বিশ্বের প্রথম সমকামী পুরুষ, শত বছর ধরে শুয়ে আছেন একই কবরে

ঢাকা, রোববার   ২৯ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৫ ১৪২৭,   ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

বিশ্বের প্রথম সমকামী পুরুষ, শত বছর ধরে শুয়ে আছেন একই কবরে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:০০ ২৩ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৭:১৪ ২৩ অক্টোবর ২০২০

ছবি: মুলার ও জেভার

ছবি: মুলার ও জেভার

যুগে যুগে অনেকেই ইতিহাসের পাতায় অমর হয়েছেন তাদের কাজ দিয়ে। এরমধ্যে শিরি-ফরহাদ কিংবা লাইলি- মজনু, রোমিও- জুলিয়েট ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন তাদের অমর প্রেম কাহিনী দিয়ে। সারা বিশ্বেই প্রেমের উদাহরণ তারা। তবে আজ বলব অন্যরকম এক ভালোবাসার কথা। সেটি হচ্ছে সমকামী দুই পুরুষের প্রেম কাহিনী।  

সমকামিতা বা সমপ্রেম বলতে সমলিঙ্গের ব্যক্তির প্রতি "রোমান্টিক আকর্ষণ, যৌন আকর্ষণ অথবা যৌন আচরণ"কে বোঝায়। দেশ ও কালভেদে সমকামিতার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্ন স্তর পরিলক্ষিত হয়েছে। সমকামী সম্পর্ককে স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক বলে মনে করা, এর প্রতি সামাজিক উদাসীনতা, সাধারণ সহনশীলতা বা তীব্র অসহনশীলতা, একে একপ্রকার লঘু পাপ হিসেবে গণ্য করা থেকে শুরু করে আইন প্রণয়ন ও বিচারব্যবস্থার সাহায্যে এর অবদমন এবং মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সমাজ সমকামিতাকে গ্রহণ বা বর্জন করেছে।

জেভার ও মুলারআচ্ছা মূল গল্পে ফেরা যাক। সময়টা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। মানবসভ্যতা মুখোমুখি হল এক বিশাল ধ্বংসলীলার। বিশ্বের সব তাবড় তাবড় দেশগুলো তখন তাদের সর্বশক্তি আর সব অস্ত্র নিয়ে নামল রণাঙ্গনে। এমন মারণযুদ্ধ এর আগে কেউ দেখেনি। হাজার হাজার মানুষের মৃতদেহ পড়ে রয়েছে মাটির ওপর। একদিকে বাড়িঘর পুড়ছে, অন্যদিকে মানুষের রক্ত স্রোত ভাসিয়ে দিচ্ছে মাটি।

আরো পড়ুন: ১৩ হাজার বছরের পুরনো হাতের ছাপ ঘিরে রহস্য 

এরই মাঝে হাজির হলেন এমিল মুলার এবং জেভার সুমের। দুজনের হাতেই বন্দুক, পরনে সমর পোশাক। রণাঙ্গনে এসেই পরস্পরের সঙ্গে পরিচয়। দুজনেই নিজের দেশের জন্য জীবনবাজি রেখেছেন। তবে এই আগুন আর বারুদের গন্ধে ভরা বাতাসের মধ্যে তাদের মনে দোলা দিল প্রেমের বাতাস। সেই আগুনের মধ্যেই তৈরি হল বন্ধুত্ব।

তাদের সমাধির উপর পাথরে পাশাপাশি লেখা তাদের নামএকটা সময় পর এমিল আর জেভার কিছু একটা অনুভব করলেন। তারা অনুভব করতে পারছিলেন যে তাদের সম্পর্কে কেবল বন্ধুত্বের গণ্ডিতেই আটকে নেই। বরং ঢেউ ছাপিয়ে নৌকা এগিয়ে চলল অনন্তের দিকে। একে অপরের চোখে চোখ আর হাতে হাত রেখে শপথ অনন্তকাল পারি দেয়ার। এমিল আর জেভার তখন ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই জন্ম নিল অন্য এক প্রেমের গল্প।

পরিবারের সঙ্গে ছোট্ট মুলার গুইলেম ক্লুয়া নামের এক স্প্যানিশ লেখকের হাত ধরেই উঠে এসেছে এই অদ্ভুত আখ্যান। ট্রানসিলভ্যানিয়ার কবরস্থানে, একই কবরে নীরবে শুয়ে আছেন দুইজন মানুষ। রোমানিয়ার এক শহর ট্রানসিলভ্যানিয়ায়। এই সেই শহর যেখানে নাকি বাস করত ভয়ংকর ড্রাকুলা। তার ভেতরেই সিঘিসোয়ারায় রয়েছে একটি কবরস্থান। সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে ছোটো ছোটো পাথরের স্তূপ। বরফ, বৃষ্টি আর স্মৃতির ভারে খানিক কালো হয়ে গেছে সেসব।

আরো পড়ুন: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও কর্মগুণে দুনিয়া কাঁপিয়েছেন তারা 

সেই মৃতদের স্তূপের ভেতর রয়েছে একটি বিশেষ পাথর। অন্যগুলোর থেকে কোনো অংশে আলাদা নয়। তারপরও এর রয়েছে অন্য এক পরিচয়। ফলকটির দিকে চোখ রাখল খানিকটা বিস্মিত হবেন বৈকি! কেননা এখানে যে সমাধিটি রয়েছে, সেখানে একজন নয়, দুইজন মানুষ শুয়ে আছে প্রায় শতবছর ধরে।

জেভারমৃত্যুও যাদের একে অপরের থেকে আলাদা করতে পারেনি। শেষ স্বপ্নের অপেক্ষায় একইসঙ্গে শুয়ে আছে তারা। তাদের ভালোবাসা অমর হয়ে আছে ইতিহাসে। তবে সেটি খুব একটা ভালো চোখে নয়। কেননা তারা দুজনেই পুরুষ, দুজনেই সৈন্য,  দুজনেই প্রেমিক।

এমিল আর জেভার দুজন দুজনের হাত ধরে পাড়ি দিতে চান বাকি জীবন। সব বিপদের ঊর্ধ্বে উঠে স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিলেন তারা। তবে তাদের মধ্যে বাধা সমাজ। কেউ কি মেনে নেবে না দুই পুরুষের ভালোবাসা। তবে কি এমিল আর জেভার কি এখানেই থেমে যাবেন? 

জেভার আর মুলারের থাকার রুম ছিল একই এইভাবেই যুদ্ধক্ষেত্রের ভেতরেই বেড়ে উঠছিল তাদের ভালোবাসার স্বপ্ন। বেড়ে উঠছিল এক অন্য রকম প্রেমের গল্প। মৃত্যুর পরও যে ঢেউ তাদের ছেড়ে যায়নি। একই মাটির নিচে স্বপ্নের বিছানা বুনছেন এমিল মুলার এবং জেভার সুমের। 

পঞ্চাশের দশকে সমকামী হওয়ার ‘অপরাধে শাস্তি’ দেয়া হয়েছিল বিজ্ঞানী অ্যালান টুরিং-কে। তখন বিশ্ব ভুলেই গেল তার অবদানের কথা। এই কাহিনী তো আরও বেশ কয়েক বছর আগের। বাধা নিষেধ তখনও বেশ তীব্র। সমকামী মানুষদের প্রতি এক বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে সব জায়গায়। কিন্তু ভালোবাসা কি এত গণ্ডি মানে? এমিল আর জেভারের মনেও কি সংশয় আসেনি? হয়তো এসেছিল।

কিন্তু সবকিছু এড়িয়ে ভালোবাসার সেই সুন্দর রাস্তাই বেছে নিয়েছিলেন। যুদ্ধ করার ফাঁকে জেভার একটি ছবিও এঁকেছিলেন ‘এমিল’স রুম’। ওই যে দূরে দেখা যাচ্ছে হলুদ ঘরটি, পাশে বিমর্ষ জানলা। মনের ভেতরে সেই জানলার ধারেই এসে বসতেন দুজনে।

ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এক অন্যরকম প্রেমের উপাখ্যান শুরু হয়এমিল আর জেভারের যুদ্ধক্ষেত্রের দিনগুলো কেমন গেছে কিংবা সেসময় তারা কি ধরনের বাধা পেয়েছিলেন। এসব ব্যাপারে তেমন কিছু জানা যায়নি।  কবরস্থানের ফলকের লেখা থেকে পাওয়া গেছে শেষের দিনটির কথা। এমিল মুলারই আগে চলে গিয়েছিলেন, ১৯১৬ সালে। তার এক বছর পরেই, ১৯১৭ সালে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের আঘাতে নিহত হন জেভার সুমের। পরে যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই উদ্ধার করা হয় ক্ষতবিক্ষত দেহ দুটি।

আরো পড়ুন: এখনো রহস্যময় তিন হাজার বছর পুরনো ঢাকার এক সমাধি 

তবে কীভাবে তাদের একসঙ্গে কবর দেয়া হয়েছিল। কেনই বা মুলারের কবরেই সমাহিত করা হয় জেভারকে? তাহলে কি তাদের সঙ্গী যোদ্ধারা তাদের ভালোবাসার কথা জানত? সে ব্যাপারেও তেমন কিছু জানা যায়নি। দীর্ঘ জীবন পাড়ি দেয়া হয়নি তাদের একসঙ্গে। তবে মৃত্যুর পর তারা একসঙ্গে থাকতে পেরেছে। তাদের মৃত্যুর বহু বছর পর ট্রানসিলভ্যানিয়ার কবরস্থানে বরফের নিচ থেকে তাদের খুঁজে পাওয়া যায়।  

কি ঘটেছিল তাদের ভাগ্যে তখন? আশেপাশের মানুষ কিংবা সমাজের কাছ থেকে কেমন ব্যবহার পেয়েছিলেন তারা। কিছুই জানা যায়নি। তাদের ব্যাপারে আর তেমন কোনো তথ্যও কোথাও নেই। অনেক ইতিহাসবিদ অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন এই দুই সমকামী পুরুষের ব্যাপারে।   

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে