ঢাকার আদি মন্দির ‘ঢাকেশ্বরী’র অজানা ইতিহাস

ঢাকা, শুক্রবার   ২৭ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৩ ১৪২৭,   ১০ রবিউস সানি ১৪৪২

ঢাকার আদি মন্দির ‘ঢাকেশ্বরী’র অজানা ইতিহাস

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৪৮ ২২ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১২:৫২ ২২ অক্টোবর ২০২০

ছবি: ঢাকেশ্বরী মন্দির

ছবি: ঢাকেশ্বরী মন্দির

একসময় পাকিস্তানি সেনার গোলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে বাংলাদেশ সরকার সংস্কার করে ফের ফিরিয়ে আনে সেটিকে। 

বুড়িগঙ্গার তীরে মহানগর ঢাকার বিখ্যাত মন্দির দেশী-বিদেশী পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ কেন্দ্র। বলছি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী মন্দিরে কথা। 

ঢাকার পুরোনো ইতিহাস ঐতিহ্য এবং সনাতন ধর্মের সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো ঢাকার শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির। 

ধারণা করা হয়, সেন রাজবংশের রাজা বল্লাল সেন ১২শ শতাব্দীতে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে সেই সময়কার নির্মাণশৈলীর সঙ্গে এর স্থাপত্যকলার মিল পাওয়া যায় না বলেও অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন।

এই মন্দির বাংলাদেশের জাতীয় সম্পত্তি। কথিত আছে, দেবী স্বয়ং মহানগর ঢাকার রক্ষাকত্রী। তাই তিনি ঢাকার ঈশ্বরী অর্থাৎ ঢাকেশ্বরী।

রাজধানীর নামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মন্দিরটির নামে যেমন মিল, তেমনই মিল রয়েছে নামকরণেও। এই মন্দিরের নামকরণ করা হয়েছে ‘ঢাকার ঈশ্বরী’ অর্থাৎ শহরের রক্ষাকর্ত্রী দেবীর নাম অনুসারে। 

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে নানা কাহিনী প্রচলিত আছে। ধারণা করা হয়, সেন রাজবংশের রাজা বল্লাল সেন ১২শ শতাব্দীতে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে সেই সময়কার নির্মাণশৈলীর সঙ্গে এর স্থাপত্যকলার মিল পাওয়া যায় না বলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন। 

কেউ কেউ দাবি করেন, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের আগমনের পূর্বে তথা সেন বংশের রাজত্বকালে বাংলার স্থাপত্যশিল্পে চুন-বালি মিশ্রণের ব্যবহার ছিল না। 

তবে ঢাকেশ্বরী মন্দিরটি আগাগোড়া চুন-বালির গাঁথনিতে নির্মিত। যা বাংলার মুসলিম আমলেরই স্থাপত্যরীতির বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন সময়ে এই মন্দিরের গঠন ও স্থাপনার নানা ধরনের পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরধারণা করা হয়, এটি ঢাকার আদি ও প্রথম মন্দির। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন, ঢাকেশ্বরী শব্দ থেকেই ঢাকা নামের উৎপত্তি। ঢাকেশ্বরী দেবী ঢাকা অধিষ্ঠাত্রী বা পৃষ্ঠপোষক দেবী। 

কিংবদন্তি অনুযায়ী, রাজা আদিসুর তার এক রানিকে বুড়িগঙ্গার এক জঙ্গলে নির্বাসন দেয়। জঙ্গলে রানি প্রসব করে পুত্র বল্লাল সেনকে। জঙ্গলেই বেড়ে ওঠে বল্লাল সেন। শৈশবে জঙ্গলের মধ্যে বল্লাল সেন একটি দেবী মূর্তি পান (মতান্তরে, রাজ ক্ষমতায় বসার পর এই জঙ্গলে তিনি মূর্তিটি পান)। 

বল্লাল সেন বিশ্বাস করতে শুরু করে জঙ্গলে সব বিপদ-আপদ থেকে এই দেবী দুর্গাই তাকে রক্ষা করছে। পরে বল্লাল সেন রাজ ক্ষমতায় অসিন হলে তার জন্মস্থানে যেখানে দেবীর মূর্তি পেয়েছিলেন সেখানে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। 

মূর্তিটি জঙ্গলে ঢাকা অবস্থায় পেয়েছিলেন যায় বলে দেবীর নাম হয় ‘ঢাকা+ঈশ্বরী’ বা ‘ঢাকেশ্বরী’। মন্দিরটিও ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির’ নামে পরিচিতি পায়।

অপর কিংবদন্তি মতে, রানি, রাজা বিজয় সেনের স্ত্রী স্নান করার জন্য লাঙ্গলবন্দ গিয়েছিলেন। ফিরে আসার সময় তিনি একটি পুত্রকে জন্ম দেন, যিনি বল্লাল সেন বলে পরিচিত হন। 

সিংহাসনে উঠার পর, বল্লাল সেন তার জন্মস্থানকে মহিমান্বিত করার জন্য এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। কিংবদন্তী যে বল্লাল সেন একবার জঙ্গলে আচ্ছাদিত দেবতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। 

বল্লাল সেন সেখানে দেবীকে আবিষ্কৃত করেন এবং একটি মন্দির নির্মাণ করান। মূর্তিটি ঢাকা ছিল বলে ঢাকেশ্বরী নামকরণ হয়।

কেউ বলেন বল্লাল সেন মন্দিরটি তৈরি করেননি, তো কারোর আবার দাবি তিনিই এই ঐতিহাসিক মন্দিরটির স্থপতি। আরও একটি প্রবাদ, সতী দেহ ছিন্ন হবার পর এই স্থানে তার কিরীটের ডাক এই জায়গায় পড়ে তাই এটা উপ-পীঠ। 

মন্দির প্রাঙ্গণডাক হলো উজ্জ্বল গহনার অংশ। ডাক থেকেই ঢাকেশ্বরী নামের উৎপত্তি। তবে এই মত-বিরোধকে আপাতত দূরে সরিয়ে রেখে এই প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পে মনোনিবেশ করা যাক।

শিউলির ছোঁয়ায় শরতের ভোর জানিয়ে দেয় ওপার বাংলার শারদোৎসবের দিনলিপি। কাশফুলের শুভেচ্ছায় সাড়ম্বরে আরাধনা হয় দেবী দুর্গার। 

বাংলাদেশে শারদোৎসবের মূল কেন্দ্র হল রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঢাকেশ্বরী মন্দির। শারদোৎসবের চারটি দিন হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়ে জমজমাট থাকে এই মন্দির প্রাঙ্গন।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরটি কয়েকটি মন্দির ও সৌধের সমষ্টি। এই মন্দিরকে দু’টি ভাগে বিভক্ত করা যায়। পূর্বদিকে অন্তর্বাটি ও পশ্চিমদিকে বহির্বাটি। অন্তর্বাটিতে রয়েছে প্রধান মন্দির, নাটমন্দির। 

বহির্বাটিতে আছে কয়েকটি মন্দির, একটি পান্থশালা ও বেশ কয়েকটি ঘর। পরিবেশ ও বেশ মনোরম। মন্দিরের পশ্চিম দিকে রয়েছে একটি প্রাচীন দিঘি। দিঘির দক্ষিণ-পূর্ব কোণে আছে একটি প্রাচীন বটগাছ। 

ওই দিঘি সংলগ্ন জমিতেই রয়েছে কয়েকটি সমাধি। আবার দিঘির উত্তর-পূর্ব কোণে একই সারিতে একই রকম দেখতে চারটি ছোটো মন্দির রয়েছে।

সবার মঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে একটি লাইব্রেরী রয়েছে। এটি মন্দিরের প্রশাসনিক ভবনের ২য় তলায় অবস্থিত। এখানে অন্যান্য পাঠাগারের মত টেবিল-চেয়ারের ব্যবস্থা থাকলেও তা মন্দিরে আগত দর্শনার্থী বা অতিথীদের জন্য নয়। 

তবে এখানে ম্যানেজমেন্ট কমিটি বা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন কমিটির সদস্য ও কর্তারা এখানে বসে বিভিন্ন ধর্মীয় আলোচনা ও বিশ্লেষণ করেন। 

তাই এই লাইব্রেরী কক্ষটি বর্তমানে সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। এটি এখন সভাকক্ষ হিসেবে ব্যবহার হয়। তবে এই পাঠাগারে হিন্দু ধর্মীয় সকল প্রকার বই সংগ্রহীত আছে। বই সংখ্যা ৫০০টি।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পরেই পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় এবং একচাটিয়া সংখ্যালঘু হিন্দু নিষ্পেষণ শুরু হয়। 

মন্দিরের সৌধ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার জরুরি ভূমি গ্রহণ আইন পাশের মাধ্যমে এবং ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পরে ১৯৬৯ সালে শত্রু সম্পত্তি আইন (বর্তমান নাম অর্পিত সম্পত্তি আইন) নামক কালা কানুন পাশ করে সংখ্যালঘু হিন্দুদের জায়গা জমি দখলের রাস্তা প্রশস্ত হয়।

এরপরে ১৯৭১ সালে এবং ১৯৯০ ও ১৯৯২ সালে বিভিন্ন সময়ে দফায় দফায় হিন্দুদের উপর সাম্প্রদায়িক নিষ্পেষণের কারনে মন্দিরের অনেক সেবায়েত এবং পুরোহিত দেশ ত্যাগে বাধ্য হন। যার ফলশ্রুতিতে এক শ্রেণীর অসাধু সরকারী কর্মকর্তার যোগসাজশে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জায়গা বেদখল হয়ে যায়

উল্লেখ্য, তৎপরবর্তী সময় থেকে আজ অবধি এই মন্দিরটি কালক্রমে ঢাকার জাতীয় মন্দির হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি ঢাকেশ্বরী মন্দিরটি তত্ত্ববধায়ন ও নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। 

বর্তমানে এখানে প্রতি বছর ধুমধামের সঙ্গে সনাতন ধর্মের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই মন্দিরে প্রতিদিনই ঈশ্বরের প্রার্থনা করা হয়। প্রতি শুক্রবার- মা সন্তোষী, শনিবার শনিদেবের পূজা, রোববার কীর্তন হরী সেবা, সোমবার শিব পূজা, মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার দেবীদূর্গার পুজা-অর্চনা করা হয়। 

পাশাপাশি সাপ্তাহিক পূজাও হয়ে থাকে। আর প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় আরতি তো থাকেই। আক্ষরিক যেনো ১২ মাসে ১৩ পূজা! মন্দিরটি বহু পুরনো হলেও এখানে প্রতিদিন বহু অতিথি ও পূণ্যার্থীদের আনাগোনা বেশী। তাই এখানে পূজা করতে আসা ভক্তরা নানান মানত করে প্রনামী, দক্ষিণা ও অনুদান দিয়ে থাকেন। 

এসব অনুদান শ্রী-শ্রী ঢাকেশ্বরী মন্দিরের অনুদান ও প্রনামী বাক্সে ফেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব অর্থ মন্দিরের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়। প্রতিদিন দুপুরে অন্নভোগের ব্যবস্থাও থাকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস