৩৩ বছর ধরে রাস্তার নুড়ি কুড়িয়ে এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন এক পিয়ন

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

৩৩ বছর ধরে রাস্তার নুড়ি কুড়িয়ে এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন এক পিয়ন

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩৩ ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৫:৫৮ ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১

দ্য প্যালেস আইডিয়াল

দ্য প্যালেস আইডিয়াল

পৃথিবীতে যত মানুষ আছেন, তাদের রয়েছে তত শখ এবং ইচ্ছা। একেক জনের ইচ্ছা একেক রকম। তবে অনেকের শখ বা কাজ দেখলে রীতি মতো হতবাক হতে হয়। অনেকেরি মনের মতো করে একটি বাড়ি বানানোর ইচ্ছা থাকে। সারাজীবনের স্বপ্ন আর স্বাদ, সাধ্য এক করে তৈরি করেন নিজের আপন ভুবনটুকু। তবে অনেকেই আবার আছেন এই থাকার জায়গাকেই বানিয়েছেন তার স্মৃতিচিহ্ন।

ওই তাজমহলের কথাই ধরুন না। ভারতের তাজমহল হোক কিম্বা হালের বুর্জ আল-খলিফা, এদের মধ্যে কেউ বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্যের তালিকায় জায়গা পেয়েছে তো কেউবা আধুনিক প্রযুক্তির জ্বলন্ত নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবার বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতার ক্ষয়িষ্ণু স্থাপত্য‌ও দেখা যায়। যেমন তুরস্কে আছে গোবেকেলি তোপে।

ফার্দিনান্দ সেশেলতাজমহল তৈরি নিয়ে শোনা যায় প্রধান শিল্পী যিনি ছিলেন তার বুড়ো আঙুলটা কেটে নেয়া হয়েছিল। অবশ্য এটা কেবলমাত্র ভারতে‌ই ঘটেছিল তা নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তে এরকম অজস্র নিদর্শন আছে যাতে একই জিনিস বা সংশ্লিষ্ট স্থাপত্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার মতো আরেকটি নমুনা ভবিষ্যতে তৈরি করতে না পারেন সংশ্লিষ্ট শিল্পী। তাই শাসকেরা শিল্পী ও কারিগরদের হাত, আঙুল কেটে নিতেন। তবে বুর্জ আল-খলিফা হোক বা তাজমহল, তৈরির সঙ্গে অসংখ্য শ্রমিক ও কর্মচারীর ঘাম-রক্ত জড়িয়ে আছে।

ফার্দিনান্দ সেশেল ৩৩ বছর ধরে এই দুর্গ তৈরি করেছিলেন এই পৃথিবীতেই এমন একটি আশ্চর্য স্থাপত্য আছে যা কেবল মাত্র একজন মানুষ নিজের চেষ্টায় তৈরি করেছে! আশ্চর্যের ব্যাপার হল তিনিই এটির নকশা তৈরি করেন এবং তিনিই ছিলেন এই স্থাপত্য নির্মাণ কার্যের একমাত্র শ্রমিক। ‘দ্য প্যালেস আইডিয়াল’,একটি দুর্গ। উনিশ শতকের শেষ ভাগে এই দুর্গ বা প্রাসাদটি একা নিজের হাতে তৈরি করেন ফার্দিনান্দ সেশেল।

চিঠি বিলি করার সময় রাস্তা থেকে নুড়ি পাথর কুড়িয়ে আনতে ফার্দিনান্দবিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়, ফার্দিনান্দ সেশেল এই প্রাসাদটি তৈরি করার ক্ষেত্রে অন্য জায়গা থেকে পাথর বা ইঁট, কাঠ আনেননি। তিনি রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া পাথরের টুকরো জমা করে করে দ্য প্যালেস আইডিয়াল গড়ে তোলেন। সম্ভবত কুড়িয়ে পাওয়া নুড়ি পাথর ব্যবহার করে প্রাসাদ তৈরির নমুনা এর আগে বা পরে আর নেই। সে দিক থেকে দেখতে গেলেও দ্য প্যালেস আইডিয়াল উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী নিদর্শন হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে।

কিছু দিন আগে এক ভ্যান চালকের কথা জেনেছিলেন অনেকেই। ৪০ বছর ধরে রাস্তা থেকে ইট কুড়িয়ে তৈরি করেছেন বাড়ি। বাস্তবতা মেনে নিয়ে মনের স্বাদ মেটানোর ব্যবস্থা করেছেন বুদ্ধি করে। তেমনি ফার্দিনান্দ সেশেল পেশায় ছিলেন একজন ডাক হরকরা। তখনকার দিনে তিনি পায়ে হেঁটে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মানুষের কাছে দৈনন্দিন চিঠি বিলি করতেন। সেই চিঠি বিলির কাজ করতে করতেই এই ফরাসি ডাক হরকরার মাথায় প্রথম আসে নুড়ি পাথর জমিয়ে একক প্রচেষ্টায় প্রাসাদ তৈরীর কথা।

দুর্গের ভেতরেও রয়েছে মনোমুগ্ধকর কারুকাজ করা  ১৮৩৬ সালের ১৯ এপ্রিল দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের চার্মস স্যার ল’হারবাসে জন্ম হয় ফার্দিনান্দ সেশেলের। ৩১ বছর বয়সে ১৮৬৭ সালে ডাক হরকরা অর্থাৎ পিওনের চাকরি পান। পরের বছরেই তাকে একটি গ্রামে বদলি করে দেয়া হয়। হটেরাইভস থেকে টারসেন পর্যন্ত ১৮ মাইল পথ প্রতিদিন তাকে চিঠি বিলি করার জন্য হেঁটে অতিক্রম করতে হতো। এই পথে যেতে যেতেই তিনি একদিন এক বিশেষ আকারের ছোটো পাথরের টুকরো পড়ে থাকতে দেখেন।

সেই শুরু, বিশেষ আকৃতির পাথর দেখে তা সংগ্রহে রাখার ইচ্ছে তৈরি হয় ফার্দিনান্দ সেশেলের। এক সময় এই নেশা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় পাথর সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে চিঠি বিলের সময় সঙ্গে করে একটি ঠেলা গাড়ি নিয়ে যেতেন। ফেরার পথে সেই গাড়ি ভর্তি করে পাথর নিয়ে আসতেন নিজের বাড়িতে।

সংগৃহীত পাথর জমতে জমতে যখন বিশাল বড় একটি স্তুপ তৈরি করে সেই সময় তিনি দ্য প্যালেস আইডিয়াল বানানোর কাজে হাত দেন। দ্য প্যালেস আইডিয়াল বানানোর কাজ শেষ হতে সময় লাগে ৩৩ বছর। ১৯১২ সালে ফার্দিনান্দ সেশেল তার এই প্রাসাদ বানানোর কাজ সম্পূর্ণ করে ওঠেন। তখন তার বয়স ৭৬ বছর। প্রাসাদটির সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিল ২৬ মিটার।

ফার্দিনান্দ সেশেলের ইচ্ছে ছিল মৃত্যুর পর তাকে এই প্রাসাদেই সমাধিস্থ করা হোকঘটনা হল ফার্দিনান্দ সেশেলের স্থাপত্যকলা সম্বন্ধে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। এমনকি পরবর্তী পর্যায়ে তিনি এই নিয়ে কখনও পড়াশোনাও করেননি। স্বাভাবিকভাবেই গোটা প্রাসাদটি গড়ে উঠেছে তার আপন খেয়ালে। সেই জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থাপত্য রীতির প্রাধান্য এই প্রাসাদে দেখা যায় না। মুঘল, ইউরোপিয়ান, আরব স্থাপত্যরীতি মিলেমিশে বিরাজ করছে দ্য প্যালেস অফ আইডিয়ালে। এমনকি হিন্দু ধর্মের বেশ কিছু মন্দিরের আদল‌ দেখা গিয়েছে এখনে। এছাড়া সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ হল বিভিন্ন জানা ও অজানা পশু-পাখির মূর্তি খোদাই করা হয়েছে প্রাসাদটির চারিদিকে।

ফার্দিনান্দ সেশেলের ইচ্ছে ছিল মৃত্যুর পর তাকে এই প্রাসাদেই সমাধিস্থ করা হোক। কিন্তু ফরাসি সরকার এই বিষয়ে অনুমতি না দেয়ায় তিনি নিজের হাতে আর একটি অসামান্য স্থাপত্য নির্মাণ করে যান। ‘দ্য টম্ব অফ সাইলেন্স অ্যান্ড এন্ডলেস রেস্ট’ ছিল ফার্দিনান্দ সেশেলের নিজের হাতে নিজের জন্য বানানো সমাধি-সৌধ। এটিকে সমাধি মন্দির‌ও বলা যায়। স্থানীয় কবরস্থানে মৃত্যুর আগে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে এই সমাধি মন্দিরটি তিনি নির্মাণ করেন। ১৯২২ সালে সমাধি মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। এর ঠিক দু’বছর পর ১৯২৪ সালে মারা যান ফার্দিনান্দ সেশেল।

নিজেই নিজের সমাধি সৌধ তৈরি করেছিলেন ফার্দিনান্দদ্য প্যালেস আইডিয়াল এবং দ্য টম্ব অফ সাইলেন্স অ্যান্ড এন্ডলেস রেস্ট এই দুই স্থাপত্য দেখতে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ ফ্রান্স ভ্রমণে যান। এরকম উজ্জ্বল স্থাপত্য সৃষ্টি করে আজও পৃথিবীতে অনন্য হয়ে আছেন ফার্দিনান্দ সেশেল।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে