আড়াই কোটি বছর আগে সৃষ্টি হওয়া হ্রদে ৮০ বছরের বৃদ্ধার স্বেচ্ছা নির্বাসন

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

আড়াই কোটি বছর আগে সৃষ্টি হওয়া হ্রদে ৮০ বছরের বৃদ্ধার স্বেচ্ছা নির্বাসন

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৩০ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৭:৪৫ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

লুবভ মরেখোডোভা

লুবভ মরেখোডোভা

যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল ছেড়ে অনেকবারই মন হারিয়ে যেতে চেয়েছে। নিশ্চয় ইচ্ছা করে নির্জন কোনো দ্বীপে গিয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে। তবে সময় আর পিছুটানে হয়ে ওঠে না স্বপ্ন পূরণ। পিছু ফিরে তাকাননি বাবুস্কা। সব অভ্যাস, আবেগ উপেক্ষা করে বেছে নিয়েছেন স্বেচ্ছা নির্বাসন। ৮০ বছর বয়সে তিনি একাই বাস করেন এই দ্বীপে।  

বিশ্বের গভীরতম হ্রদ বৈকাল'। সাইবেরিয়ার দক্ষিণের পাহাড়ি এলাকায়, ৩১ হাজার ৭২২ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে আছে হ্রদটি। দৈর্ঘ্যে ৬৩৬ কিলোমিটার এবং প্রস্থে ৭৯ কিলোমিটার। আড়াই কোটি বছর আগে সৃষ্টি হওয়া এ হ্রদটি বিশ্বের প্রাচীনতমও বটে। এর সর্বাধিক গভীরতা ৫৫৮০ ফুট। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর প্রায় ২৩ শতাংশ মিষ্টি জলের ভাণ্ডার হল রাশিয়ার এই অর্ধচন্দ্রাকৃতি হ্রদ, কারণ নিজেদের মিষ্টি জলের সুধা দিয়ে লেক বৈকালের বুক ভরিয়ে দিয়েছে ৩৩০ টি নদী। বরফেমোড়া বৈকালের বুকে যেন রঙিন প্রজাপতি আশি বছরের বাবুস্কা। 

শীতে দুধসাদা বরফে ঢেকে যায় বৈকাল হ্রদ এক দুরন্ত স্বেচ্ছা - নির্বাসন দশ বছর একলা বাস করেন , লেক বৈকালের তীরে থাকা সম্পূর্ণ জনমানবহীন এক স্থানে। গ্রীষ্মকালে বৈকালের ঘন নীল জলরাশি ও তীরের শ্যামলিমা , মন্ত্রমুগ্ধ করে তোলে পর্যটকদের । শীতের ছয়মাস বৈকাল ঘুমিয়ে পড়ে দুধসাদা বরফের নীচে। বৈকালের রুদ্ধশ্বাস শ্বেতশুভ্র সৌন্দর্য দেখতে তখনও আসেন বহু পর্যটক। জমে যাওয়া বৈকালের বুকে ‘ আইস স্কেটিং ' করেন , কুকুরে টানা স্লেজে চড়েন। 

গ্রীষ্মকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১২-১৪ ডিগ্রি ও শীতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা মাইনাস ৩০-৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। এই বৈকাল হ্রদেরই পশ্চিম তীরে আছে ইকুক-বলাস্ট রাজ্যের ওলখনস্কি জেলা। বাস করেন মাত্র ৯৪৪৬ জন মানুষ। জেলাটির প্রত্যন্ত একটি গ্রাম শাখাইঊর্ত। সেই গ্রাম থেকে উত্তর দিকে আরও আধঘণ্টার পথ পার হলে আসবে একটি ক্ষুদ্র জনবসতি। একটি অনুচ্চ টিলার ওপরে তিন চারটি কাঠের বাড়ি! সামনেই দিগন্তবিস্তৃত বৈকাল হ্রদ।

নিজের কাজ নিজেই করেন লুবভবাড়িগুলো থেকে ভেসে আসে গরু , কুকুর এবং মুরগির ডাক। ক্ষুদ্র এই জনপদে মাত্র একজন মানুষই থাকেন। ৮০ বছরের এক দুঃসাহসী নারী। নাম লুবভ মরেখোডোভা। প্রায় একশ বর্গ কিলোমিটার নির্জন এলাকায় একেবারে একা বাস করেন তিনি। কাছাকাছি গ্রামগুলোর মানুষজন ভালোবেসে তাকে ডাকেন বাবা লুবা বলে। মাথায় স্কার্ফ বাঁধা প্রৌঢ়াকে রাশিয়াতে বলা হয় বাবুস্কা। তাই সারা রাশিয়ায় লুবভ বিখ্যাত বাবুস্কা অফ বৈকাল  বলে। কারণ বৈকালের তীরে একাকী বাস করা এই নারীর মাথায় সব সময় বাঁধা থাকে নিজেরই বানানো স্কার্ফ। 

লেক বৈকালের তীরে থাকা পৈতৃক বাড়িতেই জন্মেছিলেন লুবভ। বাবা নিকোলাই ছিলেন ফরেস্ট অফিসার। ঘর ও সাত ছেলে - মেয়েকে সামলাতেন মা ফিওনা। তবে বেগ পেতে হত লুবভকে সামলাতে। এই দস্যিপনার জন্য অবশ্য লুবভকে একটু বেশি ভালোবাসতেন বাবা নিকোলাই। মেয়েকে নিয়ে জঙ্গলে প্রায়ই যেতেন বার্বিকিউ করতে। 

নিজের বানানো স্কেটিং জুতা পরে পুরো বৈকাল ঘুরে বেড়ান লুবভ গাছপালা, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ চেনাতেন। বালিকা লুবভকে বোঝাতেন, লেক বৈকাল কীভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে সারা রাশিয়াকে। এছাড়াও নিকোলাই মেয়েকে শিখিয়েছিলেন নানা শক্তপোক্ত কাজ। কাঠের বাড়ি মেরামতি, রঙ করা, কাঠ কাটা, বাগান করা, সবজি চাষ করা, গরু বাছুর সামলানো, নৌকা চালানো, ছিপ ও জাল ফেলে মাছ ধরা- সবই পারত লুবভ। লুবভ তার মায়ের কাছ থেকে সেলাইয়ের কাজও শিখেছিলেন।

শীতে যখন বরফে ঢেকে যেত লেক বৈকাল, বালিকা লুবভের আনন্দ তখন বেড়ে যেত দশগুণ। কাঠের তক্তায় দাঁড়িয়ে জমে যাওয়া বরফের ওপর হড়কে হড়কে এগিয়ে যেত বৈকালের গভীরে। বরফ জমা হ্রদের বুকে লুবভের স্কেটিং করার প্রবল ইচ্ছা দেখে, তার জন্য স্কেট বানিয়েছিলেন বাবা। বাড়িতে পড়ে থাকা একটি স্টিলের করাতকে দুখণ্ড করে , খণ্ডদুটির সঙ্গে কাঠ লাগিয়ে তৈরি হয়েছিল লুবভের স্কেট। 

পোষ্যদের সঙ্গেই সময় কাটান এই বৃদ্ধা সময়টা ছিল ১৯৪৩ সাল , তখন লুবভের বয়েস মাত্র সাত। জুতার নীচে চামড়ার দড়ি দিয়ে কেট বেঁধে, দুই হাত দুদিকে হাত পাখির ডানার মত মেলে উদ্দাম গতিতে বরফ জমা বৈকালের ভেতর হারিয়ে গিয়েছিলেন লুভব। মা ফিওনা ভয় পেতেন। কবের জানি বরফ ফেটে তলিয়ে যায় লুবভ! মেয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতেন বৈকালের তীরে। বাবা নিকোলাই হাসে অভয় দিতেন ফিওনাকে। বলতেন, তাদের পদবি মরেখোড়োভা। এর অর্থ হলো, যে মানুষ বরফ জমা সমুদ্রের ওপর হাঁটে।

পরবর্তী কালে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানোর জন্য তারা সবাই চলে আসে ইকুক্স শহরে।  লেক বৈকাল থেকে এর দূরত্ব ছিল ২৯৬ কিলোমিটার। লুবভ হয়েছিলেন মেকানিকেল ইঞ্জিনিয়ার। এরপর যোগ দেন ইকুক্স শহরের ভারী যন্ত্রপাতি তৈরির ফ্যাক্টরি কুইবাইশেভোতে। সেখানেই মনের মানুষ খুঁজে পান লুবভ। পরবর্তিতে বিয়ে এবং সংসার। কেটে যায় প্রায় ৪২ বছর। চাকরি থেকে অবসর নেন লুবভ। সন্তানেরা চাইছিলেন তাঁদের সঙ্গেই থাকুন বাবা - মা। লুবভের মন পড়ে আছে সেই হ্রদে। স্বামী সার্গেইকে নিয়ে গ্রীষ্মকালে চলে এসেছিলেন লেক বৈকালের তীরের পৈতৃক বাড়িতে। হাতে তুলে নিয়েছিলেন করাত, বাটালি , হাতুড়ি ও কুঠার নিজের হাতে বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন পরিত্যক্ত বাড়িটিকে। লুবভের হাতের স্পর্শে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল বাগান ও সবজি ক্ষেত।

শীতের বৈকালের বুক থেকে ভেসে আসা কনকনে হাওয়া লুবভকে মনে পড়িয়ে দিয়েছিল সেই ১৯৪৩ সাল । বাবার বানিয়ে দেয়া স্কেট দুটি বের করেছিলেন, দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়েছিলেন তার ভ্যালেঙ্কি বুটের নীচে। তারপর সেই ছোট্ট বেলার মত দু'দিকে হাত মেলে বরফ জমা বৈকালের বুকে প্রজাপতি হয়ে উড়ে গিয়েছিলেন লুভব। অপলকে তাকিয়েছিলেন স্বামী সাগেই।

জ্বালানির জন্য কাঠ কাটা এবং সংগ্রহ করে রাখেন নিজেই এভাবেই বৈকালের তীরে এক অসামান্য জীবন কাটাচ্ছিলেন দম্পতি। ২০১১ সব আনন্দই মাটি হয়ে যায় সার্গেই  মারা যাওয়ার পর। সন্তানরা লুবভকে বাড়ি ফেরার কথা বলেছিলেন। কানে নেন নি তিনি সেই কথা। সমাজ থেকে স্বেচ্ছা- নির্বাসন নিয়ে রয়ে যান বৈকালের তীরের পৈত্রিক বাড়িতেই। একেবারে একা। আজও সেখানেই আছেন আশি বছরের লুবভ। তবে সঙ্গীর সংখ্যা বেড়েছে। আজ তার সঙ্গে বাস করে দু'টি মোরগ , চারটি কুকুর, একটি বিড়াল, দুটি বাছুর, পাঁচটি গরু এবং দুটি ষাঁড়। 

গ্রীষ্মে বৈকাল হ্রদের বুকে নৌকা ভাসান লুবভ। মাছ ধরেন ছিপ দিয়ে , জাল ফেলে । জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে নিয়ে এসে মজুত করেন শীতকালের জন্য। গরুদের জন্য খড় কুচিয়ে ডাঁই করে রাখেন। কুকুর বিড়ালদের জন্য মাছ শুকিয়ে রাখেন। কারণ শীতকালে এই অঞ্চল ঢাকা পড়ে যায় পুরু বরফের তলায় । পশুদের খাবার পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে তখন । তাই আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রাখেন লুবভ। দিন যায় এভাবেই। 

লুবভের খাবারের তালিকায় আছে আলু , টমেটো , গাজর , শালগম ও বাঁধাকপি কুচিয়ে স্যুপ এবং রুটি। খেয়ে নিয়ে দুপুরে আবার চলে যান বৈকালের তীরে। জুতার নীচে বেঁধে নেন সেই স্কেট জোড়া। ছেলেমেয়েরা অত্যাধুনিক স্কেট দিলেও সেগুলি ছুঁয়েও দেখেননি লুবভ। কারণ এই স্কেটজোড়ার সঙ্গে মিশে আছে বাবা নিকোলাইয়ের স্মৃতি , স্নেহ । এই স্কেটদুটোতে ওঠা মানে যেন বাবার কোলে ওঠা। বরফের ওপর দিয়ে স্কেটিং করে লুবভ পৌঁছে যান পাহাড়গুলির নীচে । গ্রীষ্মকালে লুবভকে বৈকালের তীর দিয়ে পাহাড়ের কাছে পৌঁছতে হাঁটতে হয় তিন কিলোমিটার । শীতকালে সাহায্য করে লেক বৈকাল। কমিয়ে দেয় অর্ধেক দূরত্ব । লুবভকে দেখে ছুটে আসে গরু বাছুর ও ষাঁড়গুলো।

মাঝেমাঝে আধ ঘণ্টা স্কেট করে লুবত চলে যান পাশের গ্রামে । দোকান থেকে নিয়ে আসেন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র । গ্রীষ্মকালে লুবভের কাছে আসেন ছেলেমেয়ে , নাতিপুতিরা। তবে আসবার শর্ত একটাই , সবাইকে বাধ্যতামূলক ভাবে শিখতে হবে কাস্তে দিয়ে ঘাস কাটা, খড় কুচি করা, কাঠ কাটা, সবজি চাষ করা, নৌকা চালানো, জাল ফেলে মাছ ধরা। লুবভের কাছে এসে বসে থাকলে চলবে না। খেটে খেতে হবে। লুভবের কথা দু'বছর আগেও কেউ জানতেন না। দু'বছর আগে একদিন তার অফিসের বন্ধু আলেক্সি ভাসকভ গিয়েছিলেন লুবভের সঙ্গে দেখা করতে । তিনি লুবভের একটি ভিডিও আপলোড করেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। সারা বিশ্ব কয়েক ঘণ্টায় জেনে ফেলেছিল লুবভের কথা।

খ্যাতি চাননি তিনি, তাই মিডিয়ার কাছ থেকে দূরে থাকেন সবসময় একদিন পরেই লুবভকে স্টুডিওতে ডেকেছিল মস্কোর ফেডারেল টিভি চ্যানেল। লুবভ বলেছিলেন , “ আমি খ্যাতি চাই না । আমি আছি আমার কাজ নিয়ে , তোমরা তোমাদের কাজ নিয়ে থাকো না । আমার দম ফেলার সময় নেই , আর তোমরা আমাকে ৪৩৪২ কিলোমিটার দূরের মস্কোয় যেতে বলছ। আমি গেলে আমার পোষ্যদের দায়িত্ব কি তোমরা নেবে ? গজগজ করতে করতে চ্যানেলের দূতকে পত্রপাঠ বিদায় দিয়েছিলেন লুবভ।  

যে বয়সে চার দেয়ালের ভেতরে নিরাপত্তা খোঁজেন মানুষ। বাঁচার থেকেও বেশি করেন মৃত্যুর চিন্তা। সেই বয়সে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থেকে, ঘণ্টায় ষাট কিলোমিটার গতিতে বরফজমা বৈকালের বুকে প্রজাপতি হয়ে উড়ে বেড়ান আশি বছরের বাবুস্কা, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পৃথিবীর স্বাদ নেয়ার জন্য ।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে