যে দ্বীপে গেলে মানুষ মৃত্যুকে ভুলে যায়, আর দীর্ঘ জীবন লাভ করে 

ঢাকা, শনিবার   ১৯ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৭ ১৪২৮,   ০৭ জ্বিলকদ ১৪৪২

যে দ্বীপে গেলে মানুষ মৃত্যুকে ভুলে যায়, আর দীর্ঘ জীবন লাভ করে 

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১০ ৩০ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৭:২৪ ৩০ জানুয়ারি ২০২১

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই কোনো না কোনো অসুখে নাজেহাল হচ্ছেন মানুষ। কিছু অসুখ আবার সারা বিশ্বেই সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু অসুখ আবার সম্প্রতি মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। 

এত রোগব্যাধির মধ্যে একটি দ্বীপের মানুষ অমরত্বের স্বাদ নিয়ে বাস করছে পৃথিবীতে। কারণ সেখানকার মানুষের গড় আয়ু ১০০ বছর। আর রোগ-ব্যাধি বলতে তাদের কিছু নেই। গ্রিসের একটি ছোট দ্বীপ ইকারিয়া। ২৫৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। সেখানে যেন মানুষের জীবনে এমন কিছু একটা ঘটেছে, যার ফলে মৃত্যুকে ভুলতে বসেছেন তারা বা অন্য ভাবে বললে বিষয়টা এমন, অমরত্বের রহস্য জেনে ফেলেছেন।

ইকারিয়া দ্বীপ আশ্চর্যের বিষয় এই দ্বীপের মানুষ দীর্ঘজীবি। আর তার কারণ হলো এই দ্বীপের পরিবেশ আর আবহাওয়া। স্তামাতিস মোরাইতিস নামে এক লোক ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে ইকারিয়া দ্বীপে এসে দীর্ঘদিন বেঁচেছিলেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, তিনি কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। 

অদ্ভুত এই দ্বীপের মানুষের স্বাভাবিক গড় আয়ু ১০০ বছর। তার চেয়েও অবাক করার মতো বিষয় হলো এই দ্বীপের বৃদ্ধদের সঙ্গে মিল নেই সারা বিশ্বের বাকি বৃদ্ধদের। কারণ এই দ্বীপের বাসিন্দারা ১০০ বছর বয়সেও লাঠিতে ভর দিয়ে চলেন না। এমনকি পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত গির্জার সিঁড়িও অনায়াসেই একাই ভেঙে উঠে যান তারা। 

স্তামাতিস মোরাইতিসর স্ত্রী বিনা চিকিৎসায় ক্যান্সারের মতো মারণ রোগের রোগীও এখানে সুস্থ হয়ে যান। ঠিক যে ঘটনা আমরা দেখেছি ইকারিয়ার বাসিন্দা স্তামাতিস মোরাইতিসের ক্ষেত্রে। জানা যায়, যে স্তামাতিস মোরাইতিস ১৯৫১ সালে ইকারিয়া ছেড়ে চলে যান। সেখানে আমেরিকার ফ্লোরিডা শহরে নিজের স্ত্রী এবং সন্তানদের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। 

এরপর ১৯৭৬ সালে স্তামাতিস হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রবল শ্বাসকষ্ট। আর এই শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হন হাসপাতালে। যেখানে চিকিৎসকরা তাকে জানান যে তিনি ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। এমনকি ডাক্তাররা এটাও জানিয়ে দেন তিনি আর মাত্র নয় মাস বেঁচে থাকবেন।

স্তামাতিস মোরাইতিস শাক তুলছেন তখন স্তামাতিসের বয়স ছিল ৬০ বছর। তিনি জীবেনর শেষ সময় ইকারিয়ায় ছেলেবেলার বন্ধুদের সঙ্গে কাটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন। স্ত্রীর সঙ্গে ইকারিয়ায় ফিরে আসেন। আর এরপরই জীবনের মোড় ঘুরে যায় তার। মাসখানেকের মধ্যে দেখা যায় তার শরীরের পরিবর্তন। ধীরে ধীরে আগের চেয়ে অনেকটাই সুস্থবোধ করতে শুরু করেন তিনি। 

আস্তে আস্তে একা একাই হাঁটাচলাও শুরু করেন স্তামাতিস। এমনকি চাষ করাও শুরু করে দেন নিজের জমিতে। যার মাত্র নয় মাস বাঁচার কথা সেই তিনিই বেঁচেছিলেন ৯০ বছর পর্যন্ত। শুধু স্তামাতিসই নন, তার মতো উদাহরণের সংখ্যা এই দ্বীপে অসংখ্য। এখনো এই দ্বীপের বাসিন্দারা ঘড়ির ওপর নির্ভরশীল নন। এখানকার ব্যবসায়ীরা দোকান খোলেন নিজেদের ইচ্ছে মতো।

স্তামাতিস মোরাইতিসএমনকি এখানকার কারো বাড়িতে লাঞ্চে আমন্ত্রিত অতিথিরা সেই বাড়িতে চলে আসেন যেকোনো সময়, তা সকাল ১০টা হোক বা সন্ধ্যে ৬টা। এই দ্বীপের বাসিন্দারা সকলেই চলেন নিজের খেয়ালখুশি মতো। যা নিয়ে কারো কোনো সমস্যাই হয় না। এমনকি কেউ মাথা ঘামান না টাকা পয়সা নিয়েও। ফলে এখানকার বাসিন্দারা সকলেই থাকেন চিন্তামুক্ত। 

একটি সূত্র থেকে জানা যায়, যে এখানকার বাসিন্দাদের খাদ্যভাসের মধ্যে রয়েছে বেশি পরিমাণে শাক-সবজি এবং ফল-মূল। তাদের খাদ্যাভাসে নেই ফাস্টফুডের জায়গা। এমনকি তাদের খাদ্যের তালিকায় মাছ-মাংসের পরিমাণও কম। এই দ্বীপের বাসিন্দাদের মূল পেশা হল মৎসপালন, কৃষিকাজ ও পশুপালন।

ইকারিয়া দ্বীপের দোকান এখানকার ভূ-প্রকৃতি পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় আলাদা করে শরীরচর্চা করতে হয় না তাদের। এখানকার তৈরি স্থানীয় মদ খান তারা। তবে তাও পরিমিত পরিমানে। দু’গ্লাসের বেশি নয়। রাতে ঘুমনোর আগে এখানকার মানুষ খান এক ধরণের হার্বাল চা। যার ফলে তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমোনও। 

ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক এক্সপ্লোরার এবং জনপ্রিয় লেখন ড্যান বিউটনার ২০০০ সাল নাগাদ এই দ্বীপটিকে নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন। যার নাম ‘দ্য ব্লু জোন্স সলিউশন’। এই বইটিতে রয়েছে কেনও এই দ্বীপের বাসিন্দারা শতায়ু হন? কেনইবা এখানকার বাসিন্দারা অসুখে ভোগেন কম? 

 ইকারিয়া দ্বীপের বাসিন্দাদের খাবার বিশ্বে ভয়ানক হারে বাড়তে থাকা ক্যান্সার এবং হৃদরোগ এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে দেখাই যায় না, কীভাবে সম্ভব তা ইত্যাদি নানা প্রশ্নের উত্তরও। এই দ্বীপ নিয়ে এর আগেও বহু গবেষণাও হয়েছে। সব মিলিয়ে এই দ্বীপ বিশ্বের কাছে এক অত্যাশ্চর্য দ্বীপ হিসেবেই থেকে গিয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ