ছেলে হয়েও পিরিয়ড হয়, মানসিক যন্ত্রণায় কাবু তারা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৩ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৯ ১৪২৮,   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

ছেলে হয়েও পিরিয়ড হয়, মানসিক যন্ত্রণায় কাবু তারা

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৩৪ ২৬ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৮:৩৭ ২৬ নভেম্বর ২০২০

ছবি: উভয়লিঙ্গের মানুষেরা ভোগেন নানা ধরনের মানসিক যন্ত্রনায়

ছবি: উভয়লিঙ্গের মানুষেরা ভোগেন নানা ধরনের মানসিক যন্ত্রনায়

পৃথিবীতে একটি শিশু জন্ম নেয় হয় মেয়ে অথবা ছেলে হয়ে। তবে প্রকৃতি মাঝে মাঝেই এই নিয়মের ব্যতিক্রম করে। তখনই জন্ম নেয় উভয়লিঙ্গ কিংবা তৃতীয় লিঙ্গের শিশু। আধুনিকতা এই শব্দগুলো যতটা সহজে উচ্চারণ করতে শিখিয়েছে তেমনি কিন্তু মেনে নিতে শেখায় নি। এখনো বিশ্বের প্রায় সব জায়গাতেই এই মানুষগুলো অবহেলিত।  

সারাবিশ্বে এমন অনেক শিশু জন্ম নেয়, যারা প্রাকৃতিক নিয়মে ছেলে বা মেয়ে হয়ে জন্মায় না। শিশু অবস্থায় তাদের লিঙ্গ ঠিক করে দেয়া হয় বিতর্কিত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। এই ইন্টারসেক্স বা উভলিঙ্গ মানুষ একইসঙ্গে নারী ও পুরুষের শারীরিক বিশেষত্ব বা অঙ্গ নিয়ে জন্মায়। এদের মধ্যে চল্লিশটিরও বেশি ধরনের মিশ্র বিশেষত্বের খোঁজ পেয়েছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। 

কারো হরমোনের মাত্রায় তারতম্য থাকে, ফলে হরমোনের মাত্রা ভেদে সে পুরুষ না নারী সেটা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকে না। কারো আবার শরীরের ভেতরে হয়ত নারীর প্রজনন অঙ্গগুলো থাকে, কিন্তু শরীরের বাইরে থাকে পুরুষের যৌনাঙ্গ।

উভয়লিঙ্গের মানুষ সন্তান জন্ম দিতে পারেন এধরনের উভলিঙ্গ মানুষ মানসিকভাবে খুবই বিপর্যয়ের মধ্যে থাকেন, কারণ তারা প্রাকৃতিক নিয়মে তাদের আসল পরিচয় কী, সেটা খোঁজা তাদের জন্য খুবই কষ্টের একটা প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে। দেখা গেছে শিশু বয়সে অস্ত্রোপচার করে তার লিঙ্গ নির্ধারণ করে দেবার পর প্রাপ্ত বয়সে এসে সে হয়ত বিশাল দোটানায় ভুগছে যে আসলে তার লিঙ্গ সঠিকভাবে নির্ধারিত হয়েছিল কিনা।

চিকিৎসকরা বলছেন চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে কারো লিঙ্গ নির্ধারণ করার বিষয়টাকে তারা কখনই হালকাভাবে নেন না। তারা শিশুর জেনেটিক পরীক্ষা করেন। তারপর একাধিক চিকিৎসক ও জেনেটিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং বাবা মায়ের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই এসব অপরাশেন করা হয়ে থাকে।

আরো পড়ুন: ৫০০ বছরের প্রথা, শুয়ে থাকা নারীর উপর ওঝা হাঁটলেই সন্তান লাভ

তবে উভলিঙ্গদের নিয়ে যারা কাজ করেন তারা মনে করেন, শিশু বয়সে শারীরিক কারণে প্রয়োজন না হলে এধরনের অস্ত্রোপচার না করানোই ভালো। কারণ এই শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর নিজে কী হতে চায় তা সে যদি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে তাহলে ভবিষ্যতে তার মানসিক বিপর্যয় হয়ত কিছুটা কম হতে পারে।

উভলিঙ্গ শিশু হয়ে জন্মানো ও পরে নারী হিসেবে বড় হয়ে ওঠা তিনজন বিবিসিকে বলেছেন তাদের কঠিন মানসিক লড়াই আর কীভাবে তারা বিষয়টা মানিয়ে নিয়েছিলেন তার কাহিনী। চলুন এমনই কয়েকজন মানুষের কাহিনীই জানবো আজ-

ইরিনা কুযেমকো 

ইরিনা কুযেমকো
বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত ইরিনা মেয়ে হিসেবেই বড় হয়েছেন। তার অন্যান্য বান্ধবীদের সবার পিরিয়ড শুরু হলেও তার হয়নি। ইরিনার বেড়ে ওঠাটা ক্লাসের অন্যসব মেয়ের মতো এতোটা সাধারণ ছিল না। কেননা সে মেয়ে হলেও তার স্তন গড়ে ওঠেনি।

ইরিনা বলেন, একদিন শিক্ষিকা আমাদের ক্লাসে মেয়েদের বেড়ে ওঠা নিয়ে একটা ভিডিও দেখাচ্ছিলেন। আমার জন্য সেটা খুবই কষ্টের অভিজ্ঞতা ছিল। ছবিতে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল সবাই সেভাবেই বেড়ে উঠেছে। আমি ছাড়া।  

আরো পড়ুন: স্বামীর অজান্তে একই বাড়িতে প্রেমিককে লুকিয়ে রাখেন ১৭ বছর 

এদিকে ইরিনা যে আর পাঁচটা মেয়ের মতো না তা নিয়ে তার মা এবং নানীর কোনো মাথাব্যথাই ছিল না। তারা বলতেন, এটা কোনো সমস্যা নয়, সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে। ততদিনে ইরিনার বয়স ১৪ বছর। এরপর একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে তিনি জানান, ইরিনার ডিম্বাশয়গুলো কাজ করছে না। তিনি কিছু চিকিৎসা দিলেন। বেশ কয়েকমাস গেল তবে চিকিৎসায় কাজ হল না। মনের ওপর চাপ বাড়তে লাগলো তার।   

১৫ বছর হলে ইরিনার বাবা তাকে ডাক্তার দেখাতে মস্কোয় নিয়ে গেলেন। সেখানে ডাক্তাররা তার বাবাকে বললেন ইরিনার দুটো ছোট অপারেশন করাতে হবে। স্কুলে বান্ধবীরা অনেকেই জানতে চেয়েছিল এই বিষয়ে। তবে ইরিনা তো নিজেই জানে না তার কিসের অপারেশন হচ্ছে। তাই সে কিছুই বলতে পারেনি তখন।     

ইরিনা কুযেমকোর ছোটবেলা ২২ বছর বয়সে ইরিনা জানতে পারে ডাক্তাররা তার ডিম্বাশয় এবং অণ্ডকোষ দুটোই কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছিল তখন। ইরিনার শরীরে একই সঙ্গে পুরুষ ও নারীর বৈশিষ্ট্যবাহী ক্রোমোজোম ছিল। তার শরীরে অণ্ডকোষও ছিল আবার জরায়ুও ছিল। যা সবকিছুই কেটে বাদ দেয়া হয়েছে।

সবকিছু জানার পর কিছুতেই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। ইরিনা বলেন, যখন জানলাম আমার মতো উভলিঙ্গ মানুষ আরো আছে। তখন মনে হতো সমস্যাটা আমার একার না। একই শরীরে নারী ও পুরুষ অঙ্গ নিয়ে অনেক মানুষ শান্তিতে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। তখন থেকে আমার আত্মবিশ্বাসও বেড়ে গেল।

তখন থেকে আমি ঠিক করলাম আমি আমার মতো শিশু কিশোরদের পাশে দাঁড়াব। আমার যেভাবে দু:সহ শৈশব ও কৈশোর কেটেছে, অন্যদের যাতে একই মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে না হয় সেটা আমি করব। তবে এই ধরনের শিশুরা সমাজ থেকে নানাভাবে বৈষম্যের স্বীকার হয়। উভলিঙ্গ মানুষদের প্রতি এই বৈষম্য বন্ধ হওয়া উচিত।   

লিয়া (ছদ্মনাম)

লিয়ালিয়া যেভাবে বলেছেন, আমার কাহিনীর শুরু মেটারনিটি হাসপাতালে। ডাক্তাররা আমার মাকে বলেছিলেন আমার যৌনাঙ্গ অপরিণত। নারী বা পুরুষ কোনোটার মতোই দেখতে নয়। আপনি ছেলের না মেয়ের জন্ম দিয়েছেন, কী মনে হচ্ছে আপনার? আমার মাকে ওরা জিজ্ঞেস করেছিল।

মা ঠিক করলেন আমাকে মেয়ে সন্তান হিসেবে রেজিস্ট্রিভুক্ত করবেন। ডাক্তারদের এটা ছিল প্রথম ভুল। তাদের উচিত হয়নি পুরো দায়িত্বটা আমার মায়ের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া। ফলে আমি বড় হচ্ছিলাম মেয়ে হিসেবে। স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে মা আমাকে মেডিকেল পরীক্ষার জন্য নিয়ে গেলেন। শিশু ক্লিনিকের ডাক্তার মাকে বললেন, আপনি কি পাগল? এতো আপনার ছেলে শিশু! অন্য ডাক্তাররাও নিশ্চিত করলেন আমি ছেলে। নথিপত্রে আমার নাম বদলানো হল।     

আমি ছেলে হিসেবে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হলাম। তবে আমাদের কিন্ডারগার্টেনের বেশ কিছু বাচ্চা ওই ক্লাসে ছিল যারা জানতো আমি মেয়ে। ফলে মা স্কুল বদলে আমাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করলেন। তখন পর্যন্ত আমার কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু দেখলাম বড়রা আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। তখন থেকে আমার কিছুটা মানসিক সমস্যা শুরু হলো। নিজের পরিচয় নিয়ে লিয়াকে বছরের পর বছর লড়াই করতে হয়েছে।

আরো পড়ুন: বাংলার বধূর সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠার পেছনে করুণ ইতিহাস

আমি আমার লম্বা চুল কাটতে চাইতাম না। প্যান্ট আর ঢোলা জামা পরতাম ছেলেদের মতো। আমি এখন বুঝতে পারি কেন তারা আমার লিঙ্গ বেছে নেয়ার দায়িত্ব আমাকে দেননি। আমি বেশ নিশ্চিন্তেই ছিলাম। তবে আমি যখন ১৩, আমার একটা দুর্ঘটনা ঘটল। আমি একটা ঘোড়া সঙ্গে ধাক্কায় পড়ে গেলাম। হাসপাতালে যখন জ্ঞান ফিরলো, জানলাম আমার শিরদাঁড়া ভেঙে গেছে। কৃত্রিমভাবে প্রস্রাব করানোর জন্য নার্স আমার মূত্রনালিতে ক্যাথেটার পরানোর সময় আমার যৌনাঙ্গ দেখে মস্করা শুরু করলেন।  

ভাবুন ভাঙা মেরুদণ্ড নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এধরনের ব্যঙ্গবিদ্রূপ শুনছি! হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবার পর এক বছর বাসায় আমাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছে। আমার মা, নানি ও বোন সারাদিন কাজ করতো, বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আমাকে দেখাশোনা করার কেউ ছিল না।

একদিন প্রচণ্ড ব্যথা সহ্য করতে না পেরে আমি একটা কাঁচি নিয়ে নিজেকে আহত করলাম। এরপর থেকেই যন্ত্রণার উপশম পেতে আমি নিজেকে আঘাত করতে শুরু করলাম। মা কখনো টের পাননি। ডাক্তাররা আমার আবার সুস্থ হয়ে উঠে দাঁড়ানোর আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন, কিন্তু একদিন আমি সেরে উঠলাম।   

উভয়লিঙ্গের একজন মানুষের নারী এবং পুরুষ বৈশিষ্ট্যবাহী ক্রোমোজোম থাকে লিয়া বলছেন, শিশুকালে তার লিঙ্গ ঠিক করে দেবার কারণে একটা অপরাধ বোধে ভুগছেন তার মা। সেরে উঠে আমি প্রথমেই স্কুল যেতে চাইলাম। স্কুল আমার বাসা থেকে মাত্র বিশ মিনিটের পথ, কিন্তু আমার হেঁটে স্কুলে যেতে লাগল দুই ঘন্টা। আমার অক্ষমতা দেখে স্কুলে অন্য শিক্ষার্থীরা আমাকে হয়রানি শুরু করল। তারা আমার ব্যাগ টয়লেটে ছুঁড়ে ফেলে দিত। তারা জানত আমি ছুটে সেখানে যেতে পারব না।

এরপর আমি যখন ১৬, তখন একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার বিছানায় রক্ত। আমাকে হাসপাতালে নেয়া হল, পরীক্ষা করা হল, ডাক্তার আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষার ফল দেখে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, আরে ওর তো জরায়ু রয়েছে! আমি যে শুনতে পাচ্ছি সে দিকে ওনার ভ্রূক্ষেপ ছিল না। 

এভাবেই আমি জেনেছিলাম আমার শরীরে নারীর অঙ্গ আছে। তাই আমি ছেলে হয়েও আমার পিরিয়ড হয়েছে। আমি চেয়েছিলাম আমার শরীরের ভেতর যে অঙ্গ আমি দেখতে পাচ্ছি না তা ফেলে দেয়া হোক। তবে ডাক্তার আমাদের বোঝালেন আমার শরীরের ভেতরের নারী অঙ্গগুলো পুরো কাজ করছে, সেগুলো ফেলে দেয়া ঠিক হবে না। ফলে দুই বছরে আমাকে চারবার অপারেশন করানো হল, আমি নারী হলাম।

আরো পড়ুন: ভোগবিলাসে মত্ত রানির কারণেই ফ্রান্স হয় ফকির, ঘটে ‘ফরাসি বিপ্লব’!   

এখন আমার দুটি সন্তান, একটি ছেলে ও একটি মেয়ে।আমার ছেলে যখন জন্মায় আমার বয়স ছিল ২০। আমার মধ্যে কোনোরকম মাতৃত্বের অনুভূতি তৈরি হয়নি। তবে আমার ছেলে আর আমি ভালো বন্ধু। আমার মেয়ে আমার সঙ্গে থাকে না। ওর বাবা আর আমি আলাদা হয়ে গিয়েছি। 

জীবনে অনেক পুরুষ ও নারীর সঙ্গে আমার ভাব হয়েছে। আমি মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করি। পুরুষকে দেখে আমার কোনো আবেগ হয় না। আমার চারবার বিয়ে হয়েছে। আমি কিছুদিনের মধ্যে পঞ্চমবার বিয়ে করতে যাচ্ছি। আমি যাকে ভালবাসি সে ট্রান্সজেন্ডার পুরুষ।

একেক সময় মনে হয় ডাক্তারের পরামর্শ আমার জন্য সঠিক ছিল কিনা। কেন আমি এখনও আমার সঠিক পরিচিতি খুঁজে বেড়াচ্ছি, কেন চারবার বিয়ে করেছি, কেন সন্তানদের নিয়ে সমস্যা। আমার মা পাশে থেকেছেন সবসময়। মনে হয় তার ভেতরে একটা অপরাধ বোধ আছে- এত বছর ধরে তিনি সেই অপরাধ বোধ বয়ে বেড়াচ্ছেন। তার তো কোনো দোষ নেই। এই অপরাধবোধ তার ঝেড়ে ফেলা উচিত।

অলগা অনিপকো

অলগা অনিপকোঅলগা যেভাবে তার কাহিনী বলেছেন, আমাকে সবসময় মেয়েদের মত দেখতে ছিল, আমার শরীরের ভেতরেও ছিল সবরকম নারী অঙ্গ। কিন্তু আমি যখন কিশোরী, আমার হঠাৎ ওজন বাড়তে শুরু করল। আমাকে অন্যরা ঠাট্টাবিদ্রূপ করত, হেনস্থা করত। আমি দিনে রাতে জগিং করতাম, ডায়েট করতাম, খেতাম কম। তবে ওজন বাড়তেই লাগল।

আমার বয়স যখন ২৪, আমি হরমোন পরীক্ষা করলাম। দেখা গেল আমার হরমোনের নানা সমস্যা। তবে আমি জানতেই পারিনি আমি উভলিঙ্গ। বহু বছর ধরে পরীক্ষা ও ডাক্তারদের কাছে ধরনা দেবার পর অলগা জেনেছিলেন তার শরীরে ক্রোমোজোমের সংখ্যাই তার সমস্যার কারণ।  

আরো পড়ুন: মমির পেটে মিলল ৬০০০ বছর আগের তেলাপিয়ার রেসিপি

হরমোন বিশেষজ্ঞ আমার হরমোনে ভারসাম্য আনার জন্য চিকিৎসা দিলেন। এর কিছুদিন পর আমার ঠোঁটের ওপর এবং ঘাড়ে চুল গজাতে শুরু করল। ভাবুন ২৫ বছরের একটা মেয়ের জন্য এটা কতটা বিব্রতকর। আমি হরমোন খাওয়া বন্ধ করে দিলাম। আমার হাতে অর্থ থাকলে এবং উৎসাহ পেলে আরো ডাক্তার দেখাতাম। 

একজন ডাক্তার বললেন তিনি আমার ক্রোমোজোম পরীক্ষা করাবেন। ভাগ্যিস করলেন। চার বছর আগে আমি জানতে পারলাম আমার শরীরে পুরুষের ক্রোমোজোম রয়েছে, যার অর্থ আমি উভলিঙ্গ অর্থাৎ আমার শরীরে একইসঙ্গে নারী ও পুরুষ দুটো বৈশিষ্ট্যই রয়েছে। ২৪ বছর বয়সে আমি বুঝতে পারি আমি সমকামী। 

অনেক সময় শিশু জন্মের পর পর এই সমস্যা বোঝা যায় না আমার তরুণ বয়সে আমি যথেষ্ট তন্বী নই বলে দুর্ভাবনায় থাকতাম। এরপর বুঝলাম আমি সমকামী। আর তারপরে জানলাম আমি পুরোপুরি নারী নই। তাহলে আমি কী? আমার ভাই বিষয়টা নিয়ে জানতে আগ্রহ দেখাল। আমার বড় বোনেরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। আমার বাবা মা আমাকে মেনে নিলেন। তাদের ভালবাসা একইরকম রইল। কিন্তু তারা এটা নিয়ে কথা বলতে চাইতেন না।

আমার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হল সমাজে আমাদের মত যারা সাধারণের বাইরে তাদের ব্যাপারে অসহিষ্ণু মনোভাব। অনেকের মত হলো উভলিঙ্গ শিশুদের বাচ্চা বয়সে অপারেশন করিয়ে তার লিঙ্গ ঠিক করে দেয়াটা পরবর্তীকালে তাদের মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা যখন সেটা জানতে পারে, ডাক্তার বা বাবামায়ের প্রতি বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। 

কিন্তু কেউ আলাদা হলে সমাজও তাদের অমানবিক দৃষ্টিতে দেখে। স্বাভাবিকভাবে তাদের যখন জন্ম হচ্ছে, তখন প্রকৃতি যেভাবে তাদের পৃথিবীতে নিয়ে আসছে, সেভাবেই তাদের মেনে নেয়ার মানসিকতা গড়ে ওঠা দরকার।

আরো পড়ুন: নগ্ন এক জাতি, ৬০ হাজার বছর ধরে রয়েছে সবার অগোচরে!

উভয়লিঙ্গদের ব্যাপারে চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুর অস্ত্রোপচার তখনই করা উচিত যখন এটা তার জীবন সংশয়ের কারণ হয়। বাইরে থেকে কী দেখা যাচ্ছে সেটা নিয়েই মানুষের মধ্যে বেশি উদ্বেগ দেখা যায়, ফলে শিশু বয়সে যৌনাঙ্গে অস্ত্রেপচারের একটা প্রবণতা থাকে। এধরনের একটা মেয়ে বাচ্চার যৌনাঙ্গ পুরুষের মত হলেই অপারেশনের একটা তাগিদ অনুভব করেন শিশুর বাবা মা। এটা সামাজিকভাবে উদ্বেগের বা লজ্জার বিষয় হতে পারে, কিন্তু শিশুর প্রাণ সংশয়ের কোনো কারণ এতে থাকে না। 

তবে যদি এর ফলে শিশুর প্রস্রাবের সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে নিশ্চয়ই অপারেশন করানো যুক্তিসঙ্গত এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সেটা জরুরি হবে। অস্ত্রোপচারের বিষয়টার জন্য অপেক্ষা করা অনেকসময়ই ভাল সিদ্ধান্ত হতে পারে। সেক্ষেত্রে শিশুর সঙ্গে লুকোচুরি না করে তাকে খোলামেলা সবকিছু জানিয়ে তার মতামত নিয়ে অপারেশন করানো উচিত। এতে ভবিষ্যতে মানসিক যন্ত্রণা থেকে তাকে নিষ্কৃতি দিতে পারে।

উভয়লিঙ্গের মতো সমাজে অনেক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও রয়েছেন অপারেশনের পর অনেক সময়ই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। স্পর্শের অনুভূতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, বন্ধ্যাত্ব তৈরি হতে পারে, সবসময় ব্যথা হতে পারে। দীর্ঘদিন হরমোন চিকিৎসায় ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ে।  

একটা জিনিস মনে রাখা কিন্তু জরুরি। উভলিঙ্গদের সঙ্গে যৌন অভিরুচির বিষয়টা গুলিয়ে ফেললে চলবে না। তারা সাধারণ মানুষের মতই। তাদের নির্দিষ্ট কোন যৌন পরিচয় নেই। তারা প্রত্যেকে আলাদা।

তবে ইন্টারসেক্স বা উভলিঙ্গরা যখন ব্যাপারটা মেনে নিতে পারে, যখন নিজেকে বোঝাতে পারে তারা একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ, তার মত আরো অনেকে একই সমস্যা নিয়ে জন্মেছে, তখন তারা জীবনে সুখ খুঁজে পায়। সমাজের সবার উচিত উভয়লিঙ্গ কিংবা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়ানো। বৈষম্যের বেড়া জালে না আটকে স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সাহায্য করা। কেননা তারা সমাজেরই একটি অংশ। 

সূত্র: বিবিসি

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে