মিশরের ফারাওদের কফিন পাথরের হত যে কারণে

ঢাকা, বুধবার   ০৪ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ২০ ১৪২৮,   ২৪ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

মিশরের ফারাওদের কফিন পাথরের হত যে কারণে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:০৭ ২৮ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৭:১২ ২৮ জানুয়ারি ২০২১

ফারাওদের কফিন তৈরি করা হত পাথর দিয়ে

ফারাওদের কফিন তৈরি করা হত পাথর দিয়ে

মিশরের নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে হলুদ বালির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা পিরামিড আর মমি রহস্য। প্রাচীন মিশরের ইতিহাসকে অনেকটাই সমৃদ্ধ করেছে তাদের মমি। বিশেষ উপায়ে সংরক্ষিত মৃতদেহগুলো মমি নামে পরিচিত। মিশরের পিরামিড এবং এর আশেপাশে অসংখ্য মমি করা মৃতদেহ পাওয়া যায়। এগুলো বেশিরভাগই ছিল মিশরের ফারাও অর্থাৎ রাজা, রানি, তাদের বংশের লোকেদের।

জানা যায়, সেসময় রাজবংশ এবং উচ্চবংশীয় ছাড়া কারো মৃতদেহ মমি করার অনুমতি ছিল না। এতে করে তাদের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন হত। আর এটি বেশ ব্যয়বহুলও ছিল বটে। যা মিশরের সাধারণ জনগণের পক্ষে বহন করাও সম্ভব ছিল না। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় ফারাওদের জীবনযাত্রা ছিল বেশ রহস্যময়। তারা বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ছিল।

ফেরাউনের মমি তাদেরকে খুশি রাখার দায়িত্ব ছিল সমাজের নিম্ন শ্রেণির মানুষের। তিন বেলার খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেত তারা। সেখানে প্রিয়জনের মৃতদেহ মমি করার সুযোগই ছিল না। এর আগের পর্বগুলোতে মিশরীয় সভ্যতা, তাদের জীবন-যাপনের বৈচিত্র্যসহ তুলে ধরা হয়েছে পিরামিড তৈরির গোপন রহস্য। আজ থাকছে মমি তৈরির আদ্যোপান্ত- 

আরো পড়ুন: গোমূত্র দিয়ে গোসল, বাঁট থেকে দুধ পান করাই এই জাতির রীতি

প্রাচীন মিশরের ফারাওরা মৃতদেহ সংরক্ষণ করতে পাথরের কফিন বানাতো। পাথরের তৈরি এই কফিনকে বলা হতো সারকোফাগাস। ফারাওদের ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল মৃত্যুর পর তাদের আত্মা বেঁচে থাকার জন্য শরীরের প্রয়োজন। তাই মৃত্যুর পরও যেন তাদের দেহ অক্ষত থাকে, সে জন্য তারা পাথরের কফিনে মৃতদেহকে সংরক্ষণ করতো।

৭০ দিন সময় লাগত একটি মৃতদেহ মমি করতে তাদের ধারণা ছিল, দেহকে সংরক্ষণ করে রাখাই হচ্ছে, পরবর্তী জীবনে যাবার একমাত্র পথ। সারকোফাগাসকে মিশরীয়রা বলতো জীবনের প্রভু। সারকোফাগাস থাকতো ভাস্কর্য কিংবা শিলালিপি দিয়ে সজ্জিত। প্রাচীন মিশর, রোম ও গ্রিক সভ্যতায় এর চল ছিল। মিশরীয় সাম্রাজ্যের তৃতীয় রাজবংশ থেকে সারকোফাগাসে মৃতদেহ সংরক্ষণ করে রাখা শুরু হয়।

খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮৬ থেকে ২৬১৩ সালের মধ্যে শুরু হয় পাথরের কফিন। সারকোফাগাস গ্রিক শব্দ। শব্দটির বহুবচন সারকোফাগি বা সারকোফাগাসেস। সারক্স ও ফাগেইন শব্দ দুটি মিলে তৈরি হয় সারকোফাগাস। সারক্স অর্থ মাংস ও ফাগেইন অর্থ খাওয়া। সারকোফাগাস মানে মাংস খাওয়ার পাথর। এই পাথরে দেয়া হতো বিশেষ এক ধরনের রাসায়নিক। সেটি মৃতদেহের মাংস দ্রুত ক্ষয় করে ফেলতো।

মৃতদেহ যেন পচে-গলে নষ্ট না হয়ে যায় এজন্য মমি করা হয়। এই তথ্য প্রায় সবারই জানা। সহজ ভাষায় বলতে গেলে মমি হচ্ছে অপচনশীল মৃতদেহ। মমি শব্দটি মধ্য যুগের লাতিন শব্দ মুমিইয়া থেকে এসেছে। যা আরবি শব্দ মুমিয়া এবং পারস্য ফার্সি ভাষা মোম  থেকে এসেছে। যার অর্থ হলো বিটুমিন। 

সোনা দিয়ে তৈরি মিশরীয়দের কফিন তাদের সময় থেকেই শুরু হয়েছে মৃতদেহ কবর না দিয়ে মমি করে রাখার ব্যবস্থা। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৃতদেহ মমি করার প্রচলন ছিল। ইনকা, অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসী, প্রাচীন ইউরোপিয়ান সভ্যতায়ও মমি করার প্রচলন ছিল। তারা মৃতদেহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে হাজারো বছর ধরে মমি করত। 

আরো পড়ুন: প্রাচীন মিশরে অপরাধের বিচার করত মূর্তি, তার সিন্ধান্তেই মৃত্যুদণ্ড

মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পরও জীবনের অস্তিত্ব থাকে। আর সেজন্য তারা মৃত্যুর পর তাদের আত্মীয়-স্বজনের দেহকে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে কবরস্থ করত না। তার বদলে পিরামিডে মমি করে সংরক্ষণ করা হত মৃতদেহকে। পিরামিডগুলো সাধারণত গড়ে উঠেছিল তৎকালীন ফারাওদের সমাধি সৌধ হিসেবে। তবে মমির কফিনেও কিছু আভিজাত্যের চিহ্ন। কাঠ, লোহা এবং পাথর তিন ধরনের কফিন পাওয়া গেছে এখন পর্যন্ত। এগুলোও ছিল সমাজের শ্রেণি হিসেবে আলাদা। ফারাওদের বেশিরভাগ মমিই আবিষ্কৃত হয়েছে পাথরের কফিনে। 

মমি তৈরির পদ্ধতি

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে প্রাচীন মিশরীয়রা মমি তৈরির একটি নির্দিষ্ট নিয়ম বের করেন। কয়েকটি ধাপে এই মমি বানানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হতো। প্রথমে মৃতব্যক্তির নাকের মাঝে ছিদ্র করে মাথার ঘিলু ও মগজ বের করা হতো। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় লোহা জাতীয় জিনিস। তারপর মৃতদেহের পেটের বাম পাশে কেটে ভেতরের নাড়ি-ভুড়ি বের করে ফেলা হত। 

মমি করার পুরো প্রক্রিয়া ছিল বেশ দীর্ঘ এরপর শরীরের বিভিন্ন পচনশীল অঙ্গ যেমন- পাকস্থলী, মস্তিষ্ক, ফুসফুস, যকৃত ইত্যাদি বের করে ফেলত। পরবর্তীতে কেটে নেয়া দেহের অংশগুলোকে চারটি বিশেষ পাত্রে রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে ডুবিয়ে রাখত। এরপর মৃতদেহ ও বের করা অঙ্গগুলোতে লবণ মাখিয়ে শুকানো হতো। যখন সব ভালোভাবে শুকিয়ে যেত, তখন গামলা গাইন গাছের পদার্থ বা আঠা ও বিভিন্ন প্রকার মশলা মৃতদেহের গায়ে ঘষে-মেজে ভালো করে লেপে রেখে দেয়া হত।

আরো পড়ুন: ১৮০ ডিগ্রি মাথা ঘুরিয়ে চা পান, জন্মত্রুটিই এনে দিয়েছে তাকে জনপ্রিয়তা

এরপর সেগুলোকে আবার মৃতদেহে প্রতিস্থাপন করা হত। এসব অঙ্গ ঢুকিয়ে দেয়ার পর আবার পেট সেলাই করা লাগত। সেলাই করার সময় যাতে সামান্য বাতাসও শরীরে না ঢুকে তা নিশ্চিত করা হত। ৪০ দিন পর লিনেন কাপড়ের চওড়া ফিতা পেঁচিয়ে মৃতদেহটিকে বেশ পুরু করে ফেলা হত। লিনেন কাপড় যেহেতু বায়ু নিরোধক তাই সহজে বাতাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে না।

বিড়ালের মমি কাপড় জড়ানোর পর একটি ঢাকনাযুক্ত কাঠের বাক্সে লিনেন কাপড়ে ঢেকে আপাদমস্তক মমিটিকে রাখা হত। এরপর শুরু হত মৃতদেহটিকে সমাহিত করার কাজ। মমি তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সময় লাগত কমপক্ষে ৭০ দিন। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে এর থেকেও বেশি দিন লাগত। শুনতে যতটা সহজ মনে হচ্ছে মমি করাটা কিন্তু এতোটা সহজ ছিল না। আর যে কেউ চাইলেই মমি করতে পারত না। মমি করার জন্য তখন দক্ষ লোক ছিলেন। তবে মিশরীয়রা যে শুধু রাজা-বাদশাদের মৃতদেহ মমি করে রাখত, তা কিন্তু নয়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে