পাহাড়ের আড়ালে আজও লুকিয়ে রয়েছে গুপ্তধনে ঠাসা এক শহর

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৭,   ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

পাহাড়ের আড়ালে আজও লুকিয়ে রয়েছে গুপ্তধনে ঠাসা এক শহর

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০০ ৩১ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৪:১৫ ৩১ অক্টোবর ২০২০

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

সোনায় ভরা এক শহর। যেখানকার সবাই ধনী, এমন একটা শহর তো শুধু কল্পনাতেই উকিঁ দেয়! অথচ পৃথিবীর বুকেই রয়েছে সোনার এক শহর। যে শহরটি আজও মানুষের চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে। তাহলে কি শহরটি কাল্পনিক? যুগ যুগ ধরে লোকমুখে চলে আসা সেই অনন্য শহরের খোঁজ চলছে তো চলছেই। 

তবে আজ পর্যন্ত খোঁজ মেলেনি শহরটির। জানা যায়, ইনকা সভ্যতারই একটি শহর এটি। তাদের শেষ উত্তরসূরি ছিল কেচুয়ান গোষ্ঠী। তাদের কাছেই শোনা যায় পূর্বপুরুষদের আশ্চর্য এক শহরের গল্প। 

কেচুয়ান ভাষায় পাইতিতি শব্দের অর্থ হলো ‘হোম অব জাগুয়ার ফাদার’। আর তাদের মতে, রত্নে ঠাসা এ শহরটি লুকানো আছে পাহাড়ের আড়ালে। যেখানে নাকি ঝরনার পানির ধারা বইছে।

লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এই শহরের আবিষ্কার আবার নতুন করে এই প্রশ্নের আবির্ভাব ঘটেছে সত্যিই কি স্বর্ণের তৈরি কোনো শহরের অস্তিত্ব ছিল পৃথিবীর বুকে? 

পাইতিতি কি? 

হারিয়ে যাওয়া লিজেন্ডারি এই শহরকে কাল্পনিক ধনী শহর বললেও ভুল হবে না। অনেক আকর্ষণীয় কল্পকাহিনীর মধ্যে অন্যতম হলো পেত্নীর গল্প। বর্তমানে দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে জটিল প্রকৃতির অনুসন্ধানকারী গুপ্তধনের সন্ধানে হন্যে হয়ে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। 

লিজেন্ড মতে, পাইতিতি শহরটি অবস্থিত ছিল আমাজন জঙ্গলের পেরু অংশে। তবে ৫০ বছর আগে থেকে পাইতিতি নিয়ে গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় পেরুভিয়ান আমাজনিয়া। 

স্বর্ণের শহর পাইতিতির সন্ধানে বহু অভিযাত্রী দিনরাত এক করে ফেলেছেন। অনেকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, এই শহর লুকায়িত ছিল আমাজনের সর্বশেষ আবিষ্কৃত অঞ্চলে। পাইতিতির সন্ধানের বিভিন্ন অভিযান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্যার আর্থার কোনান ডয়েল দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড রচনা করেছিলেন। 

স্বর্ণের শহরপাইতিতি  ইতিহাস 

রহস্যময় এই পাইতিতি খোঁজার অভিযান নিয়ে অনেক ধরনের ডকুমেন্ট তৈরি হয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে, সোনার শহর পায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিল ইনকা বীর ইনকারি। যিনি আক্রমণের পর জঙ্গলে আশ্রয় নেয়ার পূর্বে কোনো একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 

যখন স্প্যানিশরা কোষে প্রবেশ করেন সেখানে তারা লুটপাট চালায়। তবে লুটপাট চালিয়ে ইনকাদের পুরনো রাজধানীতে অবশিষ্ট খুব সামান্যই খুঁজে পায় তারা। আসল সম্পদের খোঁজ কখনো পাওয়া যায়নি। স্প্যানিশদের আসার পূর্বেই ইনকারা তাদের স্বর্ণময় সম্পদ কোথাও লুকিয়ে ফেলেছিল। 

ইনকা সংস্কৃতি একটি শহরের কথা বলে যার অবস্থান কুস্কো শহরের আন্দিজ অংশের পূর্বদিকে এক জঙ্গলের গভীরে। স্প্যানিশদের আক্রমণের সময় ইনকারা সেখানে অবস্থান নিয়েছিল বলে ধরে নেয়া হয়। এই জঙ্গলই ছিল তাদের শেষ আশ্রয়স্থল। 

পাইতিতি আবিষ্কার

২০০১ সালে ইতালিয়ান প্রত্নতত্ত্ববিদ মারিও পলিয়া ভ্যাটিকান আর্কাইভ থেকে আন্দ্রেস লোপেজ নামের এক মিশনারির করা রিপোর্ট আবিষ্কার করেন। যা ১৬০০ সালে তৈরি করা হয়েছিল। লোপেজের করা ডকুমেন্ট থেকে সোনা রুপা এবং মহা মূল্যবান রত্ন পরিপূর্ণ একটি শহরের কথা জানা যায়। যার অবস্থান ছিল গ্রীষ্মপ্রধান জঙ্গলের মাঝখানে।

সেখানকার লোকেরা শহরটির নাম দিয়েছিল পাইতিতি। লোপেজ তার এই আবিষ্কারের ব্যাপারে পোপকে জানান। কয়েক যুগ পর্যন্ত স্থানটির অবস্থান গোপন করে রেখেছে ভ্যাটিকান সিটি।

২০০১ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী দুই বছর একটি ফিনিশ বলিভিয়ান দল পাইতিতির খোঁজে দুর্গম জঙ্গল চষে বেরিয়েছিল। তারা বলিভিয়ার কাছে রিবেরালতা অঞ্চলে কিছু ধ্বংসস্তূপ খুঁজে পায়। যেখানে ইনকা মৃৎশিল্পের চিহ্ন পাওয়া গেলেও কোনো সোনা, রুপা বা মূল্যবান কোনো পাথর পাওয়া যায়নি।

২০০৮ সালে পেরুর জাতীয় সংবাদ সংস্থার করা একটি রিপোর্টে জানা যায়, কিম্বিরি জেলায় একটি প্রত্নতাত্ত্বিক দুর্গের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানকার মেয়রের প্রস্তাব অনুযায়ী, স্থানটি ছিল ইনকাদের প্রাচীন শহর পাইতিতি। 

বিখ্যাত অভিযাত্রী গ্রেগ ডেয়ারমেঞ্জিয়ান পাইতিতির আবিষ্কারের বিষয়ে তার বিশেষ একনিষ্ঠতা সম্পর্কে বলেন, ইনকাদের সর্বশেষ আশ্রয় পাইতিতির খোঁজে আমার অভিযান শুরু হয়। ১৯৮১ সালে ভিলকামাম্বার মানকো ইনকার দুর্গ দেখার পর- যিনি প্রায় তিন বছর স্প্যানিশদের কঠোর শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। যা অবস্থিত ছিল মাচুপিচুর উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত কনভেনশন প্রদেশের সমতল অঞ্চলে। 

গ্রেগ ডেয়ারমেঞ্জিয়ানতখনই আমি জানতে পারি তার পূর্বদিক ছড়িয়ে একটি গোপন অঞ্চলের কথা যেখানে আন্দিজ ও আমাজনিয়া জঙ্গল মিলিত হয়েছে পাহাড় গিরিখাত এবং বিচ্ছিন্ন পর্বত শৃঙ্গের সমস্ত ছিল জঙ্গল ও পাথরের দুর্গম নদী ও নদী প্রবাহ দ্বারা আবৃত। 

১৯৮৪ সালে আমি সেখানে যাত্রা শুরু করলাম। কুস্কো শহরের উত্তরে এবং উত্তর-পূর্ব দিকে প্রথমে কুস্কিনো শিকারিদের সঙ্গে যারা পাওকার্টাম্বোতে নিজেদের সম্পদের খোঁজ করছিল। পরবর্তীতে চালাবাম্বা উচ্চভূমি ও ক্যালকা এর বাসিন্দা কেচুয়া ভাষাভাষীদের সঙ্গে আর কুস্কিনোদের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। 

১৯৯৪ সালের শুরুর দিকে গ্রেগ এবং তার অভিযাত্রী দল পেরুর বিখ্যাত অভিযাত্রী ড. কার্লোস নিউএনশওয়ান্ডারের সঙ্গে পাইতিতি সন্ধানে কাজ শুরু করেন। ড. কার্লোস নিজেও ১৯৫০ সাল থেকে পাইতিতি এবং পান্তিয়াকোলাতে হেলিকপ্টার নিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে তারা দুর্গম পথ বেয়ে নীচে নামতে নামতে তিম্পা উপত্যকায় এসে পৌঁছান। তারপর আরো অনেক পথ, বন ও নদী পেরিয়ে পুনরায় উচ্চভূমিতে এসে উপস্থিত হন। 

১৯৯৫ সালে চালাঙ্গা থেকে পশ্চিমের পার্বতীয় অঞ্চলে যাত্রা করার সময় আন্দিজের পূর্ব সীমানা থেকে তারা বিশাল এক পর্বত প্রাচীর দেখতে পান। যে পর্বত প্রাচীর কোনো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পর্বতের ক্ষেত্রে বিডরল। আর আশেপাশের এলাকায় কিছু ধ্বংসস্তূপ ছিল। যা পাদ্রে হুয়ান কার্লোস পলেন্তিনির বর্ণনা অনুযায়ী, হতে পারে লিজেন্ডারি পাইতি শহরের ধ্বংসাবশেষ। 

পরবর্তী কয়েক বছরে ডেয়ারমেঞ্জিয়ান এবং তার দল অসংখ্য প্রত্নতান্ত্রিক ইনকা সাইট, দুর্গ, কৃষিক্ষেত্র শত শত বাড়ির কিছু মহল্লায এবং শহর আবিষ্কার করেন। তবে পাইতিতির অবস্থান এখনও খুঁজে পাননি। হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণের শহর পাইতিতি এখনও পৌরাণিক কাহিনী হিসেবে রয়ে গেলেও গ্রেগ ডেয়ারমেঞ্জিয়ান বিশ্বাস করেন শিগগিরই পাইতিতি আবিষ্কার করতে সফল হবেন।

পাইতিতি শহরের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা

কোথায় লুকিয়ে রয়েছে পাইতিতি?পাইতিতি শহরের সম্ভাব্য জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিলকাবামবা, বলিভিয়ার উত্তর-পশ্চিম ভাগ (যার প্রায় পুরোটাই বনে ঢাকা), ব্রাজিলের পশ্চিম ভাগ আর পেরুর দক্ষিণ-পূর্ব দিক, যা উরুবামবা বা ভিলকানোটা নদীর পূর্ব পাশে পড়েছে। এসব জায়গার বেশিরভাগই গহিন বনে ঢাকা থাকায় কখনোই ঠিকভাবে খুঁজে দেখা সম্ভব হয়নি। 

পাশাপাশি অনেক জায়গায় আবার রয়েছে বিশাল সব পাহাড়, যার কোনোটা ১৩ হাজার ফুটেরও বেশি উঁচু। এসব পাহাড় পাড়ি দিয়ে বনের আরো গভীরে যাওয়া খুবই কষ্টকর আর দুঃসাধ্য। তার ওপর কিছু কিছু এলাকায় কোকেন চালান, অবৈধ কাঠ কাটা আর খনি থেকে দামি জিনিস বের করার মতো কাজ চলে। তাই এসব জায়গায় কোনো অভিযাত্রী গেলে আশঙ্কা থাকে চোরাকারবারিদের হাতে মারা পড়ারও।

গ্রেগের মতোই থিয়েরি জামিন নামের ফরাসি প্রত্নতত্ত্ববিদ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে পাইতিতি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। এজন্য পেরুর ঘন জঙ্গলের আনাচ-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। এক দিন হঠাৎ তার চোখে পড়ে আমাজন বনে পাথরের ওপর খোদাই করা ইনকাদের কিছু লেখা, যার একটি হয়তো পাইতিতির মানচিত্রও হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। 

২০১৩ সালে এই থিয়েরিই মাচুপিচুর কাছে খোঁজ পান পাচাকুটেক বলে এক সম্ভ্রান্ত ইনকার কবরের। যিনি কুস্কো বলে এক জাঁকজমকপূর্ণ শহর গড়ে তুলেছিল। একসময় হয়তো দুঃসাহসী কোনো অভিযাত্রীর হাত ধরেই খোঁজ মিলবে রহস্যঘেরা শহর পাইতিতির। তবে তার জন্য আরো কতকাল অপেক্ষা করতে হবে তা-ই প্রশ্ন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস