প্রাচীন এই শহরের রহস্যময় কুয়ায় মেলে মানুষের হাড়সহ মূল্যবান ধনরত্ন

ঢাকা, রোববার   ০৬ ডিসেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ২২ ১৪২৭,   ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২

প্রাচীন এই শহরের রহস্যময় কুয়ায় মেলে মানুষের হাড়সহ মূল্যবান ধনরত্ন

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:০৬ ২৫ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৩:৪৩ ২৫ অক্টোবর ২০২০

ছবি: চিচিন ইৎজা

ছবি: চিচিন ইৎজা

মায়া সভ্যতার একটি বিখ্যাত শহর চিচেন ইৎজা। এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাটান অঞ্চলে অবস্থিত। শহরটি তৎকালীন সময়ের তুলনায় অতি আধুনিক। 

চিচেন ইৎজা একইসঙ্গে নতুন সপ্তাশ্চর্য এবং ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে। আজ জানাবো মায়া সভ্যতার বিখ্যাত নগরী চিচেন ইৎজা সম্পর্কে-

চিচেন ইৎজা শব্দের অর্থ কুয়ায় যাওয়ার মুখ। ধারণা করা হয়, এখানকার একটি বিখ্যাত কুয়া থেকে এমন নামকরণ করা হয়েছে। 

চিচেন ইৎজা নির্মাণকাল নিয়ে ঐতিহাসিক বিবরণগুলোর মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। সম্ভবত ৬০০ থেকে ১২০০ সাল পর্যন্ত চিচেন ইৎজা ছিল, মায়া সভ্যতার একটি প্রধান কেন্দ্র। 

এখান থেকেই মায়া সভ্যতার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। এটি মায়ান সভ্যতার বৃহত্তম শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। 

বিস্তৃত বাণিজ্যিক আবাসিক এবং পাথরের তৈরি রহস্যময় কাঠামো থেকে বোঝা যায়। চিচেন ইৎজা শহরটি প্রায় সাড়ে পাঁচ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত ছিল। 

মায়া সভ্যতার প্রাচীন এক শহরমনে করা হয়, চিচেন ইৎজা শহরে প্রায় ৫০ হাজার লোকের বসতি ছিল। তৎকালীন সময়ের চেয়ে আধুনিক এবং সুপরিকল্পীত অবকাঠামো নির্মাণে মায়া সভ্যতার লোকেদের বিশেষ দক্ষতা ছিল।

চিচেন ইৎজা শহরের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সেখানকার ভবন ও অবকাঠামোগুলো ছাড়াও রয়েছে। পাকা রাস্তা ও ফুটপাত। ঐতিহাসিকরা বিষয়টি বেশ অবাক হয়েছেন। 

কারণ তৎকালীন সময়ে ইউরোপের কোনো শহরে এত উন্নত রাস্তা ছিল না। চিচেন ইৎজা শহরের প্রধান আকর্ষণ হলো এল কাস্তিলো নামের পিরামিড আকৃতির একটি দুর্গ। 

এটি কুকুলকানের মন্দির হিসেবেও পরিচিত। কুকুলকান ছিল মায়া সভ্যতার এক প্রভাবশালী দেবতা। কুকুলকানের পিরামিডের উচ্চতা প্রায় ১০০ ফুট। 

এই পিরামিডের শীর্ষে আরোহণ করার জন্য রয়েছে ৩৬৫টি সিঁড়ি। যা বছরে ৩৬৫ দিনকে নির্দেশ করে। মায়ানরা ৩৬৫ দিনের বর্ষপঞ্জির প্রচলন শুরু করেছিল। 

৩৬৫ টি সিঁড়ি রয়েছে এখানেইতারা জ্যোতির্বিদ্যায় এতটা পারদর্শী ছিল যে, কোনো ধরনের আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই সে সময়ের লোকজন সূর্যগ্রহণ এর ভবিষ্যৎবাণী করতে পারত।

সূর্য গ্রহণের সময় এখানে চলত বিশাল নরবলির উৎসব। চিচেন ইৎজা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সেনোট নামে কূপ। 

ধারণা করা হয় এই কূপের সঙ্গে ভূগর্ভস্থ কোনো নদীর সংযোগ ছিল। এই কূপটি ছিল শহরের পানির একমাত্র উৎস। এখান থেকে প্রচুর স্বর্ণ এবং মূল্যবান বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। 

তাছাড়া এই কূপে বহু মানুষের হাড় এবং মাথার খুলি পাওয়া গেছে। তা থেকে ধারণা করা হয়, সেসব লোকদেরকে মায়ান বৃষ্টির দেবতা চাকের নামে বলি দেয়া হয়েছিল। 

মায়ানরা নরবলি দেয়ার জন্য কুখ্যাত ছিল। চিচেন ইৎজা আরো বিখ্যাত কয়েকটি জায়গার মধ্যে আছে দ্য গ্রেট বল কোর্ট। যেখানে এক ধরনের বল খেলা হতো। 

এই খেলায় যে দল হেরে যেত তাদেরকেও বলি দেয়া হতো। এখানকার দ্য নর্থ টেম্পল দাড়িওয়ালা মানুষের মন্দির নামেও পরিচিত। 

স্যাকবে নাম্বার ওয়ান, এটি শহরের পাকা রাস্তাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই রাস্তার প্রস্থ প্রায় ৯০০ ফুট। গ্রুপ অব থাউজেন্ড কলাম, এখানে অনেক স্তম্ভ দেখতে পাওয়া যায়। 

ধারণা করা হয় অতীতে এগুলো একটি ছাদকে ধরে রেখেছিল। এল মার্কাডো নামের আরেকটি জায়গা শহরের বাজার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। 

বছরে প্রায় ২০ লাখ মানুষ ঘুরতে যায় চিনে ইৎজায়এছাড়া আরও বেশকিছু পিরামিড আকৃতির কাঠামোর মধ্যে এল ওসারিও নামের মন্দিরটিও বেশ বিখ্যাত।মেক্সিকান সরকার চিচেন ইৎজা শহরটিকে বেশ যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করে রেখেছে। 

সে কারণে প্রাচীন এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোকে আজও জীবিত মনে হয়। চিচেন ইৎজা ১৯৮৮ সালে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের স্বীকৃতি পায় এবং ২০০৭ সালে এটি নতুন সপ্তাশ্চর্যের একটি হিসেবে জায়গা করে নেয়। 

এসব কারণেই দিন দিন চিচেন ইৎজা প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। ২০১৭ সালে চিচেন ইৎজা মেক্সিকোর সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করার দর্শনীয় স্থানের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে। 

প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা এই অঞ্চলে আগমন এবং আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে চিচেন ইৎজাসহ মায়া সভ্যতার আরো বেশ কিছু প্রাচীন শহর বিলুপ্ত হতে শুরু করে।

মায়া সভ্যতার বিস্ময়কর শহর চিচেন ইৎজার মতোই, ইনকা সভ্যতার আরেকটি রহস্যময় শহর হলো মাচু পিচু। পেরুর আন্দিস পর্বতমালায় থাকায় এই শহরটিও বিশ্বের নতুন সব আশ্চর্যের একটি। 

ইনকার সভ্যতার সম্ভ্রান্ত লোকজন এই দুর্গ নগরে অবকাশ যাপন করতো। সে কারণে স্বভাবতই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নগরটি গড়ে তোলা হয়েছিল।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস