শয়নকক্ষ থেকে সৌদি যুবরাজের স্ত্রীর অলংকার চুরির রোমাঞ্চকর কাহিনী

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৪ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ১৯ ১৪২৭,   ১৯ রজব ১৪৪২

শয়নকক্ষ থেকে সৌদি যুবরাজের স্ত্রীর অলংকার চুরির রোমাঞ্চকর কাহিনী

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:২৫ ১৭ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৮:২৮ ১৭ জানুয়ারি ২০২১

উদ্ধার করা স্বর্ণালংকার দেখাচ্ছে পুলিশ, পাশেই হাতকড়া পরা তেচামং; ছবিঃ সংগৃহীত

উদ্ধার করা স্বর্ণালংকার দেখাচ্ছে পুলিশ, পাশেই হাতকড়া পরা তেচামং; ছবিঃ সংগৃহীত

১৯৮৯ সালের ঘটনা। থাইল্যান্ডের প্রায় দুই লাখ নাগরিক সৌদি আরবে বিভিন্ন ধরণের কাজ করতো। তাদের পাঠানো বড় অংকের রেমিট্যান্স থাই অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখতো। বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক চ্যালেঞ্জ থাকার পরও দিনে দিনে সেই সংখ্যা বেড়েই চলছিলো। আর তুলনামূলক কম বেতনে কাজ করিয়ে নিতে পেরে সৌদি পরিবারগুলোও অনেক সুবিধা আদায় করে নিচ্ছিল।

তেমনই এক থাই নাগরিক ছিলেন ক্রিয়াংক্রাই তেচামং। আর্থিক সমস্যার সমাধান খুঁজতে তিনিও এসেছিলেন সৌদি আরবে। আর শেষ পর্যন্ত কাজ জুটেও যায় তার। তৎকালীন সৌদি রাজপ্রাসাদে পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে কাজ পান তিনি।

পরিচ্ছনকর্মী হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন ক্রিয়াংক্রাই তেচামং। পরিষ্কার করার কাজে প্রতিদিন তাকে রাজপ্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করতে হত। একসময় তিনি আবিষ্কার করলেন, রাজপ্রাসাদে সৌদি যুবরাজের ঘরে বহু দূর্লভ ও অনেক দামী অলংকার রয়েছে। তবে এসবের জন্য কোনো শক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।

এদিকে তার থাকার জায়গায় অন্যদের সঙ্গে জুয়া খেলে বেশ বড় অংকের ঋণে জড়িয়ে পড়েন ক্রিয়াংক্রাই তেচামং। এত প্রতিকূলতার মধ্যে সৌদি আরবে বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। এজন্যই তিনি চাচ্চিলেন সব ছেড়ে আবার থাইল্যান্ডে ফিরে যেতে। তবে এত ঋণ আর খালি হাতে থাইল্যান্ডে ফিরতেও পারছিলেন না তিনি।

আর সেই সূত্রে সোদি রাজপ্রাসাদে কাজ করার সময় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটান ক্রিয়াংক্রাই তেচামং। সে বছর সৌদি রাজপ্রাসাদ থেকে চুরি গিয়েছিল সোনা-গহনা ও অমূল্য হীরার বিরাট সম্ভার। আর চুরির ঘটনার প্রায় তিন দশক পর নিজের মুখেই সেই চুরির কাহিনী জানিয়েছেন ক্রিয়াংক্রাই তেচামং।ক্রিয়াংক্রাই তেচামং

সে বছরই স্ত্রীকে নিয়ে মাস তিনেকের জন্য ছুটিতে গিয়েছিলেন সৌদি বাদশাহ ফাহদের পুত্র যুবরাজ ফয়সাল। আর এই সুযোগটাকে হাতছাড়া করতে চাননি ক্রিয়াংক্রাই তেচামং। এই সুযোগেই বহু অমূল্য গয়না নিয়ে পালানোর ফন্দি আঁটেন প্রাসাদের এই বিশ্বস্ত কর্মচারী।

প্রাসাদ পরিষ্কার রাখার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি হিসেবে প্রাসাদের প্রতিটি কোণ একেবারে স্পষ্টভাবে চিনতেন তেচামং। তাছাড়া যুবরাজ যে প্রায়ই তার সিন্দুকের তালা খোলা রেখেই চলে যান, সে কথাও তিনি জানতেন। অপরদিকে চুরির ফলে শরীরের অঙ্গ কেটে ফেলা হতে পারে- একথা জানার পরেও তিনি চুরির ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

একদিন সন্ধ্যায় কৌশোলে প্রাসাদে ঢুকে পড়েন তেচামং। সবাই বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। তারপর সুযোগ বুঝে ঢুকে যান যুবরাজের শোবার ঘরে। আর এ কাজ সম্পাদনের জন্য তিনি আগে থেকেই স্কচটেপ  সঙ্গে করে নিয়ে যান। ঘরে ঢুকে বেশ কিছু অলংকার নিজের শরীরের সাথে স্কচটেপ দিয় ভালোভাবে বেঁধে নেন। তাছাড়া ঘর পরিষ্কার করার যন্ত্র ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের ভেতরে করেও নিয়ে আসেন অনেক অলংকার।

তেচামং যত স্বর্ণালংকার ও গহনা চুরি করেছিলেন তার ওজন প্রায় ৩০ কেজি, যার অর্থ মূল্য দু'কেটি মার্কিন ডলার। পরবর্তীতে জানা যায় যে, তেচামং-এর চুরি করা সেই সম্পদের মধ্যে ছিল বেশ কিছু স্বর্ণের ঘড়ি ও রুবি পাথরও। যার মধ্যে একটি ছিল অত্যন্ত দামি হীরা। ৫০ ক্যারেট ওজনের একটি নীল হীরা, যার আকৃতি অনেকটা ডিমের মতো।

ঘটনার দিন রাতে চুরি করা সকল সম্পদ প্রাসাদের ভেতরেই নানা জায়গায় লুকিয়ে রাখেন তেচামং। পরবর্তীতে মাস খানেকের বেশি সময় ধরে সেগুলোকে অল্প-অল্প করে কার্গোতে স্থানান্তরিত করেন থাইল্যান্ডে পাঠানোর জন্য। সৌদি যুবরাজের ফিরে আসার আগেই এই সকল কাজ করে ফেলেন তেচামং। আর এই বিশাল চুরির খবর জানাজানি হতে হতে তেচামং নিজের দেশ থাইল্যান্ডে পাড়ি দেন।

তবে এত বিরাট অংকের স্বর্ণালংকার সহ কার্গো পাঠাতে গিয়ে বিপত্তিতে পড়েন তিনি। কেননা থাই শুল্ক বিভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে এই বিরাট চালান ঠিকঠাক ভাবে পৌঁছানোটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এই সমস্যারও একটা সমাধান বের করেন তেচামং।

তিনি জানতেন, শুধুমাত্র মোটা অংকের ঘুষ দিয়েই এই কাজ সমাধান করা সম্ভব। তাছড়া থাই শুল্ক কর্মকর্তারা বড় অংকের ঘুষের টাকা ফেরাবে না। তাই কার্গোর ভেতরে একটি খামে বেশ কিছু নগদ টাকা ও একটি চিরকুট লিখে রেখে দেন তেচামং। চিরকুটটিতে লেখা ছিল, এই কার্গোতে পর্নগ্রাফি বা যৌনতা সম্পৃক্ত বস্তু রয়েছে। তাই সার্চ করে বিব্রত অবস্থায় না ফেললে ভালো হয়।নিজের জমিতে দাঁড়িয়ে ক্রিয়াংক্রাই তেচামং

ক্রিয়াংক্রাই তেচামং থাইল্যান্ডে ফিরে আসার পর তার আনা স্বর্ণালঙ্কার একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ীর আওতায় বেচা-কেনার কাজকর্ম চলছিল। তার সব পরিকল্পনা খুবই সুন্দরভাবে কাজ করে। তিনি জেল-জরিমানাও এড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু ১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসে থাইল্যান্ডের লাম্পাং প্রদেশে নিজ বাড়ি থেকে তেচামং-কে গ্রেফতার করে থাই পুলিশ।

এরপর থাই ও সৌদি পুলিশের উদ্যোগে অনুসন্ধান অভিযান চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় সকল স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়। এমনকি যেগুলো বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল সেগুলোও সংগ্রহ করে পাঠানো হয় সৌদি প্রাসাদের ঠিকানায়।

এদিকে থাই পুলিশের উদ্ধার করা অলংকার ও দামি জিনিসপত্র সৌদি আরবে পাঠিয়ে দেয়ার পর নতুন কাহিনীর সূত্রপাত ঘটে। স্বর্ণালংকার হাতে পেয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, চুরি যাওয়া স্বর্ণালংকারের ৮০ শতাংশই পাঠানো হয়নি। আর যেগুলো ফেরত এসেছে সেগুলোর অধিকাংশই নকল রেপ্লিকা।

তারপর হঠাৎ করেই এক কাণ্ড ঘটে। উচ্চ পর্যায়ের থাই এক কর্মকর্তার স্ত্রীর গলায় এমন একটি অমূল্য হার দেখা যায় যেটি দেখতে অবিকল প্রাসাদ থেকে চুরি যাওয়া হীরের হারের মতন। সেটি ছিল প্রায় ডিমের সমান বড়, ৫০ ক্যারেটের অমূল্য দুষ্প্রাপ্য নীল হীরক।গ্রেফতার হবার পর তার দিনগুলো ছিল ভীষণ কষ্টের

আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে ক্রিয়াংক্রাই তেচামং জেল থেকে ছাড়া পান। যুবরাজের স্বর্ণালঙ্কার চুরির সেই ঘটনার প্রায় তিন দশক পর তার সন্ধান খুঁজে বের করা হয়। বর্তমানে তিনি থাইল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম এলাকায় আছেন। তার প্রথমে ৫ বছরের সাজা হলেও পরবর্তীতে তা কমিয়ে দুই বছর সাত মাস করা হয়।

তেচামং জানান, গ্রেফতার হবার পর তার দিনগুলো ছিল ভীষণ কষ্টের। তখন দিনের পর দিন এমনকি সপ্তাহও তিনি না ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। তিনি খুব ভয়াক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং সব কিছুতেই ভীত-সন্ত্রস্ত বোধ করতেন।

জেল থেকে ছাড়া পাবার পর তিনি নিজের নাম পাল্টে নেন। কারণ তিনি চাননি তার জন্য নিজের ছেলে বিব্রতকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাক। অবশেষে ২০১৬ সালের মার্চ মাসে তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষু হবার সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে তিনি ভিক্ষু হিসেবে আছেন। ভিক্ষু হিসেবে তার অভিষেক অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেখানে নিজের বক্তব্যে ক্রিয়াংক্রাই তেচামঙ বলেন, জীবন থেকে সৌদি হীরকের পাপ মোচনের জন্যই তিনি এই ভিক্ষুর জীবন বেছে নিয়েছেন।

তিন বছর একটি বৌদ্ধ মন্দিরে কাটিয়েছে ক্রিয়াংক্রাই তেচামং

তেচামং-এর কয়েক বছর জেল খাটার মধ্য দিয়েই হয়তো এই চুরি কাহিনীর সমাপ্তি হতে পারতো। কিন্তু তা না হয়ে পুরো কাহিনী হয়ে উঠলো এক রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি দূতাবাসের ভিসা বিভাগের দু'জন কর্মকর্তা থাই কম্পাউন্ডের দিকে যাচ্ছিলো। কিন্তু সেখানে যাবার আগেই তাদের উপর আক্রমণ চালানো হয় এবং তাদের হত্যা করা হয়। নিহত কর্মকর্তাদের আরেক সহকর্মীর বাসায়ও একই সময়ে হামলা হয় এবং তাকেও হত্যা করা হয়।

পরবর্তীতে জানা যায়, চোরাই গয়না খুঁজে বের করার দায়িত্ব পাবার পর পুলিশ সেগুলো উদ্ধার করে ঠিকই। কিন্তু সেখান থেকে কিছু স্বর্ণালঙ্কার তারা নিজেরাই হাতিয়ে নেয়। এ ঘটনা সম্পর্কে জানতেন এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী এই ঘটনা চেপে রাখতে সেই স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে পুলিশ চাপ দেয় এবং তার স্ত্রী ও ছেলেকে হত্যা করা হয়। এর দায়ে সেই সময়ের পুলিশ প্রধান, চেলোর কারর্থিস, যিনি ছিলেন মূল অনুসন্ধানী দলের প্রধান অধিকর্তা তার ২০ বছরের জেল হয়।

সৌদি রাজপরিবারের অলংকার চুরি ও সৌদি কূটনীতিক হত্যা ও ব্যবসায়ী অপহরণের মতো ঘটনাগুলোর জন্য সৌদি আরব ও থাইল্যান্ডের সম্পর্ক তলানিতে নেমে আসে। ১৯৯০ সালের দিকে যেখানে প্রায় দুই লাখ থাই নাগরিক সৌদি আরবে কর্মরত ছিল, সেখানে ২০০৮ সালে সংখ্যাটি নেমে আসে ১৫ হাজারে। এর ফলে থাইল্যান্ডের অর্থনীতি বড় ধরনের আঘাত পায়।

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি, ব্যাংকক পোস্ট, হিন্দুস্তান টাইমস

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচএফ