গুহার গায়ে লেখা মন্ত্র, পড়তে পারলেই ২০০০ বছরের পুরনো গুপ্তধনের সন্ধান

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৫ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

গুহার গায়ে লেখা মন্ত্র, পড়তে পারলেই ২০০০ বছরের পুরনো গুপ্তধনের সন্ধান

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:২৯ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৭:৫৩ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ছবি: গুপ্তধনের গুহা

ছবি: গুপ্তধনের গুহা

বিহারের রাজগিরে ভইভার পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত সোন ভাণ্ডার গুহা প্রাচীন ভারতের সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের দুর্দান্ত নিদর্শন। তবে গুহার গভীরে লুকিয়ে আছে এক আশ্চর্য রহস্য। মৌর্য বংশের রাজা বিম্বিসারের বিশ্রামের জায়গা ছিল পশ্চিম দিকের গুহাটি। ইতিহাস বলে যে নিজের ছেলের হাত থেকে তার বিপুল ধন-সম্পত্তি রক্ষা করতে এই গুহারই কোনো এক গোপন স্থানে তা লুকিয়ে রাখেন তিনি। 

প্রায় দুই হাজার বছর পরেও খুঁজে পাওয়া যায়নি সেই সোনাদানা। শুধু তাই নয়, মৌর্য রাজবংশের অন্যতম প্রধান দুই রাজা বিম্বিসার আর অজাতশত্রুর নামও জড়িয়ে আছে এই গুপ্তধনের গল্পের সঙ্গে। কীভাবে জনশ্রুতি বলে, একসময় রাজা বিম্বিসারের বিশ্রামের জায়গা ছিল এই 'সোন ভাণ্ডার'এর পশ্চিম দিকের গুহাটি। এই গুহাটির কোনো এক গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখেন বিপুল ধন - সম্পত্তি বিম্বিসার।

রাজা বিম্বিসারছেলের হাতে গৃহবন্দি অবস্থাতেই ৪৯১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বিম্বিসারের মৃত্যু হয়। তারপর বহু বছর ধরে অনেক খোঁড়াখুড়ি করেও খুঁজে পাওয়া যায়নি সেইসব মহামূল্য সোনাদানা। প্রত্নতত্ত্ববিদরা জানান, এই গুহা প্রাকৃতিক নয়, মানুষের হাতে তৈরি। সম্ভবত তৃতীয় বা চতুর্থ শতাব্দীতে খনন করা হয়েছিল এই গুহা। বৈভর পর্বতের পাদদেশে এ দুটো গুহা না কি তৈরি করেছিলেন ভৈরদেব নামে এক জৈন সন্ন্যাসী।  

তবে গুহাগুলোর সঙ্গে যে বৌদ্ধধর্মেরও বেশ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল সে কথারও প্রমাণ মিলেছে বিস্তর। পাহাড়ের গায়ে সেই গুহার দেয়ালে রয়েছে দরজার মতো একটি কাঠামো। আর তার পাশেই এক আশ্চর্য অজানা ভাষায় লেখা রয়েছে কিছু কথা। এই গুহাকেই স্থানীয়রা চেনেন বিম্বিসারের গুহা বলে। তারা বিশ্বাস করে, এই গুহার মধ্যেই লুকোনো আছে আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন সোনা, মণিমাণিক বোঝাই সিন্দুক, বিম্বিসারের লুকিয়ে রাখা গুপ্তধন।

আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন সোনা, মণিমাণিক বোঝাই সিন্দুকআর গুহার দেয়ালে দরজার পাশে অজানা ভাষায় লেখা সেই লিপি পড়তে পারলেই নাকি হাতের মুঠোয় চলে আসবে রাজা বিম্বিসারের সেই লুকোনো রত্নভাণ্ডার। সত্যিই কি নিজের ধনসম্পত্তি এমন জনমানবহীন গুহার ভিতরে লুকিয়ে রেখেছিলেন বিম্বিসার। সে নিয়েও রয়েছে নানা গল্প, নানা উপকথা। মৌর্য বংশের অন্যতম প্রধান রাজা ছিলেন বিম্বিসার। হৰ্যঙ্ক রাজবংশের মহারানি বিম্ব'র ছেলে জন্মালে মায়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে তার নাম রাখা হয় বিম্বিসার। 

মাত্র ১৫ বছর বয়সেই বাবা মহাপদুম তাকে মগধের রাজা হিসাবে অভিষিক্ত করেন। জানা যায় , বিম্বিসারের চেয়ে বয়সে প্রায় পাঁচ বছরের ছোট ছিলেন গৌতম বুদ্ধ৷ বোধিলাভের বেশ কিছু আগেই তরুণ গৌতমের সঙ্গে দেখা হয়েছিল বিম্বিসারের। রাজার ছেলে শুনে সিদ্ধার্থকে রাজবাড়িতেই থাকতে অনুরোধ করেন বিম্বিসার। তবে মধ্যরাতে উঠে সমাজ, সংসার ত্যাগ করে পথে নেমেছে এ মানুষ, রাজগৃহ তাকে আর টানবে কেন!

 এই গুহা প্রাকৃতিক নয়, মানুষের হাতে তৈরি
বিম্বিসারের ডাকে তখনকার মতো সাড়া না দিলেও, রাজাকে তিনি কথা দিয়ে গেছিলেন যে, সাধনায় সিদ্ধিলাভ হলে। তিনি আবার ফিরে আসবেন এই পথে। পুরোনো সেই প্রতিজ্ঞা ভোলেননি গৌতম বুদ্ধ। বোধিলাভের পর তিনি ফিরে এসেছিলেন মগধে, রাজা বিম্বিসারের সঙ্গে দেখা করতে। গৌতম বুদ্ধের খুব বড় ভক্ত ছিলেন মগধের রাজা বিম্বিসার। বোধিলাভের পর গৌতমের ভক্ত আর অনুগামীরা যাতে মগধে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারেন, যাতে তাদের কোনো অসুবিধা না হয়, সেই উদ্দেশ্যে রাজা বিম্বিসার তার 'বেণুবন' নামের উদ্যান তুলে দিয়েছিলেন গৌতম বুদ্ধের হাতে।  

বিনিময়ে চেয়ে নিয়েছিলেন বুদ্ধের আশীর্বাদ আর শিষ্যত্ব। ইতিহাস বলে, প্রথম জীবনে বাবা বিম্বিসারের ঠিক বিপরীত চরিত্রের মানুষ ছিলেন তার ছেলে অজাতশত্রু। তিনি একরকম দুচক্ষে দেখতে পারতেন না বৌদ্ধভিক্ষুদের। পৃথিবী থেকে মুছে দিতে চেয়েছিলেন তথাগত বুদ্ধের নাম। আর সেই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কত অসহায় নারীপুরুষকে যে তিনি বধ করেছিলেন, তার লেখাজোকা নেই। তবে অজাতশত্রুর পথে প্রধান অন্তরায় ছিল তার নিজেরই বাবা পরম বুদ্ধভক্ত রাজা বিম্বিসার।

যে লিপি পড়তে পারলে হাতের মুঠোয় চলে আসবে রত্নভাণ্ডারঅন্যদিকে, গৌতমবুদ্ধের অনুগামীদের মধ্যে ছিলেন দেবদত্ত নামের এক বৌদ্ধ ভিক্ষু। তথাগতের থেকে দীক্ষা নিয়ে নিজেকে বৌদ্ধধর্মের একজন কেউকেটা বড় ভিক্ষু প্রমাণ করাই ছিল দেবদত্তের মোক্ষ। আবার প্রায় একই সঙ্গে বেড়ে ওঠা সিদ্ধার্থ গৌতম যে তার থেকে এত এগিয়ে যাবে, এটাও ঠিক মেনে নিতে পারছিল না সে। ঈর্ষার আগুন তাকে ভিক্ষু বেশেও ভিক্ষু হতে দেয়নি। দেবদত্ত বুঝেছিল মগধের রাজসিংহাস দখল করতে পারলেই কেল্লা ফতে। 

রাজার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তখন সহজেই তথাগত বুদ্ধকে লাঞ্ছিত করা যাবে। সেই চেষ্টাতেই সে অজাতশত্রুর বন্ধু হয়ে ওঠে। দেবদত্ত জানত, গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে বিম্বিসারের সখ্যতা ভালো চোখে দেখত না তার ছেলে। এই সুযোগে দেবদত্ত অজাতশত্রুকে নানান কুমন্ত্রণা দিতে থাকে। তারই প্ররোচনায় বিম্বিসারকে হত্যা করে রাজত্ব লাভের চেষ্টা চালায় অজাতশত্রু। সব বুঝেও বুদ্ধের মতাদর্শে বিশ্বাসী বিম্বিসার ক্ষমা করে দেন ছেলেকে। ক্ষমা পেয়েও লজ্জা হয়না অজাতশত্রুর।

অজাতশত্রুবন্ধু দেবদত্তের সঙ্গে মিলে সে এবার বিম্বিসার ও তার কাছের মন্ত্রীদের গৃহবন্দি করে এবং নিজেকে মগধের শাসক হিসেবে ঘোষণা করে। অজাতশত্রুর মনোভাব না কি আগে থেকেই টের পেয়েছিলেন রাজা। ছেলেকে কিছু না বললেও ছেলের কুসঙ্গের হাত থেকে নিজের মহামূল্য ধনসম্পদ বাঁচানোর জন্য সেসব তিনি লুকিয়ে ফেলেছিলেন কোনো এক গোপন দুর্গম এলাকায়। আজীবন বহু তল্লাশ চালিইয়েও সে ধনসম্পত্তি খুঁজে পাননি অজাতশত্রু।  

মানুষের হাতে তৈরি একজোড়া কৃত্রিম গুহা, তার মধ্যেই না কি বছরের পর বছর ধরে আশ্চর্য কৌশলে লুকোনো আছে রাজা বিম্বিসারের গুপ্তধন। অনুসন্ধান কম হয়নি, কিন্তু সেই কুবেরের ঐশ্বর্যের খোঁজ পায়নি কেউ। ইংরেজ আমলেও অর্থের লোভে কম খোঁড়াখুঁড়ি হয়নি সোন ভাণ্ডারে। তবে হাজার চেষ্টা করেও খোঁজ পাওয়া যায়নি সেই রত্নভাণ্ডারের। লিপি উদ্ধার করতে না পেরে শেষে অস্ত্রের আঘাতেই পথ করে নিতে চেয়েছিল শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা।

গুহার সামনের দিক তবে কামান দেগেও না কি ভাঙা যায়নি গুহার সেই রহস্যময় দরজা। গুহার গায়ে রহস্যময় ভাষায় আজও লেখা আছে সেই গুপ্তধনের পথনির্দেশ। সে লিপির পাঠোদ্ধার হয়নি আজও। গুপ্তধন থাকলেও, তা কোথায় রয়েছে, সে প্রশ্ন আজও যেন চাপা পড়ে আছে আলো অন্ধকারে ঢাকা সেই রহস্যময় সোন ভাণ্ডার গুহায়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ