আপন ভাইয়ের ষড়যন্ত্রে ৫ হাজার বছর ধরে সিন্দুকে বন্দি বড়ভাই

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৩ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৯ ১৪২৮,   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

আপন ভাইয়ের ষড়যন্ত্রে ৫ হাজার বছর ধরে সিন্দুকে বন্দি বড়ভাই

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৫৬ ৮ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৪:১১ ৮ জানুয়ারি ২০২১

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

প্রাচীন মিশরীয়রা দেবতা বিশ্বাসী ছিল। সেসময়কার দুই হাজারেরও বেশি দেব দেবীর অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। এই দেবদেবতাদের মধ্যে স্থান কাল এবং পাত্রের পার্থক্য ছিল। কোনো এক স্থানে যে দেবতা পূজিত হতেন অন্য স্থানে ছিলেন পৃথক কোনো দেবতা। মিশরীয় পুরাণ অনুসারে পুনর্জন্ম, মদ, শস্য তথা উর্বরতার দেবতা ছিলেন ওসাইরিস। পৃথিবী ও আকাশের সঙ্গমে তার জন্ম, প্রকৃতির সম্মিলিত শক্তির প্রতীক বলা চলে তাকে।

তবে তার এই খ্যাতি মেনে নিতে পারেনি তার আপন ভাই সেথ। সেও একজন দেবতা। উশৃঙ্খল ও হিংস্র হিসেবে দুর্নাম আছে দেবতা সেথের। চরম বিশৃঙ্খলা, মরুকরণ ও ঝড়ের দেবতাও সে। আপন ভাই অসিরিসকে হত্যা করে মিশর দখলের পরিকল্পনা ছিল তার। পরবর্তীতে তা বিশাল যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পুরাণ মতে, ভাই অসিরিসসহ অনেক দেবতারই মাথাব্যথার কারণ ছিল সেথ। তার ধ্বংসলীলায় বিরক্ত ছিল দেবরাজ্যের অধিকাংশ সদস্য।

দেবী আইসিস ছোটবেলায় একবার সেথকে লাথি মেরেছিলেন ওসাইরিস। সে অপমান ভোলেনি সেথ। তার উপর পৃথিবীর রাজা হওয়ার লোভ, তাকে পাগল করে তুলেছিল। ইথিওপিয়ার রানির সহায়তায় এক প্রকাণ্ড কাঠের সিন্দুক তৈরি করলেন সেথ। এক মানুষ দীর্ঘ সেই সিন্দুকের গায়ে অসাধারণ কারুকাজ। খুব গোপনে ওই সিন্দুক তৈরি করা হয়েছিল ওসাইরিসের শরীরের মাপে। 

ওসাইরিস বিদেশ ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরলে তার রাজত্বের ২৮ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এক বিরাট ভোজসভার আয়োজন করেন সেথ। ভাইকে সসম্মানে আমন্ত্রণ জানান সেই মহাভোজে। আমন্ত্রণ করেন নিজের ৭২ জন বন্ধু ও অনুসারীকেও। ভোজসভায় সেথ ঘোষণা করেন যার শরীরের মাপের সঙ্গে এই সিন্দুকের মাপ মিলে যাবে তাকেই উপহার দেয়া হবে এই মহার্ঘ সিন্দুক।

আরো পড়ুন: এদেশে কুমারী মেয়ের হয় না বিয়ে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যত অদ্ভুত যৌনরীতি

একে একে সবাই সিন্দুকে শুয়ে দেখলেন। তবে কারোরই মাপের হলো না তা। ভাইয়ের প্রতি অন্ধবিশ্বাসে কোনোরকম সন্দেহ না করেই ওসাইরিস গিয়ে শুয়ে পড়লেন প্রকাণ্ড সিন্দুকে। সিন্দুকে প্রবেশ করার পর রাজা ওসাইরিস দেখলেন তার শরীরের মাপের সঙ্গে সিন্দুকের মাপ একেবারে মিলে গেছে। তবে দুষ্টু সেথ বাইরে থেকে সেই সিন্দুক বন্ধ করে তার উপর ঢেলে দিলো গলানো সীসা। তারপর ওসাইরিসসহ সেই সিন্দুক নিক্ষেপ করা হল নীলনদের জলে। সিন্দুকের ভেতরেই মারা গেলেন ওসাইরিস।

উশৃঙ্খল ও হিংস্র হিসেবে দুর্নাম আছে দেবতা সেথেরযখন ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন ওসাইরিস, তখন তার থেকে বহুদূরে থিবিসের কাছে এক গ্রামে ছিলেন আইসিস। দুর্ঘটনার আঁচ পেয়েই তিনি ছুটলেন স্বামীর খোঁজে। বিরহে , কষ্টে ভেঙে পড়লেও স্বামীর মৃহদেহ যে খুঁজে বের করতেই হবে তাকে। দেহ ছাড়া অন্ত্যেষ্টি হবে না। আর অন্ত্যেষ্টি না হলে আত্মার সদগতিও যে হবে না। শেষে উপায় না দেখে তিনি গেলেন দেবতা থোথের কাছে। জ্ঞানের দেবতা থোথ তাকে বলে দিলেন কোথায় আছে ওসাইরিসের মৃতদেহ ভরা সিন্দুক। অনেক ঝঞ্ঝাট পার করে শেষমেশ স্বামীর মৃতদেহ খুঁজে পেলেন আইসিস। তবে বিপদ কাটেনি তখনও। লোক মারফৎ সে খবর পৌঁছোল সেথের কাছেও। 

আরো পড়ুন: নৃশংসভাবে বলি দেয়া হয় এই কুমারীকে, প্রকৃতিই তাকে করেছে মমি

কালবিলম্ব না করে সেথ ওসাইরিসের দেহ ৪২ টুকরো করে ছড়িয়ে দিলেন সারা মিশরে। তারপর রাজা হয়ে বসলেন পৃথিবীর সিংহাসনে। স্বামী হারানো আইসিস আর উপায় না পেয়ে সেথের স্ত্রী নেফথিসের শরণাপন্ন হলেন। স্বামীর প্রতি নেফথিসের দুর্বলতার কথা তার অজানা ছিল না আইসিসের। দুই বোনে মিলে পাখির রূপ ধরে সারা মিশর চষে তন্নতন্ন করে খুঁজে আনতে লাগলেন ওসাইরিসের দেহ খণ্ডগুলো। খুঁজতে লাগলেন চিল হয়ে, বাজপাখি হয়ে। একে একে খুঁজে পেলেন টুকরোগুলো। স্বামীর সেই দেহাবশেষ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন আইসিস। দেবীর চোখের জলে বন্যা এল নীলনদে।

নেফথিসসময় খুবই অল্প। এরমধ্যেই সব কাজ শেষ করতে হবে। তাই জ্ঞান আর মৃত্যুদেবতার সাহায্য নিয়ে ওসাইরিসের দেহখণ্ডগুলো পরপর সাজিয়ে তাতে প্রাণসঞ্চার করলেন দেবী আইসিস। সেথের কাছে সে খবর পৌঁছলেও রানি ও তার অনুগামীদের ডিঙিয়ে ওসাইরিসের কাছে এবার আর পৌঁছতে পারলেন না অন্ধকারের দেবতা সেথ।

আরো পড়ুন: স্বামীর অজান্তে একই বাড়িতে প্রেমিককে লুকিয়ে রাখেন ১৭ বছর 

রাজার দেহে সাময়িকভাবে প্রাণসঞ্চার হল ঠিকই , কিন্তু উদ্দেশ্য পূরণহলো না। উদ্দেশ্য ছিল, ওসাইরিসের ঔরসে মিশরের যোগ্য উত্তরসূরীর জন্ম। তবে ওসাইরিসের দেহের অন্যান্য টুকরোগুলো খুঁজে পাওয়া গেলেও নীলনদের জলে চিরতরে হারিয়ে গেছে তার পুরুষাঙ্গ। পুরুষাঙ্গ ছাড়া মিলন তো সম্ভব নয়। শেষমেশ এরও সমাধান বের করলেন যাদুর দেবী আইসিস। সোনার এক পুরুষাঙ্গ স্থাপিত হল ওসাইরিসের দেহে। এরপর মিলিত হলেন মৃতরাজা ওসাইরিস ও রানি আইসিস। এই মিলনেরই ফল দেবতা হোরাস।

পুর্নজীবিত হওয়া ওসাইরিস আর আইসিসের মিলনে জন্ম নেয় হোরাসস্ত্রীর শরীরে বীজটুকু রেখে শেষ ঘুমে ঢলে পড়লেন ওসাইরিস। যাতে কোনোভাবেই তার শরীরে পচন না ঘটে, তাই আইসিস আর নেপথিস, জ্ঞানের দেবতা থোথ আর মৃত্যুর দেবতা পুত্র আনুবিস মিলে খুব গোপন পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করলেন রাজার দেহ। এই প্রথম মিশরের ইতিহাসে কোনো মৃতদেহকে পচন আটকাতে মমি করা হল। সেই প্রথম মমি হলেন দেবতা ওসাইরিস। তবে ওসাইরিসের গল্প এখানেই শেষ নয়।

আরো পড়ুন: বাংলার ‘মোগলি’, যার কাহিনী কাঁদায় বিশ্ববাসীকে 

আইসিস যখন গর্ভবতী হয়, তখন চারিদিকে সেথের গুপ্তচর। তাদের হাত থেকে ওসাইরিসের সন্তানকে বাঁচাতেই হবে। তাই নীলনদের তীরে এক প্যাপিরাস বনে নিজেকে লুকোলেন দেবী আইসিস। সেই জঙ্গলেই জন্ম নিল আইসিস পুত্র অমিত ক্ষমতাধর হোরাস। মায়ের কড়া নজরদারি আর দেবতাদের পাহারায় বড় হয়ে উঠল হোরাস। তবে সিংহাসনের উত্তরাধিকার পাবে কী করে! আসল রাজার পুত্র সে, ন্যায়ত ধর্মত তার দাবিই আগে। 

জ্ঞানের দেবথা থোততবে সেথও ছাড়ার পাত্র নয়। আইনের মারপ্যাঁচে সে আটকে দিতে চাইল হোরাসের অধিকার। মামলা চলল দীর্ঘদিন। শেষে ফয়সালা হল, শক্তির লড়াই হবে দুপক্ষের। যুদ্ধে যে জিতবে সিংহাসন তার। মারামারির কত যে প্রতিযোগিতা হল দুজনের! মানুষ - পশুর রূপ ধরে কত টক্কর! প্রতিবারই জিতল হোরাস। তবে এত সহজে দাবি ছাড়ার লোক নন অন্ধকারের রাজা সেথ। শুরু হল তুমুল যুদ্ধ ৷ যুদ্ধে হোরাস ছিঁড়ে নিলেন সেথের অণ্ডকোষ। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে প্রবল আক্রমণ শানালেন সেথ।

আরো পড়ুন: বাংলার বধূর সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠার পেছনে করুণ ইতিহাস

হোরাসের বাম চোখ উপড়ে ছ'টুকরো করে ফেলল সে ৷ সে এক নৃশংস ভয়াবহ যুদ্ধ। যুদ্ধের এক পর্যায়ে হোরাসকে বাগে পেয়ে ধর্ষণের চেষ্টাও করে সেথ। উভকামী সেথের হাত থেকে খুব অল্পের জন্য রক্ষা পায় হোরাস। সেথের বিষাক্ত বীর্য, যা সে হোরাসের শরীরে ঢোকাতে চেয়েছিল, তা হোরাস লুকিয়ে এনে দেয় মা আইসিসকে। সেই বিষ আইসিস মিশিয়ে দেয় সেথের খাবারে। নিজের অজান্তে নিজেরই বীর্য পান করে সেথ। শেষমেশ দেবতাদের হস্তক্ষেপে ইতি পড়ে সেই ভয়ানক যুদ্ধে। 

ওসাইরিসযাদুবিদ্যায় ফিরিয়ে দেয়া হয় হোরাসের বাম চোখ আর সেথের অণ্ডকোষও। হোরাসের এই নতুন বামচোখটি ছিল অলীক ক্ষমতাসম্পন্ন। প্রাচীন মিশরের লোকজন বিশ্বাস করতেন, হোরাসের এই নবলব্ধ দৈবী চোখের অনেক মহিমা। তা শুধু অন্তর্ভেদীই নয়, এ চোখের দৃষ্টি সর্বরোগহর। আর এই বিশ্বাস থেকেই ক্রমশ জনপ্রিয় হতে থাকে হোরাসের চোখের প্রতীক। সেকালে মিশরের নানান ছবিতে, বইয়ে, স্থাপত্যের গায়ে, পিরামিডের ভিতরের কারুকাজে, নানা মূল্যবান ধাতু ও পাথরের উপর, এমনকি মৃতদেহের গয়নার গায়েও আঁকা থাকত এই আই অফ হোরাস।

আরো পড়ুন: ভোগবিলাসে মত্ত রানির কারণেই ফ্রান্স হয় ফকির, ঘটে ‘ফরাসি বিপ্লব’!

চোখ ফিরে পাওয়ার পর হোরাস সিদ্ধান্ত নিলেন বাবা ওসাইরিসকে পুনর্জীবিত করার। নতুন জীবন দেয়ার ক্ষমতা ছিল তার স্বর্গীয় চোখের। ছেলের দৈবী ক্ষমতাবলে আবার প্রাণ ফিরে পেলেন ওসাইরিস। তবে পুনরুত্থান হলেও পৃথিবীতে ফেরা হল না ওসাইরিসের। জীবন পেলেন, কিন্তু জীবিত মানুষের সান্নিধ্যে আর থাকতে রাজি হলেন না তিনি। পৃথিবীর সিংহাসনে ছেলেকে বসিয়ে ফিরে গেলেন পাতালে, সেখানকার অধিপতি হয়ে। শুধু রাজাই নন, নতুন জীবনে ওসাইরিস হলেন পরকালের বিচারক দেবতা।

পুর্নজইবিত হলেও ওসাইরিস পৃথিবীতে থাকতে চাননি মানুষের মৃত্যুর পর তাকে সোজা হাজিরা দিতে হত দেবতা ওসাইরিসের দরবারে। সেখানে তার পাপ পুণ্যের বিচার হত। ফারাওদের মৃত্যুর পর তাদের লাশ যদি ঠিকঠাক সৎকার হত,  যদি ফারাওদের সঙ্গে পরকালে ভোগ করার মতো উপযুক্ত ধনসম্পত্তি দেয়া হত, তাহলে ওসাইরিস তুষ্ট হতেন। মিশরের মানুষ বিশ্বাস করতেন জীবনে ভালো কাজ করলে, সচ্চরিত্র থাকলে, মৃত্যুর পর মমির কাপড়ে ঠিকঠাক মন্ত্র লেখা হলে, তবেই খুশি হবেন ওসাইরিস। 

আরো পড়ুন: বিশ্বের কিছু অবাক করা স্থানের নাম, উচ্চারণ করাই বিব্রতকর

মহাবিচারের পর তাদের জীবিত করে নিজের অনুগামী, অনুচর করে রাখবেন। মৃত্যুর পরও সুখভোগ করবেন ওসাইরিসের অনুগামীরা। আর যারা দুরাচারী, মিথ্যেবাদী, ধর্মভীরু নয়, ওসাইরিসের নির্দেশে শরীর ছিঁড়ে খাবে কুমিরের মাথা, সিংহের শরীর আর জলহস্তির মতো পেছনওয়ালা জন্তু আমিত।

নিজের বীর্য নিজেই পান করেছিল সেথ ওসাইরিসের হাত ধরেই সভ্যতার শুরু। সমাজ জীবনের নিয়ম-কানুন তারই হাতে গড়া। জীবনের দেবতা হিসেবে সেদিনও তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ। ছিলেন শস্য আর উর্বরতার দেবতা। নীলনদের জলে ফসল ফলত তারই দয়ায়। সময়ের সঙ্গে চিরতরুণ আর শান্ত সেই দেবতার সত্যিই পুনর্জন্ম ঘটল। তিনি হয়ে গেলেন পরলোকের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, পাতালদেবতা। 

আশ্চর্য এই বদল। অনেকেই মনে করেন কৃষির উন্মেষ, সমাজজীবনের শুরু থেকে সম্পর্কের জটিলতা পেরিয়ে অধ্যাত্মজীবন তথা পরলোকের প্রতি মোহ- মানবজীবনের এই চরৈবেতি ভাবনার ছবিই আঁকা রয়েছে দেবতা ওসাইরিসের জীবনচিত্রে। আজও প্রবল বর্ষণের পর নতুন ফসল জন্মায় যখন, যখন কালো রাতের শেষে ভোর হয়- মিশরের মানুষ প্রকৃতির বুকে খুঁজে পায় ওসাইরিসের মৃত্যু আর পুনর্জীবনের ছবি।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে