খাওয়াই যাদের জীবনের অংশ, স্থূলতা নারীর সৌন্দর্য

ঢাকা, রোববার   ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১,   ফাল্গুন ১৫ ১৪২৭,   ১৫ রজব ১৪৪২

খাওয়াই যাদের জীবনের অংশ, স্থূলতা নারীর সৌন্দর্য

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২৬ ১৭ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৬:৫১ ১৭ জানুয়ারি ২০২১

ছবি: খাওয়াই যাদের জীবনের অংশ, স্থূলতা নারীর সৌন্দর্য

ছবি: খাওয়াই যাদের জীবনের অংশ, স্থূলতা নারীর সৌন্দর্য

খেতে আমরা সকলেই ভালোবাসি। তবে ইদানিং নিজেকে সুস্থ রাখতে বা নিজের ফিগারকে ঠিক রাখতে অনেকেই ডায়েট করে থাকেন। বিশেষ করে মেয়েরা, কী করে তারা নিজেদের সুস্থ রাখবে অথবা শরীরের মেদ কীভাবে তারা কমাতে পারেন তার জন্য বহু মেয়েরাই ডায়েটিশিয়ানের কাছে ছোটেন। যদিও মানুষ সর্বভুক এবং অধিকাংশ মানুষই ভালোমন্দ খেতে ভালোবাসেন। 

তবে যারা খেতে ভালোবাসেন তাদেরকে যদি বলা হয় দিনে ২০ লিটার দুধ খেতে হবে কিংবা ৫ কেজি চিকেন স্টেক খেতে হবে ঠিক কেমন লাগবে? ধরুন আপনাকে বলা হল দুপুরে ২০ টা, রাতে ২০ টা রুটি সেই সঙ্গে ভেড়া বা খাসির মাংস ২ কেজি খেতেই হবে, তখন আপনার কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে মনে হয়? সম্ভবত প্রতিক্রিয়া দেয়ার আগেই আপনি অবাক হবেন।

মা তার মেয়েকে খাবার পরিবেশন করছে এক্ষেত্রে দোষ আপনার নয়! যিনি এই বিপুল পরিমাণ খাবার খাওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন হয় তার মানসিক ভারসাম্য ঠিক নেই। না হয় তিনি ঘটোৎকচের মতো কোনো এক দৈত্য! আপনার এমন ভাবনা কিছুটা ভুল। এই পৃথিবীতেই ঠিক এইরকম এক জায়গা আছে, যেখানে এই পরিমাণেই খাবার খাওয়ানো হয়ে থাকে। তবে তা কোনো পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ বা নারীকে নয়! 

বরং এই পরিমাণ খাবার খাওয়ানো হয় ৯ থেকে ১০ বছরের বাচ্চা মেয়েদেরকে! শুনে খুব অবাক হয়ে গেলেন। অবাক হওয়ার মতোই এই ঘটনা ঘটে আফ্রিকার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে। মৌরতানিয়া নামে আফ্রিকার একটি দেশ আছে, সেই দেশে এই রীতির প্রচলন সবচেয়ে বেশি। তবে মৌরতানিয়া ছাড়াও নাইজার, উগান্ডা, সুদান, তিউনিশিয়া, মরক্কো ও নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলোর একাংশেও এই রীতিটি প্রচলিত আছে।

এই দেশগুলোর এক বিশেষ জনগোষ্ঠী মনে করে তাদের মেয়েরা যত স্থূলকায় অর্থাৎ মোটা হবে তত তাকে দেখতে সুন্দর হয়! এই ধারণা থেকেই ওই অঞ্চলে এক অদ্ভুত প্রথা গড়ে উঠেছে। স্থূলকায় এবং থলথলে নারীদের বিয়ের বাজারে কদর বেশি থাকে, তার ফলে এই সম্প্রদায়টি অল্প বয়স থেকেই কন্যা সন্তানদের অস্বাভাবিক পরিমাণ খাবার খাইয়ে মোটা করে তোলে।

স্থূলকায় এবং থলথলে নারীদের বিয়ের বাজারে কদর বেশি থাকেএই বিশেষ প্রথাটির নাম ' লেবলউ '। লেবলউ প্রথা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত মৌরিতানিয়ায়। এখানকার শিশু কন্যাদের মোটা করে তোলার জন্য স্কুল ছুটির সময় পরিবারগুলো মোটা বানানো কেন্দ্রে পাঠিয়ে থাকে। ওই আবাসিক কেন্দ্রগুলোতে পরিবারের কাছ থেকে খরচ নিয়ে অল্প বয়সেই মেয়েদের বিপুল এবং অস্বাভাবিক পরিমাণ খাবার জোর করে খাওয়ানো হয়। 

প্রতিদিন প্রায় দুই কেজি মিলেট আটা দিয়ে তৈরি রুটি খাওয়ানো হয়! তার পাশাপাশি এক একটি শিশুকে ২০ লিটার উটের দুধ এবং দুই কেজি ভেড়ার মাংস খাওয়ানো হয়ে থাকে! এখানেই শেষ নয়, স্বাভাবিকভাবেই বাচ্চারা এই বিপুল পরিমাণ খাবার খেতে চায় না। তারা তখন এক বিশেষ উপায়ে শাস্তি প্রদান করে। শাস্তি প্রদানের এই বিশেষ পদ্ধতির নাম ‘ জায়ার '। 

এই পদ্ধতিতে খাবার খেতে অস্বীকার করলে ওই বাচ্চা মেয়েদের পায়ের দুটো পাতা এক জায়গায় জড়ো করে দুটো কঞ্চি পায়ের পাতার দিকে বিশেষ কায়দায় দিয়ে প্রশিক্ষকরা চেপে ধরেন! এই অমানবিক শাস্তির ফলে যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে বেশিরভাগ সময়ই ওই ছোট ছোট বাচ্চা মেয়েরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ খাবার খেয়ে নেয়।

প্রতিদিন প্রায় দুই কেজি মিলেট আটা দিয়ে তৈরি রুটি খাওয়ানো হয় মেয়েদের এই অস্বাভাবিক পরিমাণ খাবার খাওয়ার পর অনেকেই বমি করে ফেলে। তখন প্রশিক্ষকরা বাচ্চাদের বাধ্য করে তাদের নিজের বমি চেটে খেতে! ঘৃণার চোটে তারপর থেকে এই বাচ্চারা বমি আটকানোর চেষ্টা করতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই তখন প্রশিক্ষকদের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ অল্প বয়সেই এই মেয়েদের মোটা করে তোলার বিষয়টি সফল হতে শুরু করে দেয়।

একটা পরিসংখ্যান শুনলে চোখ কপালে উঠে যাবে। মৌরিতানিয়ার পরিবারগুলো ৬ বছর বয়সেই মেয়েদের মোটা বানানোর কেন্দ্রে পাঠিয়ে থাকে। এরপর ৯ থেকে ১২ বছর বয়সে তাদের আবার ওই কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সর্বোচ্চ ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত মেয়েদের ওই কেন্দ্রে যেতে দেখা যায়। বিপুল পরিমাণ খাবার খেয়ে অস্বাভাবিক হারে মোটা হতে থাকায় মাত্র ১৫ বছর বয়সেই এখানকার মেয়েদের ওজন ৮০ কেজির কাছাকাছি হয়। 

তাদের দেখলে ওই বয়সেই মনে হবে যেন একজন ৩০ বছর বয়সী প্রাপ্ত বয়স্ক নারীকে দেখছেন আপনি! অথচ এটাই মৌরতানিয়া বাসীর কাছে গর্বের বিষয়। এই প্রথা প্রথম চালু হয় আফ্রিকার মাতৃতান্ত্রিক ' তুরেগ ’ উপজাতির মধ্যে। যদিও মধ্যযুগের পর এই প্রথা অনেকটাই ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক শাসনের সময় এই অঞ্চলের ধনী পরিবারের পুরুষেরা আরো বেশি করে অর্থ উপার্জন করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করতে শুরু করে।

এভাবে জোর করে খাওয়ানো হতো অথচ পরিবারের নারীদের বাড়িতে প্রায় কোনো কাজই করতে হতো না। কারণ আর্থিক অবস্থা ভালো হওয়ায় তাদের বাড়িতে যথেষ্ট সংখ্যক কাজের লোক থাকত। এইভাবে দিনের পর দিন কাজ না করে করে ধনী পরিবারের নারীদের স্বাস্থ্য বৃদ্ধি হতে শুরু করে। কারণ খাওয়া ও শোয়া ছাড়া তারা আর কিছুই করত না। এইভাবে চলতে চলতেই একসময় ভারী স্বাস্থ্যের অর্থাৎ স্থূলকায় চেহারার নারীরা মৌরতানিয়া সমাজে সমৃদ্ধি ও সম্পদের চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। 

ওখানকার অব্যাহিত পুরুষরাও মনে করতে শুরু করেন। স্বাস্থ্যবাণ কোনো নারীকে বিবাহ করলে তাদের জীবন সুখ ও সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। এইভাবে আফ্রিকার এই দেশটি সহ আশেপাশের আরো কিছু দেশে স্থূলকায় নারীদের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। উল্টোদিকে শীর্ণকায় মেয়েদেরকে পাত্রস্থ করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে ওঠে পরিবারের কাছে।

এখানকার নারীরা কোনো কাজ করেনা শুধু বসে বসে খায় তখন থেকেই পরিবারগুলো চেষ্টা করতে শুরু করে তাদের কন্যা সন্তানদের জোর করে খাইয়ে খাইয়ে মোটা করে তোলার জন্য। ২০০৮ সালে মৌরিতানিয়ার শাসন ক্ষমতা সামরিক জুন্টা দখল করে নেয়। সেই সময় এই লেবলউ প্রথার মারাত্মক ভাবে বেড়ে যায়। যদিও গত দুই থেকে তিন বছর ধরে সচেতনতা প্রচার চালিয়ে শহরাঞ্চলের মানুষকে এই রীতির ক্ষতিকারক দিক সম্বন্ধে অনেকটাই সচেতন করা সম্ভব হয়েছে। 

তবে এখানকার গ্রামাঞ্চলের মানুষ এখনো লেবলউ প্রথা আঁকড়ে ধরেই বাঁচেন! তাহলেই বুঝতে পারছেন আপনি বিবাহের জন্য কেবল মাত্র রোগা নারী খুঁজলেও সেটাই সব নয়, সৌন্দর্যের অনেক রকম ব্যাখ্যা আছে। তেমনি যে নারীরা নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে 'জিরো সাইজ ' ফিগারকেই একমাত্র পথ বলে মনে করেন তারাও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন দুনিয়ায় স্বাস্থ্যবান নারীরা কদর একইরকমভাবে আছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে