর্গত প্রতিটি রাজ্য ও রাজারা তাদের ইচ্ছেমতো ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা লাভ করে। ঐতিহাসিকদের মতে অসবার্গ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছিল সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার স্বার্থে।

এটি সেই দুর্গ, যেখান থেকে ফেলে দেয়া হয়েছিল প্রতিপক্ষের মানুষদের তবে এই শান্তি বেশি দিন স্থায়ী ছিল না। ১৬১৭ সালে সম্রাট, অস্ট্রিয়া এবং বোহেমিয়ার রাজা ম্যাথিয়াস দ্বিতীয় ফার্দিনান্দকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে বোহেমিয়া ও অস্ট্রিয়ার ভবিষ্যৎ রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং তাকে নির্বাচন করা হয় সম্রাট ম্যাথিয়াসের পর ক্ষমতা গ্রহণের জন্য।

ফার্দিনান্দ ছিলেন একজন ক্যাথলিক চরমপন্থী। বোহেমিয়ার প্রোটেস্টেন্টরা এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে থাকে। এর ওপর ফার্দিনান্দ ১৬১৮ সালে রাজকীয় জমিতে প্রোটেস্ট্যান্ট চ্যাপেল তৈরির নির্মাণাদেশ বাতিল করেন। বোহেমিয়ার প্রোটেস্ট্যান্ট সংসদ এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানালে ফার্দিনান্দ সংসদ বাতিল করার ঘোষণা দেন। 

পঞ্চম চার্লস, ম্যাথিয়াসের পর হোলি রোমান এম্পায়ারের সম্রাট হন অস্ট্রেলিয়ান রাজপরিবারের সদস্য ফার্দিনান্দ। তিনি ছিলেন একজন গোঁড়া ক্যাথলিক। খুব দ্রুত সাম্রাজ্যের প্রোটেস্ট্যান্ট ভাবধারায় বিশ্বাসী রাজ্যগুলোর সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সাম্রাজ্যের সরকারি জমির ওপর প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ গঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন ম্যাথিয়াস। বোহেমিয়ার প্রোটেস্ট্যান্ট রাজা ও সংসদ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে সম্রাট ফার্দিনান্দ সেই সংসদ বাতিল পর্যন্ত করে দেন।

এই ঘটনাটি ‘দ্য থার্ড ডিফেনেস্ট্রেশন’নামে পরিচিতযাবতীয় সমস্যার নিরসন করার ১৬১৮ সালের ২৩ মে সম্রাট ফার্দিনান্দ চারজন প্রতিনিধিকে প্রাগে পাঠান বাতিল প্রোটেস্ট্যান্ট সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য। কাউন্ট জারোস্লাভ বারিতা অফ মার্টিনিস, কাউন্ট ভিলেম স্লাভাতা অফ ক্লাম, দ্বিতীয় অ্যাডাম ভন স্টার্নবার্গ ও ম্যাথিউ লিওপোল্ড পোপেল লেটজকোভিচ এই চারজন ক্যাথলিক মতানুসারী রাজপ্রতিনিধি হিসেবে প্রাগ দুর্গে পৌঁছন।

আলোচনার শুরুতেই বাতিল হওয়া সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা চরমে উঠল কাউন্ট থর্ন প্রথম দুই সদস্যকে রেহাই দিলেও পরের দুই রাজপ্রতিনিধিকে তাদের প্রোটেস্ট্যান্ট ভাবধারার পক্ষে ক্ষতিকারক বলে চিহ্নিত করে ব্যক্তিগত সহায়ক সহ দুর্গের জানলা দিয়ে নিচে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার আদেশ দেন। এই দুর্গের নিচ থেকে তৃতীয় তলার উচ্চতা ছিল প্রায় ২১ মিটার। উঁচু থেকে নিচে পড়লেও ভন স্টার্নবার্গ ও লিওপোল্ড পোপেল বেঁচে যান কারণ তারা পড়েছিলেন দুর্গের বাইরে রাখা গোবরের গাদার ওপর! 

১৬১৮ সালে শিল্পীর তুলিতে আঁকা হলি রোমান এম্পায়ার এর মানচিত্র এই ঘটনার পরই বোহেমিয়া ও অষ্ট্রিয়ার নেতৃত্বে হোলি রোমান এম্পায়ারের অন্তর্গত প্রোটেস্ট্যান্ট ভাবধারায় আস্থাশীল রাজ্যগুলো ক্যাথলিক মতানুসারী রাজ্যগুলোর সঙ্গে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৩০ বছর ধরে এই যুদ্ধ চলেছিল। এই যুদ্ধ পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী যুদ্ধের মধ্যে একটি, যাতে হলি রোমান এম্পায়ারের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক পুরুষই মারা যায়। ইউরোপের ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তন হয়ে যায়, যা আরো অন্যান্য ঘটনাকে প্রভাবিত করে। এছাড়াও এই যুদ্ধের ফলে ইউরোপে প্রোটেস্ট্যান্টিজম ছড়িয়ে পড়ার পথ সুগম হয়। এসব কিছুই হয় প্রাগের দুর্গের জানালা দিয়ে তিনজন ব্যক্তিকে বাইরে ফেলে দেয়ার মাধ্যমে! 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে