টানা ৮দিন ধর্ষণের শিকার, ধর্ষককে বিয়েতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ইতিহাস

ঢাকা, রোববার   ০৭ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ২২ ১৪২৭,   ২২ রজব ১৪৪২

টানা ৮দিন ধর্ষণের শিকার, ধর্ষককে বিয়েতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ইতিহাস

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩৫ ১৭ জানুয়ারি ২০২১  

ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা। ছবি: সংগৃহীত

ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা। ছবি: সংগৃহীত

ধর্ষণের শিকার হয়ে অনেক নারীকে শেষ পর্যন্ত ধর্ষককেই বিয়ে করতে হয়। এমনকি ইতালিতে একসময় আইনও ছিল যে, ধর্ষণের শিকার নারীকে বিয়ে করলে ধর্ষক নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবে! এ কারণে ধর্ষণকারীরা একপ্রকার নিরাপদ ছিল। তবে এই আইনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা।

ইতালির সিসিলি দ্বীপের আলকামো শহরে ফ্রাঙ্কা ভিওলার জন্ম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও, কেমন যেন যুদ্ধের গন্ধ ছিল চারদিকে। তখন মাফিয়া গোষ্ঠীগুলোও বেশ তৎপর ছিল। তবে ফ্রাঙ্কার দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল তখন। স্কুলে যেত, খেলাধুলা করতো বন্ধুদের সঙ্গে। গৃহিনী মা ভিতা ফেরার সঙ্গে বিভিন্ন কাজও করতো টুকটাক।

১৯৬৩ সাল; ফ্রাঙ্কার বয়স তখন ১৫ বছর। ফর্সা ও মায়াবি চেহারার মেয়েটার দিকে চোখ পড়লো স্থানীয় মাফিয়া সদস্য ফিলিপ্পো মেলোদিয়ার। ব্যস, বিয়ের প্রস্তাব দেয় সে। তাদের বাগদানও হয় তার। তবে বিয়ে আর করা সম্ভব হয়নি! কারণ বাগদানের কয়েকদিন পরই চুরির দায়ে জেলে যায় মেলোদিয়া।

ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা ও ফিলিপ্পো মেলোদিয়া। ছবি: সংগৃহীত

বিয়ের আগেই মেয়ের হবুর জামাই জেলে, বিষয়টা লজ্জাজনক মনে হলো ফ্রাঙ্কার বাবা বার্নার্দোর কাছে। ফ্রাঙ্কা নিজেই এই সম্পর্ককে তখনই মাটি চাপা দিয়ে দেয়। মাফিয়া দৌরাত্ম্য ও নানা ভয় নিয়ে তখন ইতালি ছেড়ে জার্মানিতে পাড়ি জমান ফ্রাঙ্কা। সেখানে দু’বছর থাকার পর আরেক তরুণের সঙ্গে ফ্রাঙ্কার বাগদান সম্পন্ন হয়।

ফ্রাঙ্কা নতুন বাগদানের পর বেশিদিন ভালো থাকতে পারেননি। কারণ ততদিনে জেল থেকে বেরিয়ে গেছে মেলোদিয়া। আলকামো শহরে নেমেই ফ্রাঙ্কাকে বিয়ে করার স্বাদ জাগে তার। ফলে দ্বিতীয় বাগদান ভেঙে দিয়ে তার সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগাবার জন্য ক্রমাগত ফ্রাঙ্কাকে চাপ দিতে থাকে সে। হুমকি দিতে থাকে ফ্রাঙ্কার বাবা ও হবু জামাইকেও।

২৬ ডিসেম্বর ১৯৬৫; ততদিনেও নানা হুমকি-ধমকি দিয়েও রাজি করানো যায়নি ফ্রাঙ্কাকে। তখনই নিজের আসল রূপটা দেখিয়ে দেয় মেলোদিয়া। একদল যুবককে সঙ্গে নিয়ে ফ্রাঙ্কাকে বাড়ি থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় সে। অপকর্মে বাধা দিতে এলে মার খায় ফ্রাঙ্কার মা ও ছোট ভাই মারিয়ানো। ফ্রাঙ্কাকে শহরের বাইরের এক খামারবাড়িতে নিয়ে যান মেলোদিয়া। টানা আট দিন ধরে মেয়েটির ওপর চলে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার, চলে ক্রমাগত ধর্ষণও।

ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা এখন ভালো আছেন। ছবি: সংগৃহীত

ধর্ষণেই শেষ নয়, অট্ট হাসি দিয়ে ফ্রাঙ্কাকে মেলোদিয়া বলতো, তাকে বিয়ে করা ছাড়া ফ্রাঙ্কার আর কোনো উপায়ও নেই। বিয়ে না করলে লোকে তাকে ‘দুশ্চরিত্রা’ বলে ডাকবে। যতবার মেলোদিয়া এই কথা বলতো, ততবারই ফ্রাঙ্কা প্রতিবাদ করেছে। তাকে  জেলে পুরবার প্রতিজ্ঞাও করেছে ওই মেয়ে।

সেই বছরের ৩১ ডিসেম্বর ফ্রাঙ্কার বাবাকে ফোন করে মেলোদিয়া। উদ্দেশ্য দুই পক্ষ সমঝোতায় এসে ফ্রাঙ্কার সঙ্গে তার বিয়ের ব্যবস্থা পাকা করা। ফ্রাঙ্কার বাবা বার্নার্দো ভিওলা সামনাসামনি বিয়ের ব্যাপারে ইতিবাচক থাকলেও আড়ালে তিনি ঠিকই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ২ জানুয়ারি সাঙ্গোপাঙ্গোসহ ধরা পড়ে মেলোদিয়া, মুক্ত হয় ফ্রাঙ্কা।

ফ্রাঙ্কার বাবা তাকে শুধু একটি কথাই জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘মেলোদিয়াকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক কি-না?’ ফ্রাঙ্কা যখন দৃঢ়চিত্তে ‘না’ বলে উঠে। সেই সময়ে পুরো ইতালির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় তখন ফ্রাঙ্কার এই কাহিনী, তার রুখে দাঁড়ানোর গল্প। মেলোদিয়ার পক্ষের আইনজীবীরা তো নির্লজ্জভাবে দাবি করে বসে, ফ্রাঙ্কা আসলে অপহৃতই হয়নি। দুজন মিলেই খামারবাড়িতে যায় এবং উদ্দেশ্য ছিল গোপনে বিয়ে করা।

সেই সময়ে পুরো ইতালির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় তখন ফ্রাঙ্কার এই কাহিনী, এটি আদালতের বাইরের ছবি। ছবি: সংগৃহীত

তবে ফ্রাঙ্কার পরিবার বিচার নিয়ে সোচ্ছার ছিল। এক মুহূর্তের জন্যও মেয়ের মনোবল ভাঙতে দেয়নি তার বাবা-মা। তাই তো সব সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাইবাছাই শেষে আদালতের রায় যায় ফ্রাঙ্কার পক্ষেই।

আদালতের রায়ে ১১ বছরের সাজা পান মেলোদিয়া। এছাড়া সাত সহযোগীর প্রত্যেককে ৪ বছর করে সাজা দেয়া হয়। মেলোদিয়ার এই সাজা পরে অবশ্য ১ বছর কমিয়ে আনা হয়। পুরো সাজা খেটে ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায় ধর্ষক। অবশ্য মুক্তির মাত্র দু’বছরের মাথায় গুলি খেয়ে মডেনার রাস্তায় কুকুরের মতো পড়ে থাকে মেলোদিয়া।

ফ্রাঙ্কা ভিয়োলার বয়স এখন ৭৩ বছর। সেই ঘটনার পর ১৯৬৮ সালে জিউসেপ্পে রুইজি নামের এক পুরুষকে বিয়ে করেন তিনি। দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে এখন সুখেই দিন কাটাচ্ছেন তিনি। স্মৃতিবিজড়িত সেই আলকামো শহরেই বসবাস করছেন তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে