নিষ্ঠুর বাবা-মা, সন্তানকে ঘরে বন্দি রেখে চালিয়েছেন নির্যাতন

ঢাকা, রোববার   ১৭ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৩ ১৪২৭,   ০২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নিষ্ঠুর বাবা-মা, সন্তানকে ঘরে বন্দি রেখে চালিয়েছেন নির্যাতন

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৫৬ ২ ডিসেম্বর ২০২০  

ছবি: নিষ্ঠুর বাবা-মা কর্তৃক নির্যাতিত সন্তানরা

ছবি: নিষ্ঠুর বাবা-মা কর্তৃক নির্যাতিত সন্তানরা

বাবা-মা একটি সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। আর সেই বাবা-মা কিনা দিনের পর দিন সন্তানকে ঘরে বন্দি রেখে চালিয়েছেন নির্যাতন। আজ তেমনই কয়েকজন নিষ্ঠুর বাবা-মায়ের অমানবিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানানো হবে।

এদের কেউবা সন্তানকে ৩০ বছর ধরে নিজ ফ্ল্যাটে আটকে রেখেছেন। আবার কেউবা মেয়ের ভালোবাসার অপরাধে তাকে ২৫ বছর ঘরে বন্দি করে রেখেছেন। আর এক নিষ্ঠুর বাবা তার ছোট্ট মেয়েকে জন্মের পর থেকে ১৩ বছর যাবত ঘরের বাইরে বের হতে দেননি। তাকে ছোট্ট একটি চেয়ারে বেঁধে রাখেন বছরের পর বছর।

আরো পড়ুন: ভালোবাসার অপরাধে টানা ২৫ বছর গৃহবন্দি করে রাখেন তার মা!

৩০ বছর ধরে মা আটকে রাখলেন ছেলেকে

নিজের ছেলেকে প্রায় ৩০ বছর ধরে ফ্ল্যাটে বন্দী করে রেখেছিল এমন সন্দেহে সুইডেনের পুলিশ সম্প্রতি এক মাকে গ্রেফতার করেছে। স্টকহোমের উপকণ্ঠে এই ঘটনা ঘটেছে। তবে গ্রেফতার হওয়া মা তার ছেলেকে বন্দী করে রাখা এবং তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করার কথা অস্বীকার করেছেন।

যে ছেলেকে প্রায় ৩০ বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছিল বলে বলা হচ্ছে, তার বয়স এখন ৪০। তাকে ফ্ল্যাটের মধ্যে খুবই নোংরা পরিবেশে আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। লোকটির মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। তখন রোববার ঘটনাচক্রে ফ্ল্যাটে যাওয়া একজন আত্মীয়া ছেলেটিকে সেখানে আবিষ্কার করে। তাকে এখন হাসপাতালে তার আঘাতের জন্য চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

আরো পড়ুন: স্বামীর অজান্তে একই বাড়িতে প্রেমিককে লুকিয়ে রাখেন ১৭ বছর

অজ্ঞাতনামা এক আত্মীয়া এবং তার সঙ্গী রবিবার সন্ধ্যায় এই ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন ওই মায়ের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেছেন এ খবর শুনে। এই আত্মীয়া জানিয়েছেন, তিনি সর্বশেষ এই ফ্ল্যাটে গিয়েছেন ২০ বছর আগে। সেসময় তিনি ওই ছেলেটির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে সবাইকে সতর্ক করে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

এই বাড়িতেই আটকে রাখা হয় ছেলেটিকেছেলেটির বয়স যখন ১১ বা ১২ তখন থেকে তাকে স্কুলের খাতা থেকে নাম কেটে ঘরে নিয়ে আসা হয়েছিল। নভেম্বরের ২৯ তারিখে এই নারী ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দেখেন এটি একেবারে অন্ধকার, ধুলায় ঢাকা। সেখান থেকে মূত্র, ময়লা-আবর্জনার পঁচা গন্ধ বে হচ্ছে।

যখন তিনি হ্যালো বলে ডাক দেন, তার জবাবে কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। এরপর তাকে স্তুপ হয়ে থাকা জিনিসপত্রের মাঝ দিয়ে ঘরে ঢুকতে হয়। রান্নাঘরে শব্দ শুনতে পেয়ে তিনি দেখেন অন্ধকারে এক কোনায় একটা লোক বসা। বাইরে থেকে রাস্তার সড়ক বাতির আলোয় তাকে দেখা যাচ্ছিল। তার পা থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঘা হয়ে গেছে।

আরো পড়ুন: জন্মের পর থেকেই মেয়েকে ১৩ বছর ঘরে বন্দী রেখে নির্যাতন করেছে বাবা!

এই নারী সুইডেনের একটি সংবাদপত্রকে জানিয়েছেন, লোকটি যখন তাকে দেখেন, তিনি উঠে দাঁড়ান এবং তার নাম ধরে বারবার ডাকতে থাকেন। লোকটির প্রায় সব দাঁত পড়ে গেছে এবং তার কথা ছিল অস্পষ্ট। তিনি বলেন, এত বছর পরেও লোকটি তাকে চিনতে পেরেছে এবং তাকে দেখে ভয় পাচ্ছিল না।

যে নারী এই লোকটিকে ফ্ল্যাটে গিয়ে খুঁজে পান, তিনি সুইডেনের পাবলিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ককে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, লোকটির মা এর আগে তার আরেকটি সন্তান হারিয়েছিলেন। সেটি নিয়ে তিনি মুষড়ে পড়েছিলেন। দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর তিনি তার নাম রাখেন আগের সন্তানের নামে। তিনি তার মৃত সন্তানকে ফিরে পেতে চাইছিলেন এবং নতুন সন্তানকে খুব বেশি আগলে রাখতে চাইতেন। আর সে কারণেই হয়ত এই মা নিষ্ঠুরভাবে তার সন্তানকে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ঘরে বন্দি করে রাখেন।

মেয়ের ভালোবাসার অপরাধে ২৫ বছর আটকে রাখলেন মা

ব্ল্যাঞ্চ মনিয়েরব্ল্যাঞ্চ মনিয়ের এক ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেয় ১৮৪৯ সালের ১লা মার্চ। ছোটবেলায় যত না সুন্দর ছিল ব্ল্যাঞ্চ, বড় হবার সঙ্গে রুপ যেন সমানুপাতিক হারে বাড়তে থাকে তার। মেয়ের রুপ নিয়ে অহংকারের শেষ নেই মায়ের। মেয়ে তখন পূর্ণ যুবতী।

তার বয়স ২৫ বছরস। মা তার পছন্দ করা অভিজাত পরিবারের এক পাত্রের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করলো ব্ল্যাঞ্চের। কিন্তু ততদিনে ব্ল্যাঞ্চ মন দিয়ে বসে আছে অন্য একজনকে। পেশায় সে সাধারণ একজন উকিল। পরিবারও সাদামাটা একদম।

ব্ল্যাঞ্চ তার পছন্দের মানুষটিকে মায়ের সামনে নিয়ে আসে। তবে পারিবারিকভাবে অভিজাত ও স্বনামধন্য না হওয়ায় তার সঙ্গে বিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায় মা। তার পছন্দ করা পাত্রকেই বিয়ে কর‍তে হবে ব্ল্যাঞ্চকে- এ কথা জানিয়ে দেয় সে। 

তবে এই সিদ্ধান্ত মানতে রাজি না হলে ব্ল্যাঞ্চকে একটি ছোট রুমে আটকে রাখে তার মা। কড়াভাবে তাকে জানিয়ে দেয়া হয়- সেদিনই এ ঘর থেকে মুক্তি পাবে ব্ল্যাঞ্চ, যেদিন তার মায়ের সিদ্ধান্ত মেনে নিবে সে। তবে মায়ের মতো মেয়েও তার সিদ্ধান্তে অটল। বিয়ে যদি করতেই হয়, ভালোবাসার মানুষটিকেই করবে সে, অন্য কাউকে নয়!

ব্ল্যাঞ্চ মনিয়েরের নিষ্ঠুর মাবছরের পর বছর চলে যায়, ব্ল্যাঞ্চ তার সিদ্ধান্তে থাকে অনড়। মায়ের অহংকারী-জেদী মনও গলে না। ফলে মুক্তিও আর মেলে না। ১৮৮৫ সালে, ব্ল্যাঞ্চের ভালোবাসার মানুষটি মারা যাওয়ার পরও তাকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়!

অতঃপর, ২৫ বছর পর, ১৯০১ সালে, প্যারিসের এটর্নি জেনারেলের কাছে বেনামে একটি চিঠি পৌছে। কে বা কারা চিঠিটি পাঠিয়েছে, কখনোই তা জানা যায়নি। সেখানে লেখা থাকে- মনিয়ের পরিবার বহু বছর ধরে তাদের বাড়িতে আটকে রেখেছে এক ব্যক্তিকে।

মনিয়ের পরিবারের সামাজিক অবস্থানের কথা চিন্তা করে প্রথমে না চাইলেও পরে তদন্ত চালাতে নির্দেশ দেন জেনারেল। এই ২৫ বছরে বাইরের আলো-বাতাস থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল সে। তার চেহারাও বিদঘুটে হয়ে গেছে। তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। সে সময় তার ওজন ছিল মাত্র ২২ কেজি! 

তবে বিগত ২৫বছরের ভয়াবহ স্মৃতি মাথা থেকে কিছুতেই মুছে ফেলতে পারেনি মনিয়ের ব্ল্যাঞ্চ। ফলে গুরুতর মানসিক সমস্যা দেখা দেয় তার। তাকে ভর্তি করা হয় ফ্রান্সের এক সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে। ১৯১৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত, জীবনের বাকিটা সময় এখানেই কাটায় সে। ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করতে চাওয়ার ‘অপরাধে’ এই শাস্তি পেতে হলো তাকে।

ছোট্ট মেয়েকে আটকে রাখেন নিষ্ঠুর বাবা

জেনি উইলি ও তার নিষ্ঠুর বাবাজেনি উইলি ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যঞ্জেলেসে ১৯৫৭ সালের জন্মগ্রহণ করে। সে জন্মের পর থেকেই ভয়াবহ নির্যাতন এবং অবহেলার শিকার হতে শুরু করে। এর ফলে সে একাকীত্বকে সঙ্গে নিয়েই বেড়ে উঠছিল। কারণ জেনির বাবা ক্লার্ক উইলি শিশুদের একেবারেই পছন্দ করতেন না। তিনি কখনো চাননি তার ঘরে কোনো সন্তানের জন্ম হোক। তারপরও একটি নয় বরং চার সন্তানের পিতা হন নিষ্ঠুর ক্রার্ক। 

জেনি উইলির শৈশব ছিল বিভীষিকাময়। আরএইচ অসম্পূর্ণতা ব্যাধি নিয়ে তার জন্ম হয়। তার শরীরের ওজন অনেক কম ছিল। জেনির বাবা তার কান্নার শব্দ খুবই অপছন্দ করত। এজন্য জেনির আবাসস্থল হয়ে ওঠে একটি অন্ধকার ঘর। তাকে সেখানেই আটকে রাখা হত। ক্লার্কের ধারণা ছিল, তার মেয়ে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। এজন্য তাকে একাকী আটকে রাখাই ক্লার্ক সামাধান হিসেবে ভেবেছিল। 

জেনিকে ১৩ বছর ধরে অস্থায়ী স্ট্রেইট জ্যাকেটে একটি চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। অল্প কিছু খাদ্য, মাঝে মধ্যে সিদ্ধ ডিম এবং তরল খাবার খেতে দেয়া হত জেনিকে। একই সঙ্গে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে থাকে জেসি। যে কারণে তার মৌলিক মানবিক দক্ষতাগুলো বিকশিত হয়নি। এমনকি কারো সঙ্গে মেলামেশা না করায় সে কথা পর্যন্তও বলতে শেখেনি। বছরের পর বছর ধরে ক্লার্কের হাতে অত্যাচারের শিকার হয়ে জেনি আংশিক অন্ধত্ব বরণ করেছিল।  

মায়ের কোলে জেনি উইলি১৯৭০ সালে জেনির বয়স ১৩ বছর পূর্ণ হয়। তার উপর যে অমানবিক অত্যাচার হচ্ছিল তার মা ডরোথি আর সহ্য করতে না পেরে স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটান। এরপর তার চিকিৎসা শুরু হয়। বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান, জেনির বয়স ১৩ বছর হলেও সে মানসিকভাবে এখনো এক বছরের শিশুর ন্যায়। 

সে শারীরিক এবং মানসিকভাবে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। তার মানসিক পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী মনোবিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারা আশা করেছিলেন, জেনি কথা বলা এবং অন্যান্য বিষয় শেখার দক্ষতা অর্জন করলে তার অবস্থার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। 

জেনি বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি অ্যাডাল্ট ফোস্টার কেয়ারে বসবাস করে। বর্তমানে সেই ভয়াবহ সময় পার করে কিছুটা শান্তি খুঁজে পেয়েছে জেনি। পূর্ণ বয়স্ক হওয়ার পর সে কিছুটা ভাষা শিখেছে। ২০০১ সালে জেনির জীবনের ভয়াবহ গল্প অবলম্বনে ‘মকিংবার্ড ডোন্ট সিং’ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস