মমির দুর্গন্ধ রোধে ব্যবহার দারুচিনি, রান্নার উপকরণ হলো যেভাবে

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

মমির দুর্গন্ধ রোধে ব্যবহার দারুচিনি, রান্নার উপকরণ হলো যেভাবে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৪৫ ২ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৪:৫৭ ২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

মমি তৈরিতে ব্যবহার হতো দারুচিনি

মমি তৈরিতে ব্যবহার হতো দারুচিনি

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাঙালি রান্নায় মশলার ব্যবহার অনেক বেশি। চা থেকে মাংস, বিরিয়ানি থেকে ডাল সবেতেই মশলার ব্যবহার। এলাচ, দারুচিনি, তেজপাতা, জিরা, ধনিয়া আরো কত কি! হাজার হাজার বছর আগে থেকেই এসব মশলা রান্নায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মোঘলরা বাংলায় এনেছিল এতোসব মশলা। শিখিয়েছিল বিরিয়ানিসহ নানা রকম মোঘলাই খাবার। যা আজো বাঙালির খাবারের তালিকায় জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। 

ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন মিশরে ৩৫০ গ্রাম দারুচিনির মূল্য ছিল পাঁচ কেজি রূপার দামের সমান। দারুচিনির বহুমূল্য অবস্থান থেকে আজকের আটপৌরে জীবনযাত্রা অবাক করার মতোই। তবে এসব মশলার রান্নায় আসলো কীভাবে জানেন কি? দারুচিনি প্রাচীন মিশরীয়রা ব্যবহার করত মমি তৈরির সময়। মৃতদেহের দুর্গন্ধ দূর করতেই একটি বিশেষ গাছের ছাল ব্যবহার করা হত। তাছাড়া সুগন্ধি হিসেবেও এর ব্যাপক প্রচলন ছিল। দারুচিনি থেকে তৈরি সুগন্ধি দ্রব্য প্রাচীন গ্রিক ও রোমানরা তাদের পূজা-অর্চনায় ব্যবহার করত। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এই দারুচিনির মূল্য এতই বেশি ছিল যে, সাধারণ জনগণ এটি ব্যবহার করা তো দূরে থাক ব্যবহারের কল্পনাও করতে পারত না।  

দারুচিনির বর্তমান আটপৌরে অবস্থায় আসতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে দারুচিনির এই আকাশছোঁয়া দামের জন্য অবশ্য ঐতিহাসিকেরা মূলত দায়ী করেন এর দুর্লভতাকে। মনস্তাত্ত্বিক কারণও কিছুটা আছে। দারুচিনির খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার থাকলেও সবকিছুকে ছাপিয়ে যে বিষয়টি লক্ষণীয় হয়ে ওঠে, সেটি হলো সেসময়ে দারুচিনির সামাজিক অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা। একটা সময় এমন ছিল, যখন দারুচিনির জন্য মানুষ মানুষকে খুনও করতো। দারুচিনির জন্য নানারকম ঝামেলা এবং দলাদলি লেগেই থাকত। এমনকি যার কাছে যত বেশি দারুচিনির মজুদ থাকত, তার সামাজিক গুরুত্ব তত বেশি ধরা হতো। আভিজাত্যের প্রতীক হওয়ায় উচ্চবিত্তদের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও দারুচিনি ব্যবহারের ইচ্ছা পোষণ করত।

দারুচিনির উৎস বা উৎপাদনস্থল নিয়ে রয়েছে লুকোছাপা। এর কারণ সেসময় ছিল অন্য দেশ যাতে জানতে না পারে। তবে এই নিয়ে রয়েছে নানান মুখরোচক কাহিনী। আজ থেকে হাজার বছর পূর্বে এই গল্পগুলো চালু করেছিল বুনেই আরবরা। এতে তাদের লাভই হয়েছিল। দীর্ঘদিন  ইউরোপীয়দেরকে দারুচিনির উৎস থেকে বিরত রাখতে পেরেছিল তারা। তবে প্রথম শতাব্দীর রোমান দার্শনিক প্লিনি দ্য এল্ডার প্রস্তাব করেছিলেন যে দারুচিনি ইথিওপিয়া থেকে এসেছিল।

দারুচিনি শুধু শ্রীলংকায় চাষ হতো  আরবদের প্রচলিত গল্প ছিল অনেকটা এমন, যে দূর পাহাড়ের উঁচু শৃঙ্গে বিশাল ডানাওয়ালা পাখি বাস করত। আর সেই পাখি দারুচিনি সংগ্রহ করে সেগুলো দিয়ে তার বাসা তৈরি করত। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে এত উঁচুতে চড়ে সে পাখির অলক্ষ্যে দারুচিনি নিয়ে আসা সম্ভব হতো না। এজন্য দারুচিনির সংগ্রহকারীরা ষাঁড়ের মাংসকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করত। তারা ষাঁড়ের মাংসের টুকরো সেই পাহাড়ের উপর রেখে গোপনে অপেক্ষা করত। আর যখনই পাখিটি মাংসের টুকরো তার বাসায় নিয়ে রাখত, ঠিক তখনই কিছু পরিমাণ দারুচিনি পাখির বাসা থেকে নিচে পড়ে যেত। কারণ মাংসের টুকরোগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই বড় করে কাটা হতো, যাতে পাখি তার বাসায় মাংস রাখবে, তখন মাংসের ভারে বাসাটির কিছু অংশ খুলে নিচে পড়ে যাবে। এই কাহিনী অবশ্য পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর গ্রীক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসের লেখনীতে। 

দূরের কোনো অজানা গহীন জঙ্গলে দারুচিনির বাগান আছে, কিন্তু বিশাল দৈত্যাকার কিছু সাপ সর্বক্ষণ সে বাগান পাহারা দিচ্ছে। তাই তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দারুচিনি সংগ্রহ করা ছিল এককথায় অসম্ভব ব্যাপার। ইতিহাস ঘাঁটলে এরকম নানান ধরনের কাহিনী পাওয়া যাবে। যেগুলো সবই ছিল অবাস্তব এবং বিভ্রান্তিকর। 

গোপন পথে আরবরা দারুচিনি বাণিজ্য করত ষোড়শ শতাব্দীতে বাণিজ্যের জন্য তারা বিভিন্ন জটিল পথ ব্যবহার করত। যেন কেউ তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা দেখে উৎস অনুমান করতে না পারে। শ্রীলংকা আগে 'সিলন' বা 'সিংহলি' নামে পরিচিত ছিল। আরব বণিকরা সেখান থেকে দারুচিনি সংগ্রহ করত এবং মধ্যপ্রাচ্য হয়ে সংগৃহীত দারুচিনি মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে নিয়ে যেত। আলেকজান্দ্রিয়া থেকে ভেনিসীয়রা এ দারুচিনি সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে দিত। দারুচিনির বিভিন্ন ব্যবহার যেমন, শীতকালে মাংস সংরক্ষণ, সুগন্ধি হিসেবে এর ব্যবহার এবং নানা রকম ঔষধি গুণাবলির কারণে এটি খুব দ্রুতই ইউরোপীয়দের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

দারুচিনি ছিল তখন অমূল্য এক সম্পদ। সমাজের অভিজাত ব্যক্তিরাই শুধু এটি ক্রয় এবং মজুদ রাখতে পারত। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের ফলে উচ্চবিত্তদের পাশাপাশি মধ্যবিত্তদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দারুচিনির চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। দিনে দিনে এর পর্যাপ্ত যোগান দেয়া কষ্টসাধ্য হয়ে উঠছিল। দারুচিনির মূল্য নিয়ে রোমান সম্রাট নিরোর একটি গল্প প্রচলিত আছে। নিরো যখন তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সাবিনার পেটে আকস্মিকভাবে লাথি দেন, তিনি তখন মারা যান। একসময় সম্রাট তার ভুল বুঝতে পারেন এবং অনুশোচনায় তিনি তার এক বছরের সকল দারুচিনির মজুদ পুড়িয়ে ফেলেন।

দারুচিনি চাষীদের দুর্দশার শেষ ছিল না আরব ঐতিহাসিকদের থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালে ঠাণ্ডা-কাশি সহ গলার জ্বালাপোড়া নিরাময়ের কাজে দারুচিনির ব্যবহার ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ। ইউরোপীয়রা এর উৎস খুঁজে পাবার জন্য অত্যন্ত উৎসুক ছিল। তেরো-চৌদ্দ শতকে বহু ইউরোপীয় নাবিক বিভিন্ন দিকে যাত্রা শুরু করেন দারুচিনির উৎস খোঁজ করার জন্য। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন কলম্বাস। একপর্যায়ে ১৫১৮ সালে কলম্বাস দারুচিনির উৎস পেয়েছেন বলে দাবি করেন এবং বেশকিছু নমুনা ইউরোপে পাঠান। তবে দুর্ভাগ্যবশত কলম্বাসের পাঠানো বস্তুগুলো দারুচিনি ছিল না।

এরপরে আরেক পর্তুগীজ নাবিক সিলন এর খোঁজ পান এবং ১৫১৭ সালে শ্রীলঙ্কায় ব্যবসা-বাণিজ্যের গোড়াপত্তন করেন। এরপরের একশ বছর তারা সেখানে দারুচিনি ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার করে ছিল। এভাবে পর্তুগিজরাই প্রথম আরবদের দারুচিনি ব্যবসার একচ্ছত্র আধিপত্য থেকে বিতাড়িত করে। পর্তুগিজরা প্রথমে শ্রীলংকার রাজাদের সঙ্গে চুক্তি করে এবং তারা শ্রীলংকার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্য করার অনুমতি লাভ করে। 

ইংরেজরা ভারতে নিয়ে এসেছিল এই মশলা ধীরে ধীরে তারা শ্রীলংকার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে থাকে। সেইসঙ্গে তারা শ্রীলঙ্কায় দুর্গ তৈরি করার মাধ্যমে তাদের সংখ্যা ও শক্তি বাড়াতে থাকে। এর ফলে তারা স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রীলংকার রাজাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তারা তাদের উপর চাপও প্রয়োগ করে। শ্রীলংকার সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে দারুচিনি চাষিরা পর্তুগীজদের দ্বারা নানাভাবে নির্যাতিত ও শোষিত হতে থাকে। একপর্যায়ে তাদের নির্যাতনের সীমা চরম আকারে পৌঁছায়।

শ্রীলংকা ছাড়া দারুচিনি যেন অন্য কোথাও চাষ না করা যায়। সেজন্য পর্তুগিজরা সর্বদা সতর্ক থাকত। জাহাজে দারুচিনি তোলার সময় কেউ যেন চুরি করে কোনো দারুচিনি গাছের চারা বা বীজ নিতে না পারে, সেজন্য তারা জাহাজের সর্বত্র লবণ ছিটিয়ে দিত। কারণ কেউ যদি চুরি করতে সমর্থ হয়ও, তবে তারা দারুচিনি গাছের চারা বা বীজ ঠিক অবস্থায় নিতে পারবে না। শ্রীলংকার জনগণ শত বছরের নিপীড়ন থেকে অবশেষে মুক্তি লাভ করে ওলন্দাজদের হাত ধরে। তারা ছিল পর্তুগীজদের প্রতিদ্বন্দ্বী, আর এ কারণেই তারা শ্রীলংকার রাজাদের সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রাচীন মিশরের নারীরা দারুচিনির সুগন্ধ ব্যবহার করতেন ১৬৩৮ সালে শ্রীলংকার রাজারা ডাচদের সহায়তায় পর্তুগীজদের শ্রীলঙ্কা থেকে বিতাড়িত করে। তবে এরূপ অভূতপূর্ব সামরিক সাফল্য লাভের ফলে ডাচরা শ্রীলঙ্কায় থেকে যায়। এরপর শ্রীলংকায় ব্যবসা প্রসারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শ্রীলংকায় ব্যবসা-বাণিজ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং রাজাদের সঙ্গে চুক্তি করে দারুচিনি রফতানি করতে থাকে।  
 
অন্যদিকে ইউরোপীয়দের কাছে দারুচিনির চাহিদা প্রতিদিন ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকায় ডাচরা পর্যাপ্ত পরিমাণ দারুচিনি সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে থাকে। তাই তারা সাধারণ দারুচিনি চাষিদের উপর নানারকম চাপ দিতে থাকে উৎপাদন বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে। ফলস্বরূপ শ্রীলংকার সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরো বাড়তে থাকে।

অবশেষে ব্রিটিশরা দারুচিনি ব্যবসার প্রতি মনোনিবেশ করলে ডাচদের একচ্ছত্র আধিপত্যও বাধাপ্রাপ্ত হয়। ১৮০০ সালের পর থেকে দারুচিনি দুর্লভ এবং দামি পণ্যের তালিকায় আর ছিল না। বিশ্বের আরো অনেক দেশে চাষ হচ্ছিল এই মশলাটি। এজন্য ইংরেজরা ভারতের দক্ষিণের রাজ্য কেরালাতে দারুচিনি চাষ শুরু করেছিল। অন্যান্য জায়গায়ও দারুচিনির চাষ চলতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে এর সরবরাহ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। দারুচিনির আকাশচুম্বী দামও অবশেষে কমতে থাকে এবং বাজারে দারুচিনির আরো নানারকম প্রতিদ্বন্দ্বী আবির্ভূত হয়। আর এভাবেই দারুচিনি তার আভিজাত্য হারাতে থাকলে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা ক্রমশ দারুচিনি থেকে তাদের মনোযোগ অন্যান্য পণ্যের উপর স্থানান্তর করে। 

দারুচিনি চাষীদের নানান দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে  ইউরোপীয় ব্যবসায়ী ও শাসকদের নির্যাতনের ফলে শ্রীলংকার সাধারণ মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, আবার তেমনি শ্রীলংকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হয়েছিল এবং এর ফলে বিশ্ব দরবারে শ্রীলংকা সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এছাড়া ইউরোপীয় শাসক ও ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার স্বার্থে শ্রীলংকার বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করে, এতে শ্রীলংকার অর্থনীতি ক্রমশ উন্নতি লাভ করতে থাকে। 

শ্রীলংকার দারুচিনি কিন্তু আমাদের ব্যবহারের দারুচিনি নয়। কেননা শ্রীলংকার উৎপাদিত দারুচিনি তুলনামূলকভাবে বেশি মিষ্টি এবং সুগন্ধিযুক্ত। আমাদের নিত্য ব্যবহার্য দারুচিনি মশলা তুলনামূলক সহজলভ্য ও সস্তা। কালের বিবর্তনে একসময় আভিজাত্যের প্রতীক দারুচিনি তার পুরনো জৌলুস হারিয়ে গ্রিক-রোমানদের পূজার ঘর থেকে আমাদের রান্নাঘরে স্থান করে নিয়েছে। 

 সূত্র: হিস্টোরিডটকম  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে