নির্মমভাবে হত্যা করে ফেলা হয় লেকে, হাজারো বছরেও পচেনি নগ্ন মৃতদেহ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ১০ ১৪২৮,   ০৯ রমজান ১৪৪২

নির্মমভাবে হত্যা করে ফেলা হয় লেকে, হাজারো বছরেও পচেনি নগ্ন মৃতদেহ

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৩ ২৩ ডিসেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৭:০৯ ২৩ ডিসেম্বর ২০২০

কথায় আছে প্রকৃতিকে যতটা যত্ন করবেন তার থেকে দ্বিগুণ আপনি ফিরে পাবেন। ঠিক তেমনই এই বগ বডি। বগ বডি হচ্ছে মমি। প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালে তৈরি এই বগ বডির রহস্য মানুষকে প্রতিনিয়ত ভাবিয়ে তুলছে। মমির কথা শুনলেই মরুভূমির মধ্যে হাজার হাজার বছর ধরে পিরামিডে বন্দি থাকা ফারাওদের মনে পড়ে। 

তবে সেসব তো বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে মৃতদেহ সংরক্ষণ করা হত। সেখানে বগ বডি প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়। সবশেষ পাওয়া বগ বডিটি হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের হাতে নিহত রুশ সৈন্যের দেখে মনে হবে রূপালী - ধূসর শরীরের এই মানুষটির শরীরকে যেন খোদাই করা হয়েছে গ্রাফাইট দিয়ে। মনে হবে যেন এইমাত্র মৃত্যু হয়েছে তার । অথচ প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলছেন , তার বয়স কমপক্ষে আড়াই হাজার বছর ! পিট বগের প্রাকৃতিক সুরক্ষা তার মৃতদেহটিকে এতই সুরক্ষিত রেখেছে যে, তার চোয়ালের খোঁচা খোঁচা দাড়ি এখনো অবিকৃত রয়ে গেছে! 

রুশ সৈন্যের বগ বডিএ পর্যন্ত কতোগুলো বগ বডি পাওয়া গিয়েছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই কারো কাছেই। এযাবত আবিষ্কৃত বগ বডিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো হচ্ছে কোয়েলবার্গ নারী। এই মমিটি পাওয়া গিয়েছিল ডেনমার্কের কোয়েলবার্গ অঞ্চলে। আর বিজ্ঞানীদের দেয়া তথ্য অনুসারে এই নারীর জন্ম খ্রিস্টের জন্মের ৮ হাজার বছর আগে। অর্থাৎ এই বগ বডির বয়স দশ হাজার বছরেরও বেশি।

আরো পড়ুন: ১০০ টাকায় মিলবে ইতালির বিভিন্ন শহরে বাড়ি

প্রকৃতি এদের মমি করে রেখেছে  সবচেয়ে বেশি বগ বডি পাওয়া গেছে উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে জার্মানি, ডেনমার্ক, হল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে। এ বগ বডিগুলো বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এরা সবাই লৌহযুগের মানুষ। এদের কারোরই মৃত্যুই স্বাভাবিক হয়নি। এ পর্যন্ত কতগুলো বগবডি থাকতে পারে তার কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।  

আরো পড়ুন: ৫০০ বছরের প্রথা, শুয়ে থাকা নারীর উপর ওঝা হাঁটলেই সন্তান লাভ

এক নারীর বগ বডি থেকে তার মুখের কাল্পনিক আদল তৈরি করা হয়েছে তবে কোনো মতদেহগুলোর শরীরে পোশাক ছিল না। এসব বিশ্লেষণ করে বেশির ভাগ প্রত্নতত্ত্ববিদ ধারণা করেন বগ মানুষদের নির্মমভাবে হত্যা করে পিট বগে ফেলে রাখা হয়েছিল । তখন হয়তো কেউ জানতই না এখানে ফেলে রাখলে মৃতদেহ সংরক্ষিত থেকে যায়। তবে কী কারণে হত্যা করা হয়েছিল এদের? তার সঠিক কোনো তথ্য নেই। কারো মতে হয়তো দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি দেয়া হয়েছিল এদের। আবার কেউ বলেন কোনো অপরাধের কারণে এদের হত্যা করা হয়েছে। ঘটনা যাই হোক না কেন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব মৃতদেহের স্থান হত পিট বগে।

আরো পড়ুন: বাংলার ‘মোগলি’, যার কাহিনী কাঁদায় বিশ্ববাসীকে

রেড ফ্রাঞ্জ নামে আরেক বগ মানুষের ছিল লাল চুল ও লাল দাড়ি , গলায় তার দীর্ঘ একটি কাটা দাগ। ধারণা করা হয়, তার মৃত্যু হয়েছে আজ থেকে দুই হাজার বছর আগে । অনেক চেষ্টা করেও মেলেনি কোনো উত্তর। তবে কখন কোথায় কোন জলাভূমিতে এই মমি উদ্ধার হবে তার কোনো ঠিক নেই। এই মমিগুলো কীভাবে হাজার হাজার বছর পেরিয়ে টিকে আছে তা এক রহস্যই বটে। যেখানে আসল মমির রহস্যই আজ পর্যন্ত আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি, সেখানে হাজার বছর বয়সী এই মমিগুলো মানুষের মনে রহস্য ও আগ্রহের জন্ম দেবে এটাই স্বাভাবিক।

মমিগুলো পাওয়া যায় জলাভূমিতে মিশরীয় মমিগুলোর বয়স পাঁচ- ১০ হাজার বছরেরও বেশি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এগুলোই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো বা বয়স্ক মমি। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। আশ্চর্য হলেও সত্য এর চেয়ে বেশি বয়সী মমিও পৃথিবীতে রয়েছে। আর তার চেয়েও বড় বিষয় মিশরীয় কারিগরদের মতো এসব মমিগুলোর সুনির্দিষ্ট কোনো স্রষ্টা নেই। মানুষের চেষ্টা ছাড়াই তৈরি হয়েছে ওগুলো! পৃথিবীজুড়ে এই সংরক্ষিত মৃতদেহকে বলে বগ বডি বা জলাজমির মানুষ! এই জমিতে পড়লেই নানা রাসায়নিক কারণে মৃতদেহ সংরক্ষিত হয়ে পরিণত হয় বগ বডিতে। 

আরো পড়ুন: বাংলার বধূর সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠার পেছনে করুণ ইতিহাস

সময়ের আবর্তে কিংবা আবিষ্কারের পর সংরক্ষণের অভাবে অনেক বগ বডিই নষ্ট হয়ে গেছে। আর আবিষ্কৃত এসব মমিগুলোকে বলে বগ মানুষ। আবিষ্কারের পর থেকেই বিজ্ঞানীরা বগ বডিসের আদ্যোপান্ত জানার চেষ্টা করেছেন। বগ মানুষের শরীর বিশ্লেষণ করে তাদের সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ এই বডিগুলো হাজার হাজার বছর আগেকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে। জানা গেছে কয়েক হাজার বছর আগে ইউরোপের মানুষের জীবনযাত্রা কেমন ছিল। এও জানতে পেরেছেন তাদের খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। ফরেনসিক বিশ্লেষণের আধুনিকতম কৌশল ব্যবহার করে চেষ্টা করা হচ্ছে বগ মানুষের রহস্য পরিপূর্ণভাবে উন্মোচনের। তাতে আরও কত সময় লাগবে কে জানে।

এ পর্যন্ত কতটি বগ বডি পাওয়া যায় তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই যুক্তরাষ্ট্রের 'কার্নেগি মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি'তে প্রাকৃতিক উপায়ে মমিকৃত সাতটি বগ বডি সংরক্ষিত আছে। এগুলোর মধ্যে বিখ্যাত একটি বগ বডি হচ্ছে ইড গার্ল নামের এক কিশোরীর বডি। এটির বয়স দুই হাজার বছরেরও বেশি। এটিকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল হল্যান্ডে। এই বডিটিকে দেখে সহজেই বোঝা যায় যে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল। অন্যান্য বগ বডিগুলোর মতোই তার ভাগ্যে নেমে এসেছিল নির্মমতা। যে দড়িটি দিয়ে তার শ্বাসরোধ করা হয়েছিল সেটির দাগ এখনো তার গলায় আছে। কিন্তু কেন এই কিশোরীর জীবনে নেমে এসেছিল এই নির্মমতা? নাকি কোনো অপরাধের জন্য তার এই শাস্তি? এ রকম অনেক প্রশ্নের উত্তরই আমাদের অজানা। এরপরও বিজ্ঞানীরা ইতিহাস খুঁড়ে জানতে চাইছেন আরও অজানা সব গল্প। যা ভাবতে গেলেই গা শিউরে ওঠে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে