‘৩৬৫ দিনে এক বছর’ আবিষ্কার করেন এই মুসলিম বিজ্ঞানী

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৩ ডিসেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৯ ১৪২৭,   ১৬ রবিউস সানি ১৪৪২

‘৩৬৫ দিনে এক বছর’ আবিষ্কার করেন এই মুসলিম বিজ্ঞানী

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:১০ ২৪ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৪:২১ ২৪ অক্টোবর ২০২০

ছবি: আল বাত্তানী

ছবি: আল বাত্তানী

যুগে যুগে মুসলিমরাই বিভিন্ন সভ্যতা এগিয়ে নিতে পথ দেখিয়েছেন। আধুনিক শাস্ত্রগুলোতে মুসলিমদের অবদান অসামান্য। চিকিৎসা, গনিত, জ্যোতিষশাস্ত্র সব জায়গাতেই তাদের সমান বিচরণ। মুসলমানের অবদান অবিস্মরণীয়। বিভিন্ন শাখায় মুসলমানদের আবিষ্কার না থাকলে এ শাস্ত্রগুলো হয়তো এতখানি সমৃদ্ধ হত না।  

তেমনই একজন মুসলিম মনীষী আল বাত্তানী। আল-বিরুনী গণিতশাস্ত্রে বিশ্ববিখ্যাত ছিলেন। তার গ্রন্থ ‘আল-কানুন আল মাসউদী’ কে গনিতশাস্ত্রের বিশ্বকোষ বলা হয়। এতে জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, ক্যালকুলাস প্রভৃতি বিষয়ের সূক্ষ, জটিল ও গাণিতিক সমস্যার বিজ্ঞানসম্মত চমৎকার আলোচনা করা হয়েছে। এ গ্রন্থেই তিনি পৃথিবীর পরিমাপ সম্পর্কে যে বর্ণনা দিয়েছেন, বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে তা আজো প্রতিষ্ঠিত।

আর সর্বপ্রথম নির্ভুল পরিমাপ করে দেখিয়ে ছিলেন যিনি, তিনি আল বাত্তানী। এক সৌর সৌর বছর ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ড হয়। এই পরিমাপ কিন্তু তারই করা। আসল নাম আবু আবদুল্লাহ ইবনে জাবীর ইবনে সিনান আল বাত্তানী। তিনি আল বাত্তানী নামেই বেশি পরিচিত।

আল বাত্তানী তার সঠিক জন্ম তারিখ জানা যায়নি। তবে যতদূর জানা যায় ৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান তুরস্কের অন্তর্গত "হারান" নামক শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন আল বাত্তানী। আবার অনেক ইতিহাসবিদদের মতে ৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মেসোপটেমিয়ার অন্তর্গত ‘বাত্তান’ নামক স্থানে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। জন্মস্থানের নামেই তিনি বিশেষ ভাবে খ্যাতি লাভ করেন।

আরো পড়ুন: বিশ্বের প্রথম সমকামী পুরুষ, শত বছর ধরে শুয়ে আছেন একই কবরে  

তার পিতার নাম জাবীর ইবনে সানান। তিনিও ছিলেন তৎকালীন সময়ের একজন বিখ্যাত পন্ডিত ও বিজ্ঞানী। আল বাত্তানী পিতার নিকটই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। শৈশবকাল থেকেই শিক্ষা লাভের প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। তিনি যে শিল্প কর্মেই হাত দিতেন তা নিখুঁতভাবে শুরু করতেন এবং এর ক্রিয়া,প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।

টেলিস্কোপ আবিষ্কারের আগে তারকা গুণে হিসাব করতেন তিনিপিতার নিকট প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি ইউফ্রেটিস নদীর নিকটবর্তী রাক্কা নামক শহরে গমন করেন। মাত্র ২০ বছর বয়সেই তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হন। আল বাত্তানীর বয়স যখন মাত্র ২৫ বছর তখন খলিফা মুতাওয়াক্কিল পরলোকগমন করেন। পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক উত্থান পতনের কারণে তরুণ বয়সেই তাকে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তে হয় এবং তিনি সিনিয়র গর্ভনর পদে অধিষ্ঠিত হন। 

রাষ্ট্রীয় কাজের চরম ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি তার জ্ঞান বিজ্ঞান সাধনার কোনো ক্ষতি করেননি। রাজধানী রাক্কা ও এস্টিয়োক থেকে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর গবেষণা চালাতেন। তৎকালীন সময়ে তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ ও অংকশাস্ত্রবিদ। জ্যোতির্বিজ্ঞানে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ,নক্ষত্র প্রভৃতির গতি,প্রকৃতি ও সৌরজগত সম্পর্কে তার সঠিক তথ্য শুধু অভিনবই ছিল না। তিনি টলেমী সহ পূর্বতন বহু বৈজ্ঞানিকের ভুলও তিনি সংশোধন করে দেন। সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণ সম্পর্কিত টলেমী যে মতবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, আল বাত্তানী তা সম্পূর্ণ ভুল বলে বাতিল করে দিতে সক্ষম হন। 

তিনিই নির্ভুলভাবে প্রথম সৌর বছরের হিসাব করেনতিনি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, সূর্যের আপাত কৌণিক ব্যাসার্ধ বাড়ে ও কমে। নতুন চন্দ্র (নিউ মুন) দেখার ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ নতুন ও নির্ভুল বক্তব্য পেশ করেন। আল বাত্তানী তার নতুন উদ্ভাবিত যন্ত্র দিয়ে প্রমাণ করে দেন যে, সূর্য স্থির বলে এতদিনের প্রচলিত টলেমীর মতবাদটি সত্য নয়। সূর্য তার নিজস্ব কক্ষপথে গতিশীল। বিজ্ঞানী ডেনথর্ণি চন্দ্রের গতি নির্ধারণে চাঁদ ও সৌরগ্রহের আল বাত্তানীর চমৎকার পর্যবেক্ষণটি গ্রহণ করেন। 

আরো পড়ুন: ১৩ হাজার বছরের পুরনো হাতের ছাপ ঘিরে রহস্য 

এ আবিষ্কার সূর্যের গতি ও সময়ের সমীকরণে সামান্য পরিবর্তন আনেন। কপারনিকাস সূর্যের ইকুইটারিয়েল গতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু আল-বাত্তানী তা কখনও বিশ্বাস করতেন না। আল বাত্তানী গ্রহণের সময়ের সূর্যের ও চাঁদের সঠিক পরিমাপ নির্ণয় করেন। তিনি ঋতুর সময়-পরিধিও নির্ণয় করেন। সঠিকভাবে সূর্যের কক্ষপথে পরিভ্রমণ পরিস্থিতি তুলে ধরতে সক্ষম হন। তিনি এর সবচে’ কম গড়ও নির্ধারণ করেন।

আল বাত্তানী টলেমীর প্রচারিত আরো বহু মতবাদকে ভুল বলে প্রমাণিত করেন। আব্দুল্লাহ আল-বাত্তানী জ্যোতির্বিদ্যা ও ত্রিকোণমিতি বিষয়ে অনেক বই লিখে গেছেন। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি "কিতাবুল আজ-জিজ" নামক গ্রন্থ যেটি ইউরোপীয় পণ্ডিতদের দ্বারা অনূদিত হয়ে ৩ খণ্ডে প্রকাশিত হয়। তিনি ৮৮০ সালে তারকাগুলির একটি ক্যাটালগ তৈরি করেন। যেখানে তিনি ৪৮৯টি তারকার নামকরণ করেন। 

সব যুগেই মুসলিমরা আবিষ্কারের নেশায় ছিলেন টেলিস্কোপ আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত সবচেয়ে মূল্যবান তারকা ক্যাটালগগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। এছাড়াও এই বইটির মাঝখানে তিনি সূর্য, চাঁদ, এবং পাঁচটি গ্রহের (বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনি) গতির তত্ত্ব ব্যাখা করেন। তার এই আল জিজ বইটি লাতিন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। রোমের ভ্যাটিকানে এর মূল কপি পাওয়া যায়। আল জিজে ৫৭টি অধ্যায় রয়েছে। এর বাইরেও আল বাত্তানী এই বইতে আরো একটি প্রেক্ষাপট আলোচনা করেছেন সেটি হলো- ভবিষ্যত প্রজন্মকে তিনি আপন কর্মের ফলাফলের ভিত্তিতে উন্নতির জন্য উৎসাহিত করেছেন।

আরো পড়ুন: খাবার ক্যানে সংরক্ষণের আবিষ্কারক তিনি, ছিলেন একজন ময়রা  

রেনেসাঁ-পূর্ব ইউরোপকে তার আবিষ্কার ও ধারণা ব্যাপকভাবে প্রভাবান্বিত করতে পেরেছিল। তার বইগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল। জ্যোতির্বিদ্যা ও ত্রিকোণমিতি সম্পর্কিত তার আবিষ্কার-উদ্ভাবন ছিল শিক্ষণীয়। বিজ্ঞানের এই দুটি শাখার উন্নয়নে তার অবদান আমাদের জন্যে প্রেরণার উৎস। কোপার্নিকাস,টলেমীর মতো বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ এই গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিতেন।

চাঁদ, সূর্য নিয়ে তার আগ্রহ ছোট থেকেই আল বাত্তানীই প্রথম আবিষ্কার করেন যে, ত্রিকোণমিতি হচ্ছে একটি স্বয়ং স্বাধীন বিজ্ঞান। তিনি গোলাকার ত্রিকোণমিতির কিছু কিছু সমস্যার অত্যন্ত বিস্ময়কর সমাধান দিয়েছেন। যখন অন্যান্য বিজ্ঞানী ত্রিকোণমিতির প্রতি অমনোযোগী তখন আল বাত্তানীর অসাধারণ প্রতিভার সংস্পর্শে নির্জীব ত্রিকোণমিতি সজীব হয়ে ওঠে। সাইন,কোসাইনের সঙ্গে ট্যানজেন্টের সম্পর্ক আল বাত্তানীই প্রথম আবিষ্কার করেন। ত্রিভুজের বাহুর সঙ্গে কোণের ত্রিকোণমিতির সম্পর্কও তারই আবিষ্কার।

এককথায় আল বাত্তানীর জীবন ছিল জ্ঞান -বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিস্তৃত। তার জ্যোতির্বিজ্ঞান,ত্রিকোণমিতি ও অংকশাস্ত্রের ওপর লেখা বহু মূল্যবান গ্রন্থ ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। মুসলিম মনীষীগণের জ্ঞান বিজ্ঞান দিয়েই অমুসলিমগণ আজ জ্ঞান বিজ্ঞানের শীর্ষে উন্নীত হয়েছে। অপরদিকে মুসলিম জাতি তাদের পূর্ব পুরুষদের জ্ঞান বিজ্ঞান সাধনাকে উপেক্ষা করে আজ অমুসলিমদের মুখাপেক্ষী হয়ে আছে। এই মহা মনীষী ৯২৯ সালে ৭২ বছর বয়সে পরলোকগত হন।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে