ভারতীয় সন্ন্যাসীর হাত ধরেই সবচেয়ে ‘ভয়ংকর’ কুংফুর জন্ম

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৫ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

শাওলিন কুংফু

ভারতীয় সন্ন্যাসীর হাত ধরেই সবচেয়ে ‘ভয়ংকর’ কুংফুর জন্ম

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৪৮ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১  

শাওলিন কুংফু বেশ ভয়ংকর। ছবি: সংগৃহীত

শাওলিন কুংফু বেশ ভয়ংকর। ছবি: সংগৃহীত

‘কুংফু’ নামটার সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। বিশেষ করে চাইনিজ চলচ্চিত্রের কারণে সারাবিশ্বেই নামটি ছড়িয়ে পড়েছে। যারা মার্শাল আর্ট নিয়ে খোঁজখবর রাখেন, তাদের কাছে ‘শাওলিন কুংফু’ নামটি সবচেয়ে বেশি রোমাঞ্চকর। কারণ তামাম দুনিয়ার মার্শাল আর্টের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হলো শাওলিন কুংফু।

চীনের বিখ্যাত শাওলিস মন্দিরে দেড় হাজার বছর ধরে চর্চা হচ্ছে বিশেষ এই কুংফু। শাওলিন কুংফুর মূল ধারনা হলো মানব দেহকে শক্তিশালী ও প্রাণনাশক অস্ত্রে পরিণত করা। ভয়ংকর এই মার্শাল আর্ট সম্পর্কে জানতে তিনটি বিষয়ে জ্ঞান থাকা খুবই জরুরি—বুদ্ধভদ্র, শাওলিন মন্দির ও দ্য থার্টিসিক্স চেম্বার অব শাওলিন।

ভারতীয় সন্ন্যাসীর হাত ধরে শাওলিন কুংফু’র যাত্রা

চীনা কুংফু বা গুংফু শব্দের অর্থ হলো ধর্য ও শক্তি সহকারে কোনো কিছু অধ্যায়ন করা। ২০ শতক থেকে কুংফু শব্দটি মূলত চীনা যুদ্ধ বিষয়ক শিল্পকলার ক্ষেত্রেই ব্যবহার হতো। তবে অনেকে কুংফু ও কারাতে একই জিনিস মনে করেন। কিন্তু বিষয়টি মোটেও তা নয়। কুংফু হলো চাইনিজ, আর কারাতে জাপানিজ। কুংফু, কারাতে ছাড়াও জুডো-তাইকোর মতো আরও নানা ধরনের মার্শাল আর্ট রয়েছে। এগুলো সবকিছুর মধ্যে কুংফু একেবারেই স্বকীয়।

র্শাল আর্টের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হলো শাওলিন কুংফু। ছবি: সংগৃহীত

তামাম দুনিয়ার সব মার্শাল আর্টের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হলো কুংফু। এর ধরনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে শাওলিন কুংফু। বিশেষ এ কুংফুর যাত্রা শুরু হয়েছিল বুদ্ধভদ্র নামের একজন ভারতীয় সন্ন্যাসীর হাত ধরে।

প্রবর্তিত হল বৌদ্ধধর্মের ‘চান’ শাখা

চীনের হেনান প্রদেশের এক পাহাড়ি উপত্যকাকে ঘিরে থাকা জঙ্গল, ঝরনা আর উঁচু পর্বতশ্রেণীর অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্য বুদ্ধভদ্রকে মুগ্ধ করেছিল। তাই তিনি ‘সং’ পর্বতের গুহায় তপস্যা শুরু করেন। স্থানীয়রা বৃদ্ধভদ্রের প্রতি মুগ্ধ হয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণও শুরু করেন। তাকে নতুন নামও দেয়া হয়—‘ফতু্ও বাতুও লও’।

ভারতীয় এ সন্ন্যাসীর গুণমুগ্ধ ছিলেন স্বয়ং সম্রাট জিয়াওয়েন নিজেই। বুদ্ধভদ্রের উপাসনা পদ্ধতি অবলম্বন করে চীনে শুরু হয় বৌদ্ধধর্মের ‘চান’ বা ‘জেন’ শাখা। বুদ্ধভদ্র যাতে স্থায়ীভাবে চীনে থেকে যান, সেই উদ্দেশ্যে সম্রাট জিয়াওয়েন ৪৭৭ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করে দেন সুবিশাল শাওলিন মনাস্ট্রি। ‘সং’ পর্বতশ্রেণির নিচে থাকা ‘শাওসি’ জঙ্গলের উত্তর দিকে আজও আছে এই বিশ্বখ্যাত মনাস্ট্রি, বিশ্ব আজ যেটাকে চেনে শাওলিন টেম্পল নামে। সুউচ্চ কাষ্ঠনির্মিত প্যাগোডাটি ২০০০ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নেয়।

শাওলিন কুংফু একেবারেই স্বকীয়। ছবি: সংগৃহীত

শাওলিন মনাস্ট্রির প্রথম প্রধান বুদ্ধভদ্র। তিনি স্রষ্টা সাধনার সঙ্গে মানসিক ও শারীরিক শক্তির সাধনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। জঙ্গল পরিবেষ্টিত জায়গায় অবস্থিত মন্দিরটিকে দস্যু ও বিধর্মীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। তাই তিনি তার দুই প্রধান শিষ্য হুইগুয়ান ও সেংচাউ-এর মাধ্যমে ভারতীয় মার্শাল আর্টের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিশিয়ে দেন চাইনিজ মার্শাল আর্ট। যার নাম ‘শাওলিন কুংফু’। তারপর থেকেই শাওলিন একটি বৌদ্ধ মঠ হওয়ার পরও পৃথিবীর সবচেয়ে ঐহিত্যবাহী মার্শাল আর্ট স্কুল হিসাবে খ্যাতি অর্জন করে।

যেভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়

তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রথমেই পেশী ও হাড় শক্ত করার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। একজন আদর্শ শাওলিন শিক্ষার্থী ১০ থেকে ২০ বছর সাধারণ কুংফু শেখেন। তারপর শুরু হয় বিশেষ প্রশিক্ষণ। তেমনই একটি বিদ্যা হলো ইজিংজিং। বাহ্যিক কাঠামোর সঙ্গে শরীরের ভেতরের অঙ্গ প্রতঙ্গকেও শক্তিশালী করে গড়ে তোলা ইজিংজিং’র মূল উদ্দেশ্য। এড়ারাও শরীরের দুর্বল অংশেও তীব্র আঘাত সহ্য করার প্রশিক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রশিক্ষণের জন্য ধ্যানের কোনো বিকল্প নেই।

বিখ্যাত এই মন্দিরে প্রায় ৫০০ জন বৌদ্ধ ভিক্ষু নিয়মিত বসবাস করেন। তাদের মধ্যে প্রায় একশ শিক্ষার্থী যোদ্ধা হিসাবে প্রশিক্ষণ নেয়। শুরুর দিকে তাদেরকে প্রায় এক হাজার কুংফু শৈলী আয়ত্ত করতে হতো। এরপর তারা সেরা একশ’ শৈলী বেছে নিয়ে চর্চা করতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে সেগুলোর মধ্য থেকে ১৮টি কুংফু শৈলী গ্রহণ করে। প্রাণীজগৎ থেকে অনুপ্রাণীত হয়ে এসব পদক্ষেপ উদ্ভাবন করা হয়েছে। বাঘ, ভাল্লুক, ঈগল, সাপ, বেজী, বানর বা কাল্পনিক ড্রাগনের আক্রমণ শত শত বছর পর্যবেক্ষণ করে সেগুলো কুংফুতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

কজন আদর্শ শাওলিন শিক্ষার্থী ১০ থেকে ২০ বছর সাধারণ কুংফু শেখেন। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম ও দুর্দান্ত কসরতের ফলে অনেকেরই শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। তাই ৮০০ বছর আগে শাওলিন মন্দিরে একটি চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছিল। শারীরিক বিভিন্ন আঘাত সারিয়ে তুলতে নানা ধরনের ভেষজ উপাদান ব্যবহার করে। দীর্ঘকাল ধরে সন্ন্যাসীদের ব্যবহারিক ফলাফলের উপর ভিত্তি করে এসব ওষুধ তৈরি করা হয়। তাদের কিছু ওষুধে প্রায় ২ হাজার ভেষজ উপাদান থাকে।

চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে

শাওলিন টেম্পল নিজেকে প্রচারের আলোর বাইরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল মাত্র তিন দশক আগেও। কিন্তু  ১৯৭৮ সালে হংকং থেকে তৈরি হওয়া একটি চলচ্চিত্র ‘দ্য থার্টিসিক্স চেম্বার অব শাওলিন’ শাওলিন টেম্পলের সন্ন্যাসীদের মার্শাল আর্টে অবিশ্বাস্য দক্ষতার কথা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরে। 

এরপর দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে শাওলিন টেম্পলের নাম। বিদেশি পর্যটকদের কাছে শাওলিন টেম্পল হয়ে ওঠে জনপ্রিয় একটি পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর শত শত শিশু-কিশোর-তরুণ এসে হাজির হয় শাওলিন টেম্পলে কুংফু শেখার জন্য।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে