শত ভূমিকম্পেও ধ্বসেনি ১৫ শতকের এই দুর্গ নগরী

ঢাকা, বুধবার   ০২ ডিসেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৮ ১৪২৭,   ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

শত ভূমিকম্পেও ধ্বসেনি ১৫ শতকের এই দুর্গ নগরী

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১৮ ২৬ অক্টোবর ২০২০  

ছবি: মাচু পিচু

ছবি: মাচু পিচু

১৫ শতকের এক দুর্গ নগরী মাচু পিচু। পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার উরুবাম্বা উপত্যকার একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই শহরটি বিশ্বের নতুন সপ্তাশ্চর্যের একটি। 

সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকা এই নিদর্শনটি, ইনকাদের হারানো শহর নামেও পরিচিত। ইনকা সভ্যতার বিস্ময়কর এই মাচু পিচু শহর সম্পর্কে জানাবো আজ- 

পাথরের শহর মাচু পিচু পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। পেরুর উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত এই শহর ইনকা সভ্যতার শক্তি ও সৃজনশীলতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। 

ইনকাদের স্বর্ণযুগের এই সভ্যতা বর্তমানকালের ইকুয়েডর থেকে চিলি পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরে তীরবর্তী প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি অঞ্চল জুড়ে বিস্তার লাভ করেছিল। 

মাচু পিচুমাচু পিচুর অবস্থান ছিল সেই বিস্তৃত ইনকা সভ্যতার একদম কেন্দ্রবিন্দুতে। পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নির্মিত এই শহর এখন পর্যন্ত টিকে থাকা সবচেয়ে সুরক্ষিত ইনকা স্থাপনা। 

মাচু পিচুর প্রাসাদ এবং মন্দিরসহ সব ধরনের অবকাঠামো ইনকারা তৈরি করেছিল পাথরের সাহায্যে। কোনো ধরনের চাকা বা ধাতব নির্মিত হাতিয়ার ব্যবহার না করে, অবিশ্বাস্য নৈপুণ্যে তারা পাথরগুলোকে কেটে জোড়া দিয়েছে। 

মাচু পিচু ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় অবস্থিত হলেও, পাথরের বিশেষ ধরনের কাটিং এর কারণে, ভূমিকম্পের সময় পাথরগুলো নিজেদের জায়গায় শুধু কেঁপে ওঠে। তবে কখনোই ধসে পড়ে না। 

আর সে কারণেই এই বিস্ময়কর শহর আজো অক্ষত রয়েছে। মাচু পিচুর এই দুর্গ নগরী ইনকাদের রাজধানী কুউস্ক থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। 

হারিয়ে যাওয়া এক শহরইনকারা আসলে কি উদ্দেশ্যে শহরটি ব্যবহার করতো, তা গবেষকদের কাছে আজও এক রহস্য। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিকের ধারণা অনুযায়ী, এই শহরটি ছিল বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান বা উপলক্ষ উদযাপনের স্থান। ইনকা সভ্যতার সম্ভ্রান্তদের অবসর যাপন কেন্দ্র ছিল এটি। 

ভৌগোলিকভাবে এই জায়গাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানকার একাধিক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। মাচু পিচু শহরে অংশে ইন্তিওয়াতানা নামে ইনকাদের ব্যবহৃত একটি মহাকাশ ঘড়ি পাওয়া গেছে। 

যা ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক এবং জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করা হতো। এই নগরীর একটি বিশেষ জায়গা হল সূর্য মন্দির। তারা সূর্য পূজার জন্য মন্দির ব্যবহার করতো। তাই অনেকেই এই শহরকে সূর্য নগরী নামে ডাকতো। 

অত্যন্ত সুপরিকল্পিত শহরের প্রতিটি বাড়ি এবং কৃষি ক্ষেত্রে পানি সরবরাহের লাইন ছিল। যার পানি আসতো পবিত্র এক ঝর্ণা থেকে। ১৪৫০ সালের দিকে মাচু পিচু নির্মাণের মাত্র ১০০ বছর পরে, ইনকারা এই শহর পরিত্যাগ করেন। 

মাচু পিচুইনকাদের কোনো লিখিত ভাষা না থাকার কারণে, এই সংক্রান্ত কোনো লিখিত প্রত্নবস্তু বা প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা মাচু পিচু সম্পর্কে জানলে ও শত শত বছর ধরে এই রহস্যময় শহর পৃথিবীর কাছে অজানাই ছিল।

১৬শ শতাব্দীরর পর থেকে স্প্যানিশরা ইনকা সভ্যতার অঞ্চলগুলো দখল করে নিতে থাকে। তবে তারা মাচু পিচু সম্পর্কে তখনো কিছুই জানতো না। 

১৯১১ সালে একজন স্থানীয় কৃষকদের সহায়তায় ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাইরাম বিঙহাম মাচু পিচুকে নতুন করে বিশেষ করে নিয়ে আসেন। 

হাইরাম বিঙহাম প্রশিক্ষিত প্রত্নতাত্তিক না হলেও, তিনি তার পরবর্তী জীবন এই প্রাচীন নিদর্শনের গবেষণার কাটান। দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশে অবস্থিত মাচু পিচু আজও পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। 

দর্শনার্থীদের ঢল লেগেই থাকে স্থানটিতে১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো মাচু পিচুকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দিয়েছে। বর্তমানে সমগ্র বিশ্ব থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ লোক মাচু পিচুর এই বিস্ময়কর শহরে ভ্রমণ করতে আসে। 

মাচু পিচুর মতোই এক বিস্ময়কর শহর কম্বোডিয়া অ্যাংকর ওয়াত। দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে লাওস এবং নিকম নদী থেকে পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল রাজ্যের রাজধানী ছিল এই অ্যাংকর ওয়াত। যার অর্থ পবিত্র শহর। 

তৎকালীন সময়ে অ্যাংকর ছিল ইউরোপের যে কোনো শহরের তুলনায় অনেক বড় এবং বহুগুণ আধুনিক। একসময় জঙ্গল পরিষ্কার করে যে নগর গড়ে উঠেছিল। কালের বিবর্তনে সেই শহর আবার হারিয়ে যায় জঙ্গলের গহীনে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস