১৩ হাজার বছরের পুরনো হাতের ছাপ ঘিরে রহস্য

ঢাকা, রোববার   ২৯ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৫ ১৪২৭,   ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

১৩ হাজার বছরের পুরনো হাতের ছাপ ঘিরে রহস্য

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৫৭ ২৩ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৪:৪৪ ২৩ অক্টোবর ২০২০

ছবি: ১৩ হাজার বছর আগের মানুষের হাতের ছাপ

ছবি: ১৩ হাজার বছর আগের মানুষের হাতের ছাপ

কিছুদিন আগে আদিম মানুষের পায়ের ছাপের সন্ধান মিলেছিল যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট স্যান্ডস ন্যাশনাল পার্কে। সেখানের শুকিয়ে যাওয়া এক নদীখাত থেকে ১৩ হাজার বছর আগের আদিম মানুষের জীবাশ্মে পরিণত হওয়া পায়ের ছাপ উদ্ধার হয়। সম্প্রতি মার্কিন নৃতাত্ত্বিকরা নিউ মেক্সিকোর ওই পার্কে এসব পায়ের ছাপ উদ্ধার করেছেন। 

তবে এবার পাওয়া গেল মানুষের হাতের ছাপ। এই গুহার নামই হয়ে গেছে কুয়েভা দে লাস মানোস। স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ হলো "হাতের গুহা"। গুহাটি আর্জেন্টিনার সান্টা ক্রুজ প্রদেশের অংশ যা পেরিতো মোরেনো থেকে প্রায় ১৬৩ কি.মি বা ১০১মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। এই গুহাটি পান্টোগোনিয়ান,পিন্টুরাস নদীর উপত্যকায় অবস্থিত।

হাতের গুহা গুহাটি ১৯৪১ সালে আবিষ্কৃত হয়েছিল। তবে উনিশ শতক থেকে, বিভিন্ন ভ্রমণকারী, অভিযাত্রী, অন্বেষণকারী এবং বিজ্ঞানীরা পিন্টুরাস নদীর চারপাশে ভ্রমণ করেছেন। খ্যাতিমান ইংরেজ ভ্রমণকারী জর্জ মিস্টার ১৮৮১ সালে পিন্টুরাস নদী উপত্যকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনিই এই অঞ্চলে আসা প্রথম শ্বেতাঙ্গ মানুষ ছিলেন। তবে তিনি এই চিত্রগুলো আবিষ্কার করতে পারেন নি।  

আরো পড়ুন: খাবার ক্যানে সংরক্ষণের আবিষ্কারক তিনি, ছিলেন একজন ময়রা

এরপর মোরেনোর অনুসন্ধানের বিখ্যাত সহচর ক্লেমেস্ট ওনলির সঙ্গে ১৯০৪ সালে এই চিত্র খুঁজে পান। তবে কোনো প্রমাণ সঙ্গে আনতে পারেন নি। ফলে এটি তারাই প্রথম আবিষ্কার করেছেন বলে দাবি করতে পারেন না।। এর প্রায় আধা শতাব্দী পরে ১৯৪১ সালে আলবার্তো এম ডি আগোস্টিনি নামে একজন পুরোহিত এসে গুহার চিত্রগুলোর দেখা পান।

পুরোহিত আগোস্টিনিআর তারপর এই চিত্র নিয়ে তার ধারণা সম্পর্কে একটি বইয়ে লেখেন। তার "লস অ্যান্ডিস" বইতে এই গুহার চারটি ছবি প্রকাশ করেছিলেন। সেটা ১৯৫০ সালের কথা। এরপরই এই গুহা নিয়ে শুরু হয় গবেষকদের গবেষণা।  
 
তারা জানান, এই অঞ্চলে বহু গিরিখাত এবং পাহাড় রয়েছে। কার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে জানা যায় এই ছাপের বয়স ৯ হাজার থেকে ১৩ হাজার বছর আগের। এই গুহার দেয়ালে হাতের চিত্রকলা আছে যার কারণে গুহাটি বিখ্যাত। 

এই ছাপ পান্টোগোনিয়ান শিকারী মানুষদের দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা গবেষকদের। এই সম্প্রদায়রা দক্ষিণ আমেরিকার অত্যন্ত প্রাচীন। এই গুহায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষ বসবাস করতো। তবে তাদের মধ্যে শেষ ছিল তেহুয়েলচে সম্প্রদায়ের মানুষ। 

নানা রঙের হাতের ছাপগুহাটি ৬০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। গুহাটির দৈর্ঘ্য ২৪ মিটার (৮১৪ ফুট) এবং এর প্রবেশদ্বার ১৫ মিটার (৪২ ফুট) প্রশস্ত এবং ১০ মিটার (৩৩ফুট) উচু।

গুহাটির গভীরতা ১৫ মিটার গুহার ভিতরে একটি খাড়া ঢাল আছে। গুহার ভিতরে উচ্চতা ২ মিটারের (৬.৬ ফুট) বেশি না। এটি একটি জটিল গুহা এর আরেকটি অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬০ কিঃমিঃ। প্রত্নতত্ত্ববিদরা আবিষ্কার করেছেন যে এই গুহায় বসবাসকারী মানুষেরা গুহার দেয়ালে রং ছড়ানোর জন্য হাড় খোদাই করে পাইপ তৈরি করত।   

পাত বা ফলক হিসেবে তাদের হাতকে ব্যবহার করে লাল, বেগুনি হলুদ এবং বাদামী বিভিন্ন রঙের শত শত হাতের ছাপ তৈরি করত। এই রংগুলো  তৈরি করা হয় বিভিন্নভাবে। লৌহ অক্সাইড থেকে লাল এবং বেগুনী, চীনামাটি থেকে সাদা, ন্যাট্রোজারোসাইট থেকে হলুদ এবং ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইড থেকে কালো রং তৈরি করা হয়েছিল। 

হাতের ছাপ ছাড়াও বিভিন্ন শিল্পকলা আছে গুহার দেয়ালেএখানে ৮২৯ টি ছাপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছাপ পুরুষের। তাদের মধ্যে একজনের ছাপে ছয়টি আঙ্গুল রয়েছে। মাত্র ৩১টি ডান হাত। অধিকাংশ বাম হাত যা থেকে এটা বোঝা যেত যে শিল্পীরা ডান হাত দিয়ে তাদের নিজেদের হাত আঁকত।   

এখানে কিছু শিল্পকলাও রয়েছে, যেমন গুয়ানাকোস ও রিয়া পক্ষী সহ মানুষ এবং পশুদের সম্মিলিত শিকারের দৃশ্য এবং এর পাশাপাশি বিভিন্ন আকৃতি এবং আঁকাবাঁকা বিমূর্ত নকশা দেখা যায়।

আরো পড়ুন: কূপ খুঁড়েই বাংলায় প্রথম ফাঁসি দেয়া হয় যে অভাগাকে

ধারণা করা হয় গুহাচিত্রের ব্যক্তিরা হলো ১৯ শতকের ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারী পান্টোগোনিয়ায় ঐতিহাসিক (শিকারী গোত্রের) সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষ হতে পারে।

কেন গুহার ভিতরে এই হাতের ছাপ দেয়া হয়েছে? 

শিকারে যাওয়ার আগে এই হাতের ছাপগুলো দেয়া হতে পারেকারো মতে একটি অনুষ্ঠান বা রীতির অংশ হিসাবে কিশোর বয়সের হাতগুলোর ছাপ রেখে দেয়া হয়েছিল। কারণ হাতের ছাপগুলো দেখলে বোঝা যায় যে প্রাপ্তবয়স্কদের হাতের ছাপ নয়। আরেকটি জনপ্রিয় তত্ত্ব হল যে চিত্রগুলো একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। যা শিকারে বের হওয়ার আগে করা হয়। আবার হতে পারে শিকারে কত জন গেল এবং ফিরে এলো তার হিসাব রাখা হত এভাবে। তবে এগুলো সবই ধারণা মাত্র।   

যে কারণেই হাতের ছাপ দেয়া হোক না কেন গুহাটি মানবজাতির একটা বড় সম্পদ এটাই সবচেয়ে বড় কথা। এই গুহাটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকাভুক্ত। ১৯৯১ সাল থেকে, ল্যান্ডমার্ক ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ লিস্টে রয়েছে এবং এটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত। 

চাইলে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন এই ঐতিহাসিক স্থান থেকে। সাক্ষী হতে পারেন হাজার হাজার বছর আগের মানুষের হাতের ছাপের। এজন্য অবশ্য আপনাকে যেতে হবে আর্জেন্টিনার সান্টা ক্রুজ প্রদেশে।  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে