ঢাকায় যেদিন প্রথম বিজলি বাতি জ্বলে

ঢাকা, রোববার   ১৭ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৪ ১৪২৭,   ০২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ঢাকায় যেদিন প্রথম বিজলি বাতি জ্বলে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩৫ ২৮ নভেম্বর ২০২০  

ছবি: ঢাকার রাস্তায় প্রথম বিজলি বাতি

ছবি: ঢাকার রাস্তায় প্রথম বিজলি বাতি

১৯ শতকের শেষের দিকের কথা। ঢাকা পূর্ববঙ্গের প্রধান শহর হলেও কলকাতার সঙ্গে দৃশ্যমান পার্থক্য অনেক। কলকাতার রাস্তায় দেখা যায় সেই ১৮৫৭ সাল থেকেই গ্যাস বাতির ব্যবহার। আর এদিকে রাত নামলে পূর্ববঙ্গের বিস্তৃত জনপদে নেমে আসে অন্ধকার। 

ঢাকা শহর আর গ্রামের মধ্যে তখন আর আলাদা করে চেনার উপায় থাকে না। শহরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় কেরোসিন বাতির ব্যবস্থা করা হতো। এই বাতিগুলো হালকা বাতাস কিংবা বৃষ্টি আসলে বন্ধ হয়ে যেত। আর সে সময় এখানে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার।

যদিও তখনকার সময় ধনী ব্যক্তিদের ঘরে ঝাড়বাতির চল আছে। বাদ বাকি সবাই চলে হারিকেন, কুপি বাতি আর মোমের আলোয়। ১৮৮৬ সালে ব্রিটিশ সরকার নবাব আবদুল গণিকে নাইট কমান্ডার অব দ্য স্টার অব ইন্ডিয়া (কে.সি.এস.আই) উপাধিতে সম্মানিত করে। 

পুত্র নবাব আহসানউল্লাহ বাবার এই প্রাপ্তিকে স্মরণীয় রাখার জন্য ঢাকার রাস্তায় গ্যাস বাতির ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেন। নবাবের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, সড়কে তেলের বাতির পরিবর্তে গ্যাস বাতির উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে নানা কারণে বিলম্বিত হতে থাকে গ্যাস বাতি স্থাপনের কাজ। 

এরই মধ্যে কেটে যায় ১২ বছরেরও বেশি সময়। মানব সভ্যতার ইতিহাসে আগমন ঘটে এক নতুন শতাব্দীর। ঢাকার রাস্তায় তবু গ্যাস বাতির দেখা মেলে না। নবাব আহসানউল্লাহ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার কথা রাখতে পারলেন। এবার আর শুধু গ্যাস বাতি নয়, তিনি ঢাকাবাসীকে চমকে দিলেন সরাসরি বিজলি বাতি ব্যবস্থা করে।  

তার মৃত্যুর মাত্র নয়দিন পূর্বে স্বপ্ন পূর্ণ হলো, রাখলেন নগরবাসীকে দেয়া দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি। প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হলো। ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে জ্বলে উঠলো বিজলি বাতি আলোয়। আলো জ্বলল হলো নবাবের প্রিয় আহসান মঞ্জিলেও।

১৮৭৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যানলো পার্কে প্রথম বিজলি বাতি জ্বালিয়ে ছিল টমাস আলভা এডিসন। এরপর ১৮৮০ সালে লন্ডনে বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবহার দেখা যায়। কয়েক বছরের মধ্যেই ইউরোপ ও আমেরিকার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় বিদ্যুৎ। 

অবশ্য গ্যাস বাতি আর মোমের ব্যবহার ছেড়ে বৈদ্যুতিক আলোয় অভ্যস্ত হতে পশ্চিমাদেরও দীর্ঘ সময় লেগেছিল। তাছাড়া বিদ্যুতের খরচও ছিল তুলনামূলক বেশি ছিল। এদিকে লন্ডনে বাতি জ্বলার পর ইংরেজদের উদ্যোগে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের রাজধানী কলকাতাতেও বিদ্যুৎ নিয়ে আসা হয়।

এরপর ১৮৯৫ সালে পাশ হয় ক্যালকাটা ইলেকট্রিক লাইটিং অ্যাক্ট। লন্ডনের কিলবার্ন কোম্পানির হাত ধরে যাত্রা শুরু করে ইন্ডিয়ান ইলেকট্রনিক কোম্পানি লিমিটেড ১৮৯৭ সালে, পরে যার নাম বদলে রাখা হয় ক্যালকাটা ইলেকট্রনিক সাপ্লাই লিমিটেড। 

তার আগে জেনারেটর ব্যবহার করে বাতি জ্বালানো হলেও কলকাতায় প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয় ১৮৯৯ সালে। ক্যালকাটা ইলেকট্রনিক সাপ্লাই লিমিটেডের উদ্যোগে পাতা হয় স্থায়ী বৈদ্যুতিক লাইন। হ্যারিসন রোড অর্থাৎ বর্তমান মহাত্মা গান্ধী রোডে জ্বলে ওঠে কলকাতার প্রথম বিজলি বাতি।

ঢাকায় বিংশ শতাব্দীতে বৈদ্যুতিক সড়ক বাতি চালু হলেও পূর্ববঙ্গে প্রথম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ছিলেন গাজীপুর জেলার ভাওয়াল পরগনার রাজা। জানা যায়, ১৯ শতকেই তিনি বিলাত থেকে জেনারেটর আমদানি করে রাজবাড়ি আলোকিত করেছিলেন।

ঢাকার রাস্তায় সড়ক বাতি

১৮৬৯ সালে ঢাকায় বাতি ব্যবহারের কার্যক্রম শুরু হয়। মিউনিসিপ্যালিটির সভাপতি ও ম্যাজিস্ট্রেট জর্জ গ্রাহামের নির্দেশ অনুযায়ী, সিভিল সার্জন ড. হেনরি কাটক্লিফ ঢাকার পয়ঃনিষ্কাশন ও উন্নয়ন বিষয়ক একটি রিপোর্ট প্রস্তুত করেন। আর এই রিপোর্টেই তিনি তুলে ধরেন ঢাকার রাস্তায় সড়ক বাতি স্থাপনের কথা । 

তবে গ্যাস বাতির বদলে কাটক্লিফ কেরোসিন বাতি জ্বালানোর প্রস্তাব রাখেন। রিপোর্ট দেখে নবাব খাজা আবদুল গণি বলছিলেন, এই রিপোর্ট বাস্তবায়িত হলে ঢাকা স্বর্গে পরিণত হবে। তবে ঢাকার মানুষের আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল নয়। আর তাই নগর উন্নয়নে আর্থিক অনুদান দেয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নবাব আব্দুল গণি নিজেই ঢাকায় একটি গ্যাস লাইট ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন ১৮৭০ সালে। এদিকে ১৮৭৭ সালে রানী ভিক্টোরিয়া ভারতসম্রাজ্ঞী ঘোষিত হলে ব্রিটিশ সরকার ঘটনাটি উদযাপনের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে। ঢাকায় আয়োজন উপলক্ষে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয় নাগরিক কমিটি। 

এই কমিটির উদ্যোগে সদস্যদের চাঁদায় ৬ হাজার ৫০০ টাকার ফান্ড গঠন করা হয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ওয়াইজঘাটে তৎকালীন মিউনিসিপালিটি অফিস থেকে শুরু করে চকবাজার পর্যন্ত কেরোসিনের ১০০টি সড়কবাতি স্থাপন করা হবে। পরে এই প্রকল্পের আওতায় ৬০টি কেরোসিন ল্যাম্পপোস্ট বসানো হয়। 

রাজপথে বিজলি বাতিসড়কে মূল ভরসা ছিল কেরোসিনের বাতিই। তবে সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই বাতি নিভে গিয়ে নেমে আসত অন্ধকার। মজার ব্যাপার হলো, রোজ এই কেরোসিন বাতি জ্বালানো-নেভানোর জন্য ১৯ শতকে বাতিওয়ালা নামে এক নতুন পেশাজীবী সম্প্রদায়ের বিকাশ ঘটে। 

সন্ধ্যা হতে না হতেই বড় বড় মই হাতে এই বাতিওয়ালাদের দেখা মিলত। বিদ্যুৎ আসলেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত কেরোসিন বাতির প্রচলন ছিল। ১৯৩৫ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার রাস্তায় ৮৬৯টি কেরোসিন বাতি ও ১০৬৬টি বৈদ্যুতিক সড়কবাতি ছিল।

নবাব আবদুল গণি কে.সি.এস.আই. উপাধি লাভ করেন ১৮৮৬ সালে। এরপর তার পুত্র নবাব আহসানউল্লাহ ঢাকার রাস্তায় গ্যাস বাতি বসানোর ঘোষণা করেন। কলকাতার ইংলিশম্যান পত্রিকার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন-

আমার পিতার ‘নাইট কমান্ডার অব দ্য স্টার অব ইন্ডিয়া’ উপাধি প্রাপ্তিতে নগরবাসী যে উল্লাস-উদ্দীপনা দেখিয়েছে, তাতে আমি অভিভূত। হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের প্রদর্শিত এই সৌজন্যের প্রতিদান হিসেবে আমি ঢাকার প্রধান রাস্তাগুলোতে সম্পূর্ণ নিজ খরচে তেলের বাতি বদলে গ্যাস বাতি স্থাপনের প্রস্তাব রাখছি। 

তবে এখানে আমার একটা শর্ত থাকবে। আলোক প্রজ্জ্বলনে যে অর্থ ব্যয় হবে, মিউনিসিপ্যালিটিকে তার বদলে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও দমকল যন্ত্র ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

ভারতবর্ষের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড ডাফারিন ঢাকায় আসেন ১৮৮৮ সালে। তার ঢাকায় আসার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নবাবের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সড়কে গ্যাস বাতি বসানোর নিদের্শনা প্রদান। ভাইসরয় চলে যাওয়ার পর কার্যক্রম একরকম স্থবির হয়ে পড়ে। 

১৮৯১ সালে নবাব আহসানউল্লাহর লিগ্যাল সেক্রেটারি জি. এল. গার্থ গ্যাস বাতি স্থাপনের জন্য ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির কাছে পুনরায় একটি মেমো লিখে পাঠান। মেমোটি বেশ ভালোভাবে গ্রহণ করে পৌরসভা। তবে কোনো কারণে শেষ পর্যন্ত বাতি স্থাপন সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

এরপর কেটে যায় অনেকগুলো বছর। ততক্ষণে নবাবের প্রতিশ্রুতির কথা ভুলতে বসেছে মানুষ। এরপর নবাব খাজা ইউসুফজান পৌরসভার সভাপতি হন ১৮৯৭ সালে। নবাব খাজা ইউসুফজান সম্পর্কে নবাব আহসানউল্লাহর বোনের স্বামী ছিলেন। পরের বছর ঢাকা প্রকাশ পত্রিকায় ফের সড়ক বাতির প্রসঙ্গ ওঠে।

তখন নবাব আহসানউল্লাহকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয় যে, এতদিন হয়তো তিনি পৌরসভার উপর ভরসা রাখতে পারতেন না। আর তাই ১২ বছরেও সড়কে গ্যাস বাতির দেখা মেলেনি। এরপর নবাবের দুলাভাই পৌরসভা প্রধান হওয়ার পর সড়ক বাতির আশা করতে আর কোনো দ্বিধা রইল না।

পত্রিকার সমালোচনার জন্য হোক বা না হোক, নবাব আহসানউল্লাহ এবার সত্যিই সড়কবাতি স্থাপনের ব্যবস্থা করে ফেললেন। তবে 'কাগুজে নবাব' হলেও তিনি যেকোনো রাজা বাদশাহর চেয়ে কম নন। তিনি তার প্রমাণ দিলেন। গ্যাস বাতির পরিবর্তে এবার বিলাতি বিদ্যুৎ বাতির পেছনে ঢাললেন লাখ লাখ টাকা।

তাই ঢাকার রাস্তায় বিজলী বাতি জ্বালবার জন্য ১৯০১ সালেই তিনি ঢাকা ইলেকট্রিক লাইট ফান্ড গঠন করে তাতে সাড়ে চার লাখ টাকা প্রদান করেন। সেই বছরই ৫ই জুলাই ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির তত্ত্বাবধানে ‘দ্য ঢাকা ইলেকট্রিক লাইট ট্রাস্ট’ গঠন করা হয়। 

ট্রাস্টের পক্ষ থেকে পত্রিকায় প্রচারিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঢাকা শহরের রহমতগঞ্জ সড়ক, চকবাজার সার্কুলার রোড, মোগলটুলি রোড, নালগোলা রোড, বাবুবাজার রোড, কমিটিগঞ্জ রোড, আরমেনিয়া স্ট্রিট, ইসলামপুর রোড, আহসানমঞ্জিল রোড, পাটুয়াটুলি রোড, বাংলাবাজার রোড, ডাল বাজার রোড. ফরাশগঞ্জ, লোহারপুল রোড, দিগবাজার রোড, ভিক্টোরিয়া পার্ক, লক্ষ্মীবাজার রোড, সদরঘাট রোড. শাঁখারিবাজার রোড, জনসন রোড, নবাবপুর রোড, রেলওয়ে স্টাফকোয়ার্টার রোড, জামদানি নগর রোড ও রাজার দেউড়ি লেনে বিদ্যুত্ বাতি লাগানো হইবে।

অবশেষে বহুপ্রতীক্ষিত সেই ৭ই ডিসেম্বর এল। সাজসাজ সাড়া পড়ে গেল সারা শহরে। ঐতিহাসিক এই ঘটনা উদ্বোধনের জন্য বাংলার ছোট লাট স্যার জন উডবার্নকে আগেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়াতে তার পক্ষ থেকে কলকাতা থেকে সি. ডাব্লিউ বোল্টন এসে পৌঁছালেন। 

বিকাল ৫টা বাজতে না বাজতেই লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল আহসানমঞ্জিলের আশপাশের এলাকা। নবাব আহসানউল্লার আমন্ত্রণে গণ্যমান্য অতিথিরাও এসে গেলেন আহসানমঞ্জিলে। আহসানমঞ্জিল চত্বরে বানানো বিশাল মঞ্চের সবার মাঝখানে বসলেন স্যার বোল্টন, তার ডানদিকে বসলেন নবাব আহসানউল্লাহ, বামদিকে মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনারবৃন্দ। 

বোল্টন সাহেব ঢাকার রাস্তায় বিদ্যুত বাতির ব্যবস্থা করার জন্য নবাব আহসানউল্লাহকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, ‘আজ থেকে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটিরও দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেল। ঢাকার সরু সরু রাস্তাঘাট, অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে এই বিদ্যুৎ বাতি বড়ই বেমানান। 

আমরা আশা করি, মিউনিসিপ্যালিটি এ বিষয়টির দিকে নজর দেবে।’ এর পরই তিনি সুইচ টিপে বিজলি বাতি জ্বেলে দিলেন। প্রথম বিজলি বাতি জবলে ওঠে ঢাকা শহরে। বহু নগরবাসী পরম বিস্ময়ে দেখল, বিনা তেলে, বিনা গ্যাসে জ্বলছে বাতি আরো উজ্জ্বল, আরো স্থির।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস