নারী হওয়ায় ‘ডিএনএ’ আবিষ্কার করেও কৃতিত্ব পাননি

ঢাকা, শুক্রবার   ২২ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৮ ১৪২৭,   ০৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নারী হওয়ায় ‘ডিএনএ’ আবিষ্কার করেও কৃতিত্ব পাননি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৪২ ২৯ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৫:৪৭ ২৯ নভেম্বর ২০২০

ছবি: রোজালিন্ড

ছবি: রোজালিন্ড

তখনকার সময়ে নারীর উচ্চশিক্ষা বিষয়ে কেউ চিন্তাও করতে পারত না। সেই সময়টাতেই সব বাঁধা অতিক্রম করে নিজের জেন নিয়ে এগিয়ে যান এক নারী। তার ইচ্ছা ছিলো একজন বিজ্ঞানী হওয়া। শত কষ্টেও তিনি তার স্বপ্ন পূরণ করেছেন। তবে যে স্বপ্ন পূরণে পুরোটা জীবন পার করেছেন তিনি, সে কাজটি সফল হলেও তার মূল্যায়ন পাননি।

বলছি, অণুজীববিজ্ঞানী রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনের কথা। অনেকের মতে, জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত নারী বিজ্ঞানী। তাকে ‘ডার্ক লেডি অব ডিএনএ’ নামেও ডাকা হয়। এই বছর রোজালিন্ডের জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হয়েছে। 

আরো পড়ুন: পুরুষ হয়েও প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবির নায়িকা তিনি, ছিলেন ওয়েটার

ডিএনএ অণুর প্যাঁচানো সিঁড়ির মতো গঠন আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। তবে নারী হওয়ায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তার আবিষ্কারের কৃতিত্ব মেলেনি। তার কৃতিত্বের কথাও বহু বছর ছিল অন্ধকারে। তার জীবনের অজানা কাহিনী নিয়েই আজকের আয়োজন-

মেধাবী রোজালিন্ড

২৫ জুলাই, ১৯২০ সাল। লন্ডনের নটিংহিল শহরে এক সম্পন্ন ইহুদি পরিবারে রোজালিন্ডের জন্ম। তিনি অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ব্যাংকার বাবার পাঁচ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে রোজালিন্ড এলসি ফ্রাঙ্কলিনের জন্ম। ছোটবেলা থেকেই যৌক্তিকতা পছন্দ করতেন রোজালিন্ড। 

আরো পড়ুন: দুর্ধর্ষ হীরা চোর, মানুষের সামনেই উধাও করেন কোটি টাকার অলঙ্কার

ছোটোবেলা থেকেই তার পছন্দ ছিল যে কোনো বিষয়ের ‘কারণ, প্রমাণ এবং বাস্তব সত্য’ অনুসন্ধান করা। পরীক্ষা করে নিজে যতক্ষণ না পর্যন্ত সন্তুষ্ট হচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তার কাজ চালিয়েই যেতেন, কখনও কারো সাহায্য নিতেন না, যে কোনো পরীক্ষা তিনি একা নিজেই করতেন যে কারণে পরবর্তীতে ওয়াটসন-ক্রিকের কাছে ডিএনএ আবিষ্কারে তিনি পিছিয়ে পড়েন।

রোজালিন্ডবিজ্ঞানী রোজালিন্ড

দুর্দান্ত মেধাবী মেয়েটি ১৫ বছর বয়সেই বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। রক্ষণশীল ইংরেজ সমাজে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা তখনও খুব সহজ ছিল না। রোজালিন্ডের বাবাও চেয়েছিলেন মেয়ে সমাজকর্মী হোক। তবে জেদি মেয়েটি শেষ অবধি কেমব্রিজের নিউয়েনহ্যাম কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যা আর রসায়নবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। 

যোগ দেন ব্রিটিশ কোল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন-এর অধীনে কয়লার গঠন নিয়ে গবেষণায়। এই কাজের উপর পাঁচটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে তিনি ১৯৪৫ সালে পিএইচডি ডিগ্রি পান। পদার্থের গঠন বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি তখন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। 

আরো পড়ুন: ভোগবিলাসে মত্ত রানির কারণেই ফ্রান্স হয় ফকির, ঘটে ‘ফরাসি বিপ্লব’!

কারণ এই পদ্ধতিতে কেলাসিত বা ক্রিস্টালাইন পদার্থের অন্দরমহলে পরমাণুর বিন্যাস অবধি বোঝা যায়। ফ্রান্সের এক গবেষণাগারে যোগ দিয়ে রোজালিন্ডও এই নতুন বিষয়টিতে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করলেন। এক দিকে জৈব অণুর ছবি তোলা, অন্যদিকে উচ্চ তাপমাত্রায় কার্বনের গ্রাফাইটে পরিণত হওয়ার অন্তর্নিহিত কারণ খুঁজে বার করা, দুইয়ে মিলে রোজালিন্ড গবেষণার জগতে বেশ পরিচিত নাম হয়ে উঠছিলেন। 

ডিএনএ যেভাবে আষ্কিার হলো

এমন সময়ে লন্ডনের কিংস কলেজে তিন বছরের জন্য এক গবেষকের পদ নিয়ে ১৯৫১ সালে তিনি লন্ডনে ফিরলেন। তখন কিংস কলেজের বায়োফিজিক্স বিভাগের প্রধান ছিলেন স্যর জন র‌্যান্ডল। বিশেষভাবে এক্স-রে ব্যবহার করে ডিএনএ-র উপর গবেষণা করার জন্যই তিনি রোজালিন্ডকে নিয়োগ করেছিলেন। 

সেই সময়ে কিংস কলেজে ডিএনএ নিয়ে কাজ করছিলেন মরিস উইলকিন্স। তিনি ধরে নিলেন, রোজালিন্ড তার অধীনেই কাজ করবেন। তবে রোজালিন্ডের যথেষ্ট প্রস্তুতি আর স্বাধীন ভাবনাও ছিল। ফলে তিনি মোটেই উইলকিন্সের অধীনে থাকতে চাইলেন না। এর জন্য কিংস কলেজে সেই সূচনাপর্ব থেকেই রোজালিন্ডের সঙ্গে উইলকিন্সের তেমন বনিবনা হল না। 

রোজালিন্ডতবে রোজালিন্ডের নিজের কাজ ভালোই এগোতে লাগল। ডিনএনএ-কে কেলাসে পরিণত করা, তারপরে এক্স-রে ব্যবহার করে ছবি তোলা, দুই-ই সে সময় ছিল দুঃসাধ্য কাজ। রোজালিন্ড তার কাজের জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি সূক্ষ্ম তন্তুর মতো ‘কাফ থাইমাস ডিএনএ স্যাম্পল’ ব্যবহার করেছিলেন। 

তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বানিয়ে নিয়েছিলেন জৈব অণুর পক্ষে উপযুক্ত এক এক্স-রে ক্যামেরা। যার সাহায্যে ছবিও উঠতে লাগল চমৎকার। বিভিন্ন আলোচনা চক্রে রোজালিন্ড সে সমস্ত ফলাফল দেখাতেও লাগলেন।

আরো পড়ুন: হাজার কোটি সম্পত্তির মালিক ৬-৭ বছরের খুদেরা

একই সময়ে ডিএনএ-র গঠন নিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছিলেন জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক। ডিএনএ হলো এক অতিমাত্রায় লম্বা অণু। যার গঠনের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য সুগার আর ফসফেট অণু। অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, থাইমিন ও সাইটোসিন, এই চার রকম নিউক্লিয়োটাইড বেস জুড়ে এর কাঠামোটি তৈরি। 

ডিএনএ যদি একটা মালা হয়, তাহলে এই অণুগুলো হবে মালার পুঁতি। ওয়াটসন ও ক্রিক ডিএনএ অণুর রাসায়নিক সঙ্কেত থেকে জটিল গাণিতিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন পরমাণু দূরত্ব এবং কোণ বিশ্লেষণ করে সুগার-ফসফেট-বেসগুলো কী ভাবে সাজানো থাকে, তার একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। গাণিতিক বিশ্লেষণের সঙ্গে তাদের দরকার ছিল পরিষ্কার এক্স-রে চিত্র, যেটা তাদের গবেষণাগারে তখন পাওয়া যাচ্ছিল না।    

ফটোগ্রাফ ৫১

রোজালিন্ড-এর তোলা কেলাসাকার ডিএনএ-র এই ছবিই ছিল প্রাণের রহস্য বুঝে ওঠার প্রধান চাবিকাঠি। অন্যদিকে রোজালিন্ড এক্স-রে ছবি এবং অন্যান্য বিশ্লেষণ থেকে বুঝতে পেরেছিলেন, ডিএনএ অণু আসলে দু’ছড়া হার বা মালার মতো একটা যুগ্ম গঠন। যার বাইরের দিকে আছে সুগার আর ফসফেট অণুগুলো। 

রোজালিন্ডতিনি এটাও বুঝেছিলেন, চারপাশে জলের অণুর উপস্থিতির তারতম্যে ডিএনএ দু’রকম রূপে ধরা দেয়, ‘এ’ আর ‘বি’। তবে গোটা বিষয়টায় নিঃসন্দেহ না হয়ে তিনি ছবি সমেত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করতে চাননি। 

১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসের শেষে ওয়াটসন কিংস কলেজে এলেন। সেই সময়ে উইলকিন্স তাকে রোজালিন্ডের তোলা একটা এক্স-রে ফোটোগ্রাফ দেখতে দেন, যা পরবর্তীতে ‘ফোটোগ্রাফ ৫১’ নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। সেই ছবি দেখে ওয়াটসনের মাথায় বিদ্যুত খেলে গেল। 

ডিএনএ-র প্যাঁচালো চেহারাটা ছবির মতো ভেসে উঠল তার চোখে। নিজের পিএইচ ডি-র সময় থেকে উনি এই রকম দ্বি-সূত্রক বা ডাবল স্ট্র্যান্ডেড অণু নিয়ে কাজ করেছেন। তাই ছবিটা দেখে উনি অতি সহজে অনেকটা বুঝে গেলেন। 

কিংস থেকে ফেরার পথে চরম উত্তেজিত ওয়াটসন ছবিটা নিজের হাতেই নোটবইতে যতটা সম্ভব একে ফেললেন। ফিরেই ফ্রান্সিসকে বোঝাতে হবে এই দ্বি-সূত্রক গঠনই আসলে ঠিক। কারণ জীববিজ্ঞানে বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসকেই জোড়ায় জোড়ায় থাকতে দেখা যায়।   

মিলল না আবিষ্কারের কৃতিত্ব

রোজালিন্ডের তোলা ছবির হাত ধরে ক্রিক তার গণনার জন্য দরকারি তথ্য পেয়ে গেলেন এবং নতুন করে কাজ শুরু করলেন। শুধু ছবিটাই নয়, ক্রিস্টালোগ্রাফির যে খুঁটিনাটি তথ্য দরকার ছিল, তাও ক্রিক পেয়ে গিয়েছিলেন। মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের এক আলোচনা চক্রের সূত্রে রোজালিন্ডের কাজের ছবি ও তথ্য গিয়েছিল কাউন্সিলের অধিকর্তা ম্যাক্স পেরুজের কাছে। 

ফোটোগ্রাফ ৫১তিনি চুপচাপ সেটা লরেন্স ব্র্যাগকে এবং ব্র্যাগ সেটা ক্রিককে পাঠিয়ে দেন। রোজালিন্ডের নোটবুক জানাচ্ছে, ২৪ ফেব্রুয়ারি নাগাদ তিনি যাবতীয় তথ্য ব্যাখ্যা করে উঠতে পারছেন। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারির সেই শেষ সপ্তাহেই ডিএনএ-র মডেল শেষ করে ঘুমোতে যাচ্ছেন ফ্রান্সিস ক্রিক। 

ডিএনএ যে দ্বি-সূত্রক এক অণু এবং এর সূত্র দু’টি প্যাঁচালো এবং পরিপূরক, একটা ডান দিকে পাক খেলে দ্বিতীয়টা বাঁ দিকে পাক খায়, নিউক্লিয়োটাইডগুলোর যে অসংখ্য বিন্যাস হতে পারে এবং এই বিন্যাসের তারতম্যই যে জীবজগতের যাবতীয় বৈচিত্রের গোড়ার কথা এসব কিছুই ব্যাখ্যা করে ১৯ মার্চ পেপার লিখছেন রোজালিন্ড। 

সেই পেপার জার্নালে পাঠানোর আগেই ওয়াটসন ও ক্রিক তাদের ডিএনএ মডেল দেখাতে কেমব্রিজে ডেকে পাঠাচ্ছেন রোজালিন্ড আর উইলকিন্সকে। ঠিক করা হলো, ডিএনএ মডেল ওয়াটসন-ক্রিকই প্রকাশ করবেন। তার সপক্ষে পরীক্ষামূলক প্রমাণ হিসেবে রোজালিন্ড-উইলকিন্স তাদের পেপার প্রকাশ করবেন। 

১৯৫৩ সালের ১৮ এপ্রিল নেচার পত্রিকায় প্রথম ছাপা হলো ওয়াটসন-ক্রিকের ডিএনএ মডেল, পেপারে কিংস কলেজে তাদের সহকর্মীদের ‘অপ্রকাশিত’ পরীক্ষালব্ধ প্রমাণের কথা উল্লেখ থাকল। ২৫ এপ্রিল নেচার-এ আলাদাভাবে প্রকাশিত হলো ফ্রাঙ্কলিন-গসলিং আর উইলকিন্স ও সহকর্মীদের দুটো পেপার। 

ওয়াটসন ও ক্রিকরোজালিন্ড তার পেপারে একটা নোট সংযোজন করলেন, এই কাজ এই জার্নালেই আগে প্রকাশিত তাত্ত্বিক ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, সবই ঠিক হলো। শুধু রোজালিন্ড জানতেও পারলেন না যে, তার কাজ থেকে অন্তত দু’বার তথ্য নিয়েছেন ওয়াটসন-ক্রিক।

এরপর রোজালিন্ড লন্ডনেরই বারবেক কলেজে কাজ শুরু করেন। এবার বিষয়, টোবেকো মোজেয়িক ভাইরাস। তিনি এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি ব্যবহার করে দেখালেন, টিএমভি-র গঠন ফাঁপা নলের মতো। পোলিও ভাইরাসের উপরও কাজ করছিলেন তিনি, সাফল্যও আসছিল। 

এই সময় জীবন তার সঙ্গে শ্রেষ্ঠ রসিকতাটা করল। জরায়ুর ক্যান্সার তাকে কেড়ে নিল মাত্র ৩৮ বছর বয়সে (১৯৫৮)। সুতরাং ভাবার সুযোগ থেকে গেল যে, রোজালিন্ড বেঁচে থাকলে ওয়াটসন-ক্রিক-উইলকিন্স-এর সঙ্গেই নোবেল পুরস্কার পেতেন। তবে ওয়াটসন-ক্রিক তাদের নোবেল পুরস্কারের বক্তৃতায় রোজালিন্ডের কথা উল্লেখ করেননি। 

বিখ্যাত বিজ্ঞানী লিনাস পাউলিংও সব কিছু জেনেশুনে ‘বি’-ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কারের কৃতিত্ব উইলকিন্সকে দিয়েছিলেন। তবে রোজালিন্ড তখন এ সবের ঊর্ধ্বে। কেন ওয়াটসন বা ক্রিক রোজালিন্ডকে ওই ৫১ নম্বর ছবির কথা জানালেন না, আর কেনই বা পেরুজ চুপিচুপি ক্রিকদের তথ্য সরবরাহ করলেন? নিরপেক্ষভাবে দেখলে বলতে হয়, শুধু পেশাগত ঈর্ষা ছাড়াও একটা মেয়ের এগিয়ে যাওয়াকে সহ্য করতে না পারাও এর একটা কারণ হতে পারে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস