উচ্চ দৈর্ঘ্যের পুরুষ খুঁজে বেড়ানোই ছিল রাজার নেশা

ঢাকা, বুধবার   ০৩ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ১৮ ১৪২৭,   ১৮ রজব ১৪৪২

উচ্চ দৈর্ঘ্যের পুরুষ খুঁজে বেড়ানোই ছিল রাজার নেশা

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:১১ ১৯ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১১:১৫ ১৯ জানুয়ারি ২০২১

প্রশিয়ার রাজা প্রথম ফ্রেডরিক উইলিয়াম

প্রশিয়ার রাজা প্রথম ফ্রেডরিক উইলিয়াম

পৃথিবী শাসন করেছেন এমন সব রাজা বাদশাহ ছিলেন। যারা তাদের কর্মগুণে এখনো মানুষের মুখে মুখে রয়েছেন। কেউ আছেন তাদের অদ্ভুত কর্মকান্ডের কারণে মানুষের উদাহরণে বেঁচে আছেন। কিছু শাসক ছিলেন, যারা নিজেদের ঘর-বাড়ি সব নাকি সোনায় মুড়িয়ে রেখেছিলেন। 

ইরাকের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেনকে আমেরিকা যখন আটক। তখন বিভিন্ন মার্কিন সংবাদপত্র থেকে জানা গিয়েছিল সাদ্দামের প্রাসাদের কমোডগুলো পর্যন্ত সোনায় মোড়ানো। যে অতীতে বিভিন্ন রাজা বা সুলতানদের নানান খামখেয়াল বিভিন্ন সময়েই দেখা গিয়েছে ! যেমন এই দেশেরই মুহম্মদ - বিন তুঘলক যখন দিল্লির সুলতান ছিলেন তিনি তখন খেয়ালবশত বারবার রাজধানী পরিবর্তন করতেন! এরকম অনেক শাসকেরই বিভিন্ন ধরনের শখ ছিল একসময়। কেউ পুষতেন সাপ, বিচ্ছু। কারো বা শখ ছিল সাজগোজের। 

পরিবারের সঙ্গে ফেডরিক তবে জানেন কি? এক রাজা ছিলেন যিনি লম্বা অর্থাৎ উচ্চ দৈর্ঘ্যের পুরুষ খুঁজে বেড়াতেন! এমনকি দীর্ঘ উচ্চতার কোনো পুরুষ যদি সেই রাজার ডাকে সাড়া না দিত, তাহলে তিনি তাদেরকে কোনো কৌশলে অপহরণ পর্যন্ত করতেন তিনি! এই বিচিত্র শখ ছিল পুশিয়ার রাজা প্রথম ফ্রেডরিক উইলিয়ামের। ১৭১৩ সালে সিংহাসন লাভ করা এই রাজার বেশ কিছু বিচিত্র শখ ছিল- তারমধ্যে লম্বা মানুষ ধরে আনাটা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। আসলে লম্বা মানুষ অর্থাৎ উচ্চ দৈর্ঘ্যের পুরুষ ধরে আনার একটি বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল তার।

আরো পড়ুন: এদেশে কুমারী মেয়ের হয় না বিয়ে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যত অদ্ভুত যৌনরীতি 

সিংহাসনে বসে ফ্রেডরিক উইলিয়াম লক্ষ্য করেন তার পিতা প্রথম ফ্রেডরিকের দানশীল চরিত্র ও খরুচে হাতের জন্য কোষাগারের হাল অত্যন্ত বেহাল। সেই সঙ্গে সেনাবাহিনীর হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্র নেই। যুদ্ধ করতে পছন্দ করা ফ্রেডরিক উইলিয়াম দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের সৈন্য বাহিনীর সংখ্যা ৩৮ হাজার থেকে বৃদ্ধি করে ৮৩ হাজার করে দেন। একই সঙ্গে আধুনিক অস্ত্র কিনতে শুরু করেন। এদিকে কোষাগারের হাল ফেরাতে দেশের সমস্ত অনাবাদি জমিতে চাষ করার আদেশ দেন। একের পর এক কলকারখানা গড়ে তুলতে শুরু করেন ইউরোপে। তিনি প্রথম এক সুশৃংখল কর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। তার দেখাদেখি বাকি ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলোও কর কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করে।

লম্বা পুরুষদের খুঁজে বেড়াতেন তিনি সৈন্যবাহিনীর সংখ্যার এই বিপুল বৃদ্ধি ঘটানোর জন্য প্রথম ফ্রেডরিক উইলিয়ামকে প্রশিয়ার প্রজারা আড়ালে - আবডালে ‘ সোলজার কিং ' নামে ডাকতে শুরু করে! তিনি ইতিহাসের পাতাতেও সোলজার কিং নামে বিখ্যাত হয়ে আছেন। আর এখান থেকেই তার বিখ্যাত শখের শুরু হয়। সেনাবাহিনীর আয়তন বাড়ানোর পাশাপাশি সম্পূর্ণ নিজের ব্যক্তিগত একটি সেনাদল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন পুঁশিয়ার এই রাজা।

আরো পড়ুন: বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে ব্যাটল অফ সমে, যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা

এই সেনা দলে যোগ দিতে গেলে একটি মাত্রই শর্ত ছিল- প্রত্যেকের উচ্চতা হতে হবে ৬ ফুটের বেশি। প্রথমে সাম্রাজ্যের মূল সেনাদল থেকে বেছে বেছে অতি দীর্ঘ উচ্চতার সৈন্যদের নিয়ে এই সেনাদলটি গড়ে তোলা হয়। ফ্রেডরিক উইলিয়াম এই সেনা দলটির পোশাকি নাম দেন ‘ দ্য গ্র্যান্ড গ্রেনেডিয়ার্স অফ পটসড্যাম ' । যদিও এই সেনাবাহিনী সাধারণের কাছে ' পটসড্যাম জায়ান্ট ' নামেই পরিচিত ছিল !

অবাধ যৌনতা ও সমকামিতায় লিপ্ত হতেন এই রাজা পরবর্তীকালে এই বাহিনীর সদস্য জোগাড় করার জন্য ফ্রেডরিক উইলিয়ামের নির্দেশে তার রাজ কর্মচারীরা বিভিন্ন জায়গা থেকে ৬ ফুটের বেশি উচ্চতার লোকজনকে অপহরণ করতে শুরু করে। এমনকি পুশিয়ার প্রতিবেশী রাজারা ফ্রেডরিক উইলিয়ামের এই শখ সম্বন্ধে অবগত থাকায় তারাও নিজেদের রাজ্যের লম্বা পুরুষদের জোর করে পুশিয়ায় পাঠিয়ে দিতেন , যাতে সম্পর্ক ভালো থাকে ! বিশেষ করে রাশিয়ার জার পিটার দ্য গ্রেট এবং অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান ফ্রেডরিক উইলিয়ামকে নিয়মিত ভিত্তিতে তাদের রাজ্যের দীর্ঘ উচ্চতা সম্পন্ন পুরুষদের উপহার হিসেবে দিতেন।

কেন পটসড্যাম জায়ান্ট গড়ে তুলেছিলেন প্রথম ফ্রেডরিক উইলিয়াম ? এর উত্তর এককথায় রাজকীয় শখ। এই দীর্ঘ উচ্চতার সেনাদের তিনি কখনোই যুদ্ধে পাঠাননি। এরা কেবল দৈনিক মহড়া দেয়া ছাড়া আর বিশেষ কোনো কাজ করত না। মূলত ব্যারাকে বসে ভালোমন্দ খাওয়া দাওয়া করে আর গল্পগুজব করেই তাদের সময় কেটে যেত। তবে একেবারেই যে কোনো কাজ করতে হতো না তা নয়। হয়তো ফ্রেডরিক উইলিয়ামের দুপুর বেলায় আহার করার পর ইচ্ছে হয়েছে কুচকাওয়াজ দেখবেন- তখনই পটসড্যাম জায়ান্টের সদস্যদের রাজপ্রাসাদের মধ্যে কুচকাওয়াজ করতে হতো। এমনকি রাজার ইচ্ছা হলে এই সৈন্যবাহিনীর যে কোনো সদস্যকে চুপ করে ঘন্টার পর ঘন্টা তার সামনে বসে থাকতে হতো, কারণ রাজা তার ছবি আঁকবেন! এমনকি রাজার দেশে তাদের যখন - তখন মল্লযুদ্ধ করতে হতো।

নিজের সেনাবাহিনীতে তিনি সব লম্বা সৈন্য রাখতে চাইতেন পটসড্যাম জায়ান্টের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সদস্য ছিলেন ৭ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার জেমস কাকল্যান্ড নামে এক আইরিশ ব্যক্তি । তিনি সহজে এই বাহিনীতে যোগ দিতে না চাওয়ায় ফ্রেডরিক উইলিয়ামের নির্দেশে নানা কৌশল অবলম্বন করে তাকে লন্ডন থেকে অপহরণ করে নিয়ে আসা হয়েছিল! এই সেনাবাহিনী নিয়ে ফ্রেডরিক উইলিয়াম একসময় নানান খেয়ালে মেতে ওঠেন। তিনি বাহিনীর সদস্যদের আরও লম্বা করার জন্য এক বিশেষ যন্ত্র তৈরি করে তার মাধ্যমে সৈন্যদের টানা হ্যাচরা করতেন! যদিও এই কান্ড করতে গিয়ে বেশকিছু সেনা মারা পড়লে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা বন্ধ করে দেন তিনি।

আরো পড়ুন: বিলাসিতায় মগ্ন রাজার গলায় ২৯৩০টি হিরার কণ্ঠহার, সঙ্গী ৩৩২ জন যৌনদাসী!

পটসড্যাম জায়ান্টের ধারাবাহিকতা যাতে বজায় থাকে তার জন্য পরের দিকে পুশিয়া সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সু- উচ্চতা সম্পন্ন নারীদের নিয়ে এসে এই সেনা সদস্যদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেন। এক্ষেত্রে তার পরিকল্পনা ছিল দুজন দীর্ঘাকার মানুষের সন্তানও অতিরিক্ত উচ্চতা সম্পন্ন হবে। এই ভাবনা যে ভুল ছিলনা তার পরিচয় পরবর্তীকালে পাওয়া যায়। একসময় পটসড্যাম শহর অতিরিক্ত উচ্চতার মানুষজনে অস্বাভাবিক রকম ভর্তি হয়ে যায় !

নারীদের চেয়ে পুরুষের প্রতি তার আকর্ষণ বেশি ছিল ফ্রেডরিক উইলিয়াম এই বিশেষ সেনাবাহিনীর সদস্যদের বেশ আরামেই রাখতেন। তিনি তাদের যেমন উচ্চ বেতন দিতেন , তেমনি এই সেনাবাহিনীর সদস্যদের পোশাক ছিল সুন্দর নীল রঙের। এছাড়াও মাথায় ৪৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের বিশেষ টুপি পরতে হতো, এর ফলে এদের আরও বেশি লম্বা দেখাতো। তবে প্রথম ফ্রেডরিক উইলিয়ামের শখের শেষ এখানেই নয় , তিনি মাঝেমধ্যেই নিজে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তেন কাজকর্ম দেখতে। সেই সময় কেউ যদি কাজে সামান্যতম ফাঁকি দিত তাহলেই তার পিঠ বা পাছায় ফ্রেডরিক উইলিয়ামের বেতের বাড়ি অবধারিত ছিল। এমনকি কোনো নারীকেও বেতের ঘা দিতে তিনি পিছপা হতেন না! 

শাসক হিসেবে তিনি খুবই ভালো ছিলেন অবাধ যৌনতায় মত্ত থাকতেন তিনি। তার সেনাবাহিনীর অফিসার এবং সুন্দর দেখতে সৈন্যদের সঙ্গে সমকামিতায় লিপ্ত হতেন। এছাড়াও তার ছিল হাজার হাজার যৌন দাসী। যদিও ১৭৪০ সালের মে মাসে প্রথম ফেড্রিক উইলিয়াম মারা গেলে পুঁশিয়ার সিংহাসনে বসেন তার ছেলে ফ্রেডরিক দ্য গ্রেট । তিনি অবশ্য বাবার এই শখকে কোনো দিন বিশেষ আমল দেননি। তার মনে হয়েছিল পটসড্যাম জায়ান্ট বাহিনী টিকিয়ে রাখা অহেতুক হবে। এরপর ধীরে ধীরে এই বাহিনীর সদস্যদের প্রশিয়ান সেনার অন্যান্য ইউনিটে বদলি করে দেয়া শুরু হয় । ১৮০৬ সালে শেষমেষ বিখ্যাত দৈত্য সেনার বাহিনী ‘ পটসড্যাম জায়ান্ট ' সম্পূর্ণভাবে অবলুপ্ত হয়ে যায় ।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে