চোখের পলকে পুড়ে ছাই শহর, মৃত এ জনপদের মালিক বৃদ্ধ দম্পতি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ১৪ ১৪২৭,   ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

চোখের পলকে পুড়ে ছাই শহর, মৃত এ জনপদের মালিক বৃদ্ধ দম্পতি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৪১ ১৩ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১১:৫০ ১৩ জানুয়ারি ২০২১

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

পম্পেই নগরীর নামটি অনেকেরই জানা! এটি এমন এক নগরী যেটি ধ্বংস হওয়ার সময় সেখানকার মানুষ চোখের পলক ফেলার সময়টুকু পায়নি। মুহূর্তেই মানুষগুলো ভস্মে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু কেন এমন হল? এ নগরী নিয়ে ইসলাম ধর্মের পবিত্র কুরআনে আয়াত নাজিল হয়েছে। 

ইতালির কাম্পানিয়া অঞ্চলের নেপলসের (নাপোলি) কাছে যে আগ্নেয়গিরি রয়েছে তার পাদদেশে "পম্পেই" নামক ছোট এ নগরীটি অবস্থিত। হাজার বছরের পুরনো একটি শহর এটি। আজ থেকে প্রায় দু-হাজার আশি বছর পূর্বে পম্পেই নামক নগরটি রোমানদের দ্বারা অধিকৃত হয়। সেই থেকে রোমানরা সেখানে বসবাস শুরু করে। অভাব নামক শব্দটি হয়ত তাদের কাছে ছিল একদমই অপরিচিত।

এক অভিশপ্ত নগরী পম্পেই  প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্যের এক অপার লীলাভূমি ছিল এ নগরটি। সে সময়কার পৃথিবীর সব থেকে সুখি নগরী ছিল এটি। কিন্তু পম্পেই নগরীর মানুষগুলো ছিলো অত্যন্ত বর্বর, অসভ্য ও নির্মম। তারা যে আগ্নেয়গিরির পাদদেশে বসবাস করতে সেই আগ্নেয়গিরির আগুন ও ছাই এক মূহুর্তে ধ্বংস করে দেয় নগরীটি। সেখানকার প্রতিটি মানুষ,পশুপাখি সহ সকল জীবন্ত প্রাণের স্পন্দন চোখের পলকে ভষ্মীভূত হয়ে যায়।

আরো পড়ুন: বাংলার ‘মোগলি’, যার কাহিনী কাঁদায় বিশ্ববাসীকে

তবে শুধু পম্পেই নয় এমন অভিশাপের কবলে পড়েছিল বিশ্বের আরো কিছু শহর। যার দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে ধ্বংসাবশেষের মধ্যে আজো দাঁড়িয়ে আছে সেই নগরী। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দেখা দিয়েছে সবুজ প্রাণ। তেমনই নিউজিল্যান্ডের‘তে ওয়াইরোয়া’ নগরী। একে বলা হয় নিউজিল্যান্ডের ‘পম্পেই’। কারণ পম্পেই-এর মতো এই জনপদও নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলে অগ্ন্যুৎপাতে। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুন মাউন্ট তারাওয়েরা-র অগ্ন্যুৎপাতের গ্রাসে চলে গিয়েছিল এই জনপদ।

ধংসস্তূপে সবুজ প্রাণের সঞ্চার ধ্বংসলীলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তত ১২০ জন। অতীতের এই জনপদ আজ দাঁড়িয়ে আছে পরিত্যক্ত, ভৌতিক শহর হয়ে। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে এই গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ধর্মপ্রচারক সেমৌর মিলস স্পেনসার। নিউজিল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত উষ্ণ প্রস্রবণ ‘পিঙ্ক অ্যান্ড হোয়াইট টেরেস’ দেখতে যাওয়ার পথে এই জনপদে বিশ্রাম নিতেন পর্যটকরা।

প্রথমে ভাবা হয়েছিল ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে আগ্নেয়গিরি তারাওয়েরা-র অগ্ন্যুৎপাতে বিলীন হয়ে গিয়েছে এই দু’টি উষ্ণ প্রস্রবণও। কিন্তু পরে তাদের অস্তিত্ব আবার খুঁজে পাওয়া যায়। জনপদ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার ৪০ বছরের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাওয়া তে ওয়াইরোয়া আজ পর্যটকদের পছন্দের গন্তব্য। ওয়াইরোয়া ঝর্না, রোটোকাকাহি হ্রদ এবং তারাওয়েরা হ্রদ পর্যটকদের কাছে অন্যতম দর্শনীয়।

পুড়ে যাওয়া শহর কিনে নেন এক দম্পতি পরবর্তী সময়ে তে ওয়াইরোয়া-এ খননের ফলে বেশ কিছু জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে। মাওরি উপজাতিদের অতীত জনপদের সেই জিনিসগুলো দেখতে ভিড় জমান পর্যটকরা। রোটোরুয়া শহর থেকে ১৪ কিমি দক্ষিণপূর্বে এই ঘুমন্ত শহরে সাজানো আছে পাথরের তৈরি গুদামঘর, মাওরিদের নৌকো এবং কামারশালা। আগ্নেয়গিরির ছাই এবং কাদার স্তরের নীচ থেকে সেগুলি উদ্ধার করা হয়েছে। প্রত্নতাত্বিক জিনিসগুলো সংগ্রহ করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে তে ওয়াইরোয়া-র সংগ্রহশালায়। 

আরো পড়ুন: এদেশে কুমারী মেয়ের হয় না বিয়ে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যত অদ্ভুত যৌনরীতি

আগ্নেয়সমাধি হওয়া এই জনপদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আজ থেকে ২৩৫ বছর আগের একটি সেলাইমেশিন। অগ্ন্যুৎপাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহরের ধ্বংসাবশেষে সেই মেশিন ঝুলছিল গাছ থেকে। পরে পচে যাওয়া সেই গাছ কেটে নামানো হয় সেলাই মেশিনটিকে। ঐতিহাসিক নিদর্শনটির এখন জায়গা হয়েছে সংগ্রহশালায়।

পোড়া শহরে আজ সবুজের গালিচা পাতা  বিস্ময়কর বিষয় হল, এই মৃত জনপদ কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তি। ১৯৩১ সালে ‘তে ওয়াইরোয়া’ কিনে নেন এক দম্পতি, রেগ এবং ভি স্মিথ। সে সময় এই জমিতে একটি মাত্র বাড়ি ছিল। স্মিথ দম্পতি কিনে নেয়ার পরে শুরু হয় খননকাজ। এখন পরিবারটির তৃতীয় প্রজন্ম রয়েছে ভৌতিক শহরের মালিক হিসেবে। স্থানটির রক্ষণাবেক্ষণ ও খননের জন্য তারাও যথেষ্ট যত্নবান। খননের ফলে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক জিনিসগুলোও রাখা হয় যথেষ্ট যত্ন করে। ভৌতিক পরিচয় পেলেও ‘তে ওয়াইরোয়া’ গ্রামে পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধে আছে। প্রকৃতির কোলে জীবন্ত হয়ে থাকা ইতিহাসের টানে পা রাখেন আগ্রহীরা। 

এই শহর এখন পর্যটকের পছন্দের জায়গা ৭৯ খ্রিস্টাব্দে আগ্নেয়গিরি ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল রোমান সভ্যতার অন্যতম শহর পম্পেই। তার ১৮০০ বছর পরে আর এক আগ্নেগিরির গ্রাসে বিলীন হয়ে গিয়েছিল নিউজিল্যান্ডের গ্রাম ‘তে ওয়াইরোয়া’। ইতিহাসের সাক্ষী হতে দু’টি জনপদই উৎসাহীদের ভিড়ে দিনের কিছু সময়ের জন্য হলেও সরগরম হয়ে ওঠে। বাকি সময় অপার নিস্তব্ধতায় একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে ইতিহাস এবং প্রকৃতি।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে